• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন

সিয়াম : প্রশ্নের মুখে সত্য – ১২টি প্রশ্নের সহজ উত্তর

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২০৬ Time View
Update : বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬

সিয়াম : প্রশ্নের মুখে সত্য – ১২টি প্রশ্নের সহজ উত্তর

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

ভূমিকা
আজ আমি কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করতে আসিনি, কোনো মতের বিরুদ্ধে তলোয়ার তুলতে আসিনি, আমি এসেছি প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে সত্য বলার জন্য, কারণ আমি বিশ্বাস করি সত্য চিৎকার করে না, সত্য নিজেই দাঁড়িয়ে থাকে, আর মানুষ যদি চোখ খুলে তাকায় তাহলে তাকে আলাদা করে সাজাতে হয় না।

আমাদের সমাজে সিয়াম নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অনেকেই ভয় পায়, কেউ কেউ রেগে যায়, কেউ আবার প্রশ্নকারীকেই কাফের বানিয়ে দেয়, কিন্তু আমি বলি যে বিশ্বাস প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, সে বিশ্বাস আসলে নিজের ওপরই আস্থা রাখে না, আর কুরআনের ওপর যে আস্থা রাখে, সে প্রশ্নকে ভয় পায় না।

কুরআনে কি সত্যিই সিয়ামের দিনসংখ্যা স্পষ্টভাবে বলা আছে?

এই প্রশ্নটা শুনতে খুব সাধারণ মনে হয়, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক গভীর অভিযোগ, আর সেই অভিযোগটা হলো—কুরআন নাকি অসম্পূর্ণ, কুরআন নাকি অস্পষ্ট, কুরআন নাকি মানুষের জীবনের মতো বড় বিষয়ে পরিষ্কার কথা বলে না, আর আমি চাই এই অভিযোগের মুখোমুখি আমরা সাহস নিয়ে দাঁড়াই।

সূরা আল-বাকারা যখন বলে তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, তখন সে কথা অর্ধেক রেখে থেমে যায় না, বরং পরের আয়াতে বলে নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন, আর এখানেই যারা তাড়াহুড়ো করে তারা বলে বসে—কয়দিন, কিন্তু কুরআন কখনো তাড়াহুড়ো করে পড়ার বই নয়, কুরআন ধৈর্য নিয়ে সামনে এগোনোর কিতাব।

ঠিক পরের আয়াতেই কুরআন বলে দেয় রমজান মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে, অর্থাৎ আগের আয়াতে যে নির্দিষ্ট দিনগুলোর কথা বলা হয়েছিল, সেই দিনগুলো কোনো অজানা সময় নয়, কোনো রহস্যময় সংখ্যা নয়, বরং একটি পরিচিত প্রাকৃতিক সময়—রমজান মাস।
অনেকেই প্রশ্ন করে কেন কুরআন ২৯ বা ৩০ দিন বলে দিল না, আর এখানেই আমাদের বুঝতে হবে কুরআনের ভাষা প্রকৃতির ভাষা, কুরআন ক্যালেন্ডার ছাপার বই নয়, কুরআন আকাশের সঙ্গে মিল রেখে কথা বলে, আর চাঁদের মাস কখনো ২৯, কখনো ৩০ হয় বলেই কুরআন সংখ্যার জায়গায় সময়কে বেছে নিয়েছে।

যদি কুরআন নির্দিষ্ট সংখ্যা বলত, তাহলে প্রকৃতির এক বছরকে মিথ্যা বানাতে হতো, আর আল্লাহ এমন কিতাব নাজিল করেননি যা প্রকৃতির সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, বরং তিনি এমন কিতাব দিয়েছেন যা আকাশ, সময় আর মানুষের জীবনের সঙ্গে একসাথে চলে।
তাই সমস্যাটা কুরআনের নয়, সমস্যাটা আমাদের পড়ার ভঙ্গিতে, আমরা আয়াত আলাদা করি কিন্তু ধারাবাহিকতা দেখি না, আমরা শব্দ ধরি কিন্তু উদ্দেশ্য ধরি না।

“এত কষ্টের রোজাকে কুরআন কেন বলে অল্প কয়েকদিন?”

এই প্রশ্নটা শুধু শরীর থেকে আসে না, এই প্রশ্নটা আসে ক্লান্ত মন থেকে, গরমে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট থেকে, কাজের চাপে নুয়ে পড়া শ্রমিকের বুক থেকে, আর তাই এই প্রশ্নকে অবহেলা করা পাপ।
কুরআন যখন বলে অল্প কয়েকদিন, তখন সে আমাদের কষ্টকে অস্বীকার করে না, সে কেবল তুলনার ভাষায় কথা বলে, কারণ ত্রিশ দিন পুরো বছরের পাশে দাঁড়ালে সত্যিই অল্প, আর এই দুনিয়ার পুরো জীবন আখিরাতের পাশে দাঁড়ালে আরও অল্প।

কুরআনের দৃষ্টিতে অল্প মানে তুচ্ছ নয়, অল্প মানে সহনীয়, অল্প মানে সীমিত, অল্প মানে এমন কিছু যা মানুষের সাধ্যের ভেতরে রাখা হয়েছে।
এই জন্যই কুরআন একই সাথে ঘোষণা করে যে আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না, আর এই ঘোষণার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসুস্থের ছাড়, ভ্রমণকারীর ছাড়, অক্ষমের বিকল্প।

সিয়াম কোনো আত্মনির্যাতন নয়, সিয়াম কোনো মানববিরোধী শাস্তি নয়, সিয়াম হলো ইচ্ছার লাগাম ধরা, আর যে মানুষ ইচ্ছাকে শাসন করতে পারে না, সে মানুষতো দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দাস।
বিদ্রোহ এখানে না খাওয়ার বিরুদ্ধে নয়, বিদ্রোহ এখানে লোভের বিরুদ্ধে, অভ্যাসের বিরুদ্ধে, সীমাহীন ভোগের বিরুদ্ধে, আর এই বিদ্রোহ শান্ত বলেই শক্তিশালী।

“পূর্ববর্তী উম্মতরা কি একইভাবে রোজা রাখত?”

অনেকেই এই প্রশ্ন করে যেন প্রমাণ করতে চায় যে সিয়াম নতুন কিছু নয় বা পুরোনো কিছু নয়, কিন্তু কুরআনের বক্তব্য এখানে খুব পরিমিত এবং স্পষ্ট, কুরআন বলে উদ্দেশ্য এক ছিল, পদ্ধতি এক ছিল না।
কুরআন নিজেই দেখায় যে মারইয়াম আঃ সিয়াম পালন করেছিলেন নীরবতার মাধ্যমে, যা আমাদের সিয়ামের মতো নয়, আবার মূসা আঃ নির্দিষ্ট সময় খাদ্য সংযমে ছিলেন যা ছিল ভিন্ন উপলক্ষের জন্য, ফলে স্পষ্ট হয় যে সিয়াম মানে শুধু না খাওয়া নয়, সিয়াম মানে সংযম।

ধর্ম কোনো স্থির পাথর নয়, ধর্ম নদীর মতো বহমান, যার উৎস এক কিন্তু পথ বদলায়, সময় বদলায়, মানুষের অবস্থা বদলায়, আর আল্লাহ প্রতিটি জাতিকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী বিধান দিয়েছেন।
তাই পূর্ববর্তী উম্মতদের সঙ্গে মিল খোঁজার নামে বর্তমান বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যুক্তিযুক্ত নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রজ্ঞাকে না বোঝার ফল।

“রোজা কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়?”

এই প্রশ্নটা আজকের দুনিয়ায় খুব স্বাভাবিক, কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে খাওয়া মানেই শক্তি, খাওয়া মানেই সুস্থতা, আর না খাওয়া মানেই দুর্বলতা, অথচ মানুষ খুব কমই ভাবে যে শরীর শুধু খাবারেই বাঁচে না, শরীর নিয়মেও বাঁচে, সংযমেও বাঁচে, বিরতিতেও বাঁচে।
কুরআন যখন সংযম ফরজ করেছে, তখন সে মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়নি, বরং একই সাথে ঘোষণা করেছে যে আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না, অর্থাৎ সংযম এমন কোনো বিধান নয় যা মানুষের স্বাভাবিক জীবন ভেঙে দেয়, বরং এমন এক অনুশীলন যা মানুষের ভেতরের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।

যদি সংযম সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য ধ্বংসাত্মক হতো, তাহলে কুরআন প্রথমেই অসুস্থ মানুষকে ছাড় দিত না, ভ্রমণকারীকে ছাড় দিত না, দুর্বলকে বিকল্প দিত না, কারণ যে কিতাব মানুষের স্রষ্টার কাছ থেকে এসেছে, সে কিতাব মানুষের শরীর সম্পর্কে অজ্ঞ হতে পারে না।
বাস্তবতা হলো সংযম সবাইকে এক পাল্লায় মাপে না, যে সক্ষম সে পালন করে, যে অক্ষম সে পরে আদায় করে, আর যে স্থায়ীভাবে অক্ষম সে অন্যকে খাওয়ানোর মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করে, অর্থাৎ এখানে কোনো জোর নেই, কোনো অমানবিকতা নেই, আছে বিবেচনা।

আমরা অনেক সময় দেখি কেউ সিয়াম রেখে অসুস্থ হয়ে পড়ে, কিন্তু আমরা খুব কমই দেখি সে মানুষটা কীভাবে সিয়াম রাখছে, সে কি সাহরি খাচ্ছে, সে কি ইতমামে সংযম করছে, নাকি সিয়ামকে দায়ী করছে নিজের অবহেলার জন্য।
সিয়াম শরীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়, সিয়াম শরীরকে শোনার শিক্ষা, কারণ সারাবছর শরীর বলে খাও, খাও, খাও, আর সিয়াম এসে বলে থামো, একটু থামো, দেখো তোমার শরীর আসলে কতটুকু চায়।

তাই সমস্যা সংযমে নয়, সমস্যা আমাদের জীবনযাপনে, সিয়াম একটি আয়না, কেউ সেখানে স্বাস্থ্য দেখে, কেউ সেখানে নিজের ব্যাবস্থাপনার দেখে।

“নারী, গর্ভবতী, দুগ্ধদানকারী—সবার জন্য কি একই সিয়াম?”

এই প্রশ্নটা অনেক সময় খুব আবেগ নিয়ে আসে, বিশেষ করে যখন কেউ বলে ইসলাম নাকি নারীর প্রতি কঠোর, ইসলাম নাকি একই আইন সবার ওপর চাপিয়ে দেয়, আর আমি চাই এই প্রশ্নটা আমরা আবেগ নয়, জ্ঞানের আলোতে দেখি।
কুরআন কোথাও বলেনি যে নারী মানেই দুর্বল, আবার কুরআন কোথাও বলেনি যে নারী মানেই অগ্রাহ্য, বরং কুরআন বলেছে দায়িত্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল, আর এই নীতিটা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য।

গর্ভবতী নারী যখন নিজের শরীরের ভেতর আরেকটি জীবন বহন করে, তখন সে একা থাকে না, তখন তার সিদ্ধান্তে দুজনের জীবন জড়িত থাকে, আর এই বাস্তবতা ইসলাম উপেক্ষা করেনি, বরং সেখানে ছাড় দিয়েছে, সময় দিয়েছে, বিকল্প দিয়েছে।
দুগ্ধদানকারী মা যখন সন্তানের জন্য নিজের শরীর থেকে পুষ্টি দেয়, তখন সে শুধু নিজের কথা ভাবে না, তখন সে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবে, আর ইসলাম এই ত্যাগকে বোঝে বলেই তাকে জোর করে না, বরং সুযোগ দেয়।

এখানে লক্ষ্য করুন, ছাড় মানে অবহেলা নয়, ছাড় মানে অবমাননা নয়, ছাড় মানে দায়িত্ব মুছে ফেলা নয়, ছাড় মানে দায়িত্বকে মানবিকভাবে সরিয়ে নেওয়া।
যারা বলে নারীকে কঠিন নিয়মে বেঁধে ফেলা হয়েছে, তারা হয় কুরআন পড়েনি, নয়তো কুরআনের এই অংশগুলো এড়িয়ে গেছে, কারণ ইসলাম কোনো অবস্থাতেই শরীরকে ভাঙার আদেশ দেয় না।
বিদ্রোহ এখানে এই ধারণার বিরুদ্ধে যে ধর্ম মানেই কঠোরতা, বরং সত্য হলো ধর্ম মানেই ভারসাম্য, আর এই ভারসাম্যই নারীকে সম্মান দেয়।

যেসব দেশে দিন খুব লম্বা, সেখানে সিয়াম কি অন্যায় নয়?”

এই প্রশ্নটা আধুনিক বিশ্বের প্রশ্ন, মানচিত্রের প্রশ্ন, মানে ভূগোলের প্রশ্ন, এবং অনেকেই এই প্রশ্ন তুলে বলতে চায় যে সিয়াম নাকি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য বানানো নিয়ম।
প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে কুরআন কোনো এক দেশের জন্য নামেনি, কোনো এক জলবায়ুর জন্য নামেনি, কুরআন এসেছে মানুষের জন্য, আর মানুষ সব জায়গায় একরকম থাকে না।

কুরআন যখন সময় নির্ধারণ করে, তখন সে সূর্য আর রাতের কথা বলে, কিন্তু একই সাথে সে নীতি দেয় যে আল্লাহ কষ্ট চান না, আর এই নীতিটাই কঠিন পরিস্থিতিতে পথ দেখায়।
যেখানে দিন খুব লম্বা, সেখানে সংযম পালন যদি শরীরের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যায়, তাহলে সেখানে সময়ের হিসাব মানবিকভাবে নির্ধারণ করা ইসলামের বিরোধী নয়, বরং ইসলামের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইসলাম কখনো বলেনি যে তুমি মরলেও নিয়ম ছাড়বে না, ইসলাম বলেছে জীবন রক্ষা করো, কারণ জীবন আল্লাহর আমানত।
যারা এই প্রশ্ন তুলে ইসলামকে নিষ্ঠুর প্রমাণ করতে চায়, তারা আসলে ইসলামের মূলনীতি না বুঝেই তার শাখা ধরে টান দেয়।
বিদ্রোহ এখানে অন্ধ অনুসরণের বিরুদ্ধে, বিদ্রোহ এখানে সেই চিন্তার বিরুদ্ধে যে ধর্ম মানেই বাস্তবতা অস্বীকার করা, অথচ সত্য হলো ইসলাম বাস্তবতার ভেতর দিয়েই পথ দেখায়।

“সিয়াম রেখে মানুষ যদি মিথ্যা বলে, জুলুম করে, তাহলে সিয়াম দরকার কী?”

এই প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় সিয়ামকে ছোট করার জন্য, কারণ মানুষ ভাবে যদি সিয়াম মানুষকে ফেরেশতা বানাতে না পারে, তাহলে সিয়ামের কোনো মূল্য নেই, কিন্তু এই ভাবনাটাই ভুল জায়গা থেকে শুরু হয়।
কুরআন কখনো বলেনি যে সিয়াম রাখলেই মানুষ নিষ্পাপ হয়ে যাবে, কুরআন বলেছে সিয়াম মানুষকে তাকওয়ার পথে নিয়ে যাবে, আর পথ মানে গন্তব্য নয়, পথ মানে চেষ্টা, পথ মানে চলা, পথ মানে পড়ে গিয়ে আবার ওঠা।

কেউ যদি সিয়াম রেখে মিথ্যা বলে, তাহলে দোষ সিয়ামের নয়, দোষ মানুষের, যেমন কেউ কুরআন পড়ে জুলুম করলে কুরআন দায়ী হয় না।
সিয়াম কোনো জাদু নয়, সিয়াম কোনো সুইচ নয় যে টিপ দিলেই মানুষ বদলে যাবে, সিয়াম হলো আয়না, যেখানে মানুষ নিজের দুর্বলতা দেখতে পায়, আর যারা সেই আয়নায় তাকাতে চায় না, তারা আয়নাকেই ভাঙতে চায়।

বিদ্রোহ এখানে এই ধারণার বিরুদ্ধে যে ধর্ম মানেই তাৎক্ষণিক ফল, বরং সত্য হলো ধর্ম মানুষের ভেতরে ধীরে ধীরে কাজ করে, ঠিক যেমন বীজ মাটির নিচে কাজ করে, বাইরে দেখা যায় অনেক পরে।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল সিয়াম রেখে মানুষ কেন এখনো বদলায়নি, কিন্তু প্রশ্নটা করা হয় সিয়ামের দরকার কী, আর এখানেই আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হই।

“শুধু না খেয়ে থাকলেই কি তাকওয়া আসে?”

এই প্রশ্নটা শুনলে অনেকেই ভাবে সিয়াম বুঝি শুধু পেটের ব্যাপার, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকাই বুঝি ধর্ম, আর এর বাইরে আর কিছু নেই, কিন্তু কুরআনের ভাষা এত সরল নয়, এত সংকীর্ণ নয়।
কুরআন যখন সিয়ামের কথা বলে, তখন সে শুধু খাদ্য নয়, সে আত্মসংযমের কথা বলে, সে ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণের কথা বলে, সে ভেতরের লাগাম টানার কথা বলে, আর না খাওয়া সেই শিক্ষার একটি অংশ মাত্র।

যদি না খাওয়াই সব হতো, তাহলে মারইয়াম আলাইহাস সালামের সিয়াম অর্থহীন হতো, অথচ কুরআন তাকে সিয়াম বলেই উল্লেখ করেছে, কারণ সিয়াম মানে বিরতি, সিয়াম মানে সংযম, সিয়াম মানে নিজেকে থামাতে পারা।

যে মানুষ সারাদিন না খেয়ে সন্ধ্যায় এসে লোভে ভেঙে পড়ে, সে আসলে সিয়ামের পাঠ ঠিকমতো নেয়নি, আর যে মানুষ ক্ষুধার মধ্যেও নিজেকে সামলায়, সে ধীরে ধীরে তাকওয়ার দিকে এগোয়।
বিদ্রোহ এখানে এই ধারণার বিরুদ্ধে যে ধর্ম মানেই বাহ্যিক আচার, বরং সত্য হলো ধর্ম মানেই ভেতরের শাসন, আর সিয়াম সেই শাসনের প্রশিক্ষণ।

“কঠিন পরিশ্রম করা শ্রমিকদের জন্য সিয়াম কি জুলুম নয়?”

এই প্রশ্নটা খুব মানবিক, কারণ যারা রোদে পুড়ে কাজ করে, ইট ভাঙে, রিকশা চালায়, মাঠে ফসল তোলে, তাদের কষ্ট আমরা চোখে দেখি, আর তাই অনেকেই ভাবে সিয়াম বুঝি তাদের ওপর বাড়তি বোঝা।
ইসলাম কখনো শ্রমিকের ঘামে অন্ধ হয়নি, ইসলাম কখনো বাস্তবতা অস্বীকার করেনি, বরং ইসলামই প্রথম বলেছে যে দায়িত্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।

যদি কোনো শ্রমিকের জন্য সিয়াম রাখা বাস্তবিক অর্থে ক্ষতিকর হয়ে যায়, তাহলে ইসলাম সেখানে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে না, সেখানে সুযোগ দেয়, সময় দেয়, বিকল্প দেয়, কারণ ইসলাম মানুষের জীবনকে নিয়মের নিচে চাপা দেয় না।
কিন্তু একই সাথে এটাও সত্য যে সব কষ্টই ছাড়ের কারণ নয়, কারণ জীবন নিজেই কষ্টের, আর রোজা সেই কষ্টকে নতুন করে সৃষ্টি করে না, বরং মানুষকে শেখায় কষ্টের মধ্যে নৈতিকতা ধরে রাখতে।

বিদ্রোহ এখানে সেই সমাজের বিরুদ্ধে যে শ্রমিককে ব্যবহার করে, কিন্তু তার নামে ধর্মকে দোষ দেয়, রোদে কাজ করায়, কিন্তু তার পানির অধিকার নিশ্চিত করে না, আর তারপর বলে সিয়াম অন্যায়।

তাই প্রশ্নটা যদি সৎ হয়, তাহলে তা সমাজের দিকেও ঘুরে আসবে, শুধু ধর্মের দিকে নয়।

“সিয়াম কি মধ্যযুগীয় ও আধুনিক জীবনের সঙ্গে অসামঞ্জস্য নয়?”

এই প্রশ্নটা শুনলেই বোঝা যায় আমরা আজকাল আধুনিক শব্দটাকে কতটা পবিত্র বানিয়ে ফেলেছি, যেন আধুনিক মানেই যা পুরোনো সব ভুল, আর যা নতুন সব ঠিক, অথচ ইতিহাস আমাদের শেখায় নতুন সবসময় সত্য হয় না, আর পুরোনো সবসময় অচল হয় না।
সিয়াম এমন কোনো বিধান নয় যা ঘোড়ার গাড়ির যুগে জন্ম নিয়ে আজকের বিমানের যুগে এসে অচল হয়ে গেছে, বরং সিয়াম মানুষের মনের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর মানুষের মন প্রযুক্তি বদলালেও একই থাকে, লোভ একই থাকে, রাগ একই থাকে, নিয়ন্ত্রণহীন ইচ্ছা একই থাকে।

আজকের আধুনিক পৃথিবীই আমাদের দেখাচ্ছে যে সীমাহীন ভোগ মানুষকে শান্তি দেয়নি, বরং মানুষ যত খাচ্ছে ততই অসুস্থ হচ্ছে, যত পাচ্ছে ততই অতৃপ্ত হচ্ছে, আর এই জায়গাতেই সিয়াম দাঁড়িয়ে বলে থামো, একবার থামো, নিজেকে জিজ্ঞেস করো তুমি কি আসলেই এতটুকু চাও।
বিদ্রোহ এখানে আধুনিকতার বিরুদ্ধে নয়, বিদ্রোহ এখানে অন্ধ আধুনিকতার বিরুদ্ধে, যে আধুনিকতা মানুষকে যন্ত্র বানায়, কিন্তু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ শেখায় না।

তাই সিয়াম মধ্যযুগীয় নয়, সিয়াম মানুষের জন্য চিরকালীন, কারণ মানুষের ভেতরের সংকট চিরকালীন।

সিয়াম কি কুরআনি বিধান, না হাদিসের ওপর দাঁড়িয়ে?

এই প্রশ্নটা সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে পুরো বিধানকে হালকা করে দেওয়ার চেষ্টা, যেন যদি কুরআনে না থাকে, তাহলে তাকে সহজেই বাদ দেওয়া যায়।
কুরআন খুব স্পষ্ট ভাষায় বলে তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, এবং এই কথাটা কোনো ইশারা নয়, কোনো রূপক নয়, এটা সরাসরি ফরজ ঘোষণা।

সূরা আল-বাকারা ১৮৩ থেকে ১৮৫ আয়াত পর্যন্ত রোজার উদ্দেশ্য, সময়, ছাড়, বিকল্প, সব কিছু একটানা বলা হয়েছে, আর কোনো ফরজ বিধান কুরআনে এভাবে ধারাবাহিকভাবে না এলে সেটা ফরজ বলেই গণ্য হয় না।
হাদিস এখানে নতুন কিছু বানায়নি, হাদিস এখানে কুরআনের বাস্তব রূপ দেখিয়েছে, আর যে মানুষ কুরআনের ফরজ মানতে চায় না, সে হাদিসেরঃ নাম নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে।

বিদ্রোহ এখানে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে যে মানুষ নিজের দায়িত্ব এড়াতে ধর্মীয় উৎসগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়।

“সিয়াম না রাখলে কুরআনে শাস্তির কথা কেন নেই?”

এই প্রশ্নটা শুনলে অনেকেই ভাবে কুরআন বুঝি শাস্তির বই, আর যেখানে শাস্তির উল্লেখ নেই, সেখানে দায়িত্বও নেই, কিন্তু এই ধারণাটাই কুরআনের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
কুরআন অনেক ফরজ বিষয়ে দুনিয়াবি শাস্তি নির্ধারণ করেনি, কারণ কুরআন মানুষের ভেতরের ঈমানকে কেন্দ্র করে আইন দিয়েছে, পুলিশি ব্যবস্থাকে নয়।
সিয়ামএমন এক ইবাদত যা গোপনে করা হয়, যা মানুষ আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, আর যেখানে মানুষ নিজেই সাক্ষী, সেখানে দুনিয়াবি শাস্তির প্রয়োজন পড়ে না।

কুরআন মানুষকে ভয় দেখিয়ে ধার্মিক বানাতে চায় না, কুরআন মানুষকে সচেতন করে দায়িত্ববান বানাতে চায়, আর এই জায়গাতেই রোজা আলাদা, কারণ এখানে মানুষ নিজেই নিজের পাহারাদার।

বন্ধুগণ, বিদ্রোহ এখানে সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে যে ধর্ম মানেই লাঠি, ধর্ম মানেই জরিমানা, অথচ সত্য হলো ধর্ম মানেই দায়িত্ববোধ।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page