ইসলামে তওবা একটি মৌলিক ধারণা। আল্লাহ তওবা কবুল করেন—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তওবার শর্ত কী? কুরআন তওবাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে? আর মানুষের জীবন নেওয়ার মতো চরম অপরাধের ক্ষেত্রে কুরআন কী নীতি স্থাপন করেছে?
বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তিকে নিয়ে বর্ণিত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হাদিস এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: كَانَ فِي مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ رَجُلٌ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ نَفْسًا، فَسَأَلَ عَنْ أَعْلَمِ أَهْلِ الْأَرْضِ، فَدُلَّ عَلَى رَاهِبٍ، فَأَتَاهُ فَقَالَ: إِنَّهُ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ نَفْسًا، فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٍ؟ فَقَالَ: لَا، فَقَتَلَهُ، فَكَمَّلَ بِهِ مِائَةً… (সংক্ষিপ্ত)
শেষাংশে বলা হয়—
মৃত্যুর সময় সে বুক দিয়ে নেক গ্রামটির দিকে একটু এগিয়ে দেয়। আল্লাহ সেই গ্রামকে কাছে আসতে ও অপর গ্রামকে দূরে যেতে বলেন। মাপা হলে দেখা যায়, সে নেক গ্রামের দিকে এক বিঘত কাছে—ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
সূত্র:
মিশকাতুল মাসাবিহ
হাদিস নং: ২২১৯, ২২৩৮
(মূলত সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বিভিন্ন শব্দে এসেছে)
কুরআন মানুষের জীবন নেওয়াকে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি হিসেবে ঘোষণা করেছে।
সূরা আন-নিসা ৪:৯৩
وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম—সেখানে সে স্থায়ী হবে; আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।”
এটি একটি হত্যার ব্যাপারে। আর এখানে বলা হচ্ছে—৯৯টি হত্যাকাণ্ড (পরে ১০০)।
প্রশ্ন হচ্ছে—
কুরআনের এই স্পষ্ট ঘোষণার পর, কেবল বুক দিয়ে একদিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে এমন অপরাধ কীভাবে ক্ষমাযোগ্য হয়ে যায়?
কুরআনে তওবা কখনোই যান্ত্রিক বা প্রতীকী নয়। তওবার শর্ত কুরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে।
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৮–৭১
যারা হত্যা করে, ব্যভিচার করে—
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا
“তবে তারা ছাড়া—যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে।”
তিনটি শর্ত লক্ষ করুন:
৯৯ হত্যাকারীর ঘটনায়—
বরং পুরো ঘটনা নির্ভর করছে ভৌগোলিক দূরত্ব ও শেষ মুহূর্তের শারীরিক নড়াচড়ার ওপর।
কুরআনের তওবা কি এভাবে কাজ করে?
এই হাদিসের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো—
আল্লাহ গ্রামকে কাছে আনলেন, আরেক গ্রামকে দূরে সরালেন, তারপর দূরত্ব মাপলেন।
কুরআন কি কখনো আল্লাহর বিচারকে এভাবে স্থানিক কৌশলের ওপর নির্ভরশীল হিসেবে উপস্থাপন করে?
কুরআন বলে—
সূরা আল-যিলযাল ৯৯:৭–৮
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, তা সে দেখবে; আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, তাও সে দেখবে।”
এখানে বিচার হচ্ছে আমলের ওজন দিয়ে, দূরত্ব দিয়ে নয়।
কুরআন জুলুমকে কখনো ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবে দেখে না।
সূরা আশ-শূরা ৪২:৪০
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا
“মন্দ কাজের প্রতিফল মন্দ কাজের অনুরূপ।”
মানুষ হত্যা মানে শুধু আল্লাহর হক নষ্ট করা নয়—বান্দার হক ধ্বংস করা।
কুরআনের কোথাও নেই যে, বান্দার হক আল্লাহ একতরফাভাবে মাফ করে দেন—ভুক্তভোগীদের বাদ দিয়ে।
তাহলে ৯৯ জন নিহত মানুষের ন্যায়বিচার কোথায় গেল?
হাদিসটি মূলত এই বার্তা দেয়—
নিয়তই যথেষ্ট।
কিন্তু কুরআন বলে—
সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষ কেবল তাই পাবে, যা সে নিজে চেষ্টা করেছে।”
নিয়ত মূল্যবান, কিন্তু নিয়ত একা অপরাধ মুছে দেয় না—বিশেষ করে গণহত্যার মতো অপরাধ।
এই হাদিস আক্ষরিকভাবে নিলে যে বার্তা ছড়ায়—
কুরআন কিন্তু ভয় ও দায়িত্ববোধ জাগাতে এসেছে।
সূরা ইবরাহিম ১৪:৪২
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
“তুমি কখনোই মনে করো না যে আল্লাহ জালিমদের কাজ সম্পর্কে গাফিল।”
৯৯ হত্যাকারীর এই বর্ণনা—
কুরআনে আল্লাহ ন্যায়বিচারক—
গণিতবিদ বা মানচিত্রবিদ নন।
কুরআনই মীযান।
আর যে বর্ণনা সেই মীযানে টেকে না—তা দিয়ে তওবা, বিচার ও আখিরাতের নীতি নির্মাণ করা যায় না।
