• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০২:১৭ পূর্বাহ্ন

এক কিতাব, বহু পথ—ফেরার পথ কোথায়?

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৬৩ Time View
Update : সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

এক কিতাব, বহু পথ—ফেরার পথ কোথায়?

লেখক: মাহাতাব আকন্দ

কুরআন নীরবতার ধর্ম নয়। কুরআন এমন একটি কিতাব, যা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং বিবেককে জাগিয়ে তোলে। কুরআনের ভাষা কখনো ঘুমপাড়ানি নয়; বরং তা মানুষকে আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড় করায়। অথচ ইতিহাসের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আমরা এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছি, যেখানে কুরআনের নাম উচ্চারিত হয় প্রচুর, কিন্তু কুরআনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে গেছে। এই সংকোচন কোনো একদিনে ঘটেনি, কোনো আকস্মিক বিদ্রোহের ফলও নয়; বরং তা ঘটেছে ধীরে, নীরবে, ধারাবাহিক কিছু ধাপে।

এই অধ্যায় সেই ধাপগুলোরই বিশ্লেষণ এবং একই সঙ্গে সেই পথের সন্ধান, যেদিকে ফিরে গেলে কুরআন আবার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

১. ভয় দিয়ে শুরু: কুরআন থেকে দূরে সরানোর প্রথম ধাপ

এই বিচ্ছিন্নতার প্রথম ধাপ ছিল ভয়। মানুষকে বলা হলো—কুরআন বোঝা কঠিন, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়। অথচ কুরআন নিজেই মানুষকে প্রশ্ন করেছে, তারা কি এই কিতাব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে না।

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ
(সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:২৪)
অর্থ: তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?

এই আয়াত কুরআনের সাথে মানুষের সক্রিয় সম্পর্কের আহ্বান। কিন্তু বাস্তবে এই আহ্বানের বিপরীতে দাঁড় করানো হলো ভয়—ভুল বুঝে ফেলবে, বিভ্রান্ত হবে, পথ হারাবে। প্রশ্নের জায়গায় ভয় ঢুকে পড়ল, আর ভয় ঢুকলে চিন্তার দরজা বন্ধ হয়। কুরআন যেখানে বিবেককে মুক্ত করতে চেয়েছিল, সেখানে ভয় দিয়ে মানুষকে মানসিকভাবে নির্ভরশীল করে ফেলা হলো।

২. বোঝা নয়, শুধু মানা: চিন্তার পরিবর্তে অন্ধ অনুসরণ

দ্বিতীয় ধাপে বলা হলো—তোমাদের বোঝার দরকার নেই, শুধু মানলেই যথেষ্ট। অথচ কুরআনের পদ্ধতি ঠিক উল্টো। কুরআন বারবার মানুষকে চিন্তা করতে, ভাবতে, বিশ্লেষণ করতে বলেছে।

لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
(সূরা আন-নাহল, ১৬:১১)
অর্থ: যাতে তারা চিন্তা করে।

চিন্তা কুরআনের কাছে কোনো বিলাসিতা নয়; বরং ঈমানের অংশ। কিন্তু আমরা চিন্তাকে ঝুঁকি বানালাম এবং অন্ধ অনুসরণকে নিরাপত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলাম। এখান থেকেই কুরআনের সাথে মানুষের সম্পর্ক বদলে যেতে শুরু করল—সম্পর্কটি আর অনুসন্ধানভিত্তিক রইল না, হয়ে উঠল আনুষ্ঠানিক।

৩. আলেম: সহায়ক থেকে কর্তৃত্বে উত্তরণ

তৃতীয় ধাপে আলেমের ভূমিকা পরিবর্তিত হলো। কুরআন আলেমদের সম্মান দিয়েছে, কিন্তু কখনো কর্তৃত্বের একমাত্র উৎস বানায়নি।

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
(সূরা আন-নাহল, ১৬:৪৩)
অর্থ: যদি তোমরা না জানো, তবে জিকিরধারীদের জিজ্ঞেস করো।

এখানে “জিজ্ঞেস করা” আর “আত্মসমর্পণ” এক নয়। জিজ্ঞেস করার অর্থ হলো—বুঝতে চাওয়া, যাচাই করা, দায়িত্ব নেওয়া। কিন্তু ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করার জায়গায় নিজের বিবেক ছেড়ে দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠল। আলেম সহায়ক থেকে কর্তৃত্বে পরিণত হলেন, আর সাধারণ মানুষ চিন্তার দায় থেকে মুক্তি পেয়ে স্বস্তি খুঁজে পেল।

৪. ইজতিহাদের স্থবিরতা ও বাস্তবতার বিচ্ছেদ

চতুর্থ ধাপে ইজতিহাদ নামক জীবন্ত প্রয়াসটি বইয়ের পাতায় বন্দী হয়ে গেল। সময় বদলালেও সিদ্ধান্ত বদলানোকে বিদ্রোহ হিসেবে দেখা শুরু হলো। অথচ কুরআন বাস্তবতার সাথে কথা বলে এবং মানব সমাজের পরিবর্তনশীলতাকে স্বীকার করে।

لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
(সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৪৮)
অর্থ: প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি পথ ও একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করেছি।

এই আয়াত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার মাঝে কুরআনের চিরন্তন নীতির প্রয়োগের কথা বলে। কিন্তু আমরা পদ্ধতিকে স্থায়ী করে সত্যকে আটকে ফেললাম।

৫. পরিচয়ের সংকট: মুসলিমের আগে অন্য নাম

পঞ্চম ধাপে মাজহাব পরিচয়ে রূপ নিল। মানুষ বলতে শুরু করল—আমি আগে অমুক, পরে মুসলিম। অথচ কুরআন পরিচয় দিয়েছে অত্যন্ত সরলভাবে।

هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ
(সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮)
অর্থ: তিনিই তোমাদের নাম দিয়েছেন মুসলিম।

এখানে কোনো উপসর্গ নেই, কোনো শর্ত নেই, কোনো ব্র্যান্ড নেই। কিন্তু মানুষ নিজেরাই নতুন নাম যোগ করল, আর সেই নাম রক্ষাই ধীরে ধীরে দ্বীনের প্রধান কাজ হয়ে উঠল।

৬. বিভাজন ও কুরআনের কঠোর সতর্কতা

এই পরিচয় রক্ষার তাগিদ থেকেই শুরু হলো তর্ক, তর্ক থেকে বিভাজন, বিভাজন থেকে শত্রুতা। কুরআন এই প্রবণতাকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছে।

فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا
(সূরা আর-রূম, ৩০:৩২)
অর্থ: তারা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েছে।

এই আয়াত কেবল ইতিহাস নয়; এটি একটি আয়না, যেখানে বর্তমান উম্মাহ নিজের চেহারা দেখতে পায়।

৭. কুরআনকে পেছনে সরিয়ে দেওয়া: সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ছিল কুরআনকে ধীরে ধীরে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া। কুরআন নিজেই এই বিপদের কথা আগেই জানিয়েছিল।

نَبَذُوهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ
(সূরা আল-বাকারা, ২:১০১)
অর্থ: তারা কিতাবকে নিজেদের পিঠের পেছনে ফেলে দিয়েছিল।

মুখে কুরআনের নাম, হাতে মানুষের তৈরি কাঠামোর নেতৃত্ব—এই দ্বৈততার মধ্যেই বর্তমান সংকটের মূল।

৮. ফেরার কুরআনিক আহ্বান

কুরআন সমস্যা দেখিয়ে থেমে যায় না; পথও দেখায়। সেই পথ শুরু হয় ফেরত যাওয়ার মাধ্যমে।

فَفِرُّوا إِلَى اللَّهِ
(সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫০)
অর্থ: অতএব তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাও।

এই ফেরা মানে মানুষের বানানো আশ্রয়, নিরাপত্তা ও কর্তৃত্বের দেয়াল ভেঙে আল্লাহর কিতাবকে আবার কেন্দ্র বানানো।

৯. কুরআনকে কেন্দ্র করা: পরিত্রাণের প্রথম ধাপ

هَٰذَا الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ
(সূরা আল-বাকারা, ২:২)
অর্থ: এই কিতাবে কোনো সন্দেহ নেই।

সন্দেহ তখনই আসে, যখন কুরআনের উপরে অন্য কিছু বসানো হয়। কুরআনকে কেন্দ্র বানানো মানে—এটাকে শুধু তিলাওয়াতের নয়, সিদ্ধান্তের মানদণ্ড করা।

১০. চিন্তা, নম্রতা ও ব্যক্তিগত জবাবদিহি

কুরআন চিন্তাশীল মানুষ চায়।

لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
(সূরা আল-জাসিয়া, ৪৫:১৩)
অর্থ: যারা চিন্তা করে।

এবং শেষ পর্যন্ত কুরআন ব্যক্তিগত দায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ
(সূরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪:৩৮)
অর্থ: প্রত্যেক আত্মা নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ।

উপসংহার

মাজহাব সহায়ক হতে পারে, কিন্তু ঈমানের জায়গা নিতে পারে না। আলেম পথ দেখাতে পারেন, কিন্তু আল্লাহর জায়গা নিতে পারেন না। কুরআনের পথে ফেরা মানে বিদ্রোহ নয়; বরং বিনয়। কারণ কুরআনের বিদ্রোহ অহংকার ভাঙে, মানুষকে ছোট করে না, বরং আল্লাহর সামনে নত করে।

وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا
(সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩)
অর্থ: রহমানের বান্দারা পৃথিবীতে বিনয়ের সাথে চলাফেরা করে।

ফেরার পথ তাই স্পষ্ট—এক কিতাবের দিকে, এক কেন্দ্রের দিকে, এক সত্যের দিকে।

এক কিতাব, বহু পথ—ফেরার পথ কোথায়? মাহাতাব আকন্দ


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page