• মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৯ অপরাহ্ন

আজান দিলে শয়তান পাদতে পাদতে পালায়—হাদিসটির বিশ্লেষণ

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৫১ Time View
Update : সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

আজান দিলে শয়তান পাদতে পাদতে পালায়—হাদিসটি কি কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

ধর্মীয় বর্ণনা যখন কুরআনের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়—বরং দায়িত্ব। কারণ কুরআন নিজেই মানুষকে চিন্তা করতে, বিচার করতে এবং সত্য যাচাই করতে আহ্বান জানায়। আজান সম্পর্কে প্রচলিত একটি বহুল উদ্ধৃত হাদিস এমনই একটি বর্ণনা, যা আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে কুরআনের শয়তান-ধারণার সঙ্গে মৌলিক বিরোধে পড়ে।

আলোচিত হাদিস

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে—

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ ضُرَاطٌ حَتَّى لَا يَسْمَعَ التَّأْذِينَ»

এর প্রচলিত বাংলা অনুবাদ হলো—
“যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন শয়তান পাদতে পাদতে পেছনে ফিরে পালায়, যাতে সে আজান না শুনতে পায়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৯)

এই বর্ণনাটি বহু আলোচনায় হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বক্তব্যকে গাম্ভীর্যের বদলে কৌতুকে রূপান্তরিত করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বর্ণনা কি কুরআনের শয়তান-ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

কুরআনে শয়তান: শারীরিক নয়, মানসিক সত্তা

কুরআন শয়তানকে কোথাও শারীরিক প্রাণী হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং বারবার তাকে দেখানো হয়েছে অদৃশ্য, মানসিক ও প্ররোচনামূলক সত্তা হিসেবে।

সূরা আল-আ‘রাফে বলা হয়েছে—

إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ
“নিশ্চয়ই সে (শয়তান) ও তার দল তোমাদের দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাও না।” (সুরা আরাফ ৭ঃ২৭)

এখানে শয়তানকে স্পষ্টভাবে অদৃশ্য সত্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তার কোনো দৃশ্যমান দেহ, শারীরিক উপস্থিতি বা প্রাণীবৎ আচরণের কথা বলা হয়নি।

শয়তানের ক্ষমতার সীমা

সূরা ইব্রাহিমে শয়তান কিয়ামতের দিন নিজেই স্বীকার করবে—

وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُم مِّن سُلْطَانٍ إِلَّا أَن دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي
“আমি তোমাদের ওপর কোনো জবরদস্তি করিনি; আমি শুধু আহ্বান করেছিলাম, আর তোমরাই সাড়া দিয়েছ।” (সুরা ইবরাহিম ১৪ঃ২২)

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট—শয়তানের ক্ষমতা শারীরিক নয়, মানসিক। সে কাউকে ধাক্কা দেয় না, দৌড়ে পালায় না, কোনো দৈহিক প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তার কাজ সীমাবদ্ধ থাকে প্ররোচনায়।

শয়তানের প্রকৃত কাজ: অন্তরে কুমন্ত্রণা

সূরা আন-নাসে শয়তানের ভূমিকা আরও পরিষ্কারভাবে বর্ণিত—

مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ، الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ
“গোপনে কুমন্ত্রণা দানকারী—যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।” (সুরা নাস ১১৪ঃ৪-৫)

শয়তানের কাজ মানুষের অন্তরে ঘটে, বাহ্যিক জগতে নয়। সে মানুষের চিন্তা দুর্বল করে, সিদ্ধান্তকে বিভ্রান্ত করে। দৌড়ে পালানো, শব্দে ভয় পাওয়া বা শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখানো—এসব কুরআনের শয়তান-ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না।

তাহলে হাদিসটির সমস্যা কোথায়?

“আজান দিলে শয়তান পাদতে পাদতে পালায়”—এই বর্ণনাটি শয়তানকে একটি শারীরিক, প্রাণীবৎ সত্তা হিসেবে কল্পনা করে। এতে শয়তানের প্রতি এমন বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়, যা কুরআন কখনো দেয়নি। ফলে আক্ষরিক অর্থে নিলে এটি কুরআনের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।

এই ধরনের বর্ণনা ধর্মকে যুক্তির জায়গা থেকে সরিয়ে কল্পকাহিনির স্তরে নামিয়ে আনে। বিশ্বাস তখন চিন্তার ফল নয়, বরং গল্পনির্ভর আবেগে পরিণত হয়।

কুরআনের আলোকে আজানের প্রকৃত প্রভাব

কুরআন আজান বা সালাতকে কোথাও শয়তানকে শারীরিকভাবে তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং এগুলোকে বলা হয়েছে ذِكْر (স্মরণ)—যা মানুষের সচেতনতা জাগ্রত করে।

আজানের প্রভাব শারীরিক নয়, নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। আজান মানুষকে মনে করিয়ে দেয় তার দায়িত্ব, তার অবস্থান, তার প্রভুকে। এই স্মরণে শয়তানের প্ররোচনা দুর্বল হয়—কারণ মানুষের মন সচেতন হয়ে ওঠে।

উপসংহার

কুরআনের আলোকে বিচার করলে বলা যায়—এই হাদিসটি যদি আক্ষরিকভাবে নেওয়া হয়, তবে তা কুরআনের শয়তান-ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সর্বোচ্চ যা বলা যায়, তা হলো—এটি একটি রূপক বা লোককথামূলক বর্ণনা, যা একটি মানসিক বাস্তবতাকে অতিরঞ্জিত ভাষায় প্রকাশ করেছে।

কুরআন আমাদের শেখায়—শয়তান শব্দে পালায় না, বরং দুর্বল হয় সচেতনতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও স্মরণে। আজান শয়তানকে তাড়ায় না শারীরিকভাবে; আজান মানুষকে জাগিয়ে তোলে—আর জাগ্রত মানুষই শয়তানের সবচেয়ে বড় পরাজয়।

এই বোধ থেকেই কুরআনের আলোকে প্রতিটি বর্ণনাকে যাচাই করা প্রয়োজন—কারণ সত্য কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page