• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৩ অপরাহ্ন

“ছাগলে কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে”— হাদিসটির পর্যালোচনা

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৫১ Time View
Update : সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

ছাগলে কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে”—কুরআনের সংরক্ষণ-ঘোষণার আলোকে একটি গভীর পর্যালোচনা

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসে কিছু বর্ণনা এমনভাবে প্রচলিত হয়েছে, যেগুলো আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে কুরআনের নিজস্ব ঘোষণা, পদ্ধতি ও দর্শনের সঙ্গে গুরুতর সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। “ছাগলে কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে”—এই বর্ণনাটি তেমনই একটি বিতর্কিত দাবি, যা বহু সময় কুরআনের বাইরে কিছু শাস্তি ও বিধানকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। অথচ কুরআনের আলোকে বিচার করলে এই বর্ণনা গভীর প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সুনান ইবন মাজাহতে বর্ণিত আছারটি হলো—

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: «لَقَدْ نَزَلَتْ آيَةُ الرَّجْمِ وَرَضَاعَةُ الْكَبِيرِ عَشْرًا، وَلَقَدْ كَانَتْ فِي صَحِيفَةٍ تَحْتَ سَرِيرِي، فَلَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَتَشَاغَلْنَا بِمَوْتِهِ، دَخَلَ دَاجِنٌ فَأَكَلَهَا»

এই বর্ণনার সারকথা হলো—রজমের আয়াত এবং প্রাপ্তবয়স্ককে দশবার দুধপানের আয়াত নাজিল হয়েছিল; সেগুলো একটি কাগজে লেখা ছিল; নবী সালামুন আলা মুহাম্মাদ এর ইন্তেকালের সময় একটি গৃহপালিত পশু ঢুকে কাগজটি খেয়ে ফেলে। এখান থেকেই দাবি দাঁড় করানো হয়—কুরআনের কিছু আয়াত বাস্তবে নাজিল হলেও পরে হারিয়ে গেছে।

কিন্তু এই ধারণা কুরআনের নিজের ঘোষণার সঙ্গে মৌলিকভাবে অসংগত।
কুরআন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে—

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
(সূরা আল-হিজর ১৫:৯)
“নিশ্চয়ই আমিই এই স্মরণিকা নাজিল করেছি, এবং নিশ্চয়ই আমিই এর সংরক্ষণকারী।”

এই আয়াত কুরআনের সংরক্ষণকে মানুষের অবহেলা, দুর্ঘটনা বা বস্তুগত ঘটনার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। এখানে সংরক্ষণের দায়িত্ব কোনো সাহাবির কাগজ, কোনো ঘরের আলমারি বা কোনো পশুর উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি; বরং সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কুরআন আরও বলে—

إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ
(সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:১৭–১৮)
“এর সংকলন ও পাঠ আমাদেরই দায়িত্ব।”

অর্থাৎ কুরআনের সংকলন কোনো বিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দুর্ঘটনানির্ভর প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি ঐশীভাবে তত্ত্বাবধানকৃত সামষ্টিক প্রক্রিয়া, যেখানে মুখস্থকরণ, নিয়মিত তিলাওয়াত, প্রকাশ্য পাঠ এবং সমবেত যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষণীয়। কুরআন কোথাও বলেনি যে তার আয়াত কেবল লিখিত কাগজে সীমাবদ্ধ। বরং নবী কে বলা হয়েছে—

سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنسَىٰ
(সূরা আল-আ‘লা ৮৭:৬–৭)
“আমি তোমাকে পাঠ করাবো, তুমি ভুলবে না।”

এই আয়াত কুরআনের সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে মানুষের স্মৃতি ও জীবন্ত পাঠকে প্রতিষ্ঠা করে। সাহাবিরা কুরআন মুখস্থ করতেন, শিক্ষা দিতেন। ফলে একটি কাগজ নষ্ট হওয়া মানেই একটি আয়াত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া—এই ধারণা কুরআনিক বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

এই বর্ণনার আরেকটি গভীর সমস্যা হলো—যে বিষয়গুলোকে এখানে “আয়াত” বলা হচ্ছে, সেগুলো বর্তমান কুরআনে নেই এবং কুরআনের সামগ্রিক নৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কুরআনে শাস্তি ও বিধান স্পষ্টভাবে ঘোষিত, প্রকাশ্য এবং সকলের জন্য সমানভাবে জানা। গোপনে সংরক্ষিত কোনো বিধান পরে হারিয়ে যাওয়া—এটি কুরআনিক পদ্ধতির সঙ্গে যায় না।

এই বর্ণনাকে আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে একটি বিপজ্জনক ফল দাঁড়ায়—তাহলে বলতে হয়, কুরআনের পূর্ণতা ও সংরক্ষণ একটি পশুর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এটি শুধু সূরা আল-হিজর ১৫:৯–এর বিরোধিতা নয়; বরং পুরো কুরআনিক বিশ্বাস-ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত করে তোলে।

কুরআনের দৃষ্টিতে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান হলো—এই বর্ণনাটি হয় বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত স্মৃতিভ্রান্তি, নয়তো পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যাগত সংযোজন, যা কুরআনের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কুরআন নিজেই তার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে—সে মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে এই বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হয় না।

শেষ পর্যন্ত কুরআন আমাদের একটি মৌলিক নীতি শেখায়—কুরআনই মীযান। যে কোনো বর্ণনা, ব্যাখ্যা বা দাবি—তা যত পুরোনো বা বহুল প্রচারিতই হোক—যদি কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে কুরআনের আলোকে তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। “ছাগলে কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলেছে”—এই বর্ণনাটিও সেই পুনর্বিবেচনার আওতার বাইরে নয়।

নিচে আগের লেখাটির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে, “পূর্ণবয়স্ককে দশ ঢোক দুধ পান করানো”–সংক্রান্ত হাদিসের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সংহত, কড়া ও যুক্তিনির্ভর প্রবন্ধ দেওয়া হলো। ভাষা শক্ত, কিন্তু বিশ্লেষণাত্মক ও শালীনতার সীমার ভেতর রাখা হয়েছে।

পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে দশ ঢোক দুধ পান করানো”—হাদিস, বাস্তবতা ও কুরআনিক নৈতিকতার মুখোমুখি প্রশ্ন

ইসলামের নামে প্রচলিত সবচেয়ে বিস্ময়কর ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বর্ণনাগুলোর একটি হলো—পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে কোনো নারী দশ ঢোক বুকের দুধ পান করালে তাদের মধ্যে মাহরাম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়—এই ধারণা। এটি কোনো প্রান্তিক মত নয়; বরং কিছু হাদিসগ্রন্থে সরাসরি বর্ণিত একটি কথা, যা বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম বিবেককে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

এই ধারণার উৎস হিসেবে যে বর্ণনাটি সামনে আনা হয়, তা আয়িশা (রা.)–এর সঙ্গে সম্পৃক্ত—

«كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ، ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ» (সহিহ মুসলিম)

এবং অন্যান্য বর্ণনায় “প্রাপ্তবয়স্ককে দুধপান”–এর প্রসঙ্গ যুক্ত হয়ে একটি আইনি সিদ্ধান্ত দাঁড় করানো হয়েছে।

এখন প্রশ্নটা আবেগ দিয়ে নয়, বিবেক ও কুরআনিক নৈতিকতার আলোকে করা দরকার—

একজন পূর্ণবয়স্ক, যৌনক্ষম পুরুষ যদি কোনো নারীর বুকের দুধ পান করে—তা দশ ঢোক হোক বা এক ঢোক—এটি কি আদৌ শালীন, স্বাভাবিক ও নৈতিক কোনো কাজ? নাকি এটি স্পষ্টভাবে সেই সব আচরণের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো কুরআন “যিনার কাছে যাওয়া” বলে চিহ্নিত করেছে?

কুরআন খুব সচেতনভাবে বলে—

“وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ”
“যিনার কাছেও যেও না।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:৩২)

এখানে কুরআন যিনাকে কেবল একটি শেষ কাজ হিসেবে দেখেনি; বরং যিনার দিকে নিয়ে যায়—এমন সব শারীরিক ও মানসিক ঘনিষ্ঠতাকেই নিষিদ্ধ করেছে। তাহলে প্রশ্ন অনিবার্য—পূর্ণবয়স্ক পুরুষের মুখ নারীর স্তনের সংস্পর্শে আসা কি যিনার দিকে যাওয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়?

যারা বলেন, “এটা যৌন নয়, আইনি”—তারা আসলে নৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন। কারণ নৈতিকতা কোনো সংখ্যার খেলায় চলে না। দশ ঢোককে বৈধ আর নয় ঢোককে অবৈধ বলা—এটি নৈতিকতার ভাষা নয়, এটি কৃত্রিম আইনি কারসাজি।

আরেকটি বড় প্রশ্ন—দুধপানের ধারণা কুরআনে কোথায় এসেছে? কুরআন দুধপানকে দেখেছে শিশুর পুষ্টি ও মাতৃত্বের প্রেক্ষিতে, নির্দিষ্ট বয়স, নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য। কোথাও কুরআন বলেনি যে দুধপান একটি সামাজিক বা আইনি শর্টকাট হয়ে উঠবে, যার মাধ্যমে অচেনা নারী–পুরুষের ঘনিষ্ঠতাকে বৈধ করা যায়।

বরং কুরআন নারীর শরীরকে দেখেছে লজ্জা, সম্মান ও সুরক্ষার জায়গা হিসেবে—

“وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ
“তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” (সূরা আন-নূর ২৪:৩১)

এখানে “সৌন্দর্য” কেবল অলংকার নয়—বরং সেই সব অঙ্গ, যেগুলো মানুষের ফিতরাতগত লজ্জার সঙ্গে যুক্ত। নারীর স্তন সেই তালিকার কেন্দ্রেই রয়েছে। সেখানে একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের উপস্থিতি ও সংস্পর্শ—এটা কুরআনিক হায়া-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো—এই ধারণা যিনাকে প্রতিরোধ করে না; বরং যিনার দরজাকে আইনি ভাষায় সাজিয়ে দেয়। এটি বলে—শরীরের সবচেয়ে ব্যক্তিগত সীমা ভাঙা যাবে, যদি তার নাম পাল্টে দেওয়া যায়। কিন্তু কুরআন নাম দেখে নয়, কাজের প্রকৃতি দেখে বিচার করে।

এই কারণেই বলা যায়—
পূর্ণবয়স্ককে “দশ ঢোক দুধ পান করানো” কোনো ঐশী বিধান হতে পারে না। এটি কুরআনের নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত একটি ধারণা, যা পরবর্তী যুগে ফিকহি ব্যাখ্যার ভেতর ঢুকে পড়েছে। যে ধারণা মানুষের স্বাভাবিক লজ্জাকে আহত করে, যৌন সীমারেখা ঝাপসা করে এবং যিনার কাছাকাছি নিয়ে যায়—তা কখনো আল্লাহর দ্বীন হতে পারে না।

শেষ কথা পরিষ্কার—
শরিয়ত মানুষের ফিতরাত রক্ষা করতে আসে, ফিতরাত ভাঙতে নয়। আর যে বর্ণনা পূর্ণবয়স্ক নারী–পুরুষের মধ্যে এমন ঘনিষ্ঠতাকে বৈধ বলে, তা কুরআনের আলোকে গ্রহণযোগ্য নয়—তা যত “হাদিস” নামেই প্রচারিত হোক না কেন।
@@@@@@@@@@


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page