তাফসীর | সূরা ৯ : আয়াত ৭১
তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation
আয়াত
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍۢۚ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ ٱلزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥۚ أُو۟لَـٰٓئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ ٱللَّهُۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
অনুবাদ
বিশ্বাস স্থাপনকারী পুরুষ ও নারী একে অপরের সহায়ক। তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয়, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এ ধরনের লোকদের প্রতি আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।
আয়াতের বিস্তারিত আলোচনা
সূরা আত-তারাফ ৯:৭১ মুসলিম সমাজে পারস্পরিক দায়িত্ব, নৈতিকতা এবং ঈমানের কার্যকর প্রয়োগের উপর আলোকপাত করে। এই আয়াত মূলত মুসলিম পুরুষ ও নারীর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্কের দিক নির্দেশনা প্রদান করে, যা ইসলামের সমাজ গঠনে অপরিহার্য।
আয়াতের প্রথম অংশে বলা হয়েছে, “বিশ্বাস স্থাপনকারী পুরুষ ও নারী একে অপরের সহায়ক।” এখানে মুসলিম সমাজে সমবায় ও পারস্পরিক দায়িত্বের গুরুত্ব প্রকাশিত হয়েছে। ইসলাম একটি ব্যক্তিগত ধর্ম নয়, বরং এটি সমাজে ন্যায়, সাহায্য ও সংহতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। পুরুষ ও নারী একে অপরের সহায়ক হলে সমাজে সমতা ও নিরাপত্তা বজায় থাকে।
এরপর আয়াতটি বলে, “তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয়, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে।” অর্থাৎ, মুসলিমদের সামাজিক দায়িত্ব শুধু নিজের সীমাবদ্ধতায় নেই; বরং অন্যদের নৈতিকতার দিকে প্রভাব ফেলাও তাদের দায়িত্ব। এটি ইসলামিক নৈতিকতা ও সমাজকাঠামোর মূলনীতির সঙ্গে জড়িত। সৎ ও কল্যাণকর কাজ প্রচার এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখা মানবিক ও ধর্মীয় নৈতিকতার অন্যতম চিহ্ন।
তৃতীয় অংশে বলা হয়েছে, “তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য পালন করে।” এখানে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দায়িত্ব একত্রিত করা হয়েছে। সালাত কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং মুসলিমদের নৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক। যাকাত সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য মানে হলো আইন, আদেশ এবং নৈতিক দিশার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা।
এই আয়াতের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, বিশ্বাস স্থাপন এবং নৈতিকতা সামাজিকভাবে প্রকাশিত হওয়া উচিত। একজন মুসলিম কেবল নিজের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না; বরং তিনি সমাজের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং মানবিক সাহায্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করবে।
আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে, “এ ধরনের লোকদের প্রতি আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।” এটি প্রমাণ করে যে, সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালনকারীরা আল্লাহর দয়া এবং অনুগ্রহের প্রাপ্য। পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান আল্লাহ যিনি তাদের কর্মকাণ্ডকে সঠিকভাবে বিচার করবেন।
কুরআনের সম্পর্কিত আয়াতসমূহ
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা
আজকের সমাজে মুসলিম পুরুষ ও নারীর সমন্বিত দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৯:৭১ আয়াত আমাদের শেখায় যে, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিগত নয়; বরং সামাজিক ন্যায়, সাহায্য ও সংহতি রক্ষার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজে সৎ কাজের প্রচার, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা, সালাত ও যাকাত প্রতিষ্ঠা, এবং আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আনুগত্য মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য। এটি সমাজে ন্যায়, শান্তি ও সমতা নিশ্চিত করে।
আয়াত থেকে শেখা যায়—একজন মুসলিমের জীবনের সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার উপর নয়, বরং সমাজে নৈতিক দায়িত্ব, সহায়তা এবং বিশ্বাসের প্রকাশের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এই নীতি মেনে চললে মুসলিম সমাজে স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার ও কল্যাণ নিশ্চিত হবে।
