• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২২ : আয়াত ১৮

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২১০ Time View
Update : শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬


সুরা হজ্বের ১৮ নং আয়াতের বিস্তারিত

Friends of Quran Foundation


আজ আমরা যে শব্দটি নিয়ে বিভ্রান্তির শিকার—সে শব্দটি হলো “সিজদা”। আমাদের শেখানো হয়েছে, সিজদা মানে কেবল মাটিতে কপাল ঠেকানো। কিন্তু কুরআন কি সত্যিই এটুকুতেই থেমে গেছে? নাকি কুরআনের ভাষায় সিজদা তার চেয়েও গভীর, ব্যাপক ও সিদ্ধান্তমূলক একটি অবস্থান?

কুরআন নিজেই আমাদের প্রথম প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয়। আল্লাহ বলেন—
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ
(সূরা হাজ্জ ২২:১৮)
“তুমি কি দেখ না যে, আকাশসমূহে যা কিছু আছে এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে—সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র, পাহাড়, গাছ, জীবজন্তু এবং মানুষের অনেকেই আল্লাহর কাছে সিজদা করে?”

আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করি—সূর্য কি কপাল ঠেকায়? পাহাড় কি জায়নামাজ বিছায়? গাছ কি রুকু-সিজদা করে? না। তাহলে কুরআন কোন অর্থে বলছে—তারা সবাই সিজদা করে? এখানেই ধরা পড়ে প্রকৃত সত্য: সিজদা মানে শারীরিক ভঙ্গি নয়; সিজদা মানে আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মকে নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া।


সূর্য সিজদা করে—কারণ সে এক সেকেন্ডও নিজের কক্ষপথ লঙ্ঘন করে না। পাহাড় সিজদা করে—কারণ সে আল্লাহর নির্ধারিত ভূমিকা অতিক্রম করে না। গাছ সিজদা করে—কারণ সে আল্লাহর আইন অমান্য করে না। অর্থাৎ সিজদা = submission, compliance, acceptance—মেনে নেওয়া।

এবার মানুষ প্রসঙ্গে আসি। আল্লাহ বলেন—
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ
(সূরা বাকারা ২:৩৪)
“আর যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম—আদমকে সিজদা করো।”

এখানে সিজদা মানে কি আদমকে উপাসনা? না। কুরআন নিজেই প্রমাণ করে—সিজদা এখানে আদমের কর্তৃত্ব, অবস্থান ও আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া। ফেরেশতারা প্রশ্ন করেনি, তর্ক করেনি—মেনে নিয়েছে। কিন্তু ইবলিস কী করল?

قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا
(সূরা ইসরা ১৭:৬১)
সে বলল, “আমি কি তাকে সিজদা করব, যাকে তুমি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছ?”

ইবলিস কপাল ঠেকাতে অস্বীকার করেনি—সে আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। এই অস্বীকৃতির নামই কুরআনের ভাষায় কুফর। অর্থাৎ সিজদা না করা মানে—আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ না করা।

আল্লাহ ইবলিস সম্পর্কে বলেন—
أَبَىٰ وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
(সূরা বাকারা ২:৩৪)
“সে অস্বীকার করল, অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।”

লক্ষ করুন—এখানে কোথাও বলা হয়নি, সে নামাজ পড়েনি। বলা হয়েছে—সে মেনে নেয়নি। সুতরাং কুরআনের সংজ্ঞায় সিজদার বিপরীত হলো অহংকার ও অস্বীকৃতি।

আরেকটি আয়াত শুনুন—
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
(সূরা নূর ২৪:৫১)
“মুমিনদের কথা তো এটাই—যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ডাকা হয়, তখন তারা বলে: আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।”

এটাই প্রকৃত সিজদা। সামি‘না ও আতা‘না—শুনলাম এবং মেনে নিলাম। এখানে কোনো শারীরিক ভঙ্গির আলোচনা নেই, আছে সিদ্ধান্তের, আছে মানসিক ও নৈতিক আত্মসমর্পণের ঘোষণা।

এ কারণেই কুরআন বলে—
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
(সূরা নিসা ৪:৬৫)
“তোমার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তারা তোমাকে বিচারক মানে, তারপর তোমার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের মনে কোনো সংকোচ না থাকে এবং তারা পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে।”

এই “ইউসাল্লিমূ তাসলীমা”—এই সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণই হলো সিজদার বাস্তব রূপ। কপাল মাটিতে রাখলেই যদি সিজদা হতো, তাহলে ইবলিসও তো রাখতে পারত।

আজ আমরা এমন এক ধর্ম দাঁড় করিয়েছি, যেখানে কপাল ভিজে—কিন্তু সিদ্ধান্ত আল্লাহর না। নামাজ আছে—কিন্তু বিচার মানি অন্য উৎসের। এটাই কুরআনের ভাষায় সবচেয়ে বড় বিপদ—শারীরিক ইবাদত আছে, কিন্তু সিজদা নেই।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page