• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৩ অপরাহ্ন

পিতা পুত্রকে হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড নেই

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৩২৭ Time View
Update : রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬


পিতা পুত্রকে হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড নেই

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ


ভূমিকা

ইসলাম কি ন্যায়বিচারের ধর্ম, নাকি সম্পর্কভিত্তিক বিশেষাধিকারের ধর্ম?
ইসলাম কি মানুষের জীবনকে সমান মর্যাদা দেয়, নাকি রক্তের সম্পর্ক অনুযায়ী জীবনের মূল্য কমবেশি করে?

এই প্রশ্নগুলো কেবল আধুনিক মানবাধিকার বিতর্ক নয়; এই প্রশ্নগুলো সরাসরি কুরআনের সামনে দাঁড় করানো প্রশ্ন। কারণ কুরআন নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ফুরকান হিসেবে—যা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করে।

আল্লাহ কুরআনে বলেন—

ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ
“এটাই সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই।”
(সূরা আল-বাকারা ২:২)

অতএব ইসলামের নামে প্রচলিত কোনো বিধান, কোনো হাদিস, কোনো ফিকহি সিদ্ধান্ত যদি কুরআনের ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও স্পষ্ট ঘোষণার বিরুদ্ধে যায়—তাহলে সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঈমানের বিরুদ্ধে নয়, বরং ঈমানের দাবিই।

এই প্রবন্ধে আমরা এমনই একটি বহুল প্রচলিত হাদিস ও তার ওপর গড়ে ওঠা শরিয়াহ ধারা বিশ্লেষণ করব—
যেখানে বলা হয়েছে:

পিতা যদি পুত্রকে হত্যা করে, তবে পিতার মৃত্যুদণ্ড হবে না।

আরও ভয়ংকর হলো—এই ধারণাকে শরিয়াহ আইনে ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত করা হয়েছে:
মা, দাদা-দাদী, নানা-নানি → পুত্র-কন্যা → নাতি-নাতনি—
অর্থাৎ রক্তের সম্পর্ক যত উপরের দিকে, হত্যার শাস্তি তত হালকা।

প্রশ্ন হলো—
এই ধারণা কি কুরআনের শিক্ষা?
নাকি এটি কুরআনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একটি মানবসৃষ্ট ধর্মীয় কাঠামো?


আলোচ্য হাদিস

তিরমিজি শরীফে বর্ণিত হাদিসটি হলো—

আরবি পাঠ:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «لَا يُقْتَلُ الْوَالِدُ بِوَلَدِهِ»

বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“পিতা যদি তার সন্তানকে হত্যা করে, তবে পিতাকে হত্যা করা হবে না।”

তথ্যসূত্র:
তিরমিজি, হাদিস ১৪০৫, ১৪০৬

এই হাদিসকে ভিত্তি করে বহু ফিকহি গ্রন্থে বলা হয়েছে—
পিতা, মাতা, দাদা, দাদী, নানা, নানি—যদি সন্তান বা নাতিকে হত্যা করে, তবে তাদের ওপর কিসাস (মৃত্যুদণ্ড) প্রযোজ্য হবে না।


হাদিসটির মূল দাবি কী

এই হাদিস ও তার শরিয়াহ ব্যাখ্যার মূল দাবি দাঁড়ায়—

মানুষের জীবন সমান নয়
রক্তের সম্পর্ক যত উঁচু, হত্যার শাস্তি তত কম।
অর্থাৎ—

  • অপরিচিত মানুষ হত্যা → মৃত্যুদণ্ড
  • নিজের সন্তান হত্যা → মৃত্যুদণ্ড নেই

এখন প্রশ্ন—কুরআন কি মানুষের জীবনকে এভাবে স্তরভেদ করেছে?


কুরআনের প্রথম ও মৌলিক নীতি: মানুষের জীবন পবিত্র

কুরআন মানুষের জীবন সম্পর্কে একটি সার্বজনীন ঘোষণা দিয়েছে—

وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ

“যে প্রাণকে আল্লাহ পবিত্র করেছেন, ন্যায্য কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না।”
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৩)

এই আয়াতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট—

  • বলা হয়েছে النَّفْسَ — কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্ক নয়
  • বলা হয়নি: ‘পরের প্রাণ’, ‘অপরিচিতের প্রাণ’
  • বলা হয়েছে: যে প্রাণ আল্লাহ হারাম করেছেন

পিতা, পুত্র, কন্যা—সবাই এই ‘নফস’-এর অন্তর্ভুক্ত।


কুরআন কি সম্পর্কভিত্তিক হত্যাকে বৈধ করেছে?

কুরআনে কোথাও বলা নেই—

  • পিতা সন্তানকে হত্যা করলে শাস্তি কম
  • মা সন্তান হত্যা করলে দায় কম
  • পরিবার হলে বিচার আলাদা

বরং কুরআন ঘোষণা করে—

مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا

“যে ব্যক্তি কোনো একটি প্রাণকে হত্যা করে—হত্যার বদলা বা পৃথিবীতে ফাসাদ ছাড়া—সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।”
(সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩২)

এখানে লক্ষণীয়—

  • ‘কার প্রাণ’ বলা হয়নি
  • ‘নিজের সন্তান’ বলে কোনো ব্যতিক্রম নেই
  • হত্যা মানেই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ

ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা

কুরআন আরও কঠোর ভাষায় বলে—

وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا

“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুমিনকে হত্যা করে, তার প্রতিদান জাহান্নাম—সে সেখানে স্থায়ী হবে।”
(সূরা আন-নিসা ৪:৯৩)

এখানে—

  • হত্যাকারীর পরিচয় দেখা হচ্ছে না
  • সম্পর্ক দেখা হচ্ছে না
  • একমাত্র বিষয়: ইচ্ছাকৃত হত্যা

পিতা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পুত্রকে হত্যা করে—তাহলে এই আয়াত কি বাতিল হয়ে যায়?


মানব মর্যাদা: কুরআনের চূড়ান্ত ঘোষণা

কুরআন মানুষকে বংশ বা সম্পর্ক দিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে—

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ

“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদের মর্যাদা দিয়েছি।”
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০)

আদম সন্তান মানে—

  • পিতা
  • পুত্র
  • কন্যা
  • নাতি

সবাই সমানভাবে মর্যাদাপ্রাপ্ত।


তাহলে এই হাদিস ও শরিয়াহ ধারণা এল কোথা থেকে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাই।

প্রাক-ইসলামি আরব সমাজ ছিল পিতৃতান্ত্রিক। পিতা ছিল সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সন্তান ছিল সম্পত্তির মতো।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে— এই ধরনের হাদিস সেই সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন, কুরআনের নয়।

কারণ কুরআন ঠিক সেই সমাজেই এসে—

  • কন্যা হত্যা নিষিদ্ধ করেছে
  • উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেছে
  • পিতার ক্ষমতা সীমিত করেছে

তাহলে আবার পিতাকে সন্তান হত্যায় দণ্ডমুক্ত করা—এটা কুরআনের বিপরীত স্রোত।


শরিয়াহ সম্প্রসারণের ভয়াবহতা

এই একটি হাদিস থেকে ফিকহি গ্রন্থগুলো যে সিদ্ধান্তে গেছে তা আরও ভয়ংকর—

  • মা সন্তান হত্যা করলে → কিসাস নেই
  • দাদা নাতিকে হত্যা করলে → কিসাস নেই
  • নানা নাতনিকে হত্যা করলে → কিসাস নেই

এটি কার্যত একটি বার্তা দেয়—

“পরিবারের ভেতরে হত্যা করলে আইন দুর্বল।”

এটি কি সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে, নাকি অপরাধকে উৎসাহ দেয়?


কুরআনের ন্যায়বিচারের নীতি

কুরআন বিচার সম্পর্কে বলে—

وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ

“আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে।”
(সূরা আন-নিসা ৪:৫৮)

এখানে বলা হয়েছে—

  • মানুষের মধ্যে
  • মুসলিম–অমুসলিম নয়
  • পিতা–পুত্র নয়

উপসংহার

পিতা পুত্রকে হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড নেই— এই ধারণা কুরআনের ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জীবনপবিত্রতার সম্পূর্ণ বিরোধী।

ইসলাম যদি সত্যিই আল্লাহর ধর্ম হয়, তাহলে তার মানদণ্ড হবে কুরআন—কোনো সামাজিক রেওয়াজ নয়।


চূড়ান্ত শ্লোগান

কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ— না মিললে বর্জন।
কুরআনই সত্য ও মিথ্যার একমাত্র মানদণ্ড।



আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page