লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
কুরআন পরিচ্ছদকে মানুষের প্রয়োজন, সৌন্দর্য ও সুরক্ষা–এর উপকরণ হিসেবে উপস্থাপন করে এবং “তাকওয়ার পরিচ্ছদ”-কে নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে। অথচ প্রচলিত কিছু হাদিসে টাখনার নিচে কাপড় গেলেই জাহান্নাম, এমনকি “আল্লাহ তাকাবেন না”—এমন ভয়াবহ শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এতে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে—আল্লাহ কি পরিচ্ছদের দৈর্ঘ্যের কারণে মানুষকে জাহান্নামে দেবেন? কুরআনের ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার কাঠামোর সঙ্গে এটি কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আরবি:
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ
বাংলা অর্থ:
“হে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ অবতীর্ণ করেছি—যা তোমাদের লজ্জাস্থান আচ্ছাদন করে এবং সৌন্দর্যও বর্ধন করে; আর তাকওয়ার পরিচ্ছদ—এটাই সর্বোত্তম।”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২৬)
আরবি:
وَجَعَلَ لَكُمْ سَرَابِيلَ تَقِيكُمُ الْحَرَّ
বাংলা অর্থ:
“তিনি তোমাদের জন্য পরিধেয় বস্ত্রের ব্যবস্থা করেছেন—যা তোমাদের তাপ থেকে রক্ষা করে।”
(সূরা আন-নাহল ১৬:৮১)
সারকথা: কুরআন পরিচ্ছদের তিন উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে—
১) লজ্জাস্থান আচ্ছাদন, ২) সৌন্দর্য, ৩) আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা।
এখানে দৈর্ঘ্য, টাখনা, মাপ—এসবকে নৈতিক শাস্তির মানদণ্ড বানানো হয়নি। বরং স্থান–কাল–পাত্রভেদে পরিচ্ছদের রূপ পরিবর্তন স্বাভাবিক।
এই বর্ণনাগুলো একত্রে ধরলে যে সমস্যাগুলো দাঁড়ায়—
আরবি:
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ
বাংলা অর্থ:
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জিত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ।”
(সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩৮)
➡️ শাস্তির মানদণ্ড কর্ম ও নিয়ত, কাপড়ের সেন্টিমিটার নয়।
আরবি:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ
বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।”
(সূরা আন-নিসা ৪:৪০)
➡️ দৈর্ঘ্যভিত্তিক চরম শাস্তি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তোলে।
কুরআন বারবার তাকওয়াকে শ্রেষ্ঠ পরিচ্ছদ বলে—অর্থাৎ নৈতিকতা, বিনয়, সংযম।
টাখনার মাপ নয়, অহংকার যদি অপরাধ হয়—তবে অপরাধ অহংকারই; দৈর্ঘ্য নয়।
কুরআনের কাঠামো অনুযায়ী—
যদি হাদিসগুলোর কিছু বর্ণনায় ‘অহংকার’ উদ্দেশ্য থাকে, তবে সেটিকে নৈতিক উপদেশ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা যায়। কিন্তু দৈর্ঘ্যকেই চিরস্থায়ী শাস্তির কারণ বানালে তা কুরআনিক ন্যায় ও যুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না।
কুরআনের আলোকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত—
ফয়সালা:
পরিচ্ছদ স্থান–কাল–পাত্রভেদে।
যে বর্ণনা পরিচ্ছদের দৈর্ঘ্যকে জাহান্নামের কারণ বানায়, তা কুরআনিক মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ।
