লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
মানুষের জীবনে নতুন বস্তু আসবে, নতুন অভ্যাস তৈরি হবে, নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবে—কিন্তু কুরআনের বিধান সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন কোনো নির্দিষ্ট যুগের বই নয়; এটি নীতিমালার কিতাব। তাই কুরআনে “সিগারেট” শব্দ না থাকলেও কুরআনের নীতির আলোকে তার হুকুম নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রশ্নটি আবেগের নয়; এটি উসূলের প্রশ্ন। কোনো বস্তু হারাম হবে কি না তা নির্ধারণের জন্য দেখতে হবে—তা কি আত্মধ্বংসের অন্তর্ভুক্ত, তা কি ক্ষতিকর, তা কি অপবিত্র, তা কি অপচয়, তা কি অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা কি নেশাসৃষ্টিকারী, এবং তা কি শরীর নামক আমানতের খিয়ানত। এই ভিত্তিতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে।
প্রথমত, আত্মধ্বংসের নীতি। কুরআন মানুষকে নিজেকে ধ্বংসে ঠেলে দিতে নিষেধ করেছে।
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“তোমরা নিজেদেরকে নিজেদের হাতে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৯৫)
এই আয়াতের শব্দ সাধারণ। এখানে “তাহলুকা” বা ধ্বংস কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সাথে সীমাবদ্ধ নয়। উসূলের স্বীকৃত নীতি হলো—العبرة بعموم اللفظ لا بخصوص السبب—বিধান শব্দের সাধারণতার উপর নির্ভর করে, কেবল অবতীর্ণ হওয়ার বিশেষ ঘটনার উপর নয়। যখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে ধূমপান ফুসফুস ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোগ এবং অকালমৃত্যুর কারণ, তখন এটি নিছক সম্ভাব্য ক্ষতি নয়; এটি পরিসংখ্যানভিত্তিক নিশ্চিত ক্ষতি। যে কাজ ধারাবাহিকভাবে শরীরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তা এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে—এটি চাপানো নয়, বরং সাধারণ নীতির প্রয়োগ।
দ্বিতীয়ত, নিজের জীবন বিনষ্ট করার নিষেধাজ্ঞা।
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
“তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।” (সূরা আন-নিসা ৪:২৯)
আত্মহত্যা শুধু একবারে নিজেকে শেষ করা নয়; বরং এমন কাজও এর অন্তর্ভুক্ত যা নিশ্চিতভাবে আয়ু কমায় ও দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধ্বংস করে। কেউ যদি জানে একটি বস্তু তার শরীরের কোষ ধ্বংস করছে, তবুও আসক্তির কারণে তা গ্রহণ করে—তাহলে তা নিজের উপর জুলুম। আল্লাহর দয়া এই যে তিনি আমাদের জীবন রক্ষা করতে বলেন; আর আমরা যদি সচেতনভাবে ক্ষতির পথে যাই, তা এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা।
তৃতীয়ত, পবিত্র ও অপবিত্র বস্তুর পার্থক্য। রাসূল ﷺ–এর দায়িত্ব বর্ণনায় কুরআন বলছে—
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
“তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন।” (সূরা আল-আ’রাফ ৭:১৫৭)
এখানে “তাইয়্যিবাত” মানে কল্যাণকর ও উপকারী বস্তু; “খাবাইস” মানে নিকৃষ্ট, ক্ষতিকর ও অপবিত্র বস্তু। সিগারেট খাদ্য নয়, পুষ্টি নয়, ওষুধ নয়; বরং দুর্গন্ধ, বিষাক্ত রাসায়নিক, টার, নিকোটিন—এসবের সমষ্টি। এটি দেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। কোনো বস্তুকে “তাইয়্যিব” বলার শর্ত হলো তা মানুষের জন্য কল্যাণকর হওয়া। ধূমপানের ক্ষেত্রে কল্যাণের উপাদান নেই; বরং প্রমাণিত ক্ষতি আছে। অতএব তা “খাবাইস”-এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া যুক্তিসঙ্গত।
চতুর্থত, অপচয়ের বিষয়। কুরআন সম্পদের অপব্যবহারকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছে।
وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا
“অপব্যয় করো না।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৬)
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
“নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৭)
যে অর্থ খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা বা পরিবারের কল্যাণে ব্যয় হতে পারত, তা যদি এমন বস্তুর পেছনে ব্যয় হয় যা কেবল ক্ষতি বয়ে আনে—তবে তা নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; তা অপচয়ের শামিল। অর্থ নষ্ট করা নিজেই একটি নৈতিক প্রশ্ন; আর যখন সেই অর্থ নষ্টের সাথে শরীর ধ্বংস যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি আরও গুরুতর।
পঞ্চমত, নেশা ও আসক্তি। মদের নিষেধাজ্ঞা কুরআনে এসেছে কারণ তা বুদ্ধিনাশী ও শয়তানের কাজ।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ ... رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ
“হে মুমিনগণ! মদ ও জুয়া… শয়তানের অপবিত্র কাজ।” (সূরা আল-মায়িদা ৫:৯০)
নিকোটিন শারীরিক আসক্তি তৈরি করে। ধূমপায়ী ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময় পর অস্থির হয়ে পড়ে; এটি ইচ্ছাশক্তির উপর প্রভাব ফেলে। যদিও এটি মদের মতো তাৎক্ষণিক মাতাল করে না, তবুও আসক্তি একটি দাসত্ব। ইসলাম মানুষকে মুক্ত রাখতে চায়—কোনো বস্তুর দাস বানাতে নয়। আসক্তি যখন নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তা নৈতিক স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ষষ্ঠত, অন্যকে ক্ষতি করা। ধূমপানের ধোঁয়া শুধু ধূমপায়ীকে নয়, আশেপাশের মানুষকেও আক্রান্ত করে। শিশু, গর্ভবতী নারী, পরিবার—সবাই ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে। ইসলামি নীতিতে অন্যকে ক্ষতি করা নিষিদ্ধ। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভ্যাস যদি অন্যের স্বাস্থ্যের উপর আঘাত হানে, তবে তা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
সপ্তমত, শরীর আমানত।
إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْؤُولًا
“কান, চোখ ও হৃদয়—এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৬)
মানবদেহ আল্লাহর দেওয়া আমানত। আমানতের হক আদায় করা ফরজ। সচেতনভাবে ফুসফুস নষ্ট করা, রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করা—এটি আমানতের খিয়ানত। ইসলামে আমানতের খিয়ানত গুনাহ।
এখন প্রশ্ন—এ সিদ্ধান্ত কি চাপানো? না, যদি কেউ দাবি করে “এই আয়াত সরাসরি সিগারেটের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে”, তবে তা ভুল। কিন্তু যদি বলা হয়—“কুরআনের সাধারণ নীতির আলোকে ধূমপান আত্মধ্বংস, অপচয়, অপবিত্রতা ও ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত”—তবে তা উসূলসম্মত কিয়াস। প্রাথমিক যুগে যখন ক্ষতি স্পষ্ট ছিল না, কিছু আলেম মাকরূহ বলেছেন। কিন্তু আজ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সুস্পষ্ট। ফিকহের একটি নীতি হলো—হুকুম বাস্তবতার উপর নির্ভর করে। যখন বাস্তবতা পরিবর্তিত হয় এবং ক্ষতি নিশ্চিত হয়, তখন হুকুমও কঠোর হতে পারে।
অতএব সারসংক্ষেপ এই: কুরআনে “বিড়ি” শব্দ নেই; কিন্তু কুরআনের নীতিমালা আছে। আত্মধ্বংস নিষিদ্ধ, নিজের প্রাণ বিনষ্ট করা নিষিদ্ধ, অপবিত্র বস্তু হারাম, অপচয় নিন্দিত, অন্যকে ক্ষতি করা নিষিদ্ধ, আমানতের খিয়ানত গুনাহ। ধূমপান এই সবগুলোর সাথে সম্পর্কিত। এই কারণেই অধিকাংশ সমসাময়িক আলেম এটিকে হারাম বলেছেন। এটি আবেগের রায় নয়; এটি নীতিভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
যে ব্যক্তি আসক্ত, তার জন্য দরজা বন্ধ নয়। তাওবার দরজা খোলা। নিয়ত, ধীরে ধীরে কমানো, চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া—এসব উপায় আছে। আল্লাহ মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নিষেধ করেননি; বরং রক্ষা করার জন্য নিষেধ করেছেন। যে নিষেধাজ্ঞা জীবন বাঁচায়, তা রহমত—সংকীর্ণতা নয়।
