লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
কুরআন অভিবাদনের ভাষা হিসেবে “সালাম”–কে একটি সুস্পষ্ট নৈতিক ও আখিরাতমুখী ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করে। কুরআনের ভাষায় সালাম কখনো দোয়া, কখনো জান্নাতের অভিবাদন, আবার কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তির ঘোষণা। অথচ প্রচলিত কিছু হাদিসে সালামকে নির্দিষ্ট বাক্য-রূপ, স্তরভেদ ও শব্দ-সংযোজনের প্রতিযোগিতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—কুরআনের আলোকে মুসলিমরা কীভাবে সালাম বিনিময় করবে? এবং রাসূল কি নিজে সালাম প্রত্যাশী ছিলেন?
আরবি:
سَلَامٌ عَلَيْكُمْ
বাংলা অর্থ:
“তোমাদের উপর শান্তি।”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৪৬; আর-রা‘দ ১৩:২৪; আন-নাহল ১৬:৩২; আয-যুমার ৩৯:৭৩)
আরবি:
سَلَامٌ
বাংলা অর্থ:
“শান্তি।”
(সূরা ইবরাহীম ১৪:২৩; আল-আহযাব ৩৩:৪৪; ইয়াসীন ৩৬:৫৮; আয-যুখরুফ ৪৩:৮৯; ক্বাফ ৫০:৩৪; আয-যারিয়াত ৫১:২৫; আল-ওয়াকিয়া ৫৬:২৬, ৯১; আল-কদর ৯৭:৫)
➡️ কুরআনে কোথাও “আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু”—এই পূর্ণ বাক্যটি নেই।
আরবি:
وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا
বাংলা অর্থ:
“তোমাদেরকে যখন অভিবাদন করা হয়, তখন তোমরাও তা অপেক্ষা উত্তম প্রত্যাভিবাদন করো অথবা তারই অনুরূপ করো।”
(সূরা আন-নিসা ৪:৮৬)
➡️ এখানে শব্দসংযোজনের তালিকা নয়, বরং আচরণগত সৌজন্য নির্দেশ করা হয়েছে।
১) সালামের স্তরভেদ
আরবি:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
বাংলা অর্থ:
এক ব্যক্তি বলল: “আস্সালামু আলাইকুম।”
আরেকজন বলল: “আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।”
আরেকজন বলল: “আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।”
(তিরমিযি, আবূ দাঊদ; মেশকাত ৯/৪৪৩৯)
২) আরও সংযোজন
আরবি:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ وَمَغْفِرَتُهُ
বাংলা অর্থ:
“আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, ওয়া মাগফিরাতুহু।”
(আবূ দাঊদ; মেশকাত ৯/৪৪৪০)
৩) রাসূল সালাম প্রত্যাশী—বর্ণনা
আরবি:
كَانَ إِذَا جَاءَ الرَّجُلُ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: ارْجِعْ فَقُلِ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ
বাংলা অর্থ:
“কেউ রাসূলের কাছে এলে তিনি বলতেন: ফিরে যাও এবং এসে বলো—‘আস্সালামু আলাইকুম।’”
(তিরমিযি, আবূ দাঊদ; মেশকাত ৯/৪৪৬৬)
এখানে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—
আরবি:
وَإِذَا جَاءَكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِنَا فَقُلْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ
বাংলা অর্থ:
“যখন তোমার কাছে তারা আসে যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে, তখন তুমি বলো—‘সালামুন আলাইকুম।’”
(সূরা আল-আন‘আম ৬:৫৪)
➡️ এখানে রাসূল সালাম দেন, সালাম গ্রহণের প্রত্যাশী নন।
কুরআনে সালাম এসেছে—
কোথাও নির্দিষ্ট বাক্যবন্ধনী, শব্দসংখ্যা বা অতিরিক্ত সংযোজনকে ফরজ/সুন্নত করা হয়নি।
সূরা ৪:৮৬–এর “উত্তম” বলতে বোঝায়—
শব্দ বাড়ানো নয়, বরং মানসিকতা উন্নত করা।
কুরআনের আলোকে স্পষ্ট হয়—
হাদিসে সালামকে যেভাবে শব্দ-স্তর, অতিরিক্ত সংযোজন ও আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা হয়েছে—তা কুরআনের সরলতা ও সার্বজনীনতার সাথে খাপ খায় না।
কুরআনের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত—
ফয়সালা:
কুরআন থেকে উত্তর দেওয়াটাই উত্তম।
সালাম কুরআনের—সরল, সার্বজনীন ও মর্যাদাপূর্ণ।
যে বর্ণনা এই কাঠামোর বাইরে গিয়ে সালামকে আনুষ্ঠানিক ও স্তরভিত্তিক করে তোলে, তা কুরআনিক মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ।
