“নারীরা জাহান্নামে বেশি যাবে” এবং “নারীরা আকলে কম”—এই দুই বক্তব্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এমনভাবে ধর্মীয় বয়ানের অংশ হয়ে গেছে, যেন এগুলো কুরআনের অকাট্য ঘোষণা। মিম্বর, মাদরাসা ও সামাজিক কথোপকথনে এগুলো এমন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে খুব কম মানুষই প্রশ্ন করে—আল্লাহ কি সত্যিই লিঙ্গভিত্তিকভাবে জাহান্নাম বণ্টন করেন? নাকি এই বক্তব্যগুলো নির্দিষ্ট কিছু বর্ণনার আক্ষরিক পাঠ, যা কুরআনের ন্যায়বিচার ও মানব-মর্যাদার দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
এই প্রশ্নের উত্তর আবেগে নয়, আত্মপক্ষসমর্থনে নয়—বরং কুরআনের মানদণ্ডেই খুঁজতে হবে।
সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসটি হলো—
আরবি ইবারত:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
«يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ فَإِنِّي رَأَيْتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ»
قُلْنَ: وَبِمَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟
قَالَ: «تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ، مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ أَذْهَبَ لِلُبِّ الرَّجُلِ الْحَازِمِ مِنْ إِحْدَاكُنَّ»
সূত্র: সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮০
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত—রাসূল ﷺ বলেছেন:
“হে নারীগণ, তোমরা সদকা করো। আমি দেখেছি—তোমরাই জাহান্নামের অধিকাংশ।”
নারীরা জিজ্ঞেস করল—কেন, হে আল্লাহর রাসূল?
তিনি বললেন—“তোমরা বেশি অভিশাপ দাও এবং স্বামীর অনুগ্রহ অস্বীকার করো। আমি আকল ও দীনে তোমাদেরকে ঘাটতিপূর্ণ দেখেছি—তবুও তোমাদের কেউ একজন বিচক্ষণ পুরুষের বুদ্ধি হরণ করতে পারে।”
এই বক্তব্যটি যদি আক্ষরিক ও সার্বজনীন বিধান হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে কুরআনের একাধিক মৌলিক নীতিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কুরআনের উত্তর স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন এবং বারবার উচ্চারিত—না।
সূরা আন-নিসা ৪:১২৪
وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ
“যে কেউ সৎকর্ম করে—পুরুষ হোক বা নারী—এবং সে মুমিন হয়, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
এখানে আল্লাহ লিঙ্গকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। বিচার হবে ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে। নারী হওয়া কোনো শাস্তির মানদণ্ড নয়, যেমন পুরুষ হওয়াও কোনো ছাড়পত্র নয়। তাহলে “নারীরা জাহান্নামে বেশি”—এই সাধারণীকরণ কুরআনের কোন নীতি থেকে এসেছে?
যদি জন্মগতভাবে নারী হওয়াই জাহান্নামের সম্ভাবনা বাড়ায়, তাহলে কুরআনের ন্যায়বিচারের ঘোষণা অর্থহীন হয়ে যায়।
এই দাবিটি কুরআনের সঙ্গে আরও গভীর সংঘর্ষে যায়। কুরআন কোথাও বলেনি—নারীর আকল পুরুষের চেয়ে কম। বরং কুরআন নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্তগ্রহণ ও প্রজ্ঞার উদাহরণ নিজেই তুলে ধরেছে।
সূরা আন-নামলে সাবা রাণীর ঘটনা কুরআনে এসেছে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও যৌক্তিক পরামর্শের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে। সেখানে কুরআন কোনো জায়গায় বলেনি—তিনি নারী বলেই কম বুদ্ধিমান।
বরং কুরআন মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড ঘোষণা করেছে তাকওয়াকে।
সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
“আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।”
এখানে নারী–পুরুষ নেই, আকল কম–বেশি নেই, সামাজিক ভূমিকা নেই—আছে শুধু নৈতিক দায়িত্ব ও সচেতনতা।
কুরআনের একটি মৌলিক নীতি হলো—কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।
সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষ যা নিজে চেষ্টা করে, তাই তার প্রাপ্য।”
যদি নারী হওয়াই জাহান্নামের কারণ হয়, তাহলে এই আয়াত ভেঙে পড়ে। কারণ এখানে মানুষ বিচারাধীন হচ্ছে তার চেষ্টা ও কাজের জন্য—তার জেন্ডারের জন্য নয়।
এই হাদিসের ভাষা লক্ষ্য করলে বোঝা যায়—এটি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক প্রেক্ষাপটে, নির্দিষ্ট শ্রোতাদের উদ্দেশে বলা উপদেশমূলক বক্তব্য। এটি কোনো সার্বজনীন নৈতিক ঘোষণা নয়, কোনো লিঙ্গগত শাস্তির বিধান নয়।
সমস্যা তৈরি হয়েছে তখনই, যখন এই বক্তব্যকে সময়, প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে কুরআনের ওপরে বসানো হয়েছে। তখন এটি নারীবিদ্বেষী মতাদর্শে রূপ নিয়েছে—যা কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কুরআনের দৃষ্টিতে নারী—
নারী একজন পূর্ণ মানুষ—দায়িত্বশীল, বিবেকবান, বিচারযোগ্য।
যে ব্যাখ্যা নারীর মর্যাদা ভেঙে দেয়, তাকওয়ার বদলে লিঙ্গকে মানদণ্ড বানায়, এবং আল্লাহর ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে—সে ব্যাখ্যা কুরআনের মীযানে টেকে না।
আল্লাহ নারীকে সৃষ্টি করেননি জাহান্নাম ভরার জন্য।
তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ হিসেবে—পরীক্ষার জন্য।
কুরআনই মানদণ্ড।
আর যে বর্ণনা সেই মানদণ্ডে টেকে না— তা যত পুরোনোই হোক, তা আল্লাহর দ্বীন হতে পারে না।
