কুরআন আমাদের সামনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কেবল একজন ইতিহাসের মানুষ হিসেবে নয়, বরং চরিত্রের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তিনি কুরআনের ভাষায় “উসওয়াতুন হাসানাহ”—অনুসরণযোগ্য আদর্শ। তাঁর জীবনের প্রতিটি দিক ঈমানদারদের জন্য নৈতিক শিক্ষা। এই কারণেই কুরআন নবী (সা.)-এর ব্যক্তিগত জীবন বর্ণনায় চরম সংযম, শালীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করেছে।
কিন্তু কুরআনের বাইরে প্রচলিত কিছু বর্ণনায় এমন সব কাহিনি পাওয়া যায়, যেগুলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই কুরআনিক মর্যাদার সাথে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত। এর মধ্যে একটি হলো—নবীজি (সা.) নাকি লোকজনের সামনে নগ্ন অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন, এবং বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আর তাঁকে কোনোদিন নগ্ন দেখা যায়নি।
এই প্রবন্ধে আমরা উক্ত হাদিসটি কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ করব—এটি আদৌ কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
হাদিস (আরবি):
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَنْقُلُ مَعَهُمْ الْحِجَارَةَ لِلْكَعْبَةِ وَعَلَيْهِ إِزَارُهُ، فَقَالَ لَهُ عَبَّاسٌ عَمُّهُ: يَا ابْنَ أَخِي، لَوْ حَلَلْتَ إِزَارَكَ فَجَعَلْتَهُ عَلَى مَنْكِبَيْكَ دُونَ الْحِجَارَةِ؟ قَالَ: فَحَلَّهُ فَجَعَلَهُ عَلَى مَنْكِبَيْهِ، فَخَرَّ مَغْشِيًّا عَلَيْهِ، فَمَا رُئِيَ بَعْدَ ذَلِكَ عُرْيَانًا ﷺ
বাংলা অর্থ:
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন— নবী (সা.) কা‘বা নির্মাণের সময় লোকদের সাথে পাথর বহন করছিলেন এবং তাঁর পরনে ছিল ইজার (কোমরের কাপড়)। তখন তাঁর চাচা আব্বাস বললেন, “হে আমার ভাতিজা! তুমি যদি তোমার ইজার খুলে কাঁধে রেখে পাথর বহন করতে?” বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাঁর ইজার খুলে কাঁধে রাখলেন, তখনই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। এরপর আর কখনো তাঁকে নগ্ন অবস্থায় দেখা যায়নি।
তথ্যসূত্র:
সহিহ বুখারী- ১ম খণ্ড, হাদিস ৩৬০
এই বর্ণনায় যে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে দাবি করা হচ্ছে—
১. নবীজি (সা.) লোকজনের সামনে নিজের পরিধেয় কাপড় খুলেছেন
২. তিনি নগ্ন অবস্থায় ছিলেন
৩. সেই নগ্ন অবস্থায় তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন
৪. বর্ণনাকারী এটিকে নবীজির লজ্জাবোধের “প্রমাণ” হিসেবে উপস্থাপন করেন
এখন প্রশ্ন হলো—এই কাহিনি কি কুরআনে উপস্থাপিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
কুরআন রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে বলে—
وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ
“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।”
(সূরা আল-কলম ৬৮:৪)
এই “মহান চরিত্র” কেবল সত্যবাদিতা বা দয়া নয়; এর মধ্যে শালীনতা, লজ্জাবোধ ও আত্মমর্যাদা অন্তর্ভুক্ত।
আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
(সূরা আল-আহযাব ৩৩:২১)
একজন আদর্শ কি এমন হতে পারে, যাঁকে লোকজনের সামনে নগ্ন হয়ে অজ্ঞান হতে দেখা যায়?
কুরআনের নৈতিক দর্শনে লজ্জা একটি মৌলিক মূল্যবোধ। আল্লাহ বলেন—
قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ
“বলুন, নিশ্চয়ই আল্লাহ অশ্লীলতার নির্দেশ দেন না।”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২৮)
নগ্নতা কুরআনের দৃষ্টিতে কখনোই ইতিবাচক বা প্রশংসনীয় বিষয় নয়। বরং আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর কাহিনিতে নগ্নতা এসেছে লজ্জা ও পরীক্ষার প্রতীক হিসেবে, কোনো শিক্ষা প্রদানের সৌন্দর্য হিসেবে নয়।
এই হাদিসে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু ভয়ংকর ধারণা নিহিত আছে—
যেন রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথমে বুঝতেন না যে নগ্ন হওয়া অনুচিত, পরে অজ্ঞান হয়ে গিয়ে “শিক্ষা” পেলেন।
কিন্তু কুরআন বলে—
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ
“তিনি নিজ খেয়াল থেকে কথা বলেন না।”
(সূরা আন-নাজম ৫৩:৩)
যিনি খেয়াল থেকে কথা বলেন না, তিনি কি সামাজিক শালীনতা বোঝার জন্য অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনার মুখাপেক্ষী হতে পারেন?
কুরআন সাক্ষ্য দেয় যে, ওহির আগেও নবীজি (সা.) ছিলেন সত্যবাদী ও আমানতদার। মক্কার মানুষ তাঁকে “আল-আমিন” বলত। এমন একজন ব্যক্তি লোকজনের সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের কাপড় খুলে ফেলবেন—এটা মানবিক যুক্তির সাথেও অসঙ্গত।
কুরআন কখনোই নবীর মর্যাদা বোঝাতে নাটকীয়, শারীরিক বা বিব্রতকর দৃশ্যের আশ্রয় নেয় না। বরং কুরআনের পদ্ধতি হলো—
নৈতিক ঘোষণা, স্পষ্ট অবস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ ভাষা।
এই হাদিসের বর্ণনা ঠিক উল্টো—
একটি নাটকীয় দৃশ্য, শারীরিক নগ্নতা, অজ্ঞান হয়ে পড়া—যা কুরআনের রুচির সাথে একেবারেই বেমানান।
কুরআনের আলোকে সঠিক অবস্থান হলো—
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন জন্মগতভাবেই শালীন, লজ্জাশীল ও মর্যাদাবান। তাঁর চরিত্র কোনো “ভুল করে শিক্ষা নেওয়া”র ফল নয়; বরং আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ।
অতএব যে বর্ণনা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে লোকজনের সামনে নগ্ন ও অজ্ঞান অবস্থায় উপস্থাপন করে, তা কুরআনের এই স্পষ্ট অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক।
ইসলাম কোনো নাট্যধর্মী ধর্ম নয়, যেখানে নবীদের চরিত্র রক্ষার জন্য বিব্রতকর দৃশ্য প্রয়োজন হয়। কুরআন নবীদের মর্যাদা রক্ষা করে শব্দের শালীনতায়, নৈতিক ঘোষণায় ও আল্লাহর সরাসরি সাক্ষ্যে। যে কোনো বর্ণনা যদি এই কুরআনিক নীতিকে ভেঙে দেয়, তবে সেটিকে প্রশ্ন করা ঈমানবিরোধী নয়—বরং কুরআনকেন্দ্রিক চিন্তার অনিবার্য দাবি।
“কুরআন সত্য–মিথ্যার মানদণ্ড;
কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ,
না মিললে—নির্দ্বিধায় বর্জন।”
