ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো—মানদণ্ড কী? কুরআন নিজেকে ঘোষণা করেছে “হুদাল্লিন্নাস” (মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ), “ফুরকান” (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী), “তিবইয়ানান লিকুল্লি শাই’” (প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা) এবং “আহসানুল হাদিস” (সর্বোত্তম বাণী)। অর্থাৎ সত্য নির্ধারণের চূড়ান্ত মাপকাঠি কুরআন নিজেই। অন্য যে কোনো বর্ণনা, মত, ব্যাখ্যা বা ঐতিহাসিক প্রতিবেদন—তা কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে গ্রহণযোগ্য, আর সাংঘর্ষিক হলে তা পুনর্বিবেচ্য। এই নীতিকে সামনে রেখেই আলোচ্য হাদিসটি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ এতে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন একটি বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা কুরআনের বহু ঘোষণার সাথে সরাসরি টানাপোড়েন সৃষ্টি করে।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসটি মুসলিম সমাজে অত্যন্ত পরিচিত। এতে বলা হয়েছে, মুসলিমরা পূর্ববর্তী জাতিদের নীতি-পদ্ধতি এমনভাবে অনুসরণ করবে যে, তারা যদি গিরগিটির গর্তে প্রবেশ করে, মুসলিমরাও সেখানে প্রবেশ করবে। বর্ণনাটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক এবং অনিবার্যতার ভাষায় প্রকাশিত। এখানে প্রশ্ন ওঠে—কুরআন কি মুসলিম উম্মাহকে এমন এক অনিবার্য অনুকরণকারী জাতি হিসেবে চিত্রিত করেছে? নাকি কুরআন তাদের একটি স্বতন্ত্র, নৈতিক নেতৃত্বদানকারী, আল্লাহকেন্দ্রিক উম্মাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করাই এ প্রবন্ধের লক্ষ্য।
প্রথমে হাদিসটির আরবি পাঠ উপস্থাপন করা হলো—
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ:
لَتَتَّبِعُنَّ سُنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ، حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَدَخَلْتُمُوهُ.
قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى؟
قَالَ: فَمَنْ؟
এর বাংলা অনুবাদ—
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের নীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করবে—হাতের পরিমাপের পর হাত, বিঘতের পর বিঘত; এমনকি তারা যদি গিরগিটির গর্তে প্রবেশ করে, তোমরাও সেখানে প্রবেশ করবে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! পূর্ববর্তীদের বলতে কি ইহুদি ও নাসারাদের বোঝানো হয়েছে? তিনি বললেন: “তাহলে আর কারা?”
হাদিসটির মূল বক্তব্য হলো—মুসলিমরা ভবিষ্যতে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের পথ অন্ধভাবে অনুসরণ করবে। ভাষার ভঙ্গি লক্ষণীয়: “লাতাত্তাবিউন্না”—অবশ্যই অনুসরণ করবে। এখানে কোনো শর্ত, সতর্কতা বা বিকল্প সম্ভাবনার ইঙ্গিত নেই; বরং অনিবার্যতার ঘোষণা আছে। এ বক্তব্যকে যদি সরল অর্থে ধরা হয়, তবে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ একটি নৈতিক পতনের অনিবার্য পথে নির্ধারিত। এখন কুরআনের আলোকে এ ধারণা যাচাই করা যাক।
কুরআন মুসলিম উম্মাহকে যেভাবে পরিচয় করিয়ে দেয় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বর বহন করে। সূরা আলে ইমরান ৩:১১০ আয়াতে বলা হয়েছে: “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাহ, যা মানবজাতির কল্যাণে বের করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।” এখানে মুসলিমদের পরিচয়—নৈতিক নেতৃত্বদানকারী, সৎকর্ম প্রতিষ্ঠাকারী, অসৎ প্রতিরোধকারী। তারা অন্যদের অন্ধ অনুসারী নয়; বরং নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণকারী। যদি তাদের অনিবার্য পরিণতি হয় পূর্ববর্তী বিকৃত জাতির পথ অনুসরণ করা, তবে “খাইরা উম্মাহ” ঘোষণা তার তাৎপর্য হারায়। একটি উম্মাহ একসাথে শ্রেষ্ঠ নেতৃত্বদানকারী এবং অনিবার্যভাবে পথভ্রষ্টদের অনুসারী—দুই পরিচয় একত্রে ধারণ করতে পারে না।
সূরা আল-বাকারা ২:১২০ আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে: “ইহুদি ও নাসারারা কখনোই তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাত অনুসরণ করো। বল: আল্লাহর হিদায়াতই প্রকৃত হিদায়াত।” এখানে কুরআন শুধু সতর্কই করেনি, বরং নীতিগত অবস্থান নির্ধারণ করেছে—তাদের অনুসরণ করা হিদায়াত নয়। প্রকৃত হিদায়াত একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নির্দেশনা। আলোচ্য হাদিসে যে ভবিষ্যৎচিত্র আঁকা হয়েছে, তা যেন এই কুরআনিক সতর্কতার বিপরীত দিকে অগ্রসর হওয়ার অনিবার্যতা ঘোষণা করে।
আবার সূরা আল-মায়িদা ৫:৪৮ আয়াতে বলা হয়েছে যে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা শরীয়াহ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাদের পরিচয় স্বাতন্ত্র্যে নিহিত। পূর্ববর্তী জাতির পথ অনুকরণ করা তাদের লক্ষ্য নয়; বরং আল্লাহপ্রদত্ত বিধানের আলোকে সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করা তাদের দায়িত্ব। এই স্বাতন্ত্র্যের ধারণা হাদিসে বর্ণিত অন্ধ অনুসরণের ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
কুরআন পূর্ববর্তী জাতির বিচ্যুতির কথা বহুবার উল্লেখ করেছে সতর্কবার্তা হিসেবে। সূরা আল-বাকারা ২:৭৫ আয়াতে বনী ইসরাঈলের একটি অংশের কথা বলা হয়েছে যারা আল্লাহর বাণী শুনে তা বিকৃত করত। সূরা আল-মায়িদা ৫:১৩-১৫ আয়াতে তাদের অঙ্গীকারভঙ্গ ও বিকৃতির বিবরণ আছে। এসব বর্ণনার উদ্দেশ্য কী? যাতে পরবর্তী উম্মাহ সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে। কুরআনের ভাষা সর্বত্র সতর্কতামূলক—“তোমরা যেন তাদের মতো না হও।” কিন্তু আলোচ্য হাদিসে যেন সেই সতর্কতা অকার্যকর হয়ে পড়েছে; কারণ সেখানে বলা হচ্ছে, তোমরা অবধারিতভাবেই তাদের অনুসরণ করবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কুরআনের আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা। সূরা আল-হিজর ১৫:৯—“নিশ্চয়ই আমিই এই জিকর অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।” অর্থাৎ কুরআন সংরক্ষিত। পূর্ববর্তী কিতাব বিকৃত হয়েছে—এ কথা কুরআন বলেছে। কিন্তু একই ভুল পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা রোধের জন্যই কুরআনকে সংরক্ষণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যদি মুসলিম উম্মাহ অবধারিতভাবে পূর্ববর্তী জাতির মতো বিকৃতির পথে হাঁটে, তবে এই সংরক্ষণ-ঘোষণার কার্যকারিতা কোথায়? সংরক্ষিত কিতাবের উপস্থিতিতে উম্মাহ কেন অনিবার্যভাবে গিরগিটির গর্তে প্রবেশ করবে?
আরেকটি মৌলিক নীতি হলো ব্যক্তিগত দায়িত্ব। সূরা ফাতির ৩৫:১৮—“কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” প্রত্যেক ব্যক্তি ও জাতি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী। কুরআন মানুষকে স্বাধীন নৈতিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে। সেখানে অনিবার্য সমষ্টিগত পতনের পূর্বনির্ধারিত ঘোষণা কুরআনিক ন্যায়বোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কুরআন মানুষকে সতর্ক করে, শিক্ষা দেয়, যুক্তি উপস্থাপন করে—কিন্তু অনিবার্যভাবে পথভ্রষ্ট হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করে না।
এখন কেউ বলতে পারেন, হাদিসটি সতর্কতামূলক—অর্থাৎ ভবিষ্যদ্বাণীর আড়ালে সাবধানবাণী। কিন্তু ভাষার কাঠামো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি শর্তযুক্ত সতর্কতা নয়; বরং নিশ্চিত অনুসরণের ঘোষণা। যদি এটি সতর্কতা হতো, তবে বলা যেত—“তোমরা যেন পূর্ববর্তীদের অনুসরণ না করো।” কিন্তু এখানে বলা হয়েছে—“তোমরা অবশ্যই অনুসরণ করবে।” এই পার্থক্যটি মৌলিক।
কুরআন মুসলিম উম্মাহকে আহ্বান করে আল্লাহকেন্দ্রিক চেতনায় দৃঢ় থাকতে, আল্লাহর বিষয়ে সচেতন হতে (واتقوا الله), আল্লাহর সীমা রক্ষা করতে, এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় অবিচল থাকতে। তাদের কাজ অন্যদের অন্ধ অনুকরণ নয়; বরং আল্লাহর অবতীর্ণ নির্দেশনার আলোকে চলা। সুতরাং যে বর্ণনা মুসলিম পরিচয়কে অনিবার্য অনুকরণে সীমাবদ্ধ করে, তা কুরআনের ইতিবাচক, দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বমূলক চিত্রের সাথে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়।
উপসংহারে বলা যায়, আলোচ্য হাদিসে মুসলিম উম্মাহকে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে নির্দেশ করা হয়েছে যেখানে তারা পূর্ববর্তী বিকৃত জাতির পথ অন্ধভাবে অনুসরণ করবে। কিন্তু কুরআন তাদের স্বতন্ত্র, শ্রেষ্ঠ, নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল এবং আল্লাহর প্রত্যক্ষ হিদায়াতপ্রাপ্ত উম্মাহ হিসেবে চিত্রিত করে। কুরআন সতর্ক করে—তাদের মতো হয়ো না; আল্লাহর হিদায়াতই প্রকৃত হিদায়াত। অতএব কুরআনকে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করলে এই হাদিসের বক্তব্য গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তি যদি হয় আল্লাহর কিতাব, তবে সেই কিতাবের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যে কোনো বর্ণনাকে পুনর্বিবেচনা করাই বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও ঈমানি দায়িত্বের দাবি।
