• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১২:০৩ অপরাহ্ন

ইফতার নাকি ইতমাম? কুরআনের সাথে পথ চলা

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৭৯০ Time View
Update : রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

ইফতার নাকি ইতমাম? কুরআনের সাথে পথ চলা

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ


‘সন্ধ্যার অন্ধকার”


রিয়াজুল ইসলাম তার বন্ধুদের সঙ্গে একটি ইসলামিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করার জন্য স্থানীয় মসজিদে যাচ্ছিলেন। সেই সেমিনারে আলোচনার মূল বিষয় ছিল—’ইফতার করার সঠিক সময় এবং সিয়াম নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণার বিশ্লেষণ’। রিয়াজুল ইসলাম জানতেন, পৃথিবীর ৬০ ভাগ মুসলিম সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করে থাকেন, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এটি পুরোপুরি সঠিক নয়।

তিনি কনফারেন্সের আগেই একটু চিন্তা করতে লাগলেন—কেন এত কম মুসলমান রাতে ইফতার করেন, যখন কুরআন স্পষ্টভাবে রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করতে বলেছে? মসজিদে পৌঁছানোর পর, সেমিনারের প্রথম পর্ব শুরু হল।
প্রধান বক্তা মাওলানা শাফি বলেন, পৃথিবীর ৬০ ভাগ মুসলমানরা সূর্যাস্তের পরই সিয়াম ভঙ্গ করে থাকেন, কিন্তু ইসলাম আমাদের শুধুমাত্র সূর্যাস্তের সময়ে নয়, বরং রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করতে বলেছে।”

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলাল লাইল” অতঃপর তোমরা সিয়াম পুর্ণ কর রাত পর্যন্ত। (বাকারা ১৮৭)

বন্ধুগণ! আল্লাহ যেমন রাত পর্যন্ত সিয়াম পুর্ণ করতে বলেছেন তেমনি তিনি পবিত্র কুরআনে রাত কখন হয়, তার পরিচয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। ইফতারির সময় সম্পর্কে যাতে উম্মাহর মধ্যে কোনো সন্দেহ বা দ্বিধাবিভক্তির সৃষ্টি না হয় তার সব প্রমাণ, নির্দেশ, দলিল ও ব্যাখ্যা পবিত্র কুরআনে সবিস্তারে বিদ্যমান। আল্লাহ দিবা-রাত্র এবং মধ্যবর্তী বিভিন্ন সময় উল্লেখ করতে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন اليل ‘লাইল’ অর্থ রাত এটি পবিত্র কুরআনে ১৬২টি স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে।

পবিত্র কুরআনে ব্যবহৃত اليل ‘লাইল’ শব্দ দ্বারা কখনো, কোনোভাবেই সন্ধ্যা বা সূর্যাস্তের সময়কে বুঝানো হয়নি।

মহান আল্লাহ রাত নামে একটি সুরাই নাযিল করেছেন (সুরা আল লাইল।) তাতে তিনি রাতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,

وَٱلَّيْلِ إِذَا يَغْشَىٰ

“শপথ রাতের যখন তা (অন্ধকার দিয়ে) ঢেকে দেয়।” (সুরা আল লাইল ১) 

অর্থাৎ দিনের আলোকে তিনি রাতের অন্ধকার দিয়ে ঢেকে দেন। তিনি আরো বলেন,

وَٱلَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ

“রাতের শপথ যখন তা হয় শান্ত-নিঝুম হয়”। (সুরা আদ দুহা ৯৩ঃ২)

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন,

وَٱلَّيْلِ وَمَا وَسَقَ

“আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার।” (ইনশিকাক ৮৪ঃ১৭)

বন্ধুরা আপনারা কি জানেন? রাত কিসের সমাবেশ ঘটায়? এটাও তিনি স্পষ্ট করেছেন, সুরা আনয়ামের ৭৬ নম্বর আয়াতে। তিনি বলেন,

فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ ٱلَّيْلُ رَءَا كَوْكَبًاۖ قَالَ هَٰذَا رَبِّىۖ

“রাতের আঁধার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন সে নক্ষত্র দেখতে পেল, (তখন) বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক”। (সুরা আনআম ৬ঃ৭৬)

এই আয়াত দারা এটা প্রমাণিত হয় যে, রাত যখন নেমে আসে তখন আকাশের তারকারাজি দেখতে পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন,

يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَ يَطْلُبُهُ

“দিনকে তিনি রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন”। (সুরা আরাফ ৭ঃ৫৪)

অর্থাৎ দিনের আলো যখন অন্ধকারে ঢাকা পরে যায় এটাকে রাত বলে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন,

كَأَنَّمَآ أُغْشِيَتْ وُجُوهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ ٱلَّيْلِ مُظْلِمًاۚ

“যেন তাদের মুখমন্ডলকে আচ্ছাদিত করে দেয়া হয়েছে গাঢ় অন্ধকার রাত্রির টুকরো দিয়ে’। (সুরা ইউনুস ১০ঃ২৭)

সুরা আর রাদের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَءَايَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

“তিনি দিবসের উপর রাতের আবরণ টেনে দেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শনাবলী রয়েছে”। (সুরা রাদ ১৩ঃ ০৩)

তাই বন্ধুরা! আমরা পবিত্র কুরআনের আয়াত দ্বারা জানতে পারি রাত হলো অন্ধকারের নাম। অন্ধকার হয়ে যাওয়া মানে রাত শুরু হওয়া। যেমন আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

وَجَعَلْنَا ٱلَّيْلَ وَٱلنَّهَارَ ءَايَتَيْنِۖ فَمَحَوْنَآ ءَايَةَ ٱلَّيْلِ وَجَعَلْنَآ ءَايَةَ ٱلنَّهَارِ مُبْصِرَةً

“আমি রাত আর দিনকে দু’টো নিদর্শন বানিয়েছি। আমি রাতের নিদর্শনটিকে আলোহীন করেছি, আর দিনের নিদর্শনটিকে করেছি আলোয় উজ্জ্বল”। (সুরা ইসরা আয়াত- ১৭ঃ১২)

يُكَوِّرُ ٱلَّيْلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلَّيْلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمْسَ وَٱلْقَمَرَۖ

“রাত দিনকে ঢেকে নেয়, আর দিন ঢেকে নেয় রাতকে। তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন সুরুজ আর চাঁদকে:”। (সুরা যুমার আয়াত ৩৯ঃ০৫)

শাফি সাহেবের কথাগুলো রিয়াজুল ইসলামের মনকে একটু নাড়া দিলো, কিন্তু তিনি একদম নিশ্চিত ছিলেন না। সেমিনার শেষে, রিয়াজুল ইসলাম শাফি সাহেবের কাছে গেলেন এবং বললেন, “মাওলানা সাহেব, আপনি কি একটু বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, কেন সূর্যাস্তের পর ইফতার করা সঠিক নয়?”

শাফি সাহেব গভীরভাবে রিয়াজুল ইসলামের দিকে তাকালেন এবং বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, তুমি একটি গুরুত্বপূণ দাবি তুলেছো। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَكُلُوا۟ وَاشْرَبُوا۟ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلْخَيْطُ ٱلْأَبْيَضُ مِنَ ٱلْخَيْطِ ٱلْأَسْوَدِ مِنَ ٱلْفَجْرِ ۖ ثُمَّ أَتِمُّوا۟ ٱلصِّيَامَ إِلَى ٱلَّيْلِ ۚ

“আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে সাদা রেখা (ভোরের আলো) স্পষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর সিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।” মহান আল্লাহ তায়ালার এই নির্দেশটি, সূর্যাস্তের পর ইফতার করার বিপক্ষে, এবং রাতে ইফতার করার পক্ষে।” (সুরা বাকারা আয়াত ২ঃ১৮৭)

রিয়াজুল ইসলাম একটু অস্বস্তিতে পড়লেন। বললেন “কিন্তু আমরা তো সবসময় সূর্যাস্তের পরই ইফতার করি। “সুর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথেই আমরা যেন তারাতারি ইফতার করে ফেলি এজন্য আমাদের জোর তাগিদ দেয়া হয়।

“ঠিক বলেছো,” শাফি সাহেব হাসলেন, “এটি একটি দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা প্রথা, কিন্তু কুরআন ও হাদিসের আলোকে সন্ধ্যা হওয়ার পরেও পুরোপুরি রাত আসার আগ পর্যন্ত আমাদের সিয়াম সম্পূর্ণ হয় না। অনেক অঞ্চলে, বিশেষত উত্তরের দেশগুলোতে, সূর্যাস্তের পরও বেশ কিছুক্ষণ আলো থাকে।

সুর্যাস্তের সময়কে কুরআনে “গুরুবিশ শামস” বলা হয়েছে, আর সুর্যাস্তের স্থানকে বলা হয়েছে “মাগরীব”। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَاۖ

“এবং তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাগীতি (নিয়মিত) উচ্চারণ কর সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং সুর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বে”। (সুরা তহা ২০ঃ১৩০)

إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ ٱلشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِى عَيْنٍ حَمِئَةٍ

“যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে ঘোলা পানিতে ডুবতে দেখল। (সুরা কাহাফ ১৮ঃ৮৬)

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ ٱلْغُرُوبِ

“আর সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের মহিমা ও প্রশংসা ঘোষণা কর”। (সুরা ক্বফ ৫০ঃ৩৯)

শোন রিয়াজুল! যদি সুর্যাস্তের সময় ইফতার করা বৈধ হত তাহলে আল্লাহ তায়ালা “লাইল” শব্দটি ব্যাবহার না করে এভাবে বলতেন যে “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলা গুরুবিশ শামছ” কিন্তু তিনি তা বলেন নি।

রিয়াজুল বিষয়টি ভেবে অনেকটা আশ্চর্যবোধ করলো। এবং বললো, জি হুজুর আপনার কথায় যুক্তি আছে। রিয়াজুেলর জানার আগ্রহ যেন বেড়েই চলছে, তিনি পরিষ্কার ভাবে বুঝার জন্য আবারো প্রশ্ন করলেন, তাহলে কি হুজুর সুর্যডুবে গেলেও রাত শুরু হয়না?

শাফি সাহেব বিষয়টি আরো ভালোভাবে উপস্থাপন করলেন, সুর্য অস্ত যাওয়ার পর পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে থাকে, এ সময়টিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা “আসিলা বা সন্ধা বলেছেন” যেমন কুরআনে বলা হয়েছে,

وَٱذْكُر رَّبَّكَ فِى نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ
ٱلْجَهْرِ مِنَ ٱلْقَوْلِ بِٱلْغُدُوِّ وَٱلْءَاصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلْغَٰفِلِينَ

“তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়-ভীতি সহকারে অনুচ্চস্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ কর আর উদাসীনদের দলভুক্ত হয়ো না” (সুরা আরাফ ৭ঃ২০৫)

এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা “আছল” বা সন্ধার কথা স্পস্ট করেই বলেছেন। এছাড়াও তিনি আরো বলেন, “ওয়া সাব্বিহু বুকরতাও ওয়া আসিলা।

وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

“আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর।” (সুরা আহযাব ৩৩ঃ৪২)

وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

আর সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর। (সুরা আল ফাতহ ৪৮ঃ৯)

وَٱذْكُرِ ٱسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

আর সকাল-সন্ধ্যায় তোমার রব্ব এর নাম স্মরণ কর। সুরা ইনসান ৭৬ঃ২৫)

উপোরোক্ত চারটি আয়াতে সন্ধার সময়ের কথা সুন্দর ভাবে উল্লেখিত হয়েছে। এই সন্ধার সময়েও যদি ইফতার করা বৈধ হতো তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলতেন, “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলাল আছল” কিন্তু তিনি তা বলেননি। এরপর লালিমা দুর হবার পর সাদা আভা দেখা দেয় এটাকে “শাফাক” বা গোধূলী ” বলে। কুরআনে এসেছে,

فَلَآ أُقْسِمُ بِٱلشَّفَقِ – وَٱلَّيْلِ وَمَا وَسَقَ

আমি শপথ করি শাফাক বা গোধুলীর, আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার। (সুরা ইনশিকাক ৮৪ঃ১৬,১৭)

৪/- নাহার। দুহা এর সময় যখন অতিবাহিত হয়ে যায় এবং সূর্য যখন প্রখর তাপ দেওয়া শুরু করে ঠিক তখনি প্রকৃত দিন শুরু হয়। এই সময়কে নাহার বলে। পবিত্র কুরআনে এর বর্ণনা রয়েছে।

এসময়েও যদি ইফতার করা যেত তাহলে আল্লাহ তায়ালা বলতেন, “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইালাশ্ শাফাক্ব” কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এটাও বলেননি, তিনি বলেছেন, “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলাল লাইল“। যখন শাফাক বা গোধূলী অদৃশ্য হয়ে যায় তখন লাইল বা রাত নেমে আসে। তাই কুরআনের নির্দেশ অনুসারে রাত পর্যন্ত ইফতার করা উচিত।”

রিয়াজুল আরো কিছু প্রশ্ন করতে চাইলেন, কিন্তু শাফি সাহেব বলে উঠলেন, “এটা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাপার নয়, এটি কুরআনের বাণীও। আমাদের উচিত, আমরা যেভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) এ’র সুন্নাহ অনুসরণ করে চলি, ঠিক তেমনি এই বিষয়েও আমাদের তাঁর পথে চলা উচিৎ।”

রিয়াজুল মাথা নিচু করে শাফি সাহেবের কথাগুলো ভাবতে লাগলেন। তিনি জানতেন যে ইসলাম কখনোই মানুষকে বিভ্রান্ত করে না, তাই তার মনস্থির হল যে, তাকে আরও গভীরভাবে এই বিষয়টি খুঁজে দেখতে হবে।
মাগরীবের আগেই রিয়াজুল বাসায় ফিরে এলেন। তিনি সেদিন সন্ধ্যার সময় কোন কিছু খাবেন না, একেবারে রাতে খাবার গ্রহণ করতে মনস্থির করলেন।

ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَٰلَهُم بِٱلَّيْلِ وَٱلنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

“যেহেতু কুরআনে রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করার কথা বলেছে, তাহলে রাতের পূর্ণ আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত”—এই চিন্তা তার মন থেকে যাচ্ছিল না।
এদিকে, তার স্ত্রী ফাতেমা রিয়াজুলকে বললেন, “আপনি কি ঠিক আছেন? আজকে সন্ধ্যায় সিয়াম ভাঙার কি ব্যাবস্থা করলেন।?”

রিয়াজুল একটু হাসলেন, ” নারে আজকে আর সিয়াম ভাঙবোনা আজকে সিয়াম পূর্ণ করবো ইনশাআল্লাহ, ফাতেমা হতবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে থাকলো, কিছু বুঝে উঠতে পারছিলোনা।

রিয়াজুল বললেন, শোন ফাতেমা, ইফতার শব্দটির অর্থ হল ভেঙ্গে ফেলা, আর ইতমাম শব্দের অর্থ হল “পুর্ণ করা”। আল্লাহ বলেছেন, আতিম্মু – তোমরা পুর্ণ কর, তিনি ইফতার তথা ভেঙে ফেলতে বলেননি।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলাল লাইল” “তোমরা সিয়াম পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত” (বাকারা ১৮৭) তাই কুরআনের নির্দেশ অনুসারে রাত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে ইফতার করা উচিত।”

আর যখন আমরা রাতে ইফতার করবো তখন তা হয়ে যাবে ইতমাম। সুতরাং আমি আজকে কিছুক্ষণ পর পর আকাশের দিকে তাকিয়ে রাতের আসল আগমনের জন্য অপেক্ষা করব।”

ফাতেমা কিছুটা অবাক হলেন। তিনি জানতেন যে রিয়াজুল প্রায়ই কুরআনের বাণী ও হাদিস নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু আজকের এই বিশেষ সিদ্ধান্ত তাকে কিছুটা ভাবিয়ে তুলল।

ফাতেমা বললেন, “তাহলে এটাই যদি সঠিক হয়, আমাদের পরিবারের অন্যদেরও এই বিষয়টি জানানো উচিত। যদি সত্যিই রাতের পূর্ণ আগমনের পর ইফতার করা উত্তম হয়, তাহলে তো সবাইকে এই কথা জানাতে হবে।

রিয়াজুল গভীরভাবে চিন্তা করলেন। তিনি জানতেন, এই ধরনের বিষয়গুলি মুসলমানদের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনো এক বিশেষ সময়ের সীমায় সীমাবদ্ধ না রেখে, কুরআন ও হাদিসের অনুসরণ আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রিয়াজুল সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আজ রাতেই তিনি প্রথমবারের মত ইতমাম করবেন রাতের পুরোপুরি আগমন নিশ্চিত হওয়ার পর।

পরবর্তী সময়ে, তিনি এই বিষয়ে আরও আলোচনা করবেন মাওলানা শাফির সাথে। তিনি আরো ভালো করে জেনে নিবেন সবগুলো সময়ের পরিপুর্ণ ব্যাক্ষা। এবং সবসময় সতর্ক ও সচেষ্ট থাকবেন আল্লাহর বিধান অনুসরণ করতে। তার কাছে এটি শুধু একটি সাধারণ বিষয় ছিল না; এটি ছিল সত্যের পথে চলার একটি বড় প্রচেষ্টা। তাকে জানতেই হবে সত্যের পথ কোনটি।


‘সন্ধ্যার পরের অপেক্ষা’


রাতের খাবার প্রস্তুত হতে হতে রিয়াজুল ইসলাম কিছুটা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তার মনে হচ্ছিল, আজকের সিদ্ধান্তটি তাদের পরিবারের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ফাতেমা রাতের খাবারের জন্য মাংস, ভাত, সবজি—সবই প্রস্তুত করে রেখেছিল। কিন্তু রিয়াজুলের মন স্থির ছিল, তিনি রাতের পূর্ণ আগমনের পরই খাবার গ্রহণ করবেন।

তিনি জানতেন, সাধারণত বেশিরভাগ মুসলমানরা সূর্যাস্তের সাথে সাথেই সিয়াম ভেঙ্গে ফেলে। তবে, তার বিশ্বাস ছিল, কুরআন এবং হাদিসে যে নির্দেশনা রয়েছে, তা অনুসরণ করাই সঠিক পথ। গণতন্ত্র দিয়েতো আর ইসলাম চলেনা। সুতরাং রাতের আগমন না হওয়া পর্যন্ত ইফতার করা হালাল হবেনা।

إِذَا غَابَتِ الشَّمْسُ فَلا تَعْجَلُوا بِالإِفْطَارِ، دَعُوا اللَّيْلَ يَأْتِي حَتَّى تَغِيبَ الْحُمْرَةُ

ফাতেমা বলল, আমরাতো মাদরাসায় এমন কিছু হাদিস পড়েছি, যেই হাদিসগুলো বলে ইফতার তারাতারিই করতে হয়। এই হাদিস সমন্ধে আপনি কি বলবেন? যেমন-

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ  قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ.

“সাহল ইবন সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করতে থাকবে। (সহীহ বুখরী ১৯৫৭, মুসলিম ১০৯৮)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: أَحَبُّ عِبَادِي إِلَيَّ أَعْجَلُهُمْ فِطْرًا.

“আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আল্লাহ عز وجل বলেন, ‘আমার বান্দাদের মধ্যে আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে দ্রুত ইফতার করে। (তিরমিজি ৭০০, ইবনে মাজাহ ১৬৯৪)

রিয়াজুল একটু ভাবলেন এবং মৃদু হেসে ফাতেমাকে উত্তর দিলেন, “শোন! ফাতেমা, আমিত জানি, এই হাদিসে দ্রুত ইফতার করতে বলা হয়েছে, এর মানে এটা নয় যে “তোমরা সময়ের আগেই ইফতার কর’, এর মানে হলো সময় হলে “তোমরা খাবার খেতে বিলম্ব করনা”

রমজান মাস ইবাদতের মাস। খাবার খেতেই যদি তুমি অনেক সময় লাগিয়ে দেও তাহলে রাতের ইবাদত কখন করবে? এজন্য খাবার খেতে বিলম্ব করা বা ধীর গতীতে খাবার খাওয়া মোটেই উচিৎ নয়।

রিয়াজুল আরো বললেন, আজ আমি আল্লাহর রাস্তায় আরও একটু সতর্ক হতে চাই। কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।’ তাহলে সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করা কি করে সম্ভব হয়। রাত আগমনের আগেই ইফতার করা কুরআন-সুন্নাহর সঠিক পথ হতে পারেনা।”

ফাতেমা একটু থেমে গেলেন এবং ভাবলেন, “তাহলে কি আমাদের সবাইকে নতুন করে শিখতে হবে যে রাতের পূর্ণ আগমন না হলে ইফতার করাটা ঠিক নয়?”
“হ্যাঁ, তুমি সঠিক বলেছো,” রিয়াজুল হাসলেন। “আমরা যদি কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে চলি, তাহলে শুধু নিজেই নই, আমাদের পরিবার এবং সমাজকেও সঠিক পথ দেখাতে পারব।”

এরপর রিয়াজুল শাফি সাহেবের কথাগুলি মনে করে বললেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘তোমরা যেভাবে আমাকে দেখেছো, তেমনই আমল করো।’ শাফি সাহেব বলেছিলেন, সূর্যাস্তের সময় আমাদের সিয়াম ভাঙার প্রয়োজন নেই, বরং রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করা উচিত। এর পেছনে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখবে, এটা আমাদের বিশ্বাসের প্রতি এক ধরনের সততা প্রকাশ করে।”

ফাতেমা আর কিছু না বললেও, তার মধ্যে এক ধরনের শান্তি অনুভূত হলো। তিনি রিয়াজুলের সিদ্ধান্তে সমর্থন দিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে রিয়াজুল যে কোন সিদ্ধান্ত নেন, তা কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণেই হয়।
রিয়াজুল যখন দেখলেন সুর্য ডোবার পরেও চারোদিকে আলো ছড়িয়ে আছে, তখন তিনি বসে থেকে সময়ের সঠিক ক্ষণটা বুঝতে চেষ্টা করছিলেন। তিনি জানতেন, সঠিক সময়ে ইতমাম করা একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং রাতের আগমন নিশ্চয়তার সাথে খাবার গ্রহণই তার কাছে সবচেয়ে প্রাধান্য পায়।

তিনি চিন্তা করতে থাকলেন, “কেন আমরা সূর্যাস্তের পরেই ইফতার করি? কারণ এটি অনেক সহজ, আর সকলের কাছে প্রচলিত। কিন্তু কুরআন এবং রাসুল (সা.) এর নির্দেশ অনুসরণ করা কতটা মহৎ, তা এখন অনুভব করছি।”

একটি সময় পর, রিয়াজুল যখন দেখতে পেলেন চারদিকে অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে রাতের আগমন শুরু হয়ে গেছে, তখনই তিনি খাবার গ্রহণ করলেন। যেহেতু বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ তাই সুর্যদয় ও সুর্যাস্তের সময় এখন নির্ধারিত এবং মানুষ ঘড়ি দেখেই তা নিশ্চিত হতে পারে।

কিন্তু রিয়াজুল জানতনা যে, রাত কখন শুরু হয় এর সময়ও নির্ধারিত রয়েছে। তাই শাফি সাহেবের কাছে এই প্রশ্নটি করবেন বলে মনস্থির করলেন। এই মুহূর্তে তিনি অনুভব করলেন, ইফতার করা শুধু শারীরিক ক্ষুধা মেটানো নয়, বরং এটি ছিল তার বিশ্বাস ও ঈমানের এক নিখুঁত প্রতিফলন।

তারপর রিয়াজুল ফাতেমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আল্লাহর পথে চলা কতটা শান্তির অনুভূতি তৈরি করে, সেটা বুঝতে পারছি।”

ফাতেমা কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, “আপনি ঠিক বলেছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, আজকের এ রাতের জন্য পরিবার এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে কতটা সমালোচনা হবে?”

রিয়াজুল মনে মনে ভাবলেন, “এটাই তো আসল শিক্ষা—নতুন পথে চললে কিছুটা বিরোধিতা বা সন্দেহ আসবেই, কিন্তু সত্যের পথে চলা সবচেয়ে বড় কর্তব্য।”
পরের দিন, রিয়াজুল নিজেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের এই ব্যাপারে জানাতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “আমাদের গতকালের রাতে ইফতারীর সিদ্ধান্তটি ছিল আল্লাহর কাছে সঠিক ও মনোনিত পন্থা। কুরআনে রাত পর্যন্ত ইফতার করার নির্দেশ রয়েছে, তাই আমাদের তা অনুসরণ করা উচিত।”

পরিবারের সদস্যরা কিছুটা অবাক হলেও, তাদের মধ্যে এক ধরনের নতুন উপলব্ধি জন্ম নিল। তারা বুঝতে পারল, রিয়াজুলের সিদ্ধান্তটি একদম সঠিক ছিল। তারা সেদিন রাতে ইফতার করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এই নতুন অভিজ্ঞতা রিয়াজুলের জন্য ছিল শুধু একটি খাওয়ার সময়ের পরিবর্তন নয়, এটি ছিল তার ঈমান এবং তার বিশ্বাসের উপর একটি দৃঢ় পরীক্ষা। রাতে ইফতার করার মধ্য দিয়ে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন, এবং আল্লাহর পথে চলার এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো তার জীবনে।


‘সত্যের পথ’


পরবর্তী দিন, রিয়াজুল ভাবলেন, আজকের সিদ্ধান্তটি শুধু তার জন্য নয়, তার পরিবারের এবং সম্প্রদায়ের জন্যও একটি বিরাট বড় শিক্ষা। রাতের ইফতারের ব্যাপারে কিছুটা বিরোধিতা আসতে পারে, কিন্তু তিনি জানতেন যে, সত্যের পথে চললে একসময় সবাই সেটা বুঝতে পারবে। আজকাল অনেকেই সূর্যাস্তের সময়েই ইফতার করে, কিন্তু কুরআন এবং হাদিসের নির্দেশনাটি তাদের কাছে পরিষ্কার করার দায়িত্ব তার।

রিয়াজুল সকালে তার কর্মস্থলে যাওয়ার আগে ফাতেমাকে বললেন, “আজ কিছুটা সময় নিয়ে আমি মাওলানা শাফির সাথে দেখা করবো। আমার আরো কিছু প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, তাই সচ্ছ ধারণা প্রয়োজন।

মসজিদে জোহরের সালাত আদায় করে রিয়াজুল মাওলানা শাফির সাথে দেখা করলেন। মাওলানা শাফি মসজিদের বারান্দায় বসে দুজন লোকের সাথে এবিষয়েই কথা বলতেছিলেন। তিনি মাওলানার কাছে গিয়ে বসে পরলেন।

মাওলানা সাহেব মুচকি হেসে রিয়াজুলকে কুশল জানালেন। এবং বললেন রিয়াজুল তুমি কি কোন বিষয় নিয়ে ভাবছ?
রিয়াজুল বললেন, হুজুর আমার কিছু প্রশ্ন আছে প্রশ্নগুলোর উত্তর না জানা পর্যন্ত আমার শান্তি মিলছেনা। দয়া করে আমার টেনশন দুর করে দিন।
মাওলানা শাফি বললেন, রিয়াজুল আগে প্রশ্নগুলো বলবেতো! তবেইতো উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো। তুমি নির্দিধায় প্রশ্নগুলো আমাকে বল।

রিয়াজুল বললেন, আমি একটি হাদিসে পড়েছিলাম এমন,

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: إِذَا أَقْبَلَ اللَّيْلُ مِنْ هَا هُنَا، وَأَدْبَرَ النَّهَارُ مِنْ هَا هُنَا، وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ، فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ.

“উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যখন রাত এদিক থেকে আসবে, দিন ওদিক থেকে চলে যাবে এবং সূর্য যখন অস্ত যাবে, তখনই রোজাদার ইফতার করবে। (সহীহ বুখারী ১৯৫৪, সহীহ মুসলিম ১১০০)

হাদিসটিতে বলা হয়েছে “সূর্য যখন অস্ত যাবে, তখনই রোজাদার ইফতার করবে।
মাওলানা শাফি বললেন, হাদিসটি আমিও পড়েছি, তুমি হাদিসটির দিকে গভীর মনোযোগ দাও এখানে তিনটি বাক্য আছে।
১। যখন রাত এদিক থেকে আসবে,
২। দিন ওদিক থেকে চলে যাবে,
৩। এবং সূর্য যখন অস্ত যাবে,
তখনই রোজাদার ইফতার করবে।”

এখানে হাদিসের এই বাক্যগুলো উল্টো করে সাজানো হয়েছে, এজন্য ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। বলোতো রিয়াজুল “রাত আগে আসে তারপরে সুর্য অস্ত যায়? নাকি সুর্য আগে অস্ত যায় তারপর রাত আসে?
রিয়াজুল মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলো অবশ্যই সুর্য আগে অস্ত যায় তারপর রাত আসে।

মাওলানা শাফি বললেন, তুমি ঠিক বলেছ। এবার হাদিসের বাক্যগুলি এভাবে সঠিকভাবে সাজাও তাহলে তোমার উত্তর পেয়ে যাবে।
১। সুর্য যখন অস্ত যাবে,
২। দিন যখন ওদিক থেকে চলে যাবে,
৩। রাত যখন এদিক থেকে ঘনিয়ে আসবে।
তখনই রোজাদার ইফতার করবে।”

এখন দেখ বাক্যগুলো সঠিকভাবে সাজানোর পর আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাইতেছি” “রাত যখন এদিক থেকে ঘনিয়ে আসবে, তখনই রোজাদার ইফতার করবে।”

মাওলানা শাফি বললেন, বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমি তোমাকে একটি হাদিসের রেফারেন্স দিচ্ছি, এই হাদিসটি পুর্বের হাদিসের পূর্ণাঙ্গরুপ অর্থাত পুর্বের হাদিসটি সম্পুর্ণ নয় নিচের হাদিসটাতে এর পুর্ণতা রয়েছে। যেই হাদিসটিতে সু-স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে,

“আবু আওফা রাঃ নবী সাঃ এর সাথে সফরে ছিলেন রমজান মাসে। তারা যখন দেখলো সুর্য ডুবে গেছে তখন নবী সাঃ বললেন ছাতু গুলে আনতে। আউফা রাঃ বলেন সুর্যডুবে গেছে কিন্তু এখনো দিন রয়ে গেছে। নবী সাঃ বললেন তুমি নাম এবং ছাতু গুলে আন। তারপর তিনি নামলেন ছাতু গুলে আনলেন। রাসুল সাঃ খেলেন এবং বললেন, সূর্য যখন এদিক থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং রাত্র যখন এদিক থেকে ঘনিয়ে আসবে তখন রোযা পালনকারী ইফতার করবে। (সহীহ মুসলিম ২৪৩০, আন্তর্জাতিক নম্বর ১১০১)

রিয়াজুল বিষয়টি শুনে অবাক হয়ে গেলো! এই একটি হাদিস উল্টো করে লিখার কারণে হাজার বছর থেকে মানুষ উল্টোপথে হাটছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে কুরআনে সবিস্তারে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু আজ আমরা কুরআন কে শুধু পাঠ করেই ক্ষ্যান্ত হই, এর ভাষা মর্ম বুঝার চেষ্টাও করিনা।

মাওলানা শাফি আরো বললেন, কুরআন ও হাদিসে এই বিষয়গুলো একেবারে সু-স্পষ্ট। সুতারাং কুরআন বহির্ভূত আমল করে কখনই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জণ সম্ভব নয়।
রিয়াজুল প্রথমবারের মত গতকাল রাতে ইফতার করতে গিয়ে একটি সমস্যা উপলব্ধি করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি জানতেননা “সুর্যাস্তের ঠিক কত মিনিট পর রাত শুরু হয়। তিনি বিষয়টি মাওলানা শাফি সাহেবের সাথে শেয়ার করলে শাফি সাহেব বললেন, সুর্যাস্তের পর যে সাফাক বা গোধুলী আমরা দেখতে পাই তা শেষ হয় সুর্যাস্তের ৪০ থেকে ৭২ মিনিট পর। অর্থাত ঋতু ভেদে এবং বিভিন্ন দেশে এর সময় স্থিতি কমবেশি হয়ে থাকে।

ইসলামী ফিকহের মধ্যে শাফাকের দুটি ব্যাখ্যা আছে:
১. শাফাকে আহমার (লালচে আভা মিলিয়ে যাওয়া) → সাধারণত ২৫-৪০ মিনিটের মধ্যে ঘটে।
২. শাফাকে আবিয়াদ (সাদা আভা মিলিয়ে যাওয়া) → ৪০-৭২ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
সালাফি, শাফেঈ ও হানাফি স্কলাররা শাফাকে আহমার মত অনুসরণ করেন, যেখানে ইশার ওয়াক্ত সূর্যাস্তের ২৫-৪০ মিনিট পরে শুরু হয়।

ভারত, উপমহাদেশের হানাফি এবং সালাফিরা শাফাকে আবিয়াদ মত গ্রহণ করেন, যেখানে ইশার ওয়াক্ত সুর্যাস্তের ৭২ মিনিট পর ধরা হয়।
আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী আমাদের চূড়ান্ত বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের প্রচলিত ক্যালেন্ডার (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, উম্মুল কুরা) অনুযায়ী ইশার ওয়াক্ত সূর্যাস্তের ৭২ মিনিট পরে হয়।

কিছু স্কলার (বিশেষ করে যারা শাফাকে আহমার মত গ্রহণ করেন) তাদের মতে, ইশার সময় ২৫-৪০ মিনিট পরেও হতে পারে। জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে, সূর্য ১৮ ডিগ্রী নিচে নামতে ৪০ থেকে ৭২ মিনিট সময় লাগে, যা শাফাকে আবিয়াদ ভিত্তিক সময় নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়।

রিয়াজুলের চেহারায় আনন্দের ঝিলিক দেখা দিলো তিনি মাওলানা শাফি সাহেবকে বললেন, ইনশাআল্লাহ শিঘ্রই আমাদের পরিবার এবং প্রতিবেশীদের সাথে ইফতার করার সময়ের সঠিকতা নিয়ে আলোচনা করবো। শাফি সাহেব বললেনঃ জি! ভাই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনো ভুল না থাকে।”

তারা গল্পে এতটাই মগ্ন ছিলো যেন শেষই হচ্ছেনা এদিকে মুয়াজ্জিন এসে আসর সালাতের আজান দেয়া শুরু করলো।

এরপর রিয়াজুল আসরের সালাত আদায় করে বাসায় চলে এলেন সালাম দিয়ে বাসায় প্রবেশ করলেন। ফাতেমা কৌতুহলী দৃষ্টিতে রিয়াজুলের নিকট সব কিছু জানতে চাইলেন। রিয়াজুল বললেনঃ সিয়াম অবস্থায় এই বিকেল মুহুর্তে আর কথা বলতে ভালো লাগছেনা, কিন্তু আজ আমি অনেক খুশি, আজ আমি অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি। তুমি ধৈর্য ধারণ কর, রাতে তোমাকে সব কথা বিস্তারিত বলবো। এখন আমাকে বাজারে যেতে হবে। রাতে রিয়াজুল এবং ফাতেমা উভয়ের মধ্যে অনেক কথা হল। তারা গুগলে সার্চ করেও অনেক তথ্য জানতে পারলো।


আলোর পথে পথচলা’


রিয়াজুল ইসলাম আজ কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। তিনি জানতেন, সাধারণ মানুষ ইফতার করার সময়টি সঠিকভাবে জানে না। সূর্যাস্তের পরেই তারা খাবার খেয়ে ফেলেন, কিন্তু রিয়াজুল জানতেন, কুরআন এবং হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী এই কাজটি করা সঠিক নয়।

আজ সকালে তিনি তার সহকর্মী বন্ধুদের সাথে আলোচনায় বসেছিলেন। তারা সূর্যাস্তের পর ইফতার করার পক্ষে কথা বলছিলেন, কিন্তু রিয়াজুল তাদের কাছে একে যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন। রিয়াজুল বললেন, “কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী, সিয়াম সঠিকভাবে পালন করতে হলে সঠিক সময়ে ইতমাম করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,

“أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ”

“তোমরা সিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত”। (বাকারা ১৮৭)
এতে পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে যে সিয়াম পূর্ণ করতে হবে রাতের আগমন পর্যন্ত, সূর্যাস্তের পর না।”

তারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, “তাহলে আপনি কী বলতে চাচ্ছেন? আমরা তো সূর্যাস্তের পরেই ইফতার করি, তাহলে কি আমরা ভুল করি?”

রিয়াজুল সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের জানা উচিৎ যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেমন রাত শেষ হওয়া মাত্রই সাহরী খেতে নিষেধ করেছেন!, তেমনি আবার রাত ঘনিয়ে এলে ইফতার করতে বলেছেন। প্রতিটি বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময় আছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে যখন আল্লাহ বলেছেন ‘রাত পর্যন্ত,’ তখন আমাদের জানা প্রয়োজন যে, রাতের পূর্ণ আগমন কেমন ও কখন হয়।

এজন্য আমাদের সূর্যাস্তের পর কিছুটা সময় অপেক্ষা করা উচিৎ, যেন আমরা আল্লাহর নির্দেষ অনুযায়ী আমাদের সিয়ামকে পূর্ণ করতে পারি।

এ কথাগুলি শুনে, একজন বললেন, “আপনি বলতে চাইছেন, সূর্যাস্তের পরেও আমাদের আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে?”
রিয়াজুল হাসলেন, “হ্যাঁ, ভাই! কুরআন এবং হাদিসে সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করতে হবে এইমর্মে কোন দলীল আসেনি।

রিয়াজুলের একজন সহকর্মী অনেকটা রেগে গিয়ে বললেন- আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আপনি নতুন কোন মতবাদ নিয়ে এসে আমাদের মধ্যে ফিতনা ছড়াচ্ছেন। আমাদের অত কিছু জানার কি দরকার? আমাদের সকলের জানা আছে যে, সুর্য উঠলেই দিন শুরু হয় এবং সুর্য ডুবলেই রাত শুরু হয়।

রিয়াজুল উত্তেজিত না হয়ে শান্তভাবে বললেন, ভাই শুনুন আমাদের সবকিছু মোটাভাবে ব্যাক্ষা করলে হবেনা। প্রতিটি বিষয় গভীরভাবে ক্ষতিয়ে দেখা উচিৎ। আমাদের অজানা অনেক কিছুই থাকতে পারে। যেমন আপনাকে একটা সহজ প্রশ্ন করি উত্তরটা দিনতো। রিয়াজুল প্রশ্ন করলেন “বলুনতো দিক কয়টি?
উত্তেজিত হওয়া সহকর্মীটি উত্তর দিল ” এটা আবার কেমন প্রশ্ন করতেছেন! দিক হল চারটি এটা কে না জানে?

রিয়াজুল বললেন- ভাই আপনি এখনো রেগে আছেন। রাগ কখনো সমাধান নিয়ে আসেনা। প্লিজ শান্ত হোন। এমন সময় সেখানে বসে থাকা আরেক সহকর্মী বললেন, রিয়াজুল ভাই দিক হলো ৮টি, পুর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, অগ্নি, বায়ু, ঈষান, নৈঋত।

রিয়াজুল বললেন তবুও শেষ হয়নি আরো ২টি দিক আছে “উর্ধ এবং অধঃ” অর্থাত উপরদিক ও নিচের দিক। তাহলে আমরা সাধারণ ভাবে জানতাম দিক চারটি, এখন দেখুন আমরা ১০ দিকের খোঁজ পেয়ে গেলাম। তার সহকর্মীদয় মাথা নিচু করলেন এবং মাথা নারিয়ে সম্মতি জানালেন।

রিয়াজুল মৃদু হেসে বললেন, দিক যেমন চারটির মধ্যে সিমাবদ্ধ নয় ঠিক তেমনি শুধু রাত আর দিন দিয়ে সময় সিমাবদ্ধ নয়, বরং রাত ও দিনের মাঝে আলো আধার মিশ্রিত বেশ কিছু প্রহর রেয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনে সব কিছু সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। প্লিজ! আপনারা আমাকে একটু সময় দিয়ে সহযোগিতা করুন আমি বিষয়টি সহজে বুঝাচ্ছি। যেমন ধরুন,

১/ “তুলুইশ্ শামস” সুর্য যখন উদয় হয় এ সময়কে বলা হয় “তুলুইশ্ শামস” এ শব্দটি পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সুরায় এসেছে। আপনারা কুরআন খুলে দেখে মিলিয়ে নিন।

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَاۖ

এবং তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাগীতি (নিয়মিত) উচ্চারণ কর সূর্যোদয়ের পূর্বে ও তা অস্তমিত হওয়ার পূর্বে। (সুরা তহা ২০ঃ১৩০)

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ ٱلْغُرُوبِ

আর সূর্যোদয়ের পূর্বে আর সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের মহিমা ও প্রশংসা ঘোষণা কর। (সুরা কফ ৫০ঃ৩৯)

২/- বুকরাহ। সুর্য উদয় হওয়ার পর কিছু সময় সুর্য রক্তিম বর্ণ হয়ে থাকে এবং সুর্য থেকে এ সময়ে কোন তাপ ছড়ায়না এ সময়কে বুকরাহ বা সকাল বলে। “বুকরাহ” শব্দটি পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সুরায় এসেছে।

وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

“আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর”। (সুরা আহযাব ৩৩ঃ৪২)

فَخَرَجَ عَلَىٰ قَوْمِهِۦ مِنَ ٱلْمِحْرَابِ فَأَوْحَىٰٓ إِلَيْهِمْ أَن سَبِّحُوا۟ بُكْرَةً وَعَشِيًّا

“অতঃপর সে তার কুঠরি থেকে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে গেল এবং ইশারায় তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর প্রশংসা-পবিত্রতা বর্ণনা করতে বলল”। (সুরা মারইয়াম ১৯ঃ১১)

وَلَهُمْ رِزْقُهُمْ فِيهَا بُكْرَةً وَعَشِيًّا

“আর সকাল-সন্ধ্যা সেখানে তাদের জন্য থাকবে জীবন ধারণের উপকরণ”। (সুরা মারইয়াম ১৯ঃ৬২)

وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

“আর সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর”। (সুরা আল ফাতহ ৪৮ঃ৯)

وَٱذْكُرِ ٱسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

“আর সকাল-সন্ধ্যায় তোমার রব্ব এর নাম স্মরণ কর”। (সুরা ইনসান ৭৬ঃ২৫)

৩/- দুহা। ইশরাক। বুকরাহ এর সময় যখন অতিবাহিত হয়ে যায় এবং সূর্য যখন তাপ দেওয়া শুরু করে ঠিক এই সময়কে দুহা ও ইশরাক বলে। পবিত্র কুরআনে দুহা নামে একটি সুরা রয়েছে।

وَٱلضُّحَىٰ

সকালের উজ্জ্বল আলোর শপথ’। (সুরা দুহা ৯৩ঃ১)

“শপথ সূর্যের ও তার উজ্জ্বল কিরণের,। (সুরা শামস ৯১ঃ১)

وَأَنَّكَ لَا تَظْمَؤُا۟ فِيهَا وَلَا تَضْحَىٰ

“সেখানে তুমি তৃষ্ণার্তও হবে না, রোদেও পুড়বে না’। (সুরা তহা ২০ঃ১১৯)

وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَىٰهَا

“তিনি তার রাতকে আঁধারে ঢেকে দিয়েছেন, আর তার দিবালোক প্রকাশ করেছেন’। (সুরা নাযিয়াত ৭৯ঃ২৯)

إِنَّا سَخَّرْنَا ٱلْجِبَالَ مَعَهُۥ يُسَبِّحْنَ بِٱلْعَشِىِّ وَٱلْإِشْرَاقِ

‘আমি পর্বতমালাকে কাজে নিয়োজিত করেছিলাম, তারা তার সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত’। (সুরা সদ ৩৮ঃ১৮)

৩/- নাহার বা দিনের প্রখরতা। দুহা বা ইশরাক এর সময় যখন অতিবাহিত হয়ে যায় এবং সূর্য যখন প্রচন্ড তাপ দেওয়া শুরু করে ঠিক এই সময়কে নাহার বা দিন বলে। পবিত্র কুরআনে এই শব্দটি অনেক বার ব্যাবহার হয়েছে। যেমন-

اَلَّذِيۡنَ يُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ بِالَّيۡلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَّعَلَانِيَةً فَلَهُمۡ اَجۡرُهُمۡ عِنۡدَ رَبِّهِمۡۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُوۡنَ‏

“যারা নিজেদের মাল রাতে ও দিনে, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ব্যয় করে থাকে, তাদের জন্য সেই দানের সওয়াব তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে এবং তাদের কোন ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হবে না। (সুরা বাকারা ২ঃ২৭৪)

تُولِجُ ٱلَّيْلَ فِى ٱلنَّهَارِ وَتُولِجُ ٱلنَّهَارَ فِى ٱلَّيْلِۖ وَتُخْرِجُ ٱلْحَىَّ مِنَ ٱلْمَيِّتِ وَتُخْرِجُ ٱلْمَيِّتَ مِنَ ٱلْحَىِّۖ وَتَرْزُقُ مَن تَشَآءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ

তুমিই রাতকে দিনের ভিতর আর দিনকে রাতের ভিতর ঢুকিয়ে দাও, তুমিই জীবিতকে মৃত হতে বের কর এবং মৃতকে জীবিত হতে বের কর আর যাকে ইচ্ছে বেহিসাব রিয্ক্ব দান কর। (সুরা আলে ইমরান ৩ঃ২৭)

هُوَ ٱلَّذِى جَعَلَ لَكُمُ ٱلَّيْلَ لِتَسْكُنُوا۟ فِيهِ وَٱلنَّهَارَ مُبْصِرًاۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَءَايَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَسْمَعُونَ

তিনিই তোমাদের জন্য রাত বানিয়েছেন যেন তোমরা তাতে শান্তি লাভ করতে পার, আর দিন সৃষ্টি করেছেন (সব কিছু) দেখার জন্য। অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে ঐ সম্প্রদায়ের জন্য যারা (মনোযোগ দিয়ে) শোনে। (সুরা ইউনুস ১০ঃ৬৭)

وَجَعَلْنَا ٱلَّيْلَ وَٱلنَّهَارَ ءَايَتَيْنِۖ فَمَحَوْنَآ ءَايَةَ ٱلَّيْلِ وَجَعَلْنَآ ءَايَةَ ٱلنَّهَارِ مُبْصِرَةً

আমি রাত আর দিনকে দু’টো নিদর্শন বানিয়েছি। আমি রাতের নিদর্শনটিকে জ্যোতিহীন করেছি, আর দিনের নিদর্শনটিকে করেছি আলোয় উজ্জ্বল। (সুরা ইসরা ১৭ঃ১২)

৫/- আসর বা বিকাল। “নাহার” এর সময় যখন শেষের দিকে চলে দিনের প্রখরতা কমতে শুরু হয় আসে তখন ‘আসর’ বা বিকাল হয়। পবিত্র কুরআনে আসর নামে একটি সুরা রয়েছে।

وَٱلْعَصْرِ

“অপরাহ্নের শপথ”। (সুরা আল আসর ১০৩ঃ১)

৬/- গুরুবিশ শামস্।আসর” এর সময় যখন শেষ হয়ে সূর্য ডুবে যায় তখন এই সময়কে ‘গুরুবিশ শামস’ বা সুর্যাস্ত বলা হয়। পবিত্র কুরআনে কয়েকটি সুরায় এর বর্ণনা রয়েছে।

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَاۖ

‘এবং তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাগীতি (নিয়মিত) উচ্চারণ কর সূর্যোদয়ের পূর্বে ও তা অস্তমিত হওয়ার পূর্বে’। সুরা তহা ২০ঃ১৩০)

إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ ٱلشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِى عَيْنٍ حَمِئَةٍ

‘যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে অস্বচ্ছ জলাশয়ে ডুবতে দেখল’। (সুরা কাহাফ ১৮ঃ৮৬)

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ ٱلْغُرُوبِ

‘আর সূর্যোদয়ের পূর্বে আর সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের মহিমা ও প্রশংসা ঘোষণা কর’। (সুরা ক্বফ ৫০ঃ৩৯)

৭/- আসল বা সন্ধা। “সুর্য অস্ত যাবার পর” যখন পশ্চিমাকাশ কিছুক্ষন লাল হয়ে থাকে সে সময়কে আছল বা সন্ধা বলে। পবিত্র কুরআনে কয়েকটি সুরায় এর বর্ণনা রয়েছে।

وَٱذْكُر رَّبَّكَ فِى نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ ٱلْجَهْرِ مِنَ ٱلْقَوْلِ بِٱلْغُدُوِّ وَٱلْءَاصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلْغَٰفِلِينَ

‘তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়-ভীতি সহকারে অনুচ্চস্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ কর আর উদাসীনদের দলভুক্ত হয়ো না’। (সুরা আরাফ ৭ঃ২০৫)

وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

‘আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর’। (সুরা আহযাব ৩৩ঃ৪২)

وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

আর সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর। (সুরা আল ফাতহ ৪৮ঃ৯)

وَٱذْكُرِ ٱسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

‘আর সকাল-সন্ধ্যায় তোমার রব্ব এর নাম স্মরণ কর’। (সুরা ইনসান ৭৬ঃ২৫)

৮/- শাফাক বা গোধূলী। “পশ্চিমাকাশ থেকে লাল বর্ণ দুর হয়ে যে সাদা আভা দেখা যায় তাকে শাফাক বা গোধূলী বলে। পবিত্র কুরআনে এর বর্ণনা রয়েছে।

فَلَآ أُقْسِمُ بِٱلشَّفَقِ – وَٱلَّيْلِ وَمَا وَسَقَ

‘আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লালিমার, আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার’। (সুরা ইনশিকাক ৮৪ঃ১৬,১৭)

৯/- লাইল বা রাত। “পশ্চিমাকাশ থেকে সাদা আভা বা শাফাক দুর হয়ে যখন অন্ধকার নেমে আসে এবং আকাশের তারকারাজী স্পষ্ট হয় তখন সে সময়কে লাইল বা রাত বলে। পবিত্র কুরআনে লাইল বা রাত নামে একটি সুরা রয়েছে।

وَٱلَّيْلِ إِذَا يَغْشَىٰ

‘শপথ রাতের যখন তা (আলোকে) ঢেকে দেয়’। (সুরা আল লাইল ৯২ঃ১)

وَٱلَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ

‘রাতের শপথ যখন তা হয় শান্ত-নিঝুম’। (সুরা দুহা ৯৩ঃ২)
وَٱلَّيْلِ وَمَا وَسَقَ

‘আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার’। (সুরা ইনশিকাক ৮৪ঃ১৭)

فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ ٱلَّيْلُ رَءَا كَوْكَبًاۖ قَالَ هَٰذَا رَبِّىۖ

‘রাতের আঁধার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন সে নক্ষত্র দেখতে পেল, (তখন) বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক। (সুরা আনআম ৬ঃ৭৬)

وَجَعَلَ ٱلَّيْلَ سَكَنًا

‘তিনি রাত সৃষ্টি করেছেন শান্তি ও আরামের জন্য। (সুরা আনআম ৬ঃ৯৬)

يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَ يَطْلُبُهُ

‘দিনকে তিনি রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন। (সুরা আরাফ ৭ঃ৫৪)

كَأَنَّمَآ أُغْشِيَتْ وُجُوهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ ٱلَّيْلِ مُظْلِمًاۚ

‘যেন তাদের মুখমন্ডলকে আচ্ছাদিত করে দেয়া হয়েছে গাঢ় অন্ধকার রাত্রির টুকরো দিয়ে। (সুরা ইউনুস ১০ঃ২৭)

يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَءَايَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

‘তিনি দিবসের উপর রাতের আবরণ টেনে দেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শনাবলী রয়েছে। (সুরা  রাদ ১৩ঃ৩)

وَجَعَلْنَا ٱلَّيْلَ وَٱلنَّهَارَ ءَايَتَيْنِۖ فَمَحَوْنَآ ءَايَةَ ٱلَّيْلِ وَجَعَلْنَآ ءَايَةَ ٱلنَّهَارِ مُبْصِرَةً

‘আমি রাত আর দিনকে দু’টো নিদর্শন বানিয়েছি। আমি রাতের নিদর্শনটিকে জ্যোতিহীন করেছি, আর দিনের নিদর্শনটিকে করেছি আলোয় উজ্জ্বল। (সুরা ইসরা ১৭ঃ১২)

يُكَوِّرُ ٱلَّيْلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلَّيْلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمْسَ وَٱلْقَمَرَۖ

‘রাত দিনকে ঢেকে নেয়, আর দিন ঢেকে নেয় রাতকে। তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন সুরুজ আর চাঁদকে। (সুরা যুমার ৩৯ঃ৫)

وَجَعَلْنَا ٱلَّيْلَ لِبَاسًا

‘রাতকে করেছি আবরণ। (সুরা নাবা ৭৮ঃ১০)

১০/- সুবহুন বা ভোর। “লাইল বা রাতের অন্ধকার যখন শেষ হয়ে যায় তখন সুবহুন, ফজর বা ভোর চলে আসে। পবিত্র কুরআনে ফজর নামে একটি সুরাও রয়েছে।

وَٱلَّيْلِ إِذْ أَدْبَرَ- وَٱلصُّبْحِ إِذَآ أَسْفَرَ

‘রাতের কসম যখন তার অবসান হয়, প্রভাতের কসম- যখন তা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। (সুরা মুদ্দাসিসর ৭৪ঃ৩৩,৩৪)

وَٱلَّيْلِ إِذَا عَسْعَسَ- وَٱلصُّبْحِ إِذَا تَنَفَّسَ

‘শপথ রাতের যখন তা বিদায় নেয়, আর শপথ ভোরের যখন তা নিঃশ্বাস ফেলে অন্ধকারকে বের করে দেয়। (সুরা তাকবীর ৮১ঃ১৭,১৮)

১১/- ফালাক্ব বা উজ্জ্বল প্রভাত । “সুবহে সাদিক যখন শেষ হয় এবং চারদিক যখন পরিষ্কার হয়ে যায় তখন তাকে ‘ফালাক্ব বা উজ্জ্বল প্রভাত’ বলে। পবিত্র কুরআনে ফালাক্ব নামে একটি সুরাও রয়েছে।

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلْفَلَقِ

‘বলুন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের কাছে। (সুরা ফালাক ১১৩ঃ১)

(রাত- اليل، দিন- نهار، সকাল- بكرة، বিকাল- الاصر، সন্ধ্যা- اصيل، সূর্যাস্ত- الغروب الشمس، সুর্য উঠা-طُلُوْعِ الشَّمْسِ، ভোর-صبح، ঊষাকাল বা প্রভাত- الفلق، সকালের উজ্জ্বলতা- الضحي، সুর্য ডুবার পর লাল আভা- الشفق )
অনুরূপভাবে সকালকে ‘বুকরা’, দিনের প্রখরতাকে ‘নাহার’ বলা হয়েছে।

পবিত্র কুরআনে বিকালের সময় সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা ‘সুরা আল আসর’ বিদ্যমান। সন্ধ্যা সম্পর্কে ‘আছিল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে (১৩:১৫)। প্রভাতকালকে বোঝাতে সুরা মুদাচ্ছিরের ৩৪ নম্বর আয়াতে ‘সুব’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

সূর্যাস্তের সময়কে পবিত্র কুরআনের সুরা তাহা : ১৩০, সুরা কাহাফ : ৮৬ এবং সুরা ক্বাফ-এর ৩৯ নম্বর আয়াতে ‘গুরুবে শামস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভার সৃষ্টি হয় এবং এটি ১৮ থেকে ২৬ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে।

এ সময়টুকুকে সুরা ইনশিক্বাকের ১৬ নম্বর আয়াতে ‘শাফাক্ব’ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। আর শাফাক্বের পূর্ণ সমাপ্তির পরই যে ‘লাইল’ বা রাত শুরু হয় তাও সুরা ইনশিক্বাকের ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

উল্লিখিত সমস্ত আয়াত দ্বারা সু¯পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, ‘লাইল’ বা রাত হলো এমন একটি সময় যা পরিপূর্ণভাবে বা সম্পূর্ণভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন, যেখানে দিনের আলোর উপস্থিতির কোনো প্রশ্নই আসতে পারে না।

‘লাইল’ অর্থ রাত, শাফাক্ব, গুরুবে শামস, আসর বা আছিল নয়। আল্লাহর কুরআন সত্য এবং কুরআনে নির্ধারিত সময় সত্য হলে আমরা যে সন্ধ্যা বা গুরুবে শামসের সময় ইফতার করি তা পবিত্র কুরআনের অমোঘ নির্দেশের পরিপন্থী।


বিষয়টি পরিষ্কার বুঝার জন্য একটিওকি হাদিস নাই?

রিয়াজুল এবং তার বন্ধুদের সাথে দীর্ঘক্ষন ধরে আলোচনা চলছিলো। রিয়াজুলের বন্ধু আবু তালেব বললো- রিয়াজুল ভাই তুমি যেভাবে আমাদের কুরআন থেকে বিষয়গুলো স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে, এটার উত্তর পেলে মনে সস্থি পেতাম।

-রিয়াজুল প্রশ্নটি জানতে চাইলে আবু তালেব বললো- আচ্ছা ভাই বিষয়টি পরিষ্কার বুঝার জন্য একটিওকি হাদিস নাই? যে হাদিস দারা স্পস্ট জানতে পারবো।
-রিয়াজুল আবু তালেবের প্রশ্ন শুনে বললো – আচ্ছা ভাই কুরআনে যেটা স্পস্ট সেটা বুঝতে আবার হাদিস লাগবে কেন?

-আবু তালেব বললো ভাই বিষয়টি সেভাবে বলিনি আসলে আছে কিনা জানতে ইচ্ছে করছে।

রিয়াজুল জানালো, মুয়াত্তা মালেকে স্পস্ট হাদিস রয়েছে ভাই। চিন্তার কোন কারণ নাই, হাদিসটি তোমাকে দেখাচ্ছি আশা করি তোমার মন থেকে দিধাগুলো দুর হয়ে যাবে।
“হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, উমর বিন খাত্তাব (রা.) ও উসমান বিন আফফান (রা.) উভয়ে মাগরিবের নামাজ পড়তেন এমন সময় রাত্রির অন্ধকার ছেয়ে যেত আর তা করতেন ইফতারের আগে। এরপর তাঁরা উভয়ে ইফতার করতেন। এ শিক্ষা তাঁরা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে পেয়েছেন।’ (মুআত্তা ইমাম মালেক প্রথম খন্ড ২৩৯ পৃষ্ঠা হাঃ ৬৯৪)

বুখারি ও মুসলিম হাদিসে হজরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘সূর্যাস্তের পর যখন পূর্বদিক থেকে অন্ধকার হয়ে আসে এবং দিনের আলো পশ্চিম দিক থেকে সম্পূর্ণ চলে যায় তখন রোজাদারদের জন্য ইফতারের সময়’ (আরো দেখুন তফসিরে ইবনে কাসীর, দ্বিতীয় খঃ পৃঃ ৯৮ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)।

সূর্যাস্তের সাথে সাথে তথা পবিত্র কুরআনের ভাষায় ‘গুরুবে শামস’ ওয়াক্তে যারা ইফতার করে সারা দিনের রোজাকে নষ্ট করে দেন, তারা যুক্তি বা দলিল হিসেবে বুখারি ও মুসলিমের একটি হাদিস উল্লেখ করে থাকেন। এটি হলো হজরত ইবনে সা’দ সায়েদি থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যতদিন মানুষ জলদি ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণপ্রাপ্ত হবে’। (বুখারী মুসলিম)

এবার রিয়াজুলের বন্ধু আবু তালেবের চেহারায় আনন্দের ঝলক দেখা দিলো। সে বললো আমি এবার নিশ্চিত হলাম। কিন্তু বন্ধু এতদিন ধরে শুনে আসলাম ইফতারিতে তারাতারি করতে হবে। হুজুররাও তাগীদ দিত তারাতারি ইফতার করতে। আজকে সব উলোট পালোট হয়ে গেল।

রিয়াজুল তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে স্পস্ট ভাষায় বলতে লাগল- তারাতারি ইফতার করার মানে এ নয় যে, ইফতারের সময় হওয়ার আগেই ইফতার করে ফেলতে হবে। রাসুলুল্লাহর (সা.) এর এই হাদিস দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে যে, ইফতারের সময় হলে বিলম্ব না করে যেন তারাতারি ইফতার করে ফেলা হয়। এখানে তারাতারি বলতে কিছুতেই মাগরিবের আজানের সময়কে বুঝায় না।

পবিত্র কুরআনে ‘আতিম্মুছ ছিয়ামা ইলাল লাইল’ অর্থাৎ রাত্রের দিকে রোজা পূর্ণ করার স্পষ্ট নির্দেশ থাকার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো সূর্যাস্তের সময় ইফতার করার নির্দেশ দিতে পারেন না। সূর্যাস্তের পরও প্রায় ২৫ মিনিট পর্যন্ত রক্তিম আভা থাকে যাকে ‘শাফাক্ব’ বলা হয়েছে। ওই সময়ও ইফতারের সময় নয়। পশ্চিম আকাশ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারাচ্ছন্ন হলে পরেই ‘লাইল’ শুরু হয় এবং ওই সময়টিই পবিত্র কুরআনের নির্দেশ মোতাবেক সত্যিকারের ইফতারের সময়।

মুসলমানদের কেউ কি রাতে ইফতার করে নাকি তুমিই প্রথম?

রিয়াজুলের বন্ধু আয়েজ উদ্দীন সেখানে উপস্থিত ছিল। সে কিছু কথা বলতে চাইছিলো। কিন্তু আবু তালেবের প্রশ্ন যেন শেষই হচ্ছেনা। এবার সে আর চুপ থাকতে পারলোনা। সে বলে উঠলো “আমি ততকিছু বুঝতে চাইনা, আমাকে শুধু একবার বল পৃথিবীর আর কেউ কি রাতে ইফতার করে নাকি তুমিই প্রথম।

সেখানে উপস্থিত ছিলো আরো একজন বিচক্ষণ ব্যাক্তি ফিরোজ খান, তিনি চুপচাপ সবকিছু শুনছিলেন আর মোবাইলে কি যেন দেখছিলেন। তিনি এবার আয়েজ উদ্দীনের জবাবে বললেন- দেখ আয়েজ উদ্দীন ভাই আমি মোবাইলে র্সাচ করে অলরেডি বের করে ফেলেছি- পৃথিবীর ৪০% শিয়া মুসলিমগণ সেই রাসুলের জামানা থেকেই রাতে ইফতার করে আসছেন যা আমরা খবর রাখিনাই।

তাদের দেরিতে ইফতার করার পক্ষে আল-কাফি, তাহযীবুল আহকাম, মন লা ইয়াহযুরুহুল ফাকিহ, আল-ইস্তিবসার ইত্যাদি হাদিস গ্রন্থ থেকে দলিল প্রদান করে। তার মধ্য হতে কিছু উল্লেখযোগ্য দলিল হল-
আল-কুলাইনি (রহ.) “আল-কাফি” তে বর্ণনা করেছেন:

إِذَا غَابَتِ الشَّمْسُ فَهُوَ وَقْتُ الْمَغْرِبِ، وَ إِذَا غَابَ الشَّفَقُ فَهُوَ وَقْتُ الْعِشَاءِ

অর্থ: “যখন সূর্য ডুবে যায়, তখন মাগরিবের সময় হয়, এবং যখন শাফাক (লাল আভা) অদৃশ্য হয়, তখন এশার সময় হয়। (আল কাফী খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৭৭)

শিয়ারা বলে, এই হাদিস প্রমাণ করে যে, মাগরিব তখনই পূর্ণ হয় যখন লাল আভা সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায়, আর ততক্ষণ পর্যন্ত ইফতার করা ঠিক নয়।

لَا تُصَلِّ الْمَغْرِبَ حَتَّى تَغِيبَ الشَّفَقُ

অর্থ: “মাগরিবের নামাজ পড়ো না যতক্ষণ না শাফাক (সূর্যাস্তের পরের লাল আভা) মিলিয়ে যায়। (বল কাফী খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৮০)

এই দলিলের ভিত্তিতে তারা বলে, ইফতারও নামাজের মতো বিলম্বিত হওয়া উচিত। শাইখ তুসি (রহ.) “তাহযীবুল আহকাম”-এ বর্ণনা করেন:

অর্থ: “যখন সূর্য ডুবে যায়, তখন তাড়াহুড়ো করে ইফতার করো না। অপেক্ষা করো যতক্ষণ না রাত চলে আসে এবং লাল আভা মিলিয়ে যায়। (মান লা ইয়া ইয়াহযুরুল ফাকিহ খন্ড ২ পৃষ্ঠা ১০১)

এই হাদিস দ্বারা তারা দাবি করে যে, রাসুল (সা.) ও ইমামগণ সূর্যাস্তের পর কিছু সময় অপেক্ষা করতেন।
শাইখ সাদুক (রহ.) “মান লা ইয়াহযুরুহুল ফাকিহ”-এ বলেন:

لا تفطر حتى تغيب الحمرة من المشرق

অর্থ: “তুমি ইফতার করবে না যতক্ষণ না পূর্ব আকাশের লাল আভা মিলিয়ে যায়। (মান লা ইয়া ইয়াহযুরুল ফাকিহ খন্ড ২ পৃষ্ঠা ১০০)

শিয়ারা বলে, এখানে “পূর্ব আকাশের লাল আভা” মিলিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা সুন্নিদের সময়ের তুলনায় কিছুটা দেরিতে ঘটে।
শাইখ তুসি (রহ.) “আল-ইস্তিবসার”-এ বর্ণনা করেন:

لا تفطروا حتى يغيب الشفق الأحمر، فإنه من السنة

অর্থ: “তোমরা ইফতার করবে না যতক্ষণ না লাল আভা মিলিয়ে যায়, কেননা এটি সুন্নাহ। (আল ইস্তিবসার খন্ড ২ পৃষ্ঠা ১২)

এটি তাদের অন্যতম প্রধান দলিল, যেখানে “সুন্নাহ” শব্দ ব্যবহার করে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, ইফতার বিলম্ব করা রাসুল (সা.) ও আহলে বাইতের প্রথা ছিল।
আলী (রা) থেকে বর্ণিত হাদিস

عن أمير المؤمنين عليه السلام قال: إذا رأيتم الليل قد أقبل من المشرق فقد أفطر الصائم

হযরত আলী (রা) বলেছেন: “যখন তোমরা দেখতে পাও যে রাত পূর্ব দিক থেকে আসতে শুরু করেছে, তখনই রোজাদার ইফতার করবে। (বিহারুল আনওয়ার খন্ড ৫২, পৃষ্ঠা ১৪৫)

এখানে “পূর্ব দিক থেকে রাত প্রবেশ” মানে হচ্ছে, রাতের অন্ধকার স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। ইমাম বাকির (র) থেকে আরেকটি বর্ণনা

عن الباقر عليه السلام قال: لا تفطروا حتى يغيب الشفق الأحمر، فإنه من السنة

ইমাম বাকির (র.) বলেছেন: “তোমরা ইফতার করবে না যতক্ষণ না লাল আভা সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায়। কেননা এটি সুন্নাহ।” (আল ওয়া সাইল খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৪০)

এখানে সুন্নাহ অনুসারে ইফতার তখনই করা উচিত যখন রাত পুরোপুরি নেমে আসে। হাম্বলি মাযহাবের দলিল

“إذا زال ضوء الشمس تمامًا من السماء، فقد دخل الليل ووجب الإفطار”

অর্থ: “যখন সূর্যের আলো সম্পূর্ণরূপে আকাশ থেকে মিলিয়ে যায়, তখন রাত প্রবেশ করে এবং ইফতার করা ওয়াজিব হয়ে যায়।” (আল মুগনী খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৭০)

এখানে “সূর্যের আলো সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাওয়া” বলতে শাফাক অদৃশ্য হওয়াকে বোঝানো হয়েছে।


চলো কুরআনের আলোয় জীবন গড়ি — বিভ্রান্তি থেকে হিদায়াতের পথে

রিয়াজুল বললো—উপস্থিত বন্ধুগণ, শোনো! আমাদের দ্বীনের মূল ভিত্তি কী? কে আমাদের সৃষ্টি করেছেন? কে আমাদের জীবন-মরণ, হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায়ের বিধান দিয়েছেন? নিশ্চয়ই, একমাত্র মহান আল্লাহ। আর তিনি আমাদের জন্য যে নির্দেশিকা প্রেরণ করেছেন, তা হলো আল-কুরআন। এই কুরআনই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ একমাত্র পরিপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য দলীল। এতে আছে হিদায়াত, নূর ও ফুরকান—অর্থাৎ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী।

আমরা কোনো ইমাম, কোনো বক্তা, বা কোনো সমাজের প্রচলিত রীতিুএসবকে দ্বীনের চূড়ান্ত দলীল হিসেবে মানি না। কারণ, মানুষ ভুল করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর বাণী কখনো ভুল হতে পারে না।

তাই আমরা বলি—‘কোনো ইমাম কী বললেন, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কী করছে’—এসব নয়, আমাদের একমাত্র দেখা উচিত কুরআনে আল্লাহ কী বললেন।
তবে, যখনই আমরা কুরআনের আলোকে কথিত ভুয়া হাদীসগুলোর বিশ্লেষণ করি, তখন কিছু মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ায়। তারা বলে—‘তোমরা হাদীস অস্বীকার করো, তোমরা কাফির’। অথচ, আমরা কখনোই রাসুল (সা.)-এর প্রকৃত নির্দেশনা অস্বীকার করি না।
আমরা বলি—হাদীস অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক, অসংগত ও ভিত্তিহীন হাদীস কখনোই দ্বীনের দলীল হতে পারে না। কারণ, রাসুল (সা.) নিজেও কুরআনের বাইরে কোনো শরীয়াহ আনেননি, বরং কুরআনের অনুসারী হিসেবে জীবনযাপন করতেন।

এই ভুল ধারণা দূর করার জন্য রিয়াজুল বললো—“বন্ধুরা, যারা আমাদের ‘হাদীস অস্বীকারকারী’ বলে ট্যাগ লাগায়, তাদেরকে বলো একবার অন্তত মাহাতাব আকন্দ ভাইয়ের লেখা হাদীস অস্বীকারকারীর পরিচয় আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে। এই আর্টিকেলে দলীলসহ বিশ্লেষণ আছে—কীভাবে প্রকৃত হাদীসভিত্তিক জ্ঞান আর অন্ধ বিশ্বাসের মাঝে পার্থক্য করতে হয়।”

“যারা মোবাইলে আর্টিকেল পড়তে সমস্যা মনে কর, তারা এখনই মাহাতাব আকন্দ ভাইয়ের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে—০১৬০৯-০৪৫১৮৫ যোগাযোগ করো। তিনি আর্টিকেলটি লিখিত বইয়ের মত করে পাঠিয়ে দিবে। তারপর নিজেরাও পড়ো, এবং সংশয়গ্রস্ত মানুষদের হাতে তুলে দাও।”

রিয়াজুল আরও বললেন—“আসুন আমরা যুক্তি, প্রমাণ, কুরআনের আলো ও সুস্পষ্ট চিন্তা দিয়ে দ্বীনকে বুঝি। গালাগালি, কটুক্তি বা অন্ধ অনুসরণ নয়—আমরা কুরআনের ওপর ভিত্তি করে রাসুল (সা.)-এর প্রকৃত আদর্শ অনুসরণ করি। আমাদের কাজ মানুষকে দাওয়াত দেওয়া, আলো দেখানো—কারও বিশ্বাসের ওপর দাগ টানা নয়।”

“শেষ কথা”

সত্য একটাই—আর সেটা আল্লাহর কুরআনে। কুরআনই হিদায়াত, কুরআনই পথপ্রদর্শক, কুরআনই আমাদের মাপকাঠি। আসুন, সেই কুরআনের আলোয় নিজের জীবন গড়ি, পরিবারকে গড়ি, সমাজকে আলোকিত করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য বুঝে গ্রহণ করার, এবং মিথ্যা চিহ্নিত করে বর্জনের তাওফিক দান করুন। রব্বানা তাকব্বাল মিন্না ইন্নাকা আংতাচ্ছামিউল আলিম।

“সমাপ্ত”

ইফতার নাকি ইতমাম? কুরআনের সাথে পথ চলা


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page