লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا أُحِلَّ لَهُمْ ۖ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ ۙ وَمَا عَلَّمْتُم مِّنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللَّهُ ۖ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে—তাদের জন্য কী বৈধ করা হয়েছে। বলো, তোমাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ বৈধ করা হয়েছে। আর তোমরা যে শিকারি প্রাণী প্রশিক্ষণ দিয়েছ—তাদেরকে তোমরা শিক্ষা দাও, আল্লাহ তোমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা অনুযায়ী—তারা তোমাদের জন্য যা ধরে রাখে, তা থেকে খাও; এবং তার উপর আল্লাহর নাম স্মরণ করো। এবং আল্লাহর বিষয়ে সচেতন হও। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
সূরা আল-মায়িদাহর ৪ নম্বর আয়াতটি হালাল-হারাম প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দিক উন্মোচন করে। এর আগের আয়াতে (৫:৩) কিছু নির্দিষ্ট হারাম বিষয় তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এখন এখানে প্রশ্ন উঠেছে—“তাদের জন্য কী বৈধ করা হয়েছে?” অর্থাৎ মানুষ জানতে চায়—নিষিদ্ধ কী তা তো বলা হলো, কিন্তু বৈধতার মূলনীতি কী? কুরআন এই প্রশ্নের উত্তরে একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে: হালালই মূল, হারাম ব্যতিক্রম।
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায়—কী খাওয়া যাবে, কী যাবে না। কুরআন প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করেনি; বরং সঠিক জবাব দিয়েছে। এখানে একটি শিক্ষা রয়েছে—দ্বীনে অনুসন্ধান বৈধ, কিন্তু সিদ্ধান্ত আল্লাহর।
আল্লাহ বলেন—তোমাদের জন্য “তাইয়্যিবাত” হালাল করা হয়েছে। “তাইয়্যিব” শব্দের অর্থ—পবিত্র, কল্যাণকর, পরিচ্ছন্ন, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ ইসলাম খাদ্যকে কেবল পুষ্টির দৃষ্টিতে দেখে না; নৈতিকতা ও পবিত্রতার দৃষ্টিতেও দেখে।
এখানে একটি মৌলিক নীতি দাঁড়ায়:
সূরা বাকারা (২:১৬৮)-এ বলা হয়েছে:
“পৃথিবীতে যা আছে তা থেকে হালাল ও তাইয়্যিব খাও।”
অতএব ইসলাম সংকীর্ণ খাদ্যব্যবস্থা নয়; বরং সুস্থ ও নৈতিক জীবনব্যবস্থা।
এরপর আয়াত একটি বিশেষ প্রসঙ্গ তোলে—শিকারি প্রাণী।
“وما علمتم من الجوارح مكلبين”
তোমরা যে শিকারি প্রাণী প্রশিক্ষণ দিয়েছ।
“জাওয়ারিহ” শব্দটি এমন প্রাণীদের বোঝায় যারা শিকার ধরে—যেমন কুকুর, বাজপাখি ইত্যাদি। “মুকাল্লিবীন” মানে প্রশিক্ষিত শিকারি হিসেবে প্রস্তুত করা।
এখানে একটি সূক্ষ্ম শিক্ষা রয়েছে—মানুষ প্রাণীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কিন্তু আয়াত বলছে—
“تعلمونهن مما علمكم الله”
তোমরা তাদেরকে শিক্ষা দাও—আল্লাহ তোমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা অনুযায়ী।
অর্থাৎ মানুষের জ্ঞান স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; আল্লাহপ্রদত্ত। মানুষ প্রযুক্তি, দক্ষতা, কৌশল ব্যবহার করে—কিন্তু তা আল্লাহর প্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা। এখানে মানব সভ্যতার একটি নীতিগত দিক ফুটে ওঠে—জ্ঞান ব্যবহার করো, কিন্তু উৎস ভুলে যেও না।
“فكلوا مما أمسكن عليكم”
তারা তোমাদের জন্য যা ধরে রাখে, তা থেকে খাও।
অর্থাৎ প্রশিক্ষিত প্রাণী যদি শিকার ধরে এবং তা তোমার জন্য ধরে রাখে—তাহলে তা বৈধ। তবে শর্ত হলো—
“واذكروا اسم الله عليه”
তার উপর আল্লাহর নাম স্মরণ করো।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য গ্রহণের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ মানে—খাদ্যকে নিছক ভোগ নয়; বরং ইবাদতের অংশে পরিণত করা। হালাল খাদ্যও যদি আল্লাহর স্মরণ ছাড়া গ্রহণ করা হয়, তাহলে সেই আধ্যাত্মিক মাত্রা হারিয়ে যায়।
এখানে একটি ভারসাম্য দেখা যায়:
আয়াতের শেষাংশ—
“واتقوا الله إن الله سريع الحساب”
আল্লাহর বিষয়ে সচেতন হও; নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
খাদ্যবিধান প্রসঙ্গে হঠাৎ হিসাবের কথা কেন? কারণ খাদ্য কেবল শারীরিক বিষয় নয়; এটি আধ্যাত্মিক জবাবদিহির অংশ। মানুষ কী খাচ্ছে, কীভাবে উপার্জন করছে, কীভাবে গ্রহণ করছে—সবকিছুর হিসাব রয়েছে।
সূরা মু’মিনুন (২৩:৫১)-এ বলা হয়েছে:
“হে রাসূলগণ, পবিত্র জিনিস থেকে খাও এবং সৎকর্ম করো।”
অর্থাৎ খাদ্যের পবিত্রতা ও আমলের পবিত্রতা সম্পর্কিত।
এই আয়াত থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন।
কেউ কেউ মনে করে ইসলাম শুধু হারাম ঘোষণা করে। কিন্তু এই আয়াতের মূল ঘোষণা—“তাইয়্যিবাত হালাল।” অর্থাৎ মূলনীতি হলো অনুমোদন; নিষেধ ব্যতিক্রম।
শিকারি প্রাণী প্রশিক্ষণের অনুমোদন দেখায়—প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার বৈধ, যদি তা নৈতিক সীমায় থাকে।
এটি কৃতজ্ঞতার চেতনা। খাদ্য আল্লাহর দান—এটি স্মরণ করা ঈমানের অংশ।
এই আয়াত তিনটি মৌলিক স্তম্ভ স্থাপন করে:
১. পবিত্রতা ও কল্যাণ হালালের ভিত্তি।
২. মানব জ্ঞান আল্লাহপ্রদত্ত—ব্যবহার করো, অহংকার করো না।
৩. ভোগের মাঝেও তাকওয়া ও জবাবদিহি।
এখানে ইসলাম জীবনবিমুখ নয়; বরং জীবনকে ইবাদতে রূপান্তরিত করে। শিকার, খাদ্য, প্রযুক্তি—সব বৈধ; কিন্তু আল্লাহসচেতনতার সাথে।
✔ হালাল-তাইয়্যিব নীতি অনুসরণ
✔ খাদ্য গ্রহণে আল্লাহর নাম স্মরণ
✔ প্রযুক্তি ব্যবহারেও আল্লাহসচেতনতা
✔ উপার্জন ও ভোগে নৈতিকতা
✔ হিসাবের কথা স্মরণ রাখা
আল্লাহ আমাদেরকে পবিত্র খাদ্য গ্রহণের তাওফীক দিন, এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি ভোগকে ইবাদতে রূপান্তরিত করার চেতনা দান করুন। নিশ্চয়ই তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
