وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ ۖ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ ۚ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে, এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে—যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয় তা ছাড়া। তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশের উপর টেনে নেয়। এবং তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, সন্তান, স্বামীর সন্তান, ভাই, ভাইয়ের সন্তান, বোনের সন্তান, নিজেদের নারীসঙ্গী, তাদের অধীনস্থ ব্যক্তি, কামনাহীন পুরুষ কর্মচারী, অথবা এমন শিশুদের সামনে ছাড়া যারা এখনো নারীদের গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত নয়। তারা যেন এমনভাবে পা আঘাত না করে যাতে তাদের গোপন অলংকার প্রকাশ পায়। আর হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, যেন তোমরা সফল হও।
(অনুবাদ – Friends of Quran Foundation)
সূরা আন-নূর সমাজের নৈতিক শুদ্ধতা, পারিবারিক পবিত্রতা এবং সামাজিক শালীনতার সূরা। ২৪ নম্বর আয়াতে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযম ও পবিত্রতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
“قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ”
মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।
এরপরই ৩১ নম্বর আয়াতে একই নির্দেশ মুমিন নারীদের জন্য দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে—শালীনতা একপাক্ষিক দায়িত্ব নয়; বরং পারস্পরিক নৈতিক চুক্তি।
আয়াতটি শুরু হয়েছে— “وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ” — মুমিন নারীদের বলো। এখানে ঈমানের পরিচয় আগে এসেছে। অর্থাৎ এই বিধান কোনো সাংস্কৃতিক নিয়ম নয়; এটি ঈমানের অংশ।
প্রথম নির্দেশ— “يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ” — তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে। পুরুষদের মতো নারীদেরও দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআন নৈতিকতা শুরু করেছে অন্তরের নিয়ন্ত্রণ থেকে।
দ্বিতীয় নির্দেশ— “وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ” — তারা যেন নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে। এটি শারীরিক ও নৈতিক উভয় পবিত্রতা বোঝায়। সূরা মু’মিনুন (২৩:৫)-এ বলা হয়েছে—
“وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ”
মুমিনরা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।
এরপর বলা হয়েছে— “وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا” — তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয় তা ছাড়া। এখানে “زينت” শব্দটি অলংকার ও আকর্ষণীয় অংশ বোঝায়। “إلا ما ظهر منها” নিয়ে তাফসিরে বিভিন্ন মত রয়েছে; তবে মূলনীতি হলো শালীনতা ও সংযম।
এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ— “وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ” — তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশের উপর টেনে নেয়। “خُمُر” মানে মাথার আবরণ, আর “جيوب” মানে বক্ষদেশ। ইসলাম-পূর্ব সমাজে নারীরা ওড়না ব্যবহার করত, কিন্তু তা বক্ষ ঢাকত না। কুরআন সেই প্রথাকে সংশোধন করেছে—শালীনতার পূর্ণতা নিশ্চিত করতে।
এরপর আয়াত ব্যাখ্যা করেছে, কার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা বৈধ—স্বামী, পিতা, শ্বশুর, সন্তান, ভাই ইত্যাদি নিকট আত্মীয়দের সামনে। এটি পারিবারিক কাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
পরে বলা হয়েছে— “وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ” — তারা যেন এমনভাবে পা আঘাত না করে যাতে গোপন অলংকার প্রকাশ পায়। অর্থাৎ আচরণ ও অঙ্গভঙ্গিতেও শালীনতা বজায় রাখতে হবে। শালীনতা শুধু পোশাক নয়; আচরণও এর অংশ।
এই আয়াতের শেষে একটি সার্বজনীন আহ্বান—
“وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ”
হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসো।
অর্থাৎ শালীনতার বিধান কেবল নারীদের নয়; পুরো সমাজের জন্য আত্মসমালোচনার আহ্বান।
কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষা হলো—
সূরা আহযাব (৩৩:৫৯):
“يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ” — তারা যেন নিজেদের উপর পর্দা টেনে নেয়।
এটি নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য।
সূরা নূর (২৪:৩০–৩১) পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য দৃষ্টি ও পবিত্রতার নীতি স্থাপন করেছে।
অতএব এই আয়াত নারীর উপর একতরফা বিধান নয়; বরং একটি নৈতিক সমাজ গঠনের নির্দেশনা।
এই আয়াত আমাদের শেখায়—দৃষ্টি সংযম ঈমানের অংশ। শালীন পোশাক ও আচরণ সামাজিক পবিত্রতার ভিত্তি। নারীর মর্যাদা রক্ষা করা ইসলামের নৈতিক লক্ষ্য। এবং পুরো সমাজের জন্য তওবার আহ্বান রয়েছে—কারণ নৈতিক শুদ্ধতা ব্যক্তিগত নয়; সামষ্টিক দায়িত্ব।
আল্লাহ আমাদেরকে অন্তর ও বাহ্যিক উভয় পবিত্রতায় প্রতিষ্ঠিত করুন এবং নৈতিক সমাজ গঠনের তাওফিক দান করুন।
