বর্তমানে আমরা চারদিকে একটি কথার গুঞ্জন শুনতে পাই! তাহলো হাদিস অস্বীকারকারী। কথায় কথায় আজ শুনি অমুকে হাদিস মানে না, অমুকে হাদিস অস্বীকার করে, অমুকে কাফের হয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
চলুনতো একটু পর্যবেক্ষণ করি হাদিস অমান্য বা অস্বীকার কারী লোকগুলো কারা? চলুন আজ আমরা হাদিস অস্বীকার কারীদের মুখোস উম্মোচন করবো ইনশাআল্লাহ।
আলোচনার শুরুতেই আমাদের জানা উচিৎ হাদিস অস্বীকারকারী কাকে বলে এবং কিভাবে হয়?
(হাদিস শব্দের অর্থ হলোঃ কথা, বানী, সংবাদ, খবর ইত্যাদি। আর পারিভাষিক অর্থ হলোঃ নবী সাঃ এর কথা, কাজ এবং তার মৌনসম্মতিকে হাদিস বলা হয়)
♦ এবার আসুন আমরা জেনে নেই হাদিস অস্বীকারকারীদের পরিচয়-
যারা নবীর হাদিস সমুহকে হাদিস হিসেবে স্বীকার করেনা তারাই হাদিস অস্বীকার কারী। আর হাদিস অমান্য করা অস্বীকার করারই নামান্তর। যারা কতেক হাদিস অমান্য করে তারাও মুলত হাদিস অস্বীকার করে। হাদিস অমান্যকারী ও হাদিস অস্বীকার কারী এই দুই শ্রেণির মানুষই সমান অপরাধী।
★ হাদিস অমান্যকারী ও অস্বীকারকারীর শাস্তি কি? একথা সকলেরই জানা এবং সকল হাদিসের শায়েখগণের ফতোয়া হলো, হাদিস অস্বীকার ও অমান্যকারী হল কাফির ও মুরতাদ। হাদিস অস্বীকার কারীগণ কাফির ও মুরতাদ এ ফতোয়াটি তারা হাদিস ও ফেকাহ থেকেই দিয়ে থাকেন। এই সমস্ত হাদিস অস্বীকারকারীদের শাস্তি সরুপ তাদেরকে দিনে দুপুরে খোলামাঠে জবেহ করে রক্ত প্রবাহিত করতে হবে বলে কোন কোন হাদিসের শায়েখগণ ফতোয়া দিয়ে থাকেন। অথচ পবিত্র কুরআনে এমন কোন ফতোয়া আল্লাহ দেননি। এমনকি কুরআনে কুরআন ব্যাতিত আর কোন কিতাব মানতে হবে এমন কোন শর্ত করা হয়নি।
আজ আমাদের মুল আলোচনার বিষয় হলো হাদিস অসীকারকারীদের পরিচয়। সুতরাং চলুন আমরা আর সময় নষ্ট না করে মুল আলোচনায় ফিরে যাই।
ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাই (হাদিস অস্বীকার) প্রায় সাহাবাদের (রাঃ) এর যুগ থেকেই শুরু হয়েছে কিন্ত তা কেউ উপলব্ধি করেনাই। কারণ সাহাবা রাঃ এর যুগে গ্রন্থাকারে কোন হাদিসের কিতাব লিপিবদ্ধ হয়নি। যেহেতু তখন হাদিসের কিতাব লিপিবদ্ধই হয়নি সেহেতু হাদিস বা হাদিসের কিতাব অস্বীকারের প্রশ্নই উঠেনা। যেমন আপনাকে কেউ "আলেমের পিতা" বলে অসীকার করলো "অথচ আপনার তখনো বিয়েই হয়নি, তাহলে এই অসীকারের কোন মানেই হয়না। যখন আপনার বিয়ে হবে, ছেলে সন্তান থাকবে, তখন বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বা আনলে এর একটি যুক্তি থাকে।
হাদিস অসীকার কারীদের ব্যাপক আবির্ভাব তখনি ঘটে যখন হাদিসের কিতাব লিপিবদ্ধ হওয়ার কাজ শুরু হয়। আপনি হয়তো অবাক হবেন এটা জেনে যে, "যারা হাদিস লিপিবদ্ধ করে তারাই সর্বপ্রথম হাদিস অস্বীকার করে।"
আমি এখন তাদের পরিচয় ধারাবাহীক ভাবে উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ। আজকের এ বিষয়টি এত বড় যে, বিস্তারিত লিখার আমার ধৈর্য হবেনা। তাই বিষয়টি সংক্ষেপেই শেষ করবো। আমার সাথে শেষ পর্যন্ত থাকার অনুরোধ রইলো। খুবই সামান্য লিখনি তাই শুরু থেকে শেষ অবধী পড়বেন। মাঝে মাঝে ছেড়ে ছেড়ে পড়লে আপনি লিখনির মুল বিষয়বস্তু বুঝতে পারবেননা। চলুন নিম্নে আলেমদের দৃস্টিকোন থেকে হাদিস অস্বীকারকারীদের নাম, পরিচয়, কারণ ও প্রমান নিয়ে আলোচনা করি…
১। প্রথম হাদিস অস্বীকারকারী হলেন ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)
আবু হানিফা আল-নোমান ইবনে সাবিত ইবনে যুতা ইবনে মারযুবান (৬৯৯-৭৬৭ সাল/৮০-১৪৮ হিজরি।)
আরবি নামঃ ( نعمان بن ثابت بن زوطا بن مرزبان), "আবু হানিফা" তার উপনাম। তিনি ইমাম আবু হানিফা নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ফিকহ্ শাস্ত্রের একজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ আলেম ছিলেন। এবং হিজরি প্রথম শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ইমাম আবু হানিফার বিষয়ে চতুর্থ খলিফা দোয়া করেছিলেন।
ইসলামি ফিকহের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও পরিচিত চারটি "সুন্নি মাযহাবের" একটি হল “হানাফি মাজহাব”-এই মাযহাবের তিনিই প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি তার জ্ঞান এবং সম্মানের কারণে সুন্নি ইসলামে আল-ইমাম আল-আজম (সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম) নামে পরিচিত। এই উপাধি ইমাম আবু হানিফা ব্যতীত ইসলামের ইতিহাসে আর কাউকে দেয়া হয়নি।
তিনি কিভাবে হাদিস অস্বীকারকারী হলেন?
তিনি ইমাম আবু হানিফা (রঃ) সর্বপ্রথম হাদিস সমুহ লিখিত গন্থাকারে রুপ দেন। তার হাদিস গ্রন্থের নাম হল "কিতাবুল আসার"। এই হাদিসের কিতাবটিতে "মাকতাবা শামিলা" অনুসারে প্রায় এক হাজার হাদিস রয়েছে। প্রাচীনতম হাদিস গ্রন্থগুলির মধ্যে এটিই প্রথম। কিতাবটিতে অনেক হাদিস রয়েছে যা নবী (সাঃ) এর সাথে সরাসরি সংযুক্ত।
ইমাম আবু হানীফা (র)-এর সংকলিত 'কিতাবুল আ'সার' সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেনঃ
وَالْمَوْجُودَ مِنْ حَدِيثٍ أَبِي حَنِيفَةَ مُفْرَدًا إِنَّمَا هُوَ كِتَابُ الْآثَارِ الَّتِ رَوَاهَا مُحَمَّدُ بْنِ حَنْهَا مُحَمَّدُ بْنِ حَنْهَا
ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) বর্ণিত স্বতন্ত্র হাদীস-গ্রন্থ বর্তমান। আর তা হলো 'কিতাবুল আ'সার'; এটা তাঁর নিকট হতে মুহাম্মাদ ইবনে হাসান বর্ণনা করেছেন। (হাদিস সংকলনের ইতিহাস পৃঃ ৩১২)
'কিতাবুল আ'সার' নামক হাদীসগ্রন্থখানি প্রণয়নের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ব্যাপকভাবে হাদীস সংগ্রহ ও ছাঁটাই-বাছাই করেছেন।
সদরুল আয়িম্মা মুয়াফফিক ইবনে আহমদ মক্কী তাঁহার গ্রন্থে লিখেছেনঃ
’ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) চল্লিশ হাজার হাদীস হতে ছাঁটাই-বাছাই করে 'কিতাবুল আ'সার'-এর এই গ্রন্থখানি প্রণয়ন করেন। (হাদিস সংকলনের ইতিহাস পৃঃ ৩১৩)
ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর সংগ্রহীত হাদীসের বিপুলতা ও উহা সামান্য পরিমাণ বর্ণনা করা সম্পর্কে স্বয়ং ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-নিজেই বলেছেনঃ-
আমার নিকট কয়েক সিন্দুক ভর্তি লিখিত হাদীস-সম্পদ মওজুদ আছে। কিন্তু আমি তাহতে অতি অল্প সংখ্যকই প্রকাশ ও বর্ণনা করেছি যা লোকদের ব্যবহারিক জীবনের উপকার দিবে। (হাদিস সংকলনের ইতিহাস পৃঃ ৩১৩)
এবার একটু ভেবে দেখুন। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) চল্লিশ হাজার হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, সেখান থেকে মাত্র এক হাজার হাদিস "কিতাবুল আসারে" উল্যেখ করে গেছেন। অবশিষ্ট উনচল্লিশ হাজার হাদিস তিনি বাতিল করে দিয়েছেন। এর মানে হল.. তিনি এই উনচল্লিশ হাজার হাদিসকে হাদিস হিসেবে অস্বীকার করেছেন বা অমান্য করেছেন। সেগুলো কি নবীর হাদিস নয়? সুতরাং সুত্রমতে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সর্বপ্রথম হাদিস অস্বীকারকারী ছিলেন।
عِنْدِي صَنَادِيقُ مِنَ الْحَدِيثِ مَا أَخْرَجْتُ مِنْهَا إِلَّا الْيَسِيرَ الَّذِي يُنْتَفَعُ بِهِ-
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর হাদিস অস্বীকার করার কিছু উদাহারণ দেয়া হলোঃ-
(ক) ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সবচেয়ে বড় বিতর্কিত দিক হলো, তিনি ৪০,০০০ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ১,০০০টি হাদিস "কিতাবুল আসার"-এ লিপিবদ্ধ করেছেন। তাহলে বাকিগুলো কোথায়? বাকিগুলোকে তিনি কি হাদিস হিসেবে অস্বীকার করেননি? যদি এত বিশালসংখ্যক হাদিস তিনি সংকলন না করেন বা প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে কি এটা হাদিস অস্বীকারের শামিল নয়?
(খ) নামাজে রফউল ইয়াদাইন (হাত তোলা) সংক্রান্ত সহিহ হাদিস প্রত্যাখ্যান।
সহিহ বুখারিতে এসেছে: "আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে দেখেছি, তিনি নামাজ শুরুর সময়, রুকুর আগে ও রুকু থেকে ওঠার পর কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলতেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৭৩৫)
এটি একটি সহিহ হাদিস। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এটিকে গ্রহণ করেননি এবং বলেন, নামাজের শুরুতে একবার হাত তোলা ছাড়া আর কোনো সময় হাত তোলা জায়েজ নয়!
(গ) কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার হাদিস প্রত্যাখ্যান।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমরা তোমাদের রবকে পরিস্কারভাবে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা পূর্ণিমার চাঁদকে স্পষ্ট দেখতে পাও।" (বুখারি, হাদিস ৫৫৭৩)
কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখা যাবে না!
(ঘ) গোপনাঙ্গ স্পর্শ করলে ওজু ভঙ্গের হাদিস প্রত্যাখ্যান।
তিরমিজি শরিফে এসেছে: "যে ব্যক্তি তার গোপনাঙ্গ স্পর্শ করবে, সে যেন পুনরায় ওজু করে।" (তিরমিজি, হাঃ ৮২)
কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এই হাদিসটি গ্রহণ না করে বলেন, গোপনাঙ্গ স্পর্শ করলে ওজু ভঙ্গ হয় না।
(ঙ) দুধপান সম্পর্কিত হাদিস প্রত্যাখ্যান।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মহিলার দুধ পান করবে, সে তার দুধ-মাতার মাহরাম হয়ে যাবে।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪৫৩)
কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, যদি শিশু বয়স উত্তীর্ণ হওয়ার পর কেউ দুধ পান করে, তাহলে সে মাহরাম হবে না। অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস তো স্পষ্ট!
(চ) ইজমা ও কিয়াসকে হাদিসের উপর প্রাধান্য দেওয়া।
ইসলামে কিয়াস (যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত) একটি মাধ্যম হতে পারে, তবে এটি কুরআন ও হাদিসের বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অনেক ক্ষেত্রে কিয়াসকে সরাসরি হাদিসের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।
(ছ) অনেক মুহাদ্দিসের মতে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.)
হাদিস শাস্ত্রে দুর্বল ছিলেন এবং তার কাছে সহিহ হাদিসের বিশাল সংগ্রহ ছিল না। উপরোক্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে:
তাহলে এখন আপনারাই বলুন তিনি কি হাদিসের প্রকৃত অনুসারী ছিলেন, নাকি একজন হাদিস প্রত্যাখ্যানকারী ছিলেন?
১.। হাদিস সংকলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হাদিস সংগ্রহকারী বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণ লাখ লাখ হাদিস সংগ্রহ করলেও তার অল্প অংশই তাদের গ্রন্থে সংকলন করেছেন। তাহলে কি তারা অবশিষ্ট হাদিসগুলোকে অস্বীকার করেননি? যেগুলো তারা বাতিল করেছেন সেগুলো কি নবীর হাদীস নয়? যদি কিছু হাদিস গ্রহণ করা হয় এবং কিছু হাদিস প্রত্যাখ্যান করা হয়, তাহলে কি তারা হাদিস অস্বীকারকারী নন?
২. ইমাম মালেক রহঃ ১ লাখ হাদিস থেকে মাত্র ১৭২০টি গ্রহণ!
ইমাম মালেক (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "মুয়াত্তা ইমাম মালেক" সংকলন করেছেন, যা ইসলামের প্রথম দিকের হাদিস সংকলনগুলোর মধ্যে একটি। তিনি প্রায় ১ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৭২০টি হাদিস তাঁর গ্রন্থে সংকলন করেছেন! তাহলে বাকি ৯৮,০০০+ হাদিস কেন তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন? সেগুলো কি নবীর হাদিস নয়? যদি কেউ হাদিস লিপিবদ্ধ না করে বা গ্রহণ না করে, বা প্রত্যাক্ষান করে, তাহলে কি তাকে হাদিস অস্বীকারকারী বলা যায় না?
৩. ইমাম বুখারি (রহঃ) ৬ লাখ হাদিস থেকে মাত্র ৭,৫৬৩ টি গ্রহণ!
ইমাম বুখারি (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত "সহিহ বুখারি" সংকলন করেছেন, যা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগ্রন্থ হিসেবে মানুস বিশ্বাষ করে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিনি প্রায় ৬ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মাত্র ৭,৫৬৩ টি হাদিস তাঁর বইতে লিপিবদ্ধ করেছেন!
অর্থাৎ, তিনি প্রায় ৫,৯২,০০০+ হাদিস গ্রহণ করেননি! তাহলে কি তিনি এই বিশাল পরিমাণ হাদিসকে অস্বীকার করেননি? সেগুলো কি নবীর হাদিস নয়? যদি ইমাম বুখারি লক্ষ লক্ষ হাদিস ছুড়ে ফেলে দেন, বাতিল করেন, নবীর হাদিস অস্বীকার করেন। এরপরেও তাকে হাদিস অস্বীকারকারী বলা হবেনা কেন?
অথচ অন্যকোন ব্যক্তি যদি কিছু হাদিস গ্রহণ করেন এবং কিছু হাদিস কুরআনের সাথে মিল না হওয়ার কারণে বাতিল করেন তাহলে তাদেরকে কেন মুনকিরে হাদিস বলা হবে?
এবার একটু হিসাবটা মিলিয়ে দিয়ে যান। সুন্নিদের হাদিসের সবচাইতে বড় বিখ্যাত সংগ্রহের নাম বুখারী শরীফ। এই বুখারী শরীফের সংগ্রাহক ইমাম বুখারীরও মুয়াত্তা মালেকের অনেক হাদিস ইমাম বুখারী তার বুখারী শরিফে স্থান দেননি। তাহলে ইমাম বুখারী হাদিস অস্বীকারকারী হলো কিনা??
কাহিনি আরো আছে, ইমাম বুখারীর সমসাময়িক ও উনার ছাত্র ইমাম মুসলিম যিনি সুন্নিদের দ্বিতীয় বিখ্যাত সহিহ হাদিসের গ্রন্থ মুসলিম শরীফের প্রণেতা উনাদের দুইজনের হাদিস সংগ্রহেও অনেক বৈপরীত্য বিদ্যমান। ইমাম মুসলিম এমন অন্তত ৬০০ জন রাবীর হাদিস নিয়েছেন যাদেরকে ইমাম বুখারী বিশ্বস্ত মনে করেননি।
এই ছয়শ রাবীর যদি অন্তত একটি করেও হাদিস থাকে তাহলে ইমাম বুখারী ইমাম মুসলিমের অন্তত ৬০০ হাদিস অস্বীকারকারী! এমন না যে ইমাম বুখারী এই হাদিসগুলো শুনেন নাই, শুনেছেন অবশ্যই কিন্তু সহিহ মনে না হওয়ায় নেননি। উদাহরণ স্বরূপ, বিদায় হজ্জের ভাষণের এই যে একটি জিনিস আঁকড়ে ধরে রাখার কথা বর্ণনা মুসলিম শরিফে সহিহ সনদে বর্ণিত হলেও বুখারী শরিফে নাই!
৪. ইমাম মুসলিম (রহঃ) ৩ লাখ হাদিস থেকে মাত্র ৭,২৭৫টি গ্রহণ!
ইমাম মুসলিম (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত "সহিহ মুসলিম" গ্রন্থ সংকলন করেছেন, যা সহিহ বুখারির পরেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি প্রায় ৩ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭,২৭৫টি হাদিস সংকলন করেছেন! তাহলে কি তিনি বাকি ২,৯২,০০০+ হাদিস প্রত্যাখ্যান করেননি? যদি কেউ হাদিস গ্রহণ না করাকে হাদিস অস্বীকার করা বলা হয়, তাহলে কি ইমাম মুসলিমও হাদিস অস্বীকারকারী নন?
৫. ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) ৫ লাখ হাদিস থেকে মাত্র ৪,৮০০ টি সংকলন!
ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) তাঁর "সুনান আবু দাউদ" গ্রন্থ সংকলন করেছেন, যেখানে ইসলামের ফিকহসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস সংকলিত হয়েছে। তিনি প্রায় ৫ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তিনি মাত্র ৪,৮০০টি হাদিস সংকলন করেছেন। তাহলে কি তিনি বাকি ৪,৯৫,২০০+ হাদিস প্রত্যাখ্যান করেননি? তাহলে কি হাদিস অস্বীকারকারী নন?
অন্যান্য মুহাদ্দিসগণও কি হাদিস অস্বীকারকারী?
★ ইমাম তিরমিজি (রহঃ) ৪ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তার গ্রন্থে মাত্র ৩,৯৫৬টি হাদিস সংকলন করেছেন।
★ ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ৩ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর গ্রন্থে মাত্র ৫,৭৬১টি হাদিস রয়েছে।
★ ইমাম ইবনে মাজাহ (রহঃ) ৩ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর গ্রন্থে মাত্র ৪,৩৪১টি হাদিস সংকলিত হয়েছে।
তাহলে কি এই মুহাদ্দিসগণও হাদিস অস্বীকারকারী নন?
এবার এই প্রশ্নগুলো নিজেদের বিবেককে করুন!
১. যদি কিছু হাদিস গ্রহণ করা হয় এবং কিছু হাদিস গ্রহণ করা না হয়, তাহলে কি সেটাকে "হাদিস অস্বীকার" বলা হবে?
২. যদি তা-ই হয়, তাহলে ইমাম মালেক, ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদসহ সমস্ত মুহাদ্দিস কি হাদিস অস্বীকারকারী নন!?
৩. তাহলে কি সত্যিই যারা কিছু হাদিস গ্রহণ করে এবং কিছু হাদিস গ্রহণ করে না, তারা মুনকিরে হাদিস?
হাদিস সংকলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামের বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণ ও গবেষকরা লক্ষ লক্ষ হাদিস সংগ্রহ করলেও তাদের গ্রন্থে খুবই অল্পসংখ্যক হাদিস সংকলন করেছেন। তাহলে কি তারা অবশিষ্ট হাদিসগুলো অস্বীকার করেছেন? যদি কিছু হাদিস গ্রহণ করা হয় এবং কিছু হাদিস প্রত্যাখ্যান করা হয়, তাহলে কি তাদের হাদিস মুনকির বলা হবে?
১. ইমাম দারাকুতনি (রহঃ) সহিহ বুখারির হাদিস খণ্ডন করলেন!
ইমাম দারাকুতনি (রহঃ) হাদিসের বিশাল একজন ইমাম ছিলেন। তবে তিনি সহিহ বুখারির অনেক হাদিস খণ্ডন করেছেন এবং বলেছেন যে, এসব হাদিস বিভিন্ন কারণে দুর্বল বা গ্রহণযোগ্য নয়।
তাহলে এবার কি তিনি হাদিস অস্বীকারকারী হননি? যদি কেউ সহিহ বুখারির কিছু হাদিস গ্রহণ করে এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে কি সে মুনকিরে হাদিস? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন।
২. ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ৩ লাখ হাদিস থেকে মাত্র ৫,৭৬১টি গ্রহণ!
ইমাম নাসাঈ (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত "সুনান আন-নাসাঈ" সংকলন করেছেন।
* তিনি প্রায় ৩ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন।
* কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫,৭৬১টি হাদিস সংকলন করেছেন।
* তাহলে কি তিনি অবশিষ্ট ২,৯৪,০০০+ হাদিস অস্বীকার করেছেন?
৩. ইমাম তিরমিজি ৪ লাখ হাদিস থেকে মাত্র ৩,৯৫৬টি গ্রহণ!
ইমাম তিরমিজি (রহঃ) তাঁর "সুনান আত-তিরমিজি" সংকলন করেছেন।
* তিনি প্রায় ৪ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন।
* কিন্তু তাঁর গ্রন্থে মাত্র ৩,৯৫৬টি হাদিস সংকলন করা হয়েছে।
* তাহলে কি তিনি ৩,৯৬,০০০+ হাদিস অস্বীকার করেছেন?
৪. ইমাম ইবনে মাজাহ (রহঃ) ৩ লাখ হাদিস থেকে মাত্র ৪,৩৪১টি গ্রহণ!
ইমাম ইবনে মাজাহ (রহঃ) তাঁর "সুনান ইবনে মাজাহ" সংকলন করেছেন।
* তিনি প্রায় ৩ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন।
* কিন্তু তাঁর গ্রন্থে মাত্র ৪,৩৪১টি হাদিস সংকলিত হয়েছে।
* তাহলে কি তিনি ২,৯৫,৬৫৯+ হাদিস অস্বীকার করেছেন?
৫. ইবনে হাজার আসকালানি (রহঃ) বুখারির অনেক হাদিস দুর্বল বলেছেন!
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহঃ) তাঁর "ফতহুল বারী" কিতাবে সহিহ বুখারির অনেক হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, এগুলো দুর্বল বা অন্য কোনো হাদিস দ্বারা পরিত্যাজ্য।
তাহলে কি তিনি হাদিস অস্বীকারকারী? যদি কোনো মুহাদ্দিস কোনো হাদিসকে দুর্বল বলেন বা গ্রহণ না করেন, তাহলে কি তিনি হাদিস মুনকির?
৬. শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহঃ) শত শত হাদিসকে দুর্বল বললেন!
শায়খ আলবানী (রহঃ) আধুনিক যুগের একজন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস। তিনি সহিহ হাদিস ও দুর্বল হাদিস পৃথক করার কাজে বহু বছর গবেষণা করেছেন।
* তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ—এসব গ্রন্থের অনেক হাদিসকে তিনি দুর্বল বা জাল বলেছেন। তাহলে কি তিনি এই হাদিসগুলো অস্বীকার করেছেন?
* যদি তিনি কিছু হাদিস গ্রহণ করেন এবং কিছু হাদিস গ্রহণ না করেন, তাহলে কি তাকে হাদিস মুনকির বলা হবে?
৭. সালাফি, হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি সবাই কি হাদিস অস্বীকারকারী?
প্রথমতঃ হাদিস অস্বীকারকারীদের সঙ্গবদ্ধ সংগঠনের নাম হল সালাফি বা আহলে হাদিস।
ইসলামিক শরিয়তের বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে মাযহাবভিত্তিক মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়। তবে কিছু হাদীস আছে, যেগুলো হানাফি মাযহাবের অনুসারীরা আমলের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেও, সালাফি ঘরানার আলেমগণ সেগুলোকে দুর্বল ও জাল আখ্যায়িত করে মানতে অস্বীকৃতি জানান। নিচে এমন কয়েকটি প্রসিদ্ধ হাদীস তুলে ধরা হলো:
♦ নামাজে হাত বাঁধার স্থান (নাভির নিচে)
عليٌّ رضي الله عنه قال: إن من السُّنَّة أن يضع يده اليمنى على اليسرى تحت السرَّة في الصلاة (سنن أبي داود، رقم: ৭৫৬،)
“আলী রাঃ থেকে বর্ণীত তিনি বলেন, সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত হলো—নামাজে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নিচে রাখা।” — (আলী ইবন আবি তালিব রা.)
হানাফি মতামত: এই হাদীসের ভিত্তিতে হানাফিরা নামাজে হাত বাঁধেন নাভির নিচে।
সালাফি অবস্থান: সালাফিগণ উক্ত হাদিসসহ এই মর্মে বর্ণিত আরো বেশকিছু হাদিসকে মিথ্যা ও জাল আআখ্যায়িত করে হাদিসটিকে বর্জন, অস্বীকার ও অমান্য করে।
♦ রুকু ও উঠার সময় রাফ’উল ইয়াদাইন না করা
عبدالله بن مسعود رضي الله عنه قال: ألا أصلي بكم صلاة رسول الله صلى الله عليه وسلم؟ فصلى، فلم يرفع يديه إلا مرة واحدة (سنن الترمذي، رقم: ৩৪২، وقال: حسن)
“আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ থেকে বর্নীত তিনি বলেন, আমি কি তোমাদেরকে রাসূল (সা.) এর নামাজ দেখাব না? তিনি নামাজ পড়ালেন এবং একবার ছাড়া আর হাত তোলেননি।”
হানাফি মতামত: এই হাদীসের উপর ভিত্তি করে হানাফিরা রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে উঠার সময় হাত তোলে না।
সালাফি অবস্থান: সালাফি বা আহলে হাদিসগণ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ এর এই হাদিসটি অসীকার ও অমান্য করে।
♦ ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজ
عن عبد الرحمن بن عبد القاري قال: خرجت مع عمر بن الخطاب رضي الله عنه في رمضان إلى المسجد فإذا الناس أوزاع… فأمرهم عمر أن يصلوا خلف أبي بن كعب، فكانوا يصلون عشرين ركعة. (الموطأ، رقم: ২৫০)
হানাফি দলীল: উমর (রা.) ২০ রাকাত তারাবিহ চালু করেছিলেন এবং সাহাবিগণ ঐক্যমত্যে তা আদায় করেছেন। এটি সুন্নতে খলাফা রাশিদিনার অংশ।
সালাফি মত: সালাফি বা আহলে হাদিসগণ উক্ত ২০ রাকাতের হাদিস গুলোকে অসীকার করে খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাত বর্জণ করেছে।
♦ মাগরিবের পর ৬ রাকাত সালাত (সালাতুত তাসবীহ নয়)
من صلى بعد المغرب ست ركعات لم يتكلم بينهن بسوء عدلت له عبادة ثنتي عشرة سنة (الترمذي، رقم: ৪৩০، قال الترمذي: غريب، وضعفه الألباني)
“যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ছয় রাকাত নামাজ পড়ে, তার জন্য ১২ বছরের ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব লেখা হয়।”
হানাফি অবস্থান: তারা এই হাদীসকে ফযীলতের জন্য গ্রহণ করে, এবং অনেকে ছয় রাকাত পড়েন মাগরিবের পর (সালাতুল আওয়াবিন হিসেবে)।
সালাফিদের অবস্থান: সালাফি বা আহলে হাদিসগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার, অমান্য ও বর্জন করেছে।
♦ কবর যিয়ারতের সময় সূরা ফাতিহা বা কুরআন তিলাওয়াত
عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّهُ كَانَ إِذَا زَارَ الْقُبُورَ قَرَأَ سُورَةَ الْفَاتِحَةِ
(رواه البيهقي في شعب الإيمان، ৭/১৭)
হানাফি দলীল: কিছু সাহাবার আমল থেকে কবর যিয়ারতের সময় সূরা ফাতিহা পড়ার হাদিস পাওয়া যায়। হানাফিরা ফযীলতের নিয়তে এ আমল জায়েজ মনে করেন।
সালাফিদের অবস্থান: সালাফি বা আহলে হাদিসগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার, অমান্য ও বর্জন করেছে।
♦ মৃতের জন্য ‘সুরা ইয়াসিন’ পাঠের হাদীস
اقرؤوا على موتاكم يس (سنن أبي داود، رقم: ৩১২১، صححه بعض، وضعفه الألباني)
হানাফি আমল: মৃতের সামনে সূরা ইয়াসিন পাঠ করাকে সুন্নাত ও সওয়াবের কাজ মনে করেন।
সালাফিদের অবস্থান: সালাফি বা আহলে হাদিসগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার, অমান্য ও বর্জন করেছে।
♦ হাত মুছে চোখে লাগানোর (হাদীস)
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا دعا، مسح وجهه بيديه (رواه الترمذي، وقال الألباني: ضعيف)
হানাফি দলীল: দোয়ার পর হাত মুখে মুছে নেওয়া সাহাবা ও তাবেঈনের আমল হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং সম্মানজনক মনে করেন।
সালাফিদের অবস্থান: সালাফি বা আহলে হাদিসগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার, অমান্য ও বর্জন করেছে।
♦ যিকিরে ‘ইসমে আযম’ (الله، هو، حي، قيوم) বিশেষভাবে ব্যবহার
اسم الله الأعظم في هذه الآيات الثلاث: وآلهتكم إله واحد، لا إله إلا هو، الحي القيوم (رواه ابن ماجه، وقال الألباني: ضعيف)
হানাফিগণ: ইসমে আযম ব্যবহার করে দোয়ায় ফযীলতের কথা বলেন।
সালাফিদের মত: সালাফিগণ এই মর্মে হাদিসগুলোকে অস্বীকার, করে।
♦ ঈদের দিন কবর যিয়ারতের হাদীস
من زار قبر والديه أو أحدهما في كل جمعة غفر له، وكتب برا
(الطبراني، قال الألباني: موضوع)
হানাফি মত: ঈদ বা শুক্রবার কবর যিয়ারত করাকে ফযীলতপূর্ণ মনে করেন।
সালাফিদের মত: সালাফিগণ এই মর্মে হাদিসগুলোকে অস্বীকার, করে।
♦ ঈদের রাতের ইবাদতের ফজিলত
من أحيا ليلة العيد لم يمت قلبه يوم تموت القلوب
(الحديث رواه ابن ماجه، وقال الألباني: موضوع)
হানাফি আমল: এই হাদীসকে গ্রহণ করে ঈদের রাতে ইবাদতের গুরুত্ব দেয়।
সালাফি মত: সালাফিগণ উক্ত হাদিস অস্বীকার ও অমান্য করে।
এমন অনেক হাদীস রয়েছে, যা হানাফি মাযহাবের আলেমরা সাহাবাদের হাদিস ও তাবেঈনের আমল থেকে গ্রহণ করেন।
পক্ষান্তরে সালাফি বা আহলে হাদিসগণ নানা অজুহাত দেখিয়ে সেই হাদীসগুলোকে সম্পুর্ণরুপে অস্বীকার করে ও অমান্য করে। আর এভাবেই আহলে হাদিসগণ হাজারো হাদিস অস্বীকার করে আসছে। আহলে হাদিস সংগঠন মানেই হাদিস অস্বীকারকারীদের এক সম্মিলিত গোষ্ঠী।
♦ রফ’উল ইয়াদাইন (নামাজে হাত উঠানো)
عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما: "أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يرفع يديه حذو منكبيه إذا افتتح الصلاة، وإذا كبر للركوع، وإذا رفع رأسه من الركوع."
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শুরু করার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় কাঁধসমান উঁচু করে হাত উঠাতেন। (সহীহ বুখারী: ৭৩৫, সহীহ মুসলিম: ৩৯০)
সালাফি আমল: এই হাদীস অনুযায়ী তারা নামাজে তিন জায়গায় রফ’উল ইয়াদাইন করে।
হানাফি মত: হানাফিগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার করে।
♦ আমীন জোরে বলা
عن وائل بن حجر رضي الله عنه قال: "سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول: آمين، يمد بها صوته."
ওয়াইল ইবনে হুজর (রাঃ) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শুনেছি, তিনি আমীন বলতেন এবং দীর্ঘ করে উচ্চস্বরে বলতেন। (সুনান আবু দাউদ: ৯৩২, সহীহ)
সালাফি আমল: তারা আমীন জোরে বলে।
হানাফি মত: হানাফিগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার করে।
♦ নামাজে হাত বুকে বাঁধা
عن وائل بن حجر قال: "رأيت النبي صلى الله عليه وسلم إذا كان قائماً في الصلاة قبض بيديه فجعل اليمنى على اليسرى على صدره."
ওয়াইল ইবনে হুজুর (রাঃ) বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি তিনি নামাজে দাঁড়ানোর সময় ডান হাত বাম হাতের উপর বুকে রাখতেন। (সুনান ইবনে খুযায়মা: ৪৭৮, সহীহ)
সালাফি আমল: তারা হাত বুকে রাখে।
হানাফি মত: হানাফিগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার করে।
♦ ইমামের পেছনে ফাতিহা পড়া
عن عبادة بن الصامت قال: "كنا خلف النبي صلى الله عليه وسلم في صلاة الفجر فقرأ، فثقلت عليه القراءة، فلما فرغ قال: لعلكم تقرءون خلف إمامكم؟ قلنا: نعم. قال: لا تفعلوا إلا بفاتحة الكتاب."
উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) বলেন: আমরা রাসূলের পিছনে ফজরের নামাজে ছিলাম। তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন এবং তা ভারি হয়ে গেল। পরে বললেন: তোমরা কি ইমামের পেছনে কিরাআত করছো? আমরা বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন: তা কোরো না, তবে ফাতিহা পড়ো। (সহীহ মুসলিম: ৩৯৫)
সালাফি আমল: তারা মনে করেন ইমামের পেছনে কিরাআত ফরজ, বিশেষ করে ফাতিহা।
হানাফি মত: হানাফিগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার করে।
♦ ওযুর মাঝে মোজায় মাসেহ করার হাদিস।
عن المغيرة بن شعبة قال: "توضأ النبي صلى الله عليه وسلم ومسح على خفيه."
মুগীরাহ ইবনে শুআবাহ (রাঃ) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করলেন এবং মোজার উপর মাসেহ করলেন। (সহীহ বুখারী: ২০৩, মুসলিম: ২৭৪)
সালাফি আমল: তারা চামড়ার মোজার পাশাপাশি মোটা কাপড়ের মোজাতেও মাসেহকে জায়েজ বলেন।
হানাফি মত: হানাফিগণ এই মর্মে বর্ণীত হাদিসগুলোকে অস্বীকার করে।
ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহ প্রধানত দুটি বৃহৎ ফেরকায় বিভক্ত — শিয়া ও সুন্নি। এই বিভাজনের মূল উৎস নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতভেদ। সময়ের সাথে সাথে এ বিভক্তি শুধু বিশ্বাসগত নয়, বরং হাদীস সংকলন ও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রেও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
নবীজির ইন্তেকালের প্রায় ২০০-৩০০ বছর পর মুসলিম বিশ্বে হাদীস সংকলন এবং তা সংরক্ষণের ধারাবাহিক প্রয়াস শুরু হয়। সাহাবা, তাবেঈন এবং তাবে তাবেঈনের মাধ্যমে বর্ণিত এসব হাদীস সংকলন করে বিভিন্ন ইমামগণ কালজয়ী কিতাব রচনা করেন।
♦ সুন্নিদের প্রধান ৬ টি বিশেষ হাদীস গ্রন্থ
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী সুন্নি মতাবলম্বীদের গ্রহণযোগ্য ছয়টি প্রামাণ্য হাদীসগ্রন্থ হলো:
১। সহীহ বুখারী ৭০৫৩টি হাদীস
২। সহীহ মুসলিম ৭২৮২টি হাদীস
৩। সুনান আবু দাউদ ৫১৮৫টি হাদীস
৪। জামে তিরমিযী ৩৬০৮টি হাদীস
৫। সুনান নাসায়ী ৫৭৫৮টি হাদীস
৬। সুনান ইবনু মাজাহ ৪৩৪১টি হাদীস
👉 মোট হাদীস সংখ্যা: ৩৩,২২৭টি (প্রায়)
♦শিয়াদের প্রধান ৪ টি বিশেষ হাদীস গ্রন্থ
শিয়া মুসলিমরা তাঁদের নিজস্ব ইমামত দর্শনের আলোকে চারটি মূল হাদীসগ্রন্থকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন:
১। আল-কাফী ১৬,১৯৯টি হাদীস
২। মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকীহ ৯০৪৪টি হাদীস
৩। তাহযীব আল-আহকাম ১৩,৫৯০টি হাদীস
৪। আল-ইস্তিবসার ৫৫১১টি হাদীস
👉 মোট হাদীস সংখ্যা: ৪৪,৩৪৪টি (প্রায়)
♦ দ্বিপক্ষীয় অস্বীকৃতি
> শিয়ারা সুন্নিদের ৩৩,২২৭ টি হাদিস গ্রহণ করছেন না, বরং অস্বীকার ও অমান্য করছেন। তাদের মতে, সাহাবাদের একটি বড় অংশ রাসূল (সা.)-এর পরে ইমাম আলীর (রা.) হক আদায় করেননি, ফলে তাঁদের বর্ণিত হাদীস সন্দেহভাজন।
> সুন্নিগণ শিয়াদের ৪৪,৩৪৪ টি হাদিস গ্রহণ করছেন না, বরং অস্বীকার ও অমান্য করছেন। গ্রন্থ ও রাবিদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কারণ তাদের অনেক হাদীস এমন রাবি থেকে এসেছে, যাদেরকে সুন্নি উলামারা দুর্বল বা মুবতাদে’ (বিদআতী) মনে করেন।
♦ তাহলে কি উভয়পক্ষই হাদীস অস্বীকারকারী নন?
এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে — যখন দুই বৃহৎ ফেরকাই পরস্পরের হাদীস অস্বীকার করে, তখন কি তারা নিজেরাই হাদীস পরিত্যাগকারী নয়? একদল অপরের প্রিয় রাবিকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার অপরদল বলছে তার হাদীস ভিত্তিহীন। মূলত, উভয় ফেরকাই নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের ফেরকার সাথে মিলে এমন সব হাদীসকে মেনে চলছে এবং যেগুলো তাদের ফেরকার সাথে মিলেনা সেগুলো অস্বীকার করছে। সুতরাং উভয় পক্ষই মুনকিরে হাদিস। সবার কথা লিখলে বইটি অনেক বড় হয়ে যাবে। তাই এই পর্ব সংখেপ করছি।
সালাফিরা হানাফিদের অনেক হাদিসকে বাতিল করেছেন দুর্বল অজুহাতে।
হানাফিরা সালাফিদের অনেক হাদিস গ্রহণ করেন না।
শাফেয়িরা হানাফিদের কিছু হাদিসকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।
মালেকিরা হাদিসের পাশাপাশি আমলকেও হুকুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, যা অন্যরা পুরোপুরি মানে না।
তাহলে কি এই চার মাযহাবের অনুসারীরাই হাদিস অস্বীকারকারী?
ইসলামী জ্ঞানভান্ডারে হাদীসকে দ্বিতীয় মূল উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে হাদীস সংকলন এবং তা বর্ণনার পদ্ধতি নিয়ে মুসলিম সমাজে অনেক প্রশ্ন উঠে এসেছে। কিছু প্রশ্ন গভীর চিন্তার খোরাক যোগায়, আবার কিছু প্রশ্ন আমাদেরকে ইতিহাস পর্যালোচনার দিকেও আহ্বান করে।
যেমন: সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাহাবাদের হাদীস কম কেন?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও ঘন ঘন সঙ্গী ছিলেন:
আবু বকর (রাঃ)
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)
উসমান (রাঃ)
আলী (রাঃ)
তাঁদের অবস্থান, কর্তৃত্ব, ত্যাগ এবং ইন্তেকালের সময়কাল সবই ইসলামি ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের নিকট থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুব কম: যেমন-
আবু বকর (রাঃ) প্রায় ১৪২টি হাদীস।
ওমর (রাঃ) প্রায় ৫৩৯টি হাদীস।
উসমান (রাঃ) প্রায় ১৪৬টি হাদীস।
আলী (রাঃ) প্রায় ৫৮৬টি হাদীস
এমন অবস্থায় প্রশ্ন জাগে—যাঁরা ছিলেন সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, তাঁদের মুখে এত কম হাদীস, কেন?
আবু হুরাইরা (রাঃ) নবীজির জীবনের শেষ প্রান্তে সাড়ে তিন বছর সময় তাঁর সঙ্গ পেয়েছিলেন। অথচ শুধু তিনিই প্রায় ৫,৩৭৪টি হাদীস বর্ণনা করেছেন, যা হাদীস সাহিত্যে এককভাবে সর্বাধিক!
প্রশ্ন ওঠে, তিন বছরের সঙ্গী যদি হাজার হাজার হাদীস বর্ণনা করতে পারেন, তাহলে ২০ বছর, ৩০ বছর, এমনকি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নবীজির পাশে থাকা সাহাবারা এত কম হাদীস কেন বর্ণনা করলেন?
ইমাম আবু হানিফার সময়কাল ও হাদীস সংখ্যা
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) হিজরি ৮০ সনে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থাৎ তিনি নবীজিকে দেখেননি, বরং তাবে-তাবেয়ীনদের সময়কালে বসবাস করেছেন। অথচ তাঁর নিকট হতে ৪০০০০ হাদীস বা তারও বেশি বর্ণনার কথা পাওয়া যায়।
বিভিন্ন সূত্রে আবার দাবি করা হয়, ইমাম বুখারী (রহঃ) ৬ লক্ষ হাদীস মুখস্থ করেছিলেন! অথচ তাঁর সহীহ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে মাত্র প্রায় ৭ হাজার হাদীস (পুনরাবৃত্তিসহ)।
তাহলে বাকি ৫ লক্ষ ৯৩ হাজার হাদীস গেলো কোথায়? কেন তিনি সেগুলো পরিত্যাগ করলেন?
এভাবে যতদিন অতিবাতি হয়েছে তত হাদিস বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই হিসেবে বর্তমান যুগে যদি মোল্লাদের কেউ হাদিস লিপিবদ্ধ করতো তাহলে মনে হয় কয়েক কোটি হয়ে যেত।
ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ: হাদিসের লিখকগণ মদিনার লোক নন, তাহলে এত এত সহীহ হাদীস কারা লেখে?
আরেকটি বড় প্রশ্ন — যারা মদিনায় নবীজির জীবন প্রত্যক্ষ করেছেন, যারা মদিনার সাহাবী বা তাঁদের উত্তরসূরি — তাঁদের তুলনায় অনেক দূরের অঞ্চল যেমন:
উজবেকিস্তান (ইমাম বুখারী)
ইরাক (ইমাম আবু হানিফা)
নিশাপুর (ইমাম মুসলিম)
তিরমিয (ইমাম তিরমিযি)
তাঁরাই কিভাবে সহীহ হাদীস সংকলনের প্রধান ভুমিকা পালন করলেন?
অন্যদিকে মদিনার অনেক বড় আলিম যেমন ইমাম মালিক (রহঃ), এর লিখিত “মুআত্তা” হাদীস গ্রন্থকে অনেকে পাত্তাই দেয় না। তাহলে প্রকৃত হাদীসের মানদণ্ড কি ছিল?
ইতিহাস না ভাবনা? গজব না গবেষণা?
এই সব প্রশ্নগুলো শুধু বিরোধিতার জন্য নয়, বরং ইসলামের ইতিহাস ও হাদীস সংকলনের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার আহ্বান। এ প্রশ্নগুলো হাদীস অস্বীকার করার জন্য নয়, বরং চিন্তার দিগন্ত খুলে দেয় — কোথায় যুক্তি, কোথায় সিস্টেম, কোথায় অন্ধ অনুকরণ।
একজন মুসলমান হিসেবে প্রশ্ন করা হারাম নয়, বরং যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন হলো জ্ঞানের দ্বার। চিন্তাশীল হোন, বিদ্বেষী নয়
এই লেখার উদ্দেশ্য হাদীস বা ইমামদের অবমাননা নয়, বরং ইতিহাস ও তথ্যসূত্রকে বিশ্লেষণ করে ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় অবদান রাখা। কোনো কিছুকে শুধুমাত্র “মনে করা হয়” এই ভিত্তিতে গ্রহণ বা বর্জন নয়, বরং দলিল, যুক্তি ও বিবেচনার আলোকে হোক আমাদের গ্রহণযোগ্যতা।
ইসলামের ইতিহাসে প্রত্যেক মাজহাব ও হাদিস সংগ্রাহক নিজ নিজ পদ্ধতিতে হাদিস গ্রহণ বা বর্জন করেছেন। কেউ বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে যাচাই করে কিছু হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন, আবার কেউ কিছু হাদিসকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। আর এই মনে না করাটা দোশের কিছু নয়। কেননা হাদিস যাচাই করে গ্রহণ করাটাই যুক্তি সঙ্গত।
কিন্তু একই কাজ এখনো যদি কেউ কুরআনের মানদণ্ডে করতে চায়, তাহলে তাকে "হাদিস অস্বীকারকারী" বলে ট্যাগ দেওয়া হয়।
যদি কেউ বলে— আল্লাহ কুরআনকে "ফুরকান" সত্যমিথ্যার মানদন্ড বানিয়েছেন তাই “আমি কুরআনকে মূল মানদণ্ড মানি। তাই আমি কুরআন দিয়ে হাদিস যাচাই করি। কোনো হাদীস যদি কুরআনের বক্তব্যের বিপরীত হয়, তাহলে আমি সেটিকে গ্রহণ করবো না।” কেননা নবীর কথা কখনো কুরআন বিরোধী হতেই পারেনা। তখনই তাকে ‘হাদীস অস্বীকারকারী’, ‘মুনাফিক’ এমনকি ‘ইসলামবিরোধী’ বলেও চিহ্নিত করা হয়।
প্রশ্ন হলো, হাদীস যদি দ্বীনের দ্বিতীয় উৎস হয়, তাহলে কুরআন তো প্রথম ও মূল উৎস! সেই মূল উৎসের আলোকে যাচাই করা অন্যায় কীভাবে হতে পারে?
এখানে দ্বিমুখী মানসিকতা দেখাচ্ছ কেন? —
ইমাম বুখারী হাদীস পরিত্যাগ করলে তা হয় গবেষণা, কিন্তু সাধারণ মুসলিম কুরআনের আলোকে প্রশ্ন তুললে তা হয় বিদ্রোহ?
এমনকি বড় বড় ইমামদের মতভেদও আমরা মেনে নিই, অথচ একজন কুরআনপ্রিয় ব্যক্তি হাদীসের কন্টেন্টকে যুক্তির কষাঘাতে পরখ করতে চাইলে, তাকেই কাফিরের কাতারে ফেলি!
একটি প্রশ্ন: কুরআনের উপর হাদীস নাকি হাদীসের উপর কুরআন? আসলে মূল প্রশ্ন হলো— আমরা কাকে মূল মানদণ্ডে দাঁড় করাবো? কুরআনকে, না হাদীসকে?
কুরআন তো বারবার বলেছে:
"এটি একটি পরিপূর্ণ কিতাব… এতে কোনো কিছুর ঘাটতি নেই…" (সূরা আনআম ৬:৩৮)
অথচ অনেকেই মনে করেন, কুরআন বুঝতে হাদীস না জানলে চলবে না—এমনকি কোনো কোনো মৌলিক বিষয়েও! এই জায়গাতেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কেউ যদি বলে— “আমি আগে কুরআনের বক্তব্য বুঝব, তারপর হাদীসকে সেখানে ফিট করাবো”— তাকে বলা হয় 'হাদীস অস্বীকারকারী।'
সৎভাবে প্রশ্ন তোলাই তো চিন্তার সূচনা
বিশ্ববিদ্যালয়ে, গবেষণাগারে, ইসলামি স্কলারদের আলোচনায় হাদীস নিয়ে প্রশ্ন তোলা, বিশ্লেষণ করা, যাচাই করা—সবই বৈধ ও শ্রুতিমধুর। কিন্তু সাধারণ মুসলমান কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু প্রশ্ন তুললে, তাকেই বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তু করা হয় কেন?এই দ্বৈত মানসিকতা ইসলামি চিন্তার অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় বাধা। একটি পক্ষের যাচাই মানা হয় ইজতিহাদ, অন্য পক্ষের যাচাই মানা হয় বিদআত বা বিদ্রোহ। এই অবিচারমূলক মানসিকতা থেকেই বেরিয়ে এসে সত্যকে খুঁজে নেওয়ার পথেই রয়েছে মুক্তি।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে সঠিক নীতিটা কী? কিভাবে আমরা হাদিস গ্রহণ করব এবং কোনগুলো পরিহার করব?
১. কুরআনের সাথে সামঞ্জস্য
আল্লাহ তাআলা বলেছেন: সুরা আল-ফুরকান (সূরা ২৫), আয়াত ১:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا
ধন্য তিনি, যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী গ্রন্থ) নাজিল করেছেন, যেন সে জগৎবাসীদের জন্য একজন সতর্ককারী হয়।
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন: "আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সব বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ, আর এটি হিদায়াত, রহমত ও সুসংবাদ মুসলিমদের জন্য।" (সূরা নাহল: ৮৯)
কুরআনই চূড়ান্ত মানদণ্ড। যদি কোনো হাদিস সরাসরি কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতের বিপরীত যায়, তাহলে তা নিয়ে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। কারণ রাসূল (সা.) কখনো কুরআনের বিপরীত কিছু বলতে পারেন না।
২. পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত উৎস।
কুরআন শতভাগ সংরক্ষিত এবং পরিবর্তনহীন। কিন্তু হাদিস সংগ্রহ করা হয়েছে বহু শতাব্দী পরে, যা স্বাভাবিকভাবেই সংরক্ষণ ও বর্ণনার সীমাবদ্ধতায় পড়েছে। তাই, কুরআনের বিপরীতে কোনো কিছু থাকলে সেটিকে যাচাই করা প্রয়োজন।
৩. সহীহ হাদিসের শর্ত পূরণ
হাদিস গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্কলাররা কয়েকটি মূলনীতি অনুসরণ করেছেন:
★ সাহিহ সনদ (বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারী চেইন)
★ মুতাওয়াতির হওয়া (বহু সূত্রে প্রমাণিত হওয়া)
★ কুরআন ও বিবেকবুদ্ধির সাথে সংগতিপূর্ণ হওয়া
যদি একটি হাদিস সহীহ শর্ত পূরণ না করে, তাহলে সেটি গ্রহণ না করাই যৌক্তিক। এটি কোনোভাবেই হাদিস "অস্বীকার" করা নয়, বরং শুদ্ধ ইসলামের জন্য বিশুদ্ধ তথ্য সংরক্ষণ করা।
৪. রাসূল (সা.)-এর আসল শিক্ষা বুঝতে হবে
অনেক হাদিস রাসূল (সা.) নিজে বলেননি, বরং পরবর্তী যুগে ভুল ব্যাখ্যা বা জাল সংযোজন হয়েছে। তাই, হাদিস বুঝতে হলে তার প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং কুরআনের সাথে সম্পর্ক ভালোভাবে বিচার করতে হবে।
৫. মতপার্থক্য থাকলে যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে
ইসলামে ইজতিহাদের (যুক্তিবাদী গবেষণা) দরজা খোলা। পূর্ববর্তী স্কলারদের মতো আমাদেরও কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা করার অধিকার আছে। "অমুক আলেম এ কথা বলেছেন, তাই সেটাই চূড়ান্ত"—এই ধারণা ইসলামসম্মত নয়। বরং সঠিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আমরা কিভাবে চলব?
১। কুরআনকে প্রধান উৎস হিসেবে গ্রহণ করব।
২। কোনো হাদিস কুরআনের বিপরীত হলে যাচাই করব।
৩। সহীহ হাদিস মানতে আপত্তি নেই, তবে জাল বা দুর্বল হাদিস বর্জন করব।
৪। মতপার্থক্য থাকলে ইসলামের মূল শিক্ষা ও যুক্তির আলোকে সিদ্ধান্ত নেব।
সত্য মেনে নেওয়াই প্রকৃত মুসলমানের পরিচয়।
অতএব, যারা কুরআন ও সহীহ হাদিস মানে কিন্তু জাল, দুর্বল ও কুরাান বিরোধী হাদিস নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তারা হাদিস অস্বীকারকারী নয়। বরং তারা প্রকৃত ইসলামের অনুসন্ধানকারী। এই সত্য সবাইকে বোঝানো দরকার।
কুরআনের চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় গুরুত্ব
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا
“ধন্য তিনি, যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী গ্রন্থ) নাযিল করেছেন, যাতে সে জগৎবাসীদের জন্য একজন সতর্ককারী হয়।”(সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ১)
পবিত্র কুরআন আল্লাহর নাযিলকৃত সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ গ্রন্থ। এটি সংরক্ষিত, অপরিবর্তনীয় এবং নির্ভরযোগ্য।
মোট আয়াত সংখ্যা: ৬২৩৬টি—একটি নির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত সংখ্যা।
এই কুরআনই হিদায়াতের প্রধান উৎস, যেখানে জীবনের প্রতিটি দিকের জন্য নির্দেশনা রয়েছে। তাই দ্বীনের বিষয়ে প্রথম ও সর্বোচ্চ মানদণ্ড হচ্ছে কুরআন।
♦ হাদিস সংকলনের জটিলতা ও বিভ্রান্তি
হাদিস, অর্থাৎ নবীজির বাণী, কর্ম ও অনুমোদিত কাজের বিবরণ—এই বিষয়গুলো অনেক পরে সংগৃহীত ও সংকলিত হয়েছে। তবে সমস্যা হলো:
হাদিসের মোট সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। কেউ বলেন ৬ লাখ, কেউ বলেন ৭ লাখ। অথচ সহিহ হাদিসের সংখ্যা কত—এ প্রশ্নের উত্তর কেউ নির্দিষ্টভাবে দিতে পারেন না।
ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শে একই হাদিস নিয়ে চরম দ্বিমত দেখা যায়।
যেমন-
পাগড়ি পরার হাদিস—তাবলীগ জামাত ও দেওবন্দি মতের কাছে এটি সহিহ ও সুন্নাতের প্রতীক।
আহলে হাদিস ও সালাফি পন্থীদের মতে এসব হাদিস দুর্বল বা জাল।
কেউ এই হাদিস মানলে তাকে “বিদআতি” বলা হয়, আবার কেউ অস্বীকার করলে তাকে “হাদিস অস্বীকারকারী” বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
নবীজির পিতা-মাতার অবস্থান নিয়েও হাদিস বিভ্রান্তি:
সিহাহ সিত্তাহর কিছু হাদিসে বলা হয়: তাঁরা জাহান্নামে।
আবার সুন্নি সুফি মতাদর্শীদের মাঝে “গায়বে সিত্তাহ” নামক স্বপ্নে পাওয়া কথিত হাদিসের মাধ্যমে বলা হয়: তাঁরা জান্নাতি।
এই দ্বিধা ও বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে একজন মুসলিম কোন পথে যাবে?
♦ আমাদের করণীয় ও পথনির্দেশনা
১. কুরআনকে প্রাথমিক, সর্বোচ্চ ও অপরিহার্য উৎস হিসেবে মানতে হবে।
২. হাদিসকে মূল্যায়ন করতে হবে কুরআনের আলোকে, নয়তো বিভ্রান্তি এড়ানো যাবে না।
৩. ফিরকা বা “কোম্পানিভিত্তিক ইসলাম” নয়, বরং যুক্তি ও কুরআনের আলোকিত পথে চলতে হবে।
৪. যে হাদিস কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
৫. নবীর শিক্ষাই হোক পথ, কোনো দল বা ব্যক্তির বক্তব্য নয়।
উপসংহার:
দ্বীনের ভিত্তি যেন বিভ্রান্তিমূলক মত নয়, বরং যেন আল-কুরআন হয়। যে কুরআন আল্লাহর সংরক্ষিত বাণী—তাকে প্রাধান্য না দিয়ে যদি মানুষ জাল ও দুর্বল বর্ণনার দ্বন্দ্বে পড়ে যায়, তবে বিভ্রান্তিই তার নিয়তি হবে।
সুতরাং আসুন, কুরআনকে বুঝি, হাদিসকে যাচাই করি, এবং ইসলামকে নিখাদ ও বিশুদ্ধভাবে চর্চা করি।
