• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১০ পূর্বাহ্ন

কুরআনের আলোয় তালাক ও হিল্লা

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১১৪ Time View
Update : সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬


কুরআনের আলোয় তালাক ও হিল্লা

লেখক: মাহাতাব আকন্দ

মানুষ যখন তালাক নিয়ে কথা বলে, তখন সেই কথায় প্রায়ই রাগ, ক্ষোভ, প্রতিশোধপরায়ণতা ও সামাজিক বিচারচিন্তার প্রাধান্য দেখা যায়। তালাক তখন একটি অস্ত্র হয়ে ওঠে—যার মাধ্যমে আঘাত করা হয়, অপমান করা হয়, এবং ক্ষমতা জাহির করা হয়। অথচ কুরআন যখন তালাক নিয়ে কথা বলে, তখন তার ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কোনো উত্তেজনা নেই, নেই তাড়াহুড়ার নির্দেশ, নেই শাস্তির উল্লাস। কুরআনের তালাক-দর্শন শান্ত, সংযত, মানবিক এবং ন্যায়ভিত্তিক। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত দুই ভিন্ন জগতের প্রতিনিধি—একটি মানুষের আবেগ ও ক্ষমতার জগৎ, অন্যটি আল্লাহর সীমা ও প্রজ্ঞার জগৎ।

কুরআনের উদ্দেশ্য কখনোই পরিবার ভাঙা নয়। বরং কুরআন তালাককে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ধীর করে দেয়, যাতে সম্পর্ক ভাঙার আগেই মানুষ বারবার থামে, ভাবে এবং আত্মসমালোচনার সুযোগ পায়। এই প্রক্রিয়ায় কুরআন তালাককে হঠাৎ সিদ্ধান্ত থেকে সরিয়ে এনে একটি দীর্ঘ, দায়িত্বপূর্ণ ও মানবিক পথে পরিণত করে।

কুরআনের ভাষায় তালাক কোনো রাগের বিস্ফোরণ নয়, বরং ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া একটি প্রক্রিয়া। কুরআন স্পষ্টভাবে বলে—

فَأَمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِمَعْرُوفٍ
(সূরা আল-বাকারা, ২:২২৯)
অর্থ: হয় সুন্দরভাবে ধরে রাখা, নতুবা সুন্দরভাবে বিদায় দেওয়া।

এখানে মূল শব্দটি হলো “মা‘রূফ”—সুন্দর, শালীন ও মানবিক আচরণ। কুরআনের দৃষ্টিতে তালাক দিলেও সৌন্দর্য হারানো যাবে না, সম্মান নষ্ট করা যাবে না, আর অন্য মানুষকে অপমান করার কোনো অধিকার নেই। এমনকি বিচ্ছেদেও নৈতিকতা বজায় রাখা কুরআনের মৌলিক দাবি।

এই নৈতিকতার বাস্তব রূপ হলো ইদ্দত। প্রথম তালাকের পর কুরআন ইদ্দতের বিধান দেয়, যা মূলত সময়ের মাধ্যমে মানুষকে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ করে দেয়। ইদ্দত কোনো শাস্তি নয়, বরং একটি মানবিক বিরতি। কুরআন এই সময় সম্পর্কে বলে—

لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَٰلِكَ أَمْرًا
(সূরা আত-তালাক, ৬৫:১)
অর্থ: তুমি জানো না, হয়তো এর পরে আল্লাহ নতুন কিছু ঘটিয়ে দেবেন।

এই আয়াত ইদ্দতের গভীর দর্শন তুলে ধরে। আজ যে সিদ্ধান্ত অটল মনে হচ্ছে, কাল হয়তো তা বদলে যেতে পারে। রাগের মুহূর্তে যা অসম্ভব মনে হয়, সময়ের শান্তিতে তা সম্ভব হয়ে ওঠে। এই কারণেই ইদ্দত কুরআনের সবচেয়ে মানবিক আইনগুলোর একটি।

ইদ্দতের সময় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয় না। কুরআন স্বামীকে সুযোগ দেয়—যদি সে সত্যিকারভাবে সংশোধনের ইচ্ছা রাখে, তবে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে।

وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ
(সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮)
অর্থ: তাদের স্বামীরাই তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকতর অধিকারী।

এটি কোনো ভোগবাদী অধিকার নয়; বরং দায়িত্বপূর্ণ সুযোগ। কুরআন যেন বলছে—একটি শব্দের কারণে পুরো জীবন ধ্বংস কোরো না। ভুল হলে তা সংশোধনের সাহস দেখাও।

যদি প্রথম তালাকের পরও পুনর্মিলন না ঘটে, তবে তালাক কার্যকর হয়ে যায়। নারী তখন স্বাধীনভাবে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। তার সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে, তার পথ খোলা থাকে। দ্বিতীয় তালাকেও একই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্ত হয়—ইদ্দত, ভাবার সুযোগ, এবং পুনর্মিলনের সম্ভাবনা। কিন্তু তৃতীয় তালাকের পর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যায়। কুরআন একে আল্লাহর সীমা হিসেবে ঘোষণা করেছে—

تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ
(সূরা আল-বাকারা, ২:২২৯)
অর্থ: এগুলোই আল্লাহর সীমা।

এই সীমা অতিক্রম করা মানে সুস্পষ্ট অন্যায়। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, মানুষ এক নিঃশ্বাসে তিন তালাক উচ্চারণ করে এই সুস্পষ্ট কুরআনিক কাঠামো ভেঙে ফেলে। কুরআন কোথাও এক বসায় তিন তালাকের অনুমতি দেয়নি। বরং ধাপে ধাপে চিন্তা, সময় ও সাক্ষ্যের কথা বলেছে। তাই এক বসায় তিন তালাক কুরআনের আয়াতকে তামাশায় পরিণত করার শামিল।

وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৩১)
অর্থ: তোমরা আল্লাহর আয়াতকে উপহাসে পরিণত কোরো না।

এই প্রেক্ষাপটেই হিল্লা নামক অপমানজনক প্রথার জন্ম হয়েছে, যা কুরআনের নাম ব্যবহার করে নারীর উপর এক ভয়াবহ জুলুম চাপিয়ে দেয়। কুরআনের যে আয়াতকে হিল্লার বৈধতার দলিল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেটি হলো—

فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৩০)
অর্থ: যদি সে তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে আর তার জন্য বৈধ হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিবাহ করে।

এই আয়াত কোথাও ‘এক রাতের বিয়ে’, ‘নাটকীয় সহবাস’ বা ‘ইচ্ছাকৃত তালাকের পরিকল্পনা’র কথা বলে না। বরং এখানে বলা হচ্ছে—নারী যদি স্বাভাবিকভাবে নতুন জীবন শুরু করে, দায়িত্বপূর্ণ বিবাহে আবদ্ধ হয়, এবং সেই বিবাহ যদি স্বাভাবিক কারণে ভেঙে যায়, তবেই পূর্ববর্তী স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এটি জীবনচক্রের কথা, দেহগত নাটকের নয়।

হিল্লা মূলত নারীর দেহকে একটি যন্ত্রে পরিণত করে। এতে নারী এক পুরুষ থেকে আরেক পুরুষের কাছে পৌঁছানোর সেতুতে পরিণত হয়, যা কুরআনের নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত। কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করে—

وَلَا تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُوا
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৩১)
অর্থ: ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নারীদের আটকে রেখো না।

হিল্লা এই ক্ষতিরই চূড়ান্ত রূপ। এতে নারীর সম্মান, ইচ্ছা ও মানবিক মর্যাদা উপেক্ষিত হয়। অথচ কুরআন তালাকের পরও নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে—

وَلِلْمُطَلَّقَاتِ مَتَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৪১)
অর্থ: তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য সম্মানজনক বিদায়-উপহার রয়েছে।

এমনকি তালাকের পরও কুরআন নতুন জীবনের আশ্বাস দেয়—

وَيُغْنِ اللَّهُ كُلًّا مِّن سَعَتِهِ
(সূরা আন-নিসা, ৪:১৩০)
অর্থ: আল্লাহ উভয়কে তাঁর প্রাচুর্য থেকে সমৃদ্ধ করবেন।

এটি তালাকের কুরআনিক দর্শন—শেষ নয়, বরং নতুন সূচনা। এই দর্শনের সঙ্গে হিল্লার কোনো সম্পর্ক নেই। হিল্লা মানুষের তৈরি শোষণমূলক কাঠামো, যেখানে নারী শাস্তির বস্তুতে পরিণত হয়। কুরআন এমন জুলুমের অনুমতি দেয় না।

শেষ পর্যন্ত কুরআনের সতর্কবাণী আবারও স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি—

تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا
(সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭)
অর্থ: এগুলো আল্লাহর সীমা, এগুলোর কাছেও যেয়ো না।

কুরআন তালাক দিয়েছে, কিন্তু হিল্লা দেয়নি। কুরআন সম্মান দিয়েছে, অপমান নয়। কুরআন নারীকে মুক্ত করেছে, বন্দী করেনি। তাই স্পষ্ট সত্য হলো—তালাক কুরআনিক বিধান, আর হিল্লা মানুষের তৈরি অত্যাচার।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page