• মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০১ অপরাহ্ন

বানরীকে জেনার কারণে পাথর মারা— এই বর্ণনা কি গ্রহণযোগ্য?

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৫৯ Time View
Update : সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

বানরীকে জেনার কারণে পাথর মারা—কুরআনের মানদণ্ডে এই বর্ণনা কি গ্রহণযোগ্য?

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

ইসলামের নামে প্রচারিত কিছু বর্ণনা আছে, যেগুলো আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে কুরআনের নৈতিক দর্শন, মানবিক বিচারব্যবস্থা এবং যুক্তিবোধের সঙ্গে গুরুতর সংঘর্ষ তৈরি হয়। “বানরীকে জেনার কারণে পাথর মারা” সংক্রান্ত বর্ণনাটি ঠিক তেমনই একটি উদাহরণ। এই বর্ণনাটি বহু সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন প্রাণীদের মধ্যেও শরিয়তি ‘জিনা’ ও ‘রজম’ আইন কার্যকর ছিল। কিন্তু কুরআনের আলোকে বিষয়টি বিচার করলে এই ধারণা টেকসই হয় না।

সহিহ বুখারীতে উদ্ধৃত একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে—

قَالَ عَمْرُو بْنُ مَيْمُونٍ: «رَأَيْتُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ قِرْدَةً اجْتَمَعَ عَلَيْهَا قِرَدَةٌ، قَدْ زَنَتْ، فَرَجَمُوهَا، فَرَجَمْتُهَا مَعَهُمْ»

এর বাংলা অর্থ হিসেবে বলা হয়—আমর ইবন মাইমুন জাহেলি যুগে দেখেছেন, একটি বানরী ব্যভিচার করেছে বলে অন্য বানররা তাকে পাথর মেরেছে, এবং তিনিও নাকি তাদের সঙ্গে পাথর মেরেছেন।

প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এটি নবী কোনো বাণীই নয়। এটি একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের দাবি, যা জাহেলি যুগের ঘটনা হিসেবে বর্ণিত। এর সত্যতা, ব্যাখ্যা কিংবা তাৎপর্য—কোনোটিই ওহির মানদণ্ডে যাচাই করা হয়নি। তবু এই বর্ণনাকে শরিয়তি শাস্তির যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়—এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।

কুরআন স্পষ্টভাবে বলে—

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
“কেউ কারো পাপের বোঝা বহন করবে না।”(সূরা আল-আন‘আম ৬:১৬৪)

এই আয়াত নৈতিক দায়বদ্ধতার মূলনীতি নির্ধারণ করে—পাপ ও দায় কেবল সচেতন, নৈতিক সত্তার জন্য প্রযোজ্য। পশুদের ক্ষেত্রে এই নৈতিক দায়ের প্রশ্নই ওঠে না।

কুরআন আরও বলে—

وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ
“তিনি পশুগুলো তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।”(সূরা আন-নাহল ১৬:৫/১১)

পশুদের এখানে মানুষের কল্যাণে সৃষ্ট সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, নৈতিক আইনপ্রণেতা বা অপরাধী হিসেবে নয়। কোথাও বলা হয়নি যে পশুরা শরিয়তি বিধান মানে বা ভঙ্গ করে।

নৈতিক বোধের উৎস সম্পর্কে কুরআন আরও স্পষ্ট—

فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا
“তিনি মানুষকে পাপ ও তাকওয়ার বোধ দান করেছেন।”(সূরা আশ-শামস ৯১:৮)

পাপ ও তাকওয়ার বোধ—এই নৈতিক সচেতনতা কেবল মানুষের জন্য। কোনো প্রাণীর মধ্যে এই বোধ আরোপ করা কুরআনের মৌলিক দর্শনের বিরোধী।

এই বাস্তবতায় “বানরী জিনা করেছে”—এই ধারণাই ভেঙে পড়ে। জিনা কোনো জৈবিক আচরণের নাম নয়; এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক অপরাধ, যা কেবল বিবেকবান, দায়িত্বশীল মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। প্রাণীদের মধ্যে বিবাহ, বৈবাহিক চুক্তি, নৈতিক দায় বা শরিয়তি শাস্তির প্রশ্নই ওঠে না।

এই বর্ণনাটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে ভয়ংকর পরিণতি দাঁড়ায়—তাহলে বলতে হয়, বানরদের শরিয়া আছে, সাক্ষী আছে, বিচারব্যবস্থা আছে এবং রজমের বিধান আছে। এটি কেবল অবাস্তবই নয়, কুরআনের সামগ্রিক নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ।

কুরআন কোথাও পশুদের অপরাধী বানায়নি। বরং কুরআনের দৃষ্টিতে পশুরা আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়মে চলে; তারা মানুষের মতো নৈতিক পরীক্ষার আওতায় পড়ে না। তাই এই বর্ণনাকে কুরআনের মানদণ্ডে দাঁড় করালে এটি টেকে না।

সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা হলো—এই ধরনের আছার মূলত জাহেলি যুগের কল্পকাহিনি, ভুল বোঝাবুঝি বা প্রতীকী গল্প, যা পরবর্তী সময়ে বর্ণনাসাহিত্যে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু কুরআন যেহেতু সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মীযান, তাই তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বর্ণনা—যত পরিচিত গ্রন্থেই থাকুক না কেন—গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

কুরআনের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট হয়—“বানরীকে জেনার কারণে পাথর মারা” কোনো শরিয়তি বাস্তবতা নয়, বরং মানবিক যুক্তি ও কুরআনী নৈতিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একটি বিভ্রান্তিকর বর্ণনা। কুরআনই মাপকাঠি, আর এই বর্ণনা সেই মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয় না।

বানরীকে জেনার কারণে পাথর মারা—কুরআনের মানদণ্ডে এই বর্ণনা কি গ্রহণযোগ্য?


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page