লিখক: মাহাতাব আকন্দ
গত কয়েক বছরে কুরআন পাঠ ও কুরআনভিত্তিক আলোচনার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব আলোচনা, অনলাইন প্রবন্ধ—সব মিলিয়ে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি কুরআনের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন।
কিন্তু এই ইতিবাচক প্রবণতার পাশাপাশি একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। তা হলো—কুরআনের শব্দ ও পরিভাষাকে তার নিজস্ব ভাষাগত ও প্রসঙ্গভিত্তিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করে আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইন, সংবিধান বা আইনি উপমার ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা।
এই প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যাচ্ছে “কুতিবা” ও “ফরজ” শব্দদ্বয়ের ব্যাখ্যায়। কোথাও বলা হচ্ছে—
“কুতিবা মানে কেবল লিখিত আইন, যা প্রয়োজনে কার্যকর হয়।”
আবার এর বিপরীতে বলা হচ্ছে—
“ফরজ মানে সার্বক্ষণিক বাধ্যতামূলক বিষয়, অক্সিজেনের মতো।”
এই প্রবন্ধে আমরা কোনো মাযহাবি ফিকহি বিতর্কে প্রবেশ করব না। আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইনের উপমাও ব্যবহার করব না। বরং কুরআনের ভেতরেই থেকে, কুরআনের ভাষায়, কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করব—কুতিবা ও ফরজ আসলে কী বোঝায়, এবং কুরআন নিজে এদের কীভাবে ব্যবহার করেছে।
কুরআনের কোনো শব্দ বোঝার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি আছে—
👉 একটি আয়াত দিয়ে নয়, কুরআনের সামগ্রিক ব্যবহারে শব্দটির অর্থ নির্ধারণ করতে হবে।
একটি শব্দ কোথায়, কী প্রসঙ্গে, কী দায়িত্ব আরোপ করতে ব্যবহৃত হয়েছে—সেগুলো একত্রে দেখলেই শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায়।
এই নীতি সামনে রেখেই প্রথমে আমরা “কুতিবা” শব্দটির দিকে তাকাব।
আরবি ভাষায় “কাতাবা” ধাতুর মূল অর্থ লিখন বা নির্ধারণ। কিন্তু কুরআনে কোনো শব্দের অর্থ কেবল শাব্দিক অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং প্রসঙ্গ, নির্দেশনা ও ফলাফলের মাধ্যমে তার অর্থ স্পষ্ট হয়।
সবচেয়ে আলোচিত আয়াতটি হলো—
সূরা আল-বাকারাহ ২:১৮৩
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ
“হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম কুতিবা করা হয়েছে…”
এখানে “কুতিবা” শব্দটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—
এটি কি কেবল “লিখে রাখা”, যার বাস্তব প্রয়োগ ঐচ্ছিক?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের কুরআনের অন্য জায়গাগুলোতে “কুতিবা” শব্দটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা দেখা জরুরি।
সূরা আল-বাকারাহ ২:১৭৮
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَىٰ
“তোমাদের উপর কিসাস কুতিবা করা হয়েছে…”
কিসাস একটি সামাজিক ও ন্যায়সংক্রান্ত বিধান। এটি এমন কোনো বিষয় নয় যা কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়। যদি কেউ হত্যা করে, তবে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কিসাসের বিধান কার্যকর হয়।
এখানে “কুতিবা” শব্দটি কি নিষ্ক্রিয় কোনো আইন বোঝাচ্ছে?
না। বরং এটি একটি বাস্তবায়নযোগ্য দায়িত্ব বোঝাচ্ছে, যা সমাজে ন্যায় নিশ্চিত করার জন্য নির্ধারিত।
যদি কুতিবা মানে হতো “লিখে রাখা, প্রয়োগ না করলেও চলে”, তাহলে কিসাসের পুরো ধারণাটিই অর্থহীন হয়ে যেত।
সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৬
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ
“তোমাদের উপর যুদ্ধ কুতিবা করা হয়েছে, যদিও তা তোমাদের অপছন্দনীয়…”
এখানে কুরআন স্বীকার করছে—যুদ্ধ মানুষের কাছে অপছন্দনীয়। তবুও যখন প্রয়োজন আসে, তখন এটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এটি কি এমন কোনো আইন, যা কেবল ফাইলে পড়ে থাকে?
না। বরং প্রয়োজনের সময় এটি একটি অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব।
সূরা আল-বাকারাহ ২:১৮০
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ…
“তোমাদের উপর কুতিবা করা হয়েছে—মৃত্যু উপস্থিত হলে ওসিয়ত করা…”
এখানে কোনো রাষ্ট্র নেই, কোনো আদালত নেই। তবুও কুরআন একে “কুতিবা” বলছে।
এর অর্থ কী?
এর অর্থ—কুতিবা শুধু রাষ্ট্রীয় আইন নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দায়িত্ব, তা ব্যক্তিগত হোক বা সামাজিক।
উপরের আয়াতগুলো একত্রে দেখলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়—
অতএব “কুতিবা মানে কেবল আইনে লেখা, প্রয়োগ না হলেও চলে”—এই ধারণার কুরআনিক ভিত্তি পাওয়া যায় না।
“কুতিবা” শব্দের আলোচনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—তাহলে “ফরজ” শব্দটি কী বোঝায়? সাম্প্রতিক কিছু আলোচনায় ফরজকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন এটি কুরআনের অন্য সব নির্দেশের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির কিছু—যেন ফরজ মানেই সার্বক্ষণিক, অক্সিজেনের মতো অপরিহার্য বিষয়; আর কুতিবা মানে তুলনামূলকভাবে হালকা, প্রয়োগযোগ্য হলে প্রয়োগ হবে।
এই ধারণা কুরআনের ভাষার সঙ্গে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই এখানে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কুরআনে “ফারাদা” ধাতু থেকে আগত শব্দের অর্থ মূলত—দায়িত্ব আরোপ করা, নির্ধারণ করে দেওয়া, সীমা টেনে দেওয়া। এটি এমন কোনো শব্দ নয় যা নিজে থেকেই সময়, ধরন বা স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে দেয়। বরং প্রসঙ্গই বলে দেয়—এই ফরজ কীভাবে, কখন, কতটুকু পালনযোগ্য।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় হজ সংক্রান্ত আয়াতে।
সূরা আল-বাকারাহ ২:১৯৭
الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ ۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ
“হজ নির্দিষ্ট কয়েকটি মাসে; অতঃপর যে ব্যক্তি এ সময়ের মধ্যে হজ ফরজ করে নেয়…”
এই আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—
প্রথমত, হজকে কুরআন সরাসরি ফরজ বলছে।
দ্বিতীয়ত, সেই ফরজ আবার নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে বাঁধা।
তৃতীয়ত, ফরজ হওয়া সত্ত্বেও এটি সার্বক্ষণিক বা আজীবন ধারাবাহিক আমল নয়।
এখান থেকেই বোঝা যায়—“ফরজ” মানেই সার্বক্ষণিক বা অক্সিজেনের মতো সর্বদা কার্যকর—এমন ধারণা কুরআন নিজেই সমর্থন করে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত—
সূরা আল-কাসাস ২৮:৮৫
إِنَّ الَّذِي فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ
“নিশ্চয়ই যিনি তোমার উপর কুরআন ফরজ করেছেন…”
এখানে ফরজ মানে কী?
এখানে ফরজ মানে—কুরআনের দায়িত্ব তোমার ওপর অর্পণ করা হয়েছে, তুমি এর দায় বহন করবে।
এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্দেশ করছে না, আবার এটি কেবল আবেগী আনুগত্যও বোঝাচ্ছে না। বরং এটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যবহারিক দায়িত্বের ঘোষণা।
অতএব, ফরজ শব্দটি নিজে থেকেই “টাইম বাউন্ড” বা “টাইম ফ্রি”—এই বিভাজন তৈরি করে না।
এটি এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কুরআনের কোথাও বলা হয়নি—
বরং কুরআনের ব্যবহারিক বাস্তবতা হলো—
সবগুলোই আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া বাধ্যতামূলক নির্দেশ। পার্থক্য শব্দে নয়, বরং প্রসঙ্গে।
যেখানে কোনো নির্দেশ নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে সময় উল্লেখ আছে।
যেখানে শর্ত আছে, সেখানে শর্ত উল্লেখ আছে।
কিন্তু কোথাও শব্দের ভিত্তিতে গুরুত্ব কমানো বা বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত নেই।
রোজা প্রসঙ্গে প্রায়ই বলা হয়—
“রোজা সারা বছর ফরজ নয়, তাই এটি আসলে কেবল কুতিবা।”
এই কথার প্রথম অংশ সত্য—রোজা সারা বছর ফরজ নয়।
কিন্তু এখান থেকে যে সিদ্ধান্ত টানা হয়, সেটিই সমস্যাজনক।
কারণ কুরআন নিজেই স্পষ্টভাবে বলে—
সূরা আল-বাকারাহ ২:১৮৫
فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই মাসটি পায়, সে যেন তা রোজা রাখে।”
এখানে কোনো শিথিল ভাষা নেই।
এখানে বলা হয়নি—চাইলে রাখবে, না চাইলে নয়।
এটি একটি স্পষ্ট আদেশ।
অতএব সময় সীমিত হওয়া মানেই গুরুত্ব কমে যাওয়া নয়।
রোজা প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অসুস্থতা ও সফরের ছাড়।
সূরা আল-বাকারাহ ২:১৮৪
فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
এখানে কী বলা হচ্ছে?
দায় মাফ করা হয়নি।
বরং বলা হয়েছে—পরে আদায় করবে।
এটি আইন বাতিল নয়, বরং দায়িত্ব পালনের জন্য সময় বাড়িয়ে দেওয়া।
এখানে শিথিলতা আছে, কিন্তু অবহেলা নেই।
এটি কুরআনের রহমত, কুরআনের নীতির নমনীয়তা।
ধর্মীয় আলোচনায় উপমা অনেক সময় বিষয় বোঝাতে সাহায্য করে। কিন্তু সমস্যা হয়, যখন উপমাই মূল ধারণাকে বিকৃত করে ফেলে।
“ফরজ অক্সিজেনের মতো”—এই কথাটি আবেগীভাবে আকর্ষণীয় হলেও কুরআনের ভাষা নয়।
কুরআন বরং বলে—
সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৪৮
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
“প্রত্যেকের জন্য আমরা নির্ধারিত করেছি একটি শরিয়াহ ও একটি পথ।”
অর্থাৎ—সব বিধান একরকম নয়, কিন্তু সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।
কিছু ব্যক্তিগত, কিছু সামাজিক, কিছু সময়নির্দিষ্ট, কিছু সার্বজনীন—কিন্তু কোনোটি অবহেলার জন্য নয়।
যখন বলা হয়—
“এটা ফরজ না, কুতিবা—মানে আইনে আছে”
সাধারণ শ্রোতা যেটা বোঝে তা হলো—
“চাইলে মানবো, না মানলেও খুব সমস্যা নেই।”
কিন্তু কুরআনের দাওয়াত এমন নয়।
সূরা আন-নূর ২৪:৫১
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ… سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
“মুমিনদের কথা তো এটুকুই—আমরা শুনলাম এবং মানলাম।”
শব্দের ভুল ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত আনুগত্যের মানসিকতাকেই দুর্বল করে দেয়।
এই আলোচনার সারকথা সংক্ষেপে বললে—
কুরআন নিজেই নিজের ব্যাখ্যা দেয়।
আধুনিক সংবিধান বা আইনি উপমা দিয়ে কুরআনের শব্দকে সীমাবদ্ধ করা জ্ঞানগতভাবে দুর্বল এবং দাওয়াতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
হিকমাহ মানে শব্দ নিয়ে খেলাধুলা নয়।
হিকমাহ মানে—কুরআনের ভাষায় কুরআনকে বোঝা এবং বোঝানো।
সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ
এই হিকমাহই আমাদের প্রয়োজন—
যাতে কুরআনের নির্দেশ সহজ হয়, বিকৃত না হয়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দিন।
ইনশাআল্লাহ।
