• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৪:১৭ অপরাহ্ন

ইফতার নাকি ইতমাম কোনটা ঠিক

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১২৬ Time View
Update : সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬

অধ্যায় ১: সন্ধ্যার অন্ধকার

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

মাহাতাব আকন্দ তার বন্ধুদের সঙ্গে একটি ইসলামিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করার জন্য স্থানীয় মসজিদে যাচ্ছিলেন। সেই সেমিনারে আলোচনার মূল বিষয় ছিল—ইফতার করার সঠিক সময় এবং রোজা নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা। মাহাতাব জানতেন, অনেকেই সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করে থাকেন, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এটি পুরোপুরি সঠিক নয়।

তিনি কনফারেন্সের আগেই একটু চিন্তা করতে লাগলেন—কেন এত কম মুসলমান রাতে ইফতার করেন, যখন কুরআন স্পষ্টভাবে রাত পর্যন্ত ইফতারের কথা বলেছে?
মসজিদে পৌঁছানোর পর, সেমিনারের প্রথম পর্ব শুরু হল।

প্রথম বক্তা মাওলানা শাফি বলেন,
“বেশিরভাগ মুসলমানরা সূর্যাস্তের পরই রোজা ভঙ্গ করে থাকেন, কিন্তু ইসলাম আমাদের শুধুমাত্র সূর্যাস্তের সময়ে নয়, বরং রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করতে বলেছে।”
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
“ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলাল লাইল” অতঃপর তোমরা সিয়াম পুর্ণ কর রাত পর্যন্ত। (বাকারা ১৮৭)
বন্ধুগণ! আল্লাহ যেমন রাত পর্যন্ত সিয়াম পুর্ণ করতে বলেছেন তেমনি তিনি পবিত্র কুরআনে রাত কখন হয়, তার পরিচয় জানিয়েছেন।

ইফতারির সময় সম্পর্কে যাতে উম্মাহর মধ্যে কোনো সন্দেহ বা দ্বিধাবিভক্তির সৃষ্টি না হয় তার সব প্রমাণ, নির্দেশ, দলিল ও ব্যাখ্যা পবিত্র কুরআনে বিদ্যমান। আল্লাহ দিবা-রাত্র এবং মধ্যবর্তী বিভিন্ন সময় উল্লেখ করতে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন اليل ‘লাইল’ অর্থ রাত। এটি পবিত্র কুরআনে ১৬২টি স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ব্যবহৃত اليل ‘লাইল’ শব্দ দ্বারা কখনো, কোনোভাবেই সন্ধ্যা বা সূর্যাস্তের সময়কে বুঝানো হয়না।

মহান আল্লাহ রাত নামে একটি সুরা নাযিল করেছেন (সুরা আল লাইল।) তাতে তিনি রাতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,
وَٱلَّيْلِ إِذَا يَغْشَىٰ
শপথ রাতের যখন তা (অন্ধকার দিয়ে) ঢেকে দেয়। অর্থাৎ দিনের আলোকে তিনি রাতের অন্ধকার দিয়ে ঢেকে দেন। তিনি আরো বলেন,
وَٱلَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ
রাতের শপথ যখন তা হয় শান্ত-নিঝুম ( দুহা ৯৩ঃ২)। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন,
وَٱلَّيْلِ وَمَا وَسَقَ
আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার। (ইনশিকাক ৮৪ঃ১৭) বন্ধুরা আপনারা কি জানেন? রাত কিসের সমাবেশ ঘটায়? এটাও তিনি স্পষ্ট করেছেন,  সুরা আনয়ামের ৭৬ নম্বর আয়াতে। তিনি বলেন,
فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ ٱلَّيْلُ رَءَا كَوْكَبًاۖ قَالَ هَٰذَا رَبِّىۖ
রাতের আঁধার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন সে নক্ষত্র দেখতে পেল, (তখন) বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক। (আনআম ৬ঃ৭৬)

এই আয়াত দারা এটা প্রমাণিত হয় যে, রাত যখন নেমে আসে তখন আকাশের তারকারাজি দেখতে পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন,
يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَ يَطْلُبُهُ
দিনকে তিনি রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন। (আরাফ ৭ঃ৫৪)
অর্থাত দিনের আলো যখন অন্ধকারে ঢাকা পরে যায় এটাকে রাত বলে।  আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন,
كَأَنَّمَآ أُغْشِيَتْ وُجُوهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ ٱلَّيْلِ مُظْلِمًاۚ
যেন তাদের মুখমন্ডলকে আচ্ছাদিত করে দেয়া হয়েছে গাঢ় অন্ধকার রাত্রির টুকরো দিয়ে। (ইউনুস ১০ঃ২৭)
সুরা আর রাদের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَءَايَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
তিনি দিবসের উপর রাতের আবরণ টেনে দেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শনাবলী রয়েছে। (রাদ ১৩ঃ৩)

তাই বন্ধুরা! আমরা পবিত্র কুরআনের আয়াত দ্বারা জানতে পারি রাত হলো অন্ধকারের নাম। অন্ধকার হয়ে যাওয়া মানে রাত শুরু হওয়া। যেমন আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
وَجَعَلْنَا ٱلَّيْلَ وَٱلنَّهَارَ ءَايَتَيْنِۖ فَمَحَوْنَآ ءَايَةَ ٱلَّيْلِ وَجَعَلْنَآ ءَايَةَ ٱلنَّهَارِ مُبْصِرَةً
আমি রাত আর দিনকে দু’টো নিদর্শন বানিয়েছি। আমি রাতের নিদর্শনটিকে আলোহীন করেছি, আর দিনের নিদর্শনটিকে করেছি আলোয় উজ্জ্বল। (ইসরা ১৭ঃ১২)
يُكَوِّرُ ٱلَّيْلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلَّيْلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمْسَ وَٱلْقَمَرَۖ

রাত দিনকে ঢেকে নেয়, আর দিন ঢেকে নেয় রাতকে। তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন সুরুজ আর চাঁদকে। (যুমার ৩৯ঃ৫)

শাফি সাহেবের কথাগুলো মাহাতাবের মনকে একটু নাড়া দিলো, কিন্তু তিনি একদম নিশ্চিত ছিলেন না।

সেমিনার শেষে, মাহাতাব শাফি সাহেবের কাছে গেলেন এবং বললেন, “মাওলানা সাহেব, আপনি কি একটু বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, কেন সূর্যাস্তের পর ইফতার করা সঠিক নয়?”
শাফি সাহেব গভীরভাবে মাহাতাবের দিকে তাকালেন এবং বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, তুমি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছো। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَكُلُوا۟ وَاشْرَبُوا۟ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلْخَيْطُ ٱلْأَبْيَضُ مِنَ ٱلْخَيْطِ ٱلْأَسْوَدِ مِنَ ٱلْفَجْرِ ۖ ثُمَّ أَتِمُّوا۟ ٱلصِّيَامَ إِلَى ٱلَّيْلِ ۚ
বাংলা অনুবাদ:
“আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে সাদা রেখা (ভোরের আলো) স্পষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর রোজা পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৭)
এই নির্দেশটি, সূর্যাস্তের পর ইফতার করার পক্ষে নয়, বরং রাতে ইফতার করার পক্ষে।”

মাহাতাব একটু অস্বস্তিতে পড়লেন। বললেন “কিন্তু আমরা তো সবসময় সূর্যাস্তের পরই ইফতার করি। “সুর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথেই আমরা যেন তারাতারি ইফতার করে ফেলি এজন্য আমাদের জোর তাগিদ দেয়া হয়।

“ঠিক বলেছো,” শাফি সাহেব হাসলেন, “এটি একটি দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা প্রথা, কিন্তু কুরআন ও হাদিসের আলোকে, সন্ধ্যা হওয়ার পরেও পুরোপুরি রাত আসার আগ পর্যন্ত আমাদের রোজা সম্পূর্ণ হয় না। অনেক অঞ্চলে, বিশেষত উত্তরের দেশগুলোতে, সূর্যাস্তের পরও বেশ কিছুক্ষণ আলো থাকে।

সু্র্যাস্তের সময়কে কুরআনে “গুরুবিশ শামস” বলা হয়েছে, আর সু্র্যাস্তের স্থানকে বলা হয়েছে “মাগরীব“। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَاۖ
এবং তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাগীতি (নিয়মিত) উচ্চারণ কর সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং সুর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বে। (সুরা তহা ২০ঃ১৩০)

إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ ٱلشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِى عَيْنٍ حَمِئَةٍ
যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে ঘোলা পানিতে ডুবতে দেখল। (সুরা কাহাফ ১৮ঃ৮৬)

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ ٱلْغُرُوبِ
আর সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের মহিমা ও প্রশংসা ঘোষণা কর। (সুরা কফ ৫০ঃ৩৯)
শোন মাহাতাব! যদি সু্র্যাস্তের সময় ইফতার করা বৈধ হত তাহলে আল্লাহ তায়ালা “লাইল” শব্দটি ব্যাবহার না করে এভাবে বলতেন যে “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলা গুরুবিশ শামছ” কিন্তু তিনি তা বলেন নি।

মাহাতাব বিষয়টি ভেবে অনেকটা আশ্চর্যবোধ করলো। এবং বললো, জি হুজুর আপনার কথায় যুক্তি আছে। মাহাতাবের জানার আগ্রহ যেন বেড়েই চলছে, তিনি পরিষ্কার ভাবে বুঝার জন্য আবারো প্রশ্ন করলেন, তাহলে কি হুজুর সুর্যডুবে গেলেও রাত শুরু হয়না?

শাফি সাহেব বিষয়টি আরো ভালোভাবে উপস্থাপন করলেন, সুর্য অস্ত  যাওয়ার পর পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে থাকে, এ সময়টিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা “আসিলা বা সন্ধা বলেছেন” যেমন কুরআনে বলা হয়েছে,
وَٱذْكُر رَّبَّكَ فِى نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ ٱلْجَهْرِ مِنَ ٱلْقَوْلِ بِٱلْغُدُوِّ وَٱلْءَاصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلْغَٰفِلِينَ

তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়-ভীতি সহকারে অনুচ্চস্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ কর আর উদাসীনদের দলভুক্ত হয়ো না। (আরাফ ৭ঃ২০৫)
এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা “আছল” বা সন্ধার কথা স্পস্ট করেই বলেছেন। এছাড়াও তিনি আরো বলেন, “ওয়া সাব্বিহু বুকরতাও ওয়া আসিলা।
وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর। (আহযাব ৩৩ঃ৪২)
وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
আর সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর। (আল ফাতহ্ ৪৮ঃ৯)

وَٱذْكُرِ ٱسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
আর সকাল-সন্ধ্যায় তোমার রব্ব এর নাম স্মরণ কর। (ইনসান ৭৬ঃ২৫)

উপোরোক্ত চারটি আয়াতে সন্ধার সময়ের কথা সুন্দর ভাবে উল্লেখিত হয়েছে। এই সন্ধার সময়েও যদি ইফতার করা বৈধ হতো তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলতেন, “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলাল আছল” কিন্তু তিনি তা বলেননি। এরপর লালিমা দুর হবার পর সাদা আভা দেখা দেয় এটাকে “শাফাক” বা গোধূলী ” বলে। কুরআনে এসেছে,
فَلَآ أُقْسِمُ بِٱلشَّفَقِ – وَٱلَّيْلِ وَمَا وَسَقَ

আমি শপথ করি শাফাক বা গোধুলীর, আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার। (ইনশিকাক ৮৪ঃ১৬,১৭) এসময়েও যদি ইফতার করা যেত তাহলে আল্লাহ তায়ালা বলতেন, “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইালাশ শাফাক্”  কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এটাও বলেননি, তিনি বলেছেন, “ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামা ইলাল লাইল”।  যখন শাফাক বা গোধূলী অদৃশ্য হয়ে যায় তখন লাইল বা রাত নেমে আসে। তাই কুরআনের নির্দেশ অনুসারে রাত পর্যন্ত ইফতার করা উচিত।”

মাহাতাব আরো কিছু প্রশ্ন করতে চাইলেন, কিন্তু শাফি সাহেব বলে উঠলেন, “এটা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাপার নয়, এটি কুরআনের বাণীও। আমাদের উচিত, যেভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)এ’র সুন্নাহ অনুসরণ করে চলি, ঠিক তেমনি এই বিষয়েও তাঁর পথে চলা।”

মাহাতাব মাথা নিচু করে শাফি সাহেবের কথাগুলো ভাবতে লাগলেন। তিনি জানতেন যে ইসলাম কখনোই মানুষকে বিভ্রান্ত করে না, তাই তার মনস্থির হল যে, তাকে আরও গভীরভাবে এই বিষয়টি খুঁজে দেখতে হবে।

মাগরীবের আগেই মাহাতাব বাসায় ফিরে এলেন। তিনি সেদিন সন্ধ্যার সময় কোন কিছু খাবেন না, একেবারে রাতে খাবার গ্রহণ করতে মনস্থির করলেন। “যেহেতু কুরআনে রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করার কথা বলেছে, তাহলে রাতের পূর্ণ আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত”—এই চিন্তা তার মন থেকে যাচ্ছিল না।

এদিকে, তার স্ত্রী সেলিনা মাহাতাবকে বললেন, “আপনি কি ঠিক আছেন? আজকে সন্ধ্যায় তো রোজা ভাঙবেন নাকি।?”
মাহাতাব একটু হাসলেন, ” নাগো আজকে আর রোজা ভাঙবোনা আজকে রোজা পূর্ণ করবো ইনশাআল্লাহ, সেলিনা হতবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে থাকলো, কিছু বুঝে উঠতে পারছিলোনা। মাহাতাব বললেন, আমি আজকে কিছুক্ষণ পর পর আকাশের দিকে তাকিয়ে রাতের আসল আগমনের জন্য অপেক্ষা করব।”

সেলিনা কিছুটা অবাক হলেন। তিনি জানতেন যে মাহাতাব প্রায়ই কুরআনের বাণী ও হাদিস নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু আজকের এই বিশেষ সিদ্ধান্ত তাকে কিছুটা ভাবিয়ে তুলল।

সেলিনা বললেন, “তাহলে, আমাদের পরিবারের অন্যদেরও এই বিষয়টি জানানো উচিত। যদি সত্যিই রাতের পূর্ণ আগমনের পর ইফতার করা উত্তম হয়, তাহলে তো সবাইকে এই কথা জানাতে হবে।”

মাহাতাব গভীরভাবে চিন্তা করলেন। তিনি জানতেন, এই ধরনের বিষয়গুলি মুসলমানদের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনো এক বিশেষ সময়ের সীমায় সীমাবদ্ধ না রেখে, কুরআন ও হাদিসের অনুসরণ আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মাহাতাব সিদ্ধান্ত নিলেন যে,
আজ রাতেই তিনি প্রথমবারের মত ইফতার করবেন এবং রাতের পুরোপুরি আগমন নিশ্চিত হওয়ার পর।
পরবর্তী সময়ে, তিনি এই বিষয়ে আরও আলোচনা করবেন মাওলানা শাফির সাথে। তিনি আরো ভালো করে জেনে নিবেন সবগুলো সময়ের পরিপুর্ণ ব্যাক্ষা। এবং সবসময় সতর্ক ও সচেষ্ট থাকবেন কুরআন ও হাদিসের বিধান অনুসরণ করতে।

খতার কাছে এটি শুধু একটি সাধারণ বিষয় ছিল না; এটি ছিল সত্যের পথে চলার একটি বড় প্রচেষ্টা। তাকে জানতেই হবে সত্যের পথ কোনটি।

অধ্যায়ঃ-২ সন্ধ্যার পরের অপেক্ষা
রাতের খাবার প্রস্তুত হতে হতে মাহাতাব আকন্দ কিছুটা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তার মনে হচ্ছিল, আজকের সিদ্ধান্তটি তাদের পরিবারের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসবে। সেলিনা রাতের খাবারের জন্য মাংস, ভাত, সবজি—সবই প্রস্তুত করে রেখেছিল। কিন্তু মাহাতাবের মন স্থির ছিল, তিনি রাতের পূর্ণ আগমনের পরই খাবার গ্রহণ করবেন।

তিনি জানতেন, সাধারণত মুসলমানরা সূর্যাস্তের সাথে সাথেই রোজা ভাঙেন। তবে, তার বিশ্বাস ছিল, কুরআন এবং হাদিসে যে নির্দেশনা রয়েছে, তা অনুসরণ করাই সঠিক পথ। রাতের আগমন না হওয়া পর্যন্ত ইফতার করা ভুল হবে, কারণ এতে সূর্যাস্তের পরেও কিছু সময় অস্বচ্ছ ও আলোকিত থেকে যায়, এসময় ইফতার করলে কুরআনের পরিপন্থী হবে।

সেলিনা মাহাতাবকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি কেন এত দেরিতে ইফতার করতে চাচ্ছেন? সবাই তো দ্রুত ইফতার করে, এতে তো রোজার উত্তম পালন হবে।” আমি এই মর্মে বেশ কিছু হাদিস পড়েছি। যেমন-

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ – قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ.

বাংলা অনুবাদ: সাহল ইবন সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করতে থাকবে।”(বুখারি: ১৯৫৭, মুসলিম: ১০৯৮)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ – قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: أَحَبُّ عِبَادِي إِلَيَّ أَعْجَلُهُمْ فِطْرًا.

বাংলা অনুবাদ: আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আল্লাহ عز وجل বলেন, ‘আমার বান্দাদের মধ্যে আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে দ্রুত ইফতার করে।’”(তিরমিজি: ৭০০, ইবনে মাজাহ: ১৬৯৪)

মাহাতাব একটু ভাবলেন এবং মৃদু হেসে সেলিনাকে উত্তর দিলেন, “শোন! সেলিনা, আমি জানি, এখানে দ্রুত ইফতার করতে বলা হয়েছে এর মানে এটা নয় যে “তোমরা সময়ের আগেই ইফতার কর”,  এর মানে হলো সময় হলে “তোমরা খাবার খেতে বিলম্ব করনা” রমজান মাস ইবাদতের মাস। খাবার খেতেই যদি তুমি অনেক সময় লাগিয়ে দেও তাহলে রাতের ইবাদত কখন করবে?এজন্য খাবার খেতে বিলম্ব করা বা ধীর গতীতে খাবার খাওয়া মোটেই উচিৎ নয়।

মাহাতাব আরো বললেন, আজ আমি আল্লাহর রাস্তায় আরও একটু সতর্ক হতে চাই। কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা রোজা পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।’ তাহলে সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা কি করে সম্ভব হয়। রাত আগমনের আগেই ইফতার করা কুরআন-সুন্নাহর সঠিক পথ হতে পারেনা।”

সেলিনা একটু থেমে গেলেন এবং ভাবলেন, “তাহলে কি আমাদের সবাইকে নতুন করে শিখতে হবে যে রাতের পূর্ণ আগমন না হলে ইফতার করাটা ঠিক নয়?”
“হ্যাঁ, তুমি সঠিক বলেছো,” মাহাতাব হাসলেন। “আমরা যদি কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে চলি, তাহলে শুধু নিজেই নই, আমাদের পরিবার এবং সমাজকেও সঠিক পথ দেখাতে পারব।”

এরপর মাহাতাব শাফি সাহেবের কথাগুলি মনে করে বললেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘তোমরা যেভাবে আমাকে দেখেছো, তেমনই আমল করো।’ শাফি সাহেব বলেছিলেন, সূর্যাস্তের সময় আমাদের রোজা ভাঙার প্রয়োজন নেই, বরং রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করা  উচিত। এর পেছনে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখবে, এটা আমাদের বিশ্বাসের প্রতি এক ধরনের সততা প্রকাশ করে।”

সেলিনা আর কিছু না বললেও, তার মধ্যে এক ধরনের শান্তি অনুভূত হলো। তিনি মাহাতাবের সিদ্ধান্তে সমর্থন দিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে মাহাতাব যে কোন সিদ্ধান্ত নেন, তা কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণেই হয়।

মাহাতাব যখন দেখলেন সু্র্য ডোবার পরেও চারোদিকে আলো ছড়িয়ে আছে, তখন তিনি বসে থেকে সময়ের সঠিক ক্ষণটা বুঝতে চেষ্টা করছিলেন। তিনি জানতেন, সঠিক সময়ে ইফতার করা একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং রাতের আগমন নিশ্চয়তার সাথে খাবার গ্রহণই তার কাছে সবচেয়ে প্রাধান্য পায়।

তিনি চিন্তা করতে থাকলেন, “কেন আমরা সূর্যাস্তের পরেই ইফতার করি? কারণ এটি অনেক সহজ, আর সকলের কাছে প্রচলিত। কিন্তু কুরআন এবং রাসুল (সা.) এর নির্দেশ অনুসরণ করা কতটা মহৎ, তা এখন অনুভব করছি।”

একটি সময় পর, মাহাতাব যখন দেখতে পেলেন
চারদিকে অন্ধকার ছেয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে রাতের আগমন শুরু হয়ে গেছে, তখনই তিনি খাবার গ্রহণ করলেন। যেহেতু বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ তাই সুর্যদয় ও সুর্যাস্তের সময় এখন নির্ধারিত এবং মানুষ ঘড়ি দেখেই তা নিশ্চিত হতে পারে। কিন্তু মাহাতাব জানতনা যে, রাত কখন শুরু হয় এর সময়ও নির্ধারিত  রয়েছে। তাই শাফি সাহেবের কাছে এই প্রশ্নটি করবেন বলে মনস্থির করলেন।  এই মুহূর্তে তিনি অনুভব করলেন, ইফতার করা শুধু শারীরিক ক্ষুধা মেটানো নয়, বরং এটি ছিল তার বিশ্বাস ও ঈমানের এক নিখুঁত প্রতিফলন।

তারপর মাহাতাব সেলিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আল্লাহর পথে চলা কতটা শান্তির অনুভূতি তৈরি করে, সেটা বুঝতে পারছি।”
সেলিনা কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, “আপনি ঠিক বলেছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, আজকের রাতের জন্য পরিবার এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে কত সমালোচনা হবে?”

মাহাতাব মনে মনে ভাবলেন, “এটাই তো আসল শিক্ষা—নতুন পথে চললে কিছুটা বিরোধিতা বা সন্দেহ আসবেই, কিন্তু সত্যের পথে চলা সবচেয়ে বড় কর্তব্য।”

পরের দিন, মাহাতাব নিজেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের এই ব্যাপারে জানাতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “আমাদের গতকালের রাতে ইফতারীর  সিদ্ধান্তটি ছিল আল্লাহর কাছে সঠিক ও মনোনিত পন্থা। কুরআনে রাত পর্যন্ত ইফতার করার নির্দেশ রয়েছে, তাই আমাদেরও তা অনুসরণ করা উচিত।”

পরিবারের সদস্যরা কিছুটা অবাক হলেও, তাদের মধ্যে এক ধরনের নতুন উপলব্ধি জন্ম নিল। তারা বুঝতে পারল, মাহাতাবের সিদ্ধান্তটি একদম সঠিক ছিল। তারা সেই রাতে রাতে ইফতার করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

এই নতুন অভিজ্ঞতা মাহাতাবের জন্য ছিল শুধু একটি খাওয়ার সময়ের পরিবর্তন নয়, এটি ছিল তার ঈমান এবং তার বিশ্বাসের উপর একটি দৃঢ় পরীক্ষা। রাতে ইফতার করার মধ্য দিয়ে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন, এবং আল্লাহর পথে চলার এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো তার জীবনে।

অধ্যায় ৩: সত্যের পথ
পরবর্তী দিন, মাহাতাব আকন্দ ভাবলেন, আজকের সিদ্ধান্তটি শুধু তার জন্য নয়, তার পরিবারের এবং সম্প্রদায়ের জন্যও একটি বিরাট বড় শিক্ষা। রাতের ইফতারের ব্যাপারে কিছুটা বিরোধিতা আসতে পারে, কিন্তু তিনি জানতেন যে, সত্যের পথে চললে একসময় সবাই সেটা বুঝতে পারবে। আজকাল অনেকেই সূর্যাস্তের সময়েই ইফতার করে, কিন্তু কুরআন এবং হাদিসের নির্দেশনাটি তাদের কাছে পরিষ্কার করার দায়িত্ব তার।

মাহাতাব সকালে তার কর্মস্থলে যাওয়ার আগে সেলিনাকে বললেন, “আজ কিছুটা সময় নিয়ে আমি মাওলানা শাফির সাথে দেখা করবো। আমার আরো কিছু প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, তাই সচ্ছ ধারণা প্রয়োজন।

মসজিদে জোহরের সালাত আদায় করে মাহাতাব মাওলানা শাফির সাথে দেখা করলেন। মাওলানা শাফি  মসজিদের বারান্দায় বসে দুজন লোকের সাথে এবিষয়েই কথা বলতেছিলেন। তিনি মাওলানার কাছে গিয়ে বসে পরলেন।

মাওলানা সাহেব মুচকি হেসে মাহাতাবকে কুশল জানালেন। এবং বললেন মাহাতাব তুমি কি কোন বিষয় নিয়ে ভাবছ?
মাহাতাব বললেন, হুজুর আমার কিছু প্রশ্ন আছে প্রশ্নগুলোর উত্তর না জানা পর্যন্ত আমার শান্তি মিলছেনা। দয়া করে আমার টেনশন দুর করে দিন।

মাওলানা শাফি বললেন, মাহাতাব আগে প্রশ্নগুলো বলবেতো! তবেইতো উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো। তুমি নির্দিধায় প্রশ্নগুলো আমাকে বল।

মাহাতাব বললেন, আমি একটি হাদিসে পড়লাম এমন,
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ – قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
إِذَا أَقْبَلَ اللَّيْلُ مِنْ هَا هُنَا، وَأَدْبَرَ النَّهَارُ مِنْ هَا هُنَا، وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ، فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ.
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যখন রাত এদিক থেকে আসবে,দিন ওদিক থেকে চলে যাবে এবং সূর্য যখন অস্ত যাবে, তখনই রোজাদার ইফতার করবে।” (সহিহ বুখারি: ১৯৫৪, সহিহ মুসলিম: ১১০০)
হাদিসটিতে বলা হয়েছে “সূর্য যখন অস্ত যাবে, তখনই রোজাদার ইফতার করবে।

মাওলানা শাফি বললেন, হাদিসটি আমিও পড়েছি, তুমি হাদিসটির দিকে গভীর মনোযোগ দাও এখানে তিনটি বাক্য আছে।
১। যখন রাত এদিক থেকে আসবে,
২। দিন ওদিক থেকে চলে যাবে,
৩। এবং সূর্য যখন অস্ত যাবে,
তখনই রোজাদার ইফতার করবে।
এখানে হাদিসের এই বাক্যগুলো উল্টো করে সাজানো হয়েছে, এজন্য ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। বলতো মাহাতাব “রাত আগে আসে তারপরে সুর্য  অস্ত যায়? নাকি সুর্য আগে অস্ত যায় তারপর রাত আসে?
মাহাতাব মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলো অবশ্যই সুর্য আগে অস্ত যায় তারপর রাত আসে।

মাওলানা শাফি বললেন, তুমি ঠিক বলেছ।  এবার হাদিসের বাক্যগুলি এভাবে সঠিকভাবে সাজাও তাহলে তোমার উত্তর পেয়ে যাবে।
১। সুর্য যখন অস্ত যাবে,
২। দিন যখন ওদিক থেকে চলে যাবে,
৩। রাত যখন এদিক থেকে আসবে।
তখনই রোজাদার ইফতার করবে।”

এখন দেখ বাক্যগুলো সঠিকভাবে সাজানোর পর আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাইতেছি”রাত যখন এদিক থেকে আসবে, তখনই রোজাদার ইফতার করবে।

মাওলানা শাফি বললেন, বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমি তোমাকে একটি হাদিসের রেফারেন্স দিচ্ছি, এহাদিসটি পুর্বের হাদিসের অপূর্ণাঙ্গরুপ অর্থাত পুর্বের হাদিসটি সম্পুর্ণ নয় নিচের হাদিসটাতে এর পুর্ণতা রয়েছে। যেই হাদিসটিতে সু স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আবু আওফা রাঃ নবী সাঃ এর সাথে সফরে ছিলেন রমজান মাসে। তারা যখন দেখলো সুর্য ডুবে গেছে তখন নবী সাঃ বললেন ছাতু গুলে আনতে। আউফা রাঃ বলেন সুর্যডুবে গেছে কিন্তু এখনো দিন রয়ে গেছে। নবী সাঃ বললেন তুমি নাম এবং ছাতু গুলে আন। তারপর তিনি নামলেন ছাতু গুলে আনলেন।  রাসুল সাঃ খেলেন এবং বললেন, সূর্য যখন এদিক থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং রাত্র যখন এদিক থেকে ঘনিয়ে আসবে তখন রোযা পালনকারী ইফতার করবে।— (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩০ আন্তর্জাতিক নং ১১০১-১)

মাহাতাব বিষয়টি শুনে অবাক হয়ে গেলো! একটি হাদিস উল্টো করে লিখার কারণে হাজার বছর থেকে মানুষ উল্টোপথে হাটছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে কুরআনে সবিস্তারে স্পস্ট করে দিয়েছেন। কিন্ত আজ আমরা কুরআন কে শুধু পাঠ করেই ক্ষ্যান্ত হই, এর ভাষা মর্ম বুঝার চেষ্টাও করিনা।
মাওলানা শাফি আরো বললেন, কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়গুলো একেবারে সু-স্পষ্ট। সুতারাং কুরআন বহির্ভূত আমল করে কখনই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জণ সম্ভব নয়।

মাহাতাব প্রথমবারের মত গতকাল রাতে ইফতার করতে গিয়ে একটি সমস্যা উপলব্ধি  করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি জানতেননা “সু্র্যাস্তের ঠিক কত মিনিট পর রাত শুরু হয়। তিনি বিষয়টি মাওলানা শাফি সাহেবের সাথে শেয়ার করলে শাফি সাহেব বললেন, সু্র্যাস্তের পর যে সাফাক বা গোধুলী আমরা দেখতে পাই তা শেষ হয় সু্র্যাস্তের ২৫ থেকে ৪০ মিনিট পর। অর্থাত ঋতু ভেদে এবং বিভিন্ন দেশে এর সময় স্থিতি কমবেশি হয়ে থাকে।

ইসলামী ফিকহের মধ্যে শাফাকের দুটি ব্যাখ্যা আছে:
(১) শাফাক আহমার (লালচে আভা মিলিয়ে যাওয়া) → সাধারণত ২৫-৪০ মিনিটের মধ্যে ঘটে।
(২) শাফাক আবিয়াদ (সাদা আভা মিলিয়ে যাওয়া) → ৪০-৭২ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
সালাফি, শাফেঈ ও হানাফি স্কলাররা শাফাক আহমার মত অনুসরণ করেন, যেখানে ইশার ওয়াক্ত সূর্যাস্তের ২৫-৪০ মিনিট পরে শুরু হয়।
ভারত, উপমহাদেশের হানাফি এবং সালাফিরা শাফাক আবিয়াদ মত গ্রহণ করেন, যেখানে ইশার ওয়াক্ত সু্র্যাস্তের ৭২ মিনিট পর ধরা হয়।
আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী আমাদের চূড়ান্ত বক্তব্য হলো,
বাংলাদেশের প্রচলিত ক্যালেন্ডার (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, উম্মুল কুরা) অনুযায়ী ইশার ওয়াক্ত সূর্যাস্তের ৭২ মিনিট পরে হয়।
কিছু স্কলার (বিশেষ করে যারা শাফাক আহমার মত গ্রহণ করেন) তাদের মতে, ইশার সময় ২৫-৪০ মিনিট পরেও হতে পারে।  জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে, সূর্য ১৮° নিচে নামতে ৪০ থেকে ৭২ মিনিট সময় লাগে, যা শাফাক আবিয়াদ ভিত্তিক সময় নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়।

মাহাতাবের চেহারায় আনন্দের ঝিলিক দেখা দিলো তিনি মাওলানা শাফি সাহেবকে বললেন, ইনশাআল্লাহ শিঘ্রই আমাদের পরিবার এবং প্রতিবেশীদের সাথে ইফতার করার সময়ের সঠিকতা নিয়ে আলোচনা করবো। শাফি সাহেব বললেনঃ জি! ভাই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনো ভুল না থাকে।”

তারা গল্পে এতটাই মগ্ন ছিলো যেন শেষই হচ্ছেনা এদিকে মুয়াজ্জিন এসে আসর সালাতের আজান দেয়া শুরু করলো। আজান শেষ হলে মাওলানা শাফি সাহেব দরুদ ও ও দুআ পাঠ করলেন এবং বললেন মাহাতাব আপনি কি জানেন! রাসুল সাঃ কি বলে গেছেন?

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন: “যখন তোমরা মুয়াজ্জিনকে (আজান দিতে) শুনবে, তখন মুয়াজ্জিন যা বলে তার মতোই বলো। এরপর আমার ওপর দরুদ পাঠ করো, কারণ যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাকে দশগুণ রহমত দান করবেন। তারপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ‘ওয়াসীলাহ’ প্রার্থনা করো, কেননা এটি জান্নাতের একটি বিশেষ مقام, যা আল্লাহর কোনো এক বান্দার জন্য নির্ধারিত হবে। আমি আশা করি, আমিই সেই ব্যক্তি। তাই যে ব্যক্তি আমার জন্য ‘ওয়াসীলাহ’ প্রার্থনা করবে, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াযীব হয়ে যায়।”[সহিহ মুসলিম: ৩৮৪]

এরপর মাহাতাব আসরের সালাত আদায় বাসায় চলে এলেন সালাম দিয়ে বাসায় প্রবেশ করলেন। সেলিনা কৌতুহলী দৃষ্টিতে মাহাতাবের নিকট সব কিছু জানতে চাইলেন। মাহাতাব বললেনঃ সিয়াম অবস্থায় এই বিকেল মুহুর্তে  আর কথা বলতে ভালো লাগছেনা, কিন্তু আজ আমি অনেক খুশি, আজ আমি অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি। তুমি ধৈর্য ধারণ কর, রাতে তোমাকে সব কথা বিস্তারিত বলবো। এখন আমাকে বাজারে যেতে হবে। রাতে মাহাতাব এবং সেলিনা উভয়ের মধ্যে অনেক কথা হল। তারা গুগলে সার্চ করেও অনেক তথ্য জানতে পারলো।

অধ্যায় ৪ : আলোর পথে পথচলা
মাহাতাব আকন্দ আজ কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। রোজার মাস চলছিল এবং তিনি জানতেন, সাধারণ মানুষ ইফতার করার সময়টি সঠিকভাবে জানে না। সূর্যাস্তের পরেই তারা খাবার খেয়ে ফেলেন, কিন্তু মাহাতাব জানতেন, কুরআন এবং হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী এই কাজটি করা সঠিক নয়।

আজ সকালে তিনি তার সহকর্মীদের সাথে আলোচনায় বসেছিলেন। তারা সূর্যাস্তের পর ইফতার করার পক্ষে কথা বলছিলেন, কিন্তু মাহাতাব তাদের কাছে একে যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন।
মাহাতাব বললেন, “কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী, রোজা সঠিকভাবে পালন করতে হলে ইফতার করার সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, “أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ” (তোমরা রোজা পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত)। (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭)। এতে পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে যে রোজা পূর্ণ করতে হবে রাতের আগমন পর্যন্ত, সূর্যাস্তের পর না।”

তারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, “তাহলে আপনি কী বলছেন? আমরা তো সূর্যাস্তের পরেই ইফতার করি।”
মাহাতাব সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের জানা উচিৎ যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেমন রাত শেষ হওয়া মাত্রই সাহরী খেতে নিষেধ করেছেন!, তেমনি আবার রাত ঘনিয়ে এলে  ইফতার করতে বলেছেন। প্রতিটি বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময় আছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে যখন আল্লাহ বলেছেন ‘রাত পর্যন্ত,’ তখন আমাদের জানার প্রয়োজন যে, রাতের পূর্ণ আগমন কেমন ও কখন হয়। এজন্য আমাদের সূর্যাস্তের পর কিছুটা সময় অপেক্ষা করা উচিৎ, যেন আমরা আল্লাহর নির্দেষ অনুযায়ী আমাদের সিয়ামকে পূর্ণ করতে পারি।

এ কথাগুলি শুনে, একজন বললেন, “আপনি বলতে চাইছেন, সূর্যাস্তের পরেও আমাদের আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে?”
মাহাতাব হাসলেন, “হ্যাঁ, ভাই! কুরআন এবং হাদিসে সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করতে হবে এইমর্মে কোন দলীল আসেনি।

মাহাতাবের একজন সহকর্মী অনেকটা রেগে গিয়ে বললেন- আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আপনি নতুন মতবাদ নিয়ে এসে আমাদের মধ্যে ফিতনা ছড়াচ্ছেন। আমাদের অত কিছু জানার কি দরকার? আমাদের সকলের জানা আছে যে, সুর্য উঠলেই দিন শুরু হয় এবং সুর্য ডুবলেই রাত শুরু হয়।

মাহাতাব উত্তেজিত না হয়ে শান্তভাবে বললেন, ভাই শুনুন আমাদের সবকিছু মোটাভাবে ব্যাক্ষা করলে হবেনা।  প্রতিটি বিষয় গভীরভাবে ক্ষতিয়ে দেখা উচিৎ। আমাদের অজানা অনেক কিছুই থাকতে পারে। যেমন আপনাকে একটা সহজ প্রশ্ন করি উত্তরটা দিনতো। মাহাতাব প্রশ্ন করলেন “দিক কয়টি?
উত্তেজিত হওয়া সহকর্মীটি উত্তর দিল ” এটা আবার কেমন প্রশ্ন করতেছেন! দিক হল চারটি এটা কে না জানে? 
মাহাতাব বললেন- ভাই আপনি এখনো রেগে আছেন। রাগ কখনো সমাধান নিয়ে আসেনা। প্লিজ শান্ত হোন। এমন সময় সেখানে বসে থাকা আরেক সহকর্মী বললেন, মাহাতাব ভাই দিক হলো ৮টি,  পুর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ,  অগ্নি, বায়ু, ঈষান, নৈঋত।


মাহাতাব বললেন তবুও শেষ হয়নি আরো ২টি দিক আছে “উর্ধ এবং অধঃ” অর্থাত উপরদিক ও নিচের দিক। তাহলে আমরা সাধারণ ভাবে জানতাম দিক চারটি,  এখন দেখুন আমরা ১০ দিকের খোঁজ পেয়ে গেলাম। তার সহকর্মীদয় মাথা নিচু করলেন এবং মাথা নারিয়ে সম্মতি জানালেন।
মাহাতাব মৃদু হেসে বললেন, দিক যেমন চারটির মধ্যে সিমাবদ্ধ নয় ঠিক তেমনি শুধু রাত আর দিন দিয়ে সময় সিমাবদ্ধ নয়, বরং রাত ও দিনের মাঝে আলো আধার মিশ্রিত বেশ কিছু প্রহর রেয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া পবিত্র কুরআনে সব কিছু সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।

যেমন ধরুন, সুর্য যখন উদয় হয় এসময়কে বলা হয় “তুলুইশশামছ” এ শব্দটি পবিত্র কুরআনের সুরা 
তুলুইশ শাম্স।১৯

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَاۖ

এবং তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাগীতি (নিয়মিত) উচ্চারণ কর সূর্যোদয়ের পূর্বে ও তা অস্তমিত হওয়ার পূর্বে। (তহা ২০ঃ১৩০)

إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ ٱلشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِى عَيْنٍ حَمِئَةٍ

যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে অস্বচ্ছ জলাশয়ে ডুবতে দেখল। (কাহাফ ১৮ঃ৮৬)

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ ٱلْغُرُوبِ

আর সূর্যোদয়ের পূর্বে আর সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের মহিমা ও প্রশংসা ঘোষণা কর। (কফ ৫০ঃ৩৯)

২/- বুকরা-৯

وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর। (আহযাব ৩৩ঃ৪২)

فَخَرَجَ عَلَىٰ قَوْمِهِۦ مِنَ ٱلْمِحْرَابِ فَأَوْحَىٰٓ إِلَيْهِمْ أَن سَبِّحُوا۟ بُكْرَةً وَعَشِيًّا

অতঃপর সে তার কুঠরি থেকে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে গেল এবং ইশারায় তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর প্রশংসা-পবিত্রতা বর্ণনা করতে বলল। (মারিয়াম ১৯ঃ১১)

وَلَهُمْ رِزْقُهُمْ فِيهَا بُكْرَةً وَعَشِيًّا

আর সকাল-সন্ধ্যা সেখানে তাদের জন্য থাকবে জীবন ধারণের উপকরণ। (মারিয়াম ১৯ঃ৬২)

وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
আর সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর। (আল ফাতহ্ ৪৮ঃ৯)

وَٱذْكُرِ ٱسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

আর সকাল-সন্ধ্যায় তোমার রব্ব এর নাম স্মরণ কর। (ইনসান ৭৬ঃ২৫)

৩/- দুহা।৭ ইশরাক ১৭।
وَٱلضُّحَىٰ
সকালের উজ্জ্বল আলোর শপথ। (দুহা ৯৩ঃ১)
وَٱلشَّمْسِ وَضُحَىٰهَا

শপথ সূর্যের ও তার (উজ্জ্বল) কিরণের,।(শামস ৯১ঃ১)

وَأَنَّكَ لَا تَظْمَؤُا۟ فِيهَا وَلَا تَضْحَىٰ

সেখানে তুমি তৃষ্ণার্তও হবে না, রোদেও পুড়বে না। (তহা ২০ঃ১১৯)

وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَىٰهَا

তিনি তার রাতকে আঁধারে ঢেকে দিয়েছেন, আর তার দিবালোক প্রকাশ করেছেন।(নাযিয়াত ৭৯ঃ২৯)

إِنَّا سَخَّرْنَا ٱلْجِبَالَ مَعَهُۥ يُسَبِّحْنَ بِٱلْعَشِىِّ وَٱلْإِشْرَاقِ

আমি পর্বতমালাকে কাজে নিয়োজিত করেছিলাম, তারা তার সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত। (সদ ৩৮ঃ১৮)

৪/- নাহার। ১১৩.

ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَٰلَهُم بِٱلَّيْلِ وَٱلنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

যারা নিজেদের মাল রাতে ও দিনে, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ব্যয় করে থাকে, তাদের জন্য সেই দানের সওয়াব তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে এবং তাদের কোন ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হবে না।(বাকারা ২ঃ২৭৪)

تُولِجُ ٱلَّيْلَ فِى ٱلنَّهَارِ وَتُولِجُ ٱلنَّهَارَ فِى ٱلَّيْلِۖ وَتُخْرِجُ ٱلْحَىَّ مِنَ ٱلْمَيِّتِ وَتُخْرِجُ ٱلْمَيِّتَ مِنَ ٱلْحَىِّۖ وَتَرْزُقُ مَن تَشَآءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ

তুমিই রাতকে দিনের ভিতর আর দিনকে রাতের ভিতর ঢুকিয়ে দাও, তুমিই জীবিতকে মৃত হতে বের কর এবং মৃতকে জীবিত হতে বের কর আর যাকে ইচ্ছে বেহিসাব রিয্ক্ব দান কর। (আলে ইমরান ৩ঃ২৭)

هُوَ ٱلَّذِى جَعَلَ لَكُمُ ٱلَّيْلَ لِتَسْكُنُوا۟ فِيهِ وَٱلنَّهَارَ مُبْصِرًاۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَءَايَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَسْمَعُونَ

তিনিই তোমাদের জন্য রাত বানিয়েছেন যেন তোমরা তাতে শান্তি লাভ করতে পার, আর দিন সৃষ্টি করেছেন (সব কিছু) দেখার জন্য। অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে ঐ সম্প্রদায়ের জন্য যারা (মনোযোগ দিয়ে) শোনে। (ইউনুস ১০ঃ৬৭)

وَجَعَلْنَا ٱلَّيْلَ وَٱلنَّهَارَ ءَايَتَيْنِۖ فَمَحَوْنَآ ءَايَةَ ٱلَّيْلِ وَجَعَلْنَآ ءَايَةَ ٱلنَّهَارِ مُبْصِرَةً

আমি রাত আর দিনকে দু’টো নিদর্শন বানিয়েছি। আমি রাতের নিদর্শনটিকে জ্যোতিহীন করেছি, আর দিনের নিদর্শনটিকে করেছি আলোয় উজ্জ্বল। (ইসরা ১৭ঃ১২)

قَالَ رَبِّ إِنِّى دَعَوْتُ قَوْمِى لَيْلًا وَنَهَارًا

সে বলল, ‘হে আমার রব! আমি তো আমার কওমকে রাত-দিন আহবান করেছি। (নুহ ৭১ঃ৫)

৫/- আসর। ১। বিকাল।

وَٱلْعَصْرِ

অপরান্হের শপথ। (আসর ১০৩ঃ১)

৬/- গুরুবিশ শামস্। ১৯

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَاۖ

এবং তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাগীতি (নিয়মিত) উচ্চারণ কর সূর্যোদয়ের পূর্বে ও তা অস্তমিত হওয়ার পূর্বে। (তহা ২০ঃ১৩০)

إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ ٱلشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِى عَيْنٍ حَمِئَةٍ

যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে অস্বচ্ছ জলাশয়ে ডুবতে দেখল। (কাহাফ ১৮ঃ৮৬)

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ ٱلشَّمْسِ وَقَبْلَ ٱلْغُرُوبِ

আর সূর্যোদয়ের পূর্বে আর সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের মহিমা ও প্রশংসা ঘোষণা কর। (কফ ৫০ঃ৩৯)

৭/- আসল ১০ বা ইশা ১৪। সন্ধা।

وَٱذْكُر رَّبَّكَ فِى نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ ٱلْجَهْرِ مِنَ ٱلْقَوْلِ بِٱلْغُدُوِّ وَٱلْءَاصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلْغَٰفِلِينَ

তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়-ভীতি সহকারে অনুচ্চস্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ কর আর উদাসীনদের দলভুক্ত হয়ো না। (আরাফ ৭ঃ২০৫)

وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর। (আহযাব ৩৩ঃ৪২)
وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
আর সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর। (আল ফাতহ্ ৪৮ঃ৯)

وَٱذْكُرِ ٱسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
আর সকাল-সন্ধ্যায় তোমার রব্ব এর নাম স্মরণ কর। (ইনসান ৭৬ঃ২৫)

وَجَآءُوٓ أَبَاهُمْ عِشَآءً يَبْكُونَ

সন্ধায় তারা তাদের পিতার কাছে কাঁদতে কাঁদতে আসল। (ইউসুফ ১২ঃ১৬)

ٱلنَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّاۖ

তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা হয়। (গফির ৪০ঃ৪৬)

৮/- শাফাক।

فَلَآ أُقْسِمُ بِٱلشَّفَقِ – وَٱلَّيْلِ وَمَا وَسَقَ

আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লালিমার, আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার। (ইনশিকাক ৮৪ঃ১৬,১৭)

৯/- লাইল। ৯২
Al-Layl 92:1

وَٱلَّيْلِ إِذَا يَغْشَىٰ
শপথ রাতের যখন তা (আলোকে) ঢেকে দেয়,

وَٱلَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ

রাতের শপথ যখন তা হয় শান্ত-নিঝুম ( দুহা ৯৩ঃ২)
وَٱلَّيْلِ وَمَا وَسَقَ
আর রাতের কসম এবং রাত যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার। (ইনশিকাক ৮৪ঃ১৭)

فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ ٱلَّيْلُ رَءَا كَوْكَبًاۖ قَالَ هَٰذَا رَبِّىۖ

রাতের আঁধার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন সে নক্ষত্র দেখতে পেল, (তখন) বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক। (আনআম ৬ঃ৭৬)

وَجَعَلَ ٱلَّيْلَ سَكَنًا

তিনি রাত সৃষ্টি করেছেন শান্তি ও আরামের জন্য। (আনয়াম ৬ঃ৯৬)

يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَ يَطْلُبُهُ

দিনকে তিনি রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন। (আরাফ ৭ঃ৫৪)

كَأَنَّمَآ أُغْشِيَتْ وُجُوهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ ٱلَّيْلِ مُظْلِمًاۚ
যেন তাদের মুখমন্ডলকে আচ্ছাদিত করে দেয়া হয়েছে গাঢ় অন্ধকার রাত্রির টুকরো দিয়ে। (ইউনুস ১০ঃ২৭)

يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَءَايَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
তিনি দিবসের উপর রাতের আবরণ টেনে দেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শনাবলী রয়েছে। (রাদ ১৩ঃ৩)

وَجَعَلْنَا ٱلَّيْلَ وَٱلنَّهَارَ ءَايَتَيْنِۖ فَمَحَوْنَآ ءَايَةَ ٱلَّيْلِ وَجَعَلْنَآ ءَايَةَ ٱلنَّهَارِ مُبْصِرَةً

আমি রাত আর দিনকে দু’টো নিদর্শন বানিয়েছি। আমি রাতের নিদর্শনটিকে জ্যোতিহীন করেছি, আর দিনের নিদর্শনটিকে করেছি আলোয় উজ্জ্বল। (ইসরা ১৭ঃ১২)

يُكَوِّرُ ٱلَّيْلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلَّيْلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمْسَ وَٱلْقَمَرَۖ

রাত দিনকে ঢেকে নেয়, আর দিন ঢেকে নেয় রাতকে। তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন সুরুজ আর চাঁদকে। (যুমার ৩৯ঃ৫)

وَجَعَلْنَا ٱلَّيْلَ لِبَاسًا

রাতকে করেছি আবরণ,(নাবা ৭৮ঃ১০)
১০/- সুবহুন। ৪৫

وَٱلَّيْلِ إِذْ أَدْبَرَ- وَٱلصُّبْحِ إِذَآ أَسْفَرَ

রাতের কসম যখন তার অবসান হয়, প্রভাতের কসম- যখন তা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, (মুদ্দাসিসর ৭৪ঃ৩৩,৩৪)

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلْفَلَقِ

বল, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের কাছে। (ফালাক্ব ১১৩ঃ১)

وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَن فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَظِلَٰلُهُم بِٱلْغُدُوِّ وَٱلْءَاصَالِ

আসমানে আর যমীনে যা কিছু আছে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর প্রতি সাজদাহয় অবনত হয় আর তাদের ছায়াগুলোও। (রাদ ১৩ঃ১৫)

وَٱلَّيْلِ إِذَا عَسْعَسَ- وَٱلصُّبْحِ إِذَا تَنَفَّسَ

শপথ রাতের যখন তা বিদায় নেয়, আর ঊষার যখন তা নিঃশ্বাস ফেলে অন্ধকারকে বের করে দেয়, (তাকবীর ৮১ঃ১৭,১৮)


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page