প্রশ্ন: ১ - মাওলানা সানি, জয়দেবপুর
আমি কতেক সনামধন্য বক্তাদের মুখে শুনেছি — কুরআন শিক্ষা করা নফল ইবাদত। একথা কি ঠিক? কুরআন থেকে জানতে চাই।
উত্তর:
জি! আপনি ঠিকই শুনেছেন— আমাদের দেশের অধিকাংশ আলেম ও বক্তাগণ নিম্নোক্ত হাদিসগুলোর ভিত্তিতে এই মত পোষণ করে থাকেন—
(হাদিস- ১) خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।”(সহিহ বুখারি)
(হাদিস- ২) أَفْضَلُ الْعِبَادَةِ تِلَاوَةُ الْقُرْآنِ
“সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো কুরআন তিলাওয়াত করা।” (হাদিস হিসেবে প্রসিদ্ধ, বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত)
এই দুইটি হাদিস সামনে রেখে অনেকেই সিদ্ধান্ত দেন—কুরআন শেখা বা পড়া যেহেতু ‘আফদাল’ বা ‘খাইর’, তাই এটি নফল ইবাদত। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক ভুল ঘটে যায়। কোনো কাজকে ‘শ্রেষ্ঠ’ বলা মানেই সেটিকে নফল ঘোষণা করা নয়। ফরজ কাজও মর্যাদার দিক থেকে সর্বোত্তম হতে পারে। হাদিসদ্বয়ে কোথাও ‘নফল’ শব্দটি নেই—এটি পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের যোগ করা ধারণা।
এখন কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্য দেখি।
আল্লাহ বলেন—
سُورَةٌ أَنزَلْنَاهَا وَفَرَضْنَاهَا
“এটি একটি সূরা—আমি তা অবতীর্ণ করেছি এবং আমি তা ফরজ করেছি।”(সূরা নূর ২৪:১)
এখানে ‘ফরজ করেছি’ (فَرَضْنَاهَا) শব্দটি অত্যন্ত স্পষ্ট। একটি সূরা যখন ফরজ হয়, তখন সেই সূরার বিধান জানা, বোঝা ও মানা—সবই ফরজের অংশ। না জেনে ফরজ পালন করা কুরআনিকভাবে অসম্ভব। অতএব, কুরআনের শিক্ষা অর্জনকে নফল বলা এই আয়াতের সরাসরি বিরোধিতা। আরও পরিষ্কার ঘোষণা এসেছে—
إِنَّ الَّذِي فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لَرَادُّكَ إِلَىٰ مَعَادٍ
“নিশ্চয়ই যিনি আপনার উপর কুরআন ফরজ করেছেন, তিনি অবশ্যই আপনাকে প্রত্যাবর্তনের স্থানে ফিরিয়ে আনবেন।”(সূরা কাসাস ২৮:৮৫)
এখানে আল্লাহ পুরো কুরআনকেই ফরজ বলেছেন। কুরআন যদি ফরজ হয়, তবে কুরআনের তিলাওয়াত, শিক্ষা ও অনুধাবন—সবই ফরজ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কারণ আল্লাহ অজানা বিষয়ের উপর কোনো দায়িত্ব চাপান না।
সুতরাং হাদিসে কুরআন শিক্ষাকে ‘সর্বোত্তম’ ও ‘সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত’ বলা হয়েছে, আর কুরআনে কুরআনকে ‘ফরজ’ বলা হয়েছে। হাদিস কখনো কুরআনের বিরোধিতা করতে পারে না; বরং কুরআনের আলোতেই হাদিস বুঝতে হবে।
ফলাফল পরিষ্কার: কুরআন শিক্ষা নফল নয়; এটি ঈমানের মৌলিক ফরজ দায়িত্ব। নফল বলা মানে কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণাকে আড়াল করা।
