• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০১:৫০ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৯ : আয়াত ৮৪

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৭০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬


কুরআনের আলোকে জানাজার সালাত

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ


মৃত্যু মানবজীবনের এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। জন্মের মতোই মৃত্যু একটি নিশ্চিত সত্য, এবং কুরআন বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। “كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ” — “প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে” (৩:১৮৫)। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যখন একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করে, তখন জীবিতদের করণীয় কী? বিশেষ করে যারা কুরআনকেন্দ্রিক চিন্তায় বিশ্বাসী, তাদের জন্য জানাজার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রচলিত সমাজে জানাজার নামাজ একটি নির্দিষ্ট রিচুয়াল আকারে পালিত হয়—চার তাকবীর, নির্দিষ্ট দো‘আ, কোনো রুকু-সিজদা নেই, ইমাম সামনে দাঁড়ান, সবাই সারিবদ্ধভাবে অংশ নেয়। কিন্তু যখন আমরা কেবল কুরআনের ভেতর উত্তর খুঁজতে চাই, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: কুরআনে কি এই জানাজার নামাজ আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের প্রথমে “সালাত” শব্দটির কুরআনিক অর্থ বুঝতে হবে। কারণ জানাজার সাথে যে শব্দটি যুক্ত, তা হলো “সালাত”। আমরা সাধারণত সালাতকে রাকাতভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট রিচুয়াল হিসেবে বুঝি। কিন্তু কুরআন কি সালাতকে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করেছে? কুরআনে সালাত শব্দটি বহুবার এসেছে, কিন্তু এক জায়গাতেও সালাতের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো—কত রাকাত, কোন সূরা, কয় তাকবীর, কীভাবে শুরু, কীভাবে শেষ—এসব বিশদভাবে দেওয়া হয়নি। কুরআন আমাদের দাঁড়াতে বলে, রুকু করতে বলে, সিজদা করতে বলে, আল্লাহকে স্মরণ করতে বলে, কুরআন তিলাওয়াত করতে বলে, নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলে; কিন্তু আজ আমরা যে সুসংহত কাঠামোবদ্ধ রিচুয়াল জানি, তা কুরআনের আয়াতগুলোকে একত্র করে তৈরি করা একটি অনুশীলিত রূপ, সরাসরি আয়াতের ভাষায় নির্ধারিত কোনো বিস্তারিত বিধান নয়।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কুরআনে সালাত শব্দটি সবসময় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। সূরা আহযাব ৩৩:৫৬-এ বলা হয়েছে, “إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ” — “নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর উপর সালাত করেন।” এখানে কি আল্লাহ রাকাত পড়ছেন? নিশ্চয়ই না। এখানে সালাত অর্থ আশীর্বাদ, সমর্থন, মর্যাদা প্রদান। আবার সূরা তাওবা ৯:১০৩-এ নবীকে বলা হয়েছে, “وَصَلِّ عَلَيْهِمْ ۖ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ” — “তুমি তাদের উপর সালাত করো; তোমার সালাত তাদের জন্য প্রশান্তি।” এখানে স্পষ্ট যে এটি রিচুয়াল নামাজ নয়; বরং দো‘আ, আধ্যাত্মিক সমর্থন, কল্যাণকামনা। সুতরাং সালাত শব্দটি কুরআনে একটি বহুমাত্রিক শব্দ—যার মধ্যে দো‘আ, সংযোগ, আশীর্বাদ, আনুগত্য এবং রিচুয়ালিক উপাসনার উপাদান রয়েছে।

এখন আসি জানাজার মূল আয়াতে। সূরা আত-তাওবা ৯:৮৪-এ বলা হয়েছে: “وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰ أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَىٰ قَبْرِهِ ۖ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ” — “তাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তুমি কখনো তার উপর সালাত পড়বে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না; কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে।” এখানে কয়েকটি গভীর দিক রয়েছে। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির উপর সালাত পড়ার বিষয়টি স্বীকৃত একটি কাজ ছিল, নইলে তা নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন উঠত না। দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞাটি মুনাফিক বা কুফরি অবস্থায় মৃতদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, এই নিষেধাজ্ঞা থেকে যৌক্তিকভাবে বোঝা যায় যে মুমিনদের ক্ষেত্রে সালাত বৈধ ছিল। তৃতীয়ত, এখানে “কবরের পাশে দাঁড়াবে না” বলা হয়েছে—যা একটি সামাজিক বা আনুষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট নির্দেশ করে।

কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন: এই সালাত কি রিচুয়ালিক নামাজ, নাকি দো‘আ? কুরআনের সামগ্রিক ব্যবহার বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, সালাত শব্দটি দো‘আ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। বিশেষত যখন কারো উপর সালাত করা হয় (“عَلَى”), তখন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আশীর্বাদ বা দো‘ার অর্থ বহন করে। নবীর উপর আল্লাহর সালাত, মুমিনদের উপর নবীর সালাত—সব ক্ষেত্রেই এটি দো‘আমূলক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং ৯:৮৪ আয়াতে মৃত ব্যক্তির উপর সালাত পড়া বলতে দো‘আ করা, কল্যাণ কামনা করা—এটাই কুরআনিক ব্যবহারের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মৃত ব্যক্তির জন্য দো‘আর বিষয়ে কুরআন অত্যন্ত স্পষ্ট। সূরা হাশর ৫৯:১০-এ বলা হয়েছে: “رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ” — “হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে এমন ভাইদের ক্ষমা করুন।” এখানে জীবিতদেরকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তারা যেন পূর্বে ঈমান এনে চলে যাওয়া ভাইদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। এটি মৃত মুমিনদের জন্য দো‘আর সরাসরি কুরআনিক ভিত্তি। আবার সূরা ইবরাহীম ১৪:৪১-এ ইবরাহীম (আ.) বলেন: “رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ” — “হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন।” এখানেও মৃতদের অন্তর্ভুক্ত করে দো‘আর শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সূরা তাওবা ৯:১১৩-এ বলা হয়েছে যে নবী ও মুমিনদের জন্য শোভন নয় যে তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী। অর্থাৎ কুরআন মৃতদের ব্যাপারে একটি বিশ্বাসভিত্তিক নীতি নির্ধারণ করেছে: মুমিনদের জন্য দো‘আ বৈধ, কুফরি অবস্থায় মৃতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা বৈধ নয়।

এখন যদি আমরা সব আয়াত একত্রে দেখি, তাহলে একটি কুরআনিক কাঠামো স্পষ্ট হয়। কুরআন মৃত ব্যক্তির জন্য রাকাতসংখ্যা নির্ধারণ করেনি, কোনো নির্দিষ্ট তাকবীর বা সূরা নির্ধারণ করেনি, কিন্তু দো‘আ করার শিক্ষা দিয়েছে। কুরআন দাফনকে মানবিক মর্যাদার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে—“ثُمَّ أَمَاتَهُ فَأَقْبَرَهُ” (৮০:২১)। অর্থাৎ মৃত্যু, দাফন, দো‘আ—এগুলো কুরআনিক বাস্তবতা। কিন্তু সুনির্দিষ্ট রিচুয়ালিক কাঠামো কুরআনের পাঠ্যভিত্তিক নির্দেশ নয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় বুঝতে হবে। কুরআন নিজেকে “তিবইয়ানান লিকুল্লি শাই” বললেও, এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি সামাজিক অনুশীলনের মাইক্রো-ডিটেইল কুরআনে লেখা থাকবে। বরং কুরআন মৌলিক নীতি দেয়—তাওহিদ, তাকওয়া, ন্যায়, দো‘আ, মানবিক মর্যাদা। সমাজ সেই নীতির আলোকে কাঠামো নির্মাণ করে। জানাজার ক্ষেত্রেও কুরআন নীতি দিয়েছে: মৃত মুমিনের জন্য দো‘আ করো, কুফরি অবস্থায় মৃতের জন্য ক্ষমা চেয়ো না, সম্মানের সাথে দাফন করো। কিন্তু চার তাকবীর, নির্দিষ্ট দো‘আ, সারিবদ্ধ দাঁড়ানো—এসব কুরআনের সরাসরি ভাষায় নির্ধারিত নয়।

অতএব প্রশ্নটি “জানাজার নামাজ আছে কি নেই”—এভাবে দ্বৈতভাবে দেখা সঠিক নয়। কুরআনে মৃত ব্যক্তির উপর সালাতের উল্লেখ আছে, যা দো‘আমূলক অর্থ বহন করে। কিন্তু রিচুয়ালিক কাঠামো কুরআনের নির্ধারিত পাঠ্য নয়। সুতরাং কুরআনিক দৃষ্টিতে জানাজার মূল হলো দো‘আ, আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ, মৃতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং মানবিক সম্মানের সাথে দাফন।


কুরআনের ভেতরে শব্দ ব্যবহারের ধারা লক্ষ্য করলে একটি সুস্পষ্ট নীতি পাওয়া যায়—যখন “সালাত” কারও উপর করা হয় (“عَلَى”), তখন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দো‘আ, সমর্থন, কল্যাণ কামনা বা আধ্যাত্মিক সংযোগ বোঝায়। আল্লাহ ও ফেরেশতারা নবীর উপর সালাত করেন—এটি কোনো রিচুয়াল নয়; এটি মর্যাদা ও আশীর্বাদ। নবী মুমিনদের উপর সালাত করেন—এটি তাদের জন্য প্রশান্তি ও দো‘আ। এই ব্যবহারগত ধারাবাহিকতা বিবেচনায় ৯:৮৪ আয়াতেও “সালাত”কে দো‘আমূলক অর্থে বোঝা কুরআনিক প্রেক্ষাপটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আয়াতটি মূলত একটি নিষেধাজ্ঞা—যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে, তাদের জন্য কোনো আধ্যাত্মিক সমর্থন বা ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। এটি রিচুয়াল কাঠামোর চেয়ে বিশ্বাসভিত্তিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে।

এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। কুরআন কখনো কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট রাকাত বা নির্দিষ্ট পদ্ধতির কথা বলেনি। অথচ জীবিতদের সালাতের ক্ষেত্রে কিয়াম, রুকু, সিজদা, কুরআন তিলাওয়াত, নির্দিষ্ট সময়—এসবের ইঙ্গিত আছে। যদি জানাজার সালাত একটি স্বতন্ত্র রিচুয়াল হতো, তবে অন্তত তার মৌলিক উপাদানগুলোর কোনো না কোনো ইঙ্গিত কুরআনে থাকত। কিন্তু আমরা তা পাই না। বরং আমরা পাই মৃতদের জন্য দো‘আ করার সাধারণ নির্দেশ, ক্ষমা প্রার্থনার শিক্ষা এবং কুফরি অবস্থায় মৃতদের জন্য দো‘আ নিষিদ্ধের নীতি। এর মানে জানাজার মূল আত্মা কুরআনের দৃষ্টিতে একটি দো‘ামূলক ও নৈতিক অবস্থান, আনুষ্ঠানিক রিচুয়াল কাঠামো নয়।

কুরআনের সামগ্রিক পদ্ধতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি মানুষের জীবনের মৌলিক নীতিগুলো নির্ধারণ করে—তাওহিদ, ন্যায়, তাকওয়া, দয়া, জবাবদিহিতা। কিন্তু সামাজিক বা আনুষ্ঠানিক রূপগুলোকে কঠোরভাবে নির্ধারণ করে না, যদি না সেগুলো ঈমান ও আকীদার মৌলিক অংশ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন বিয়ের কথা বলে, তালাকের কথা বলে, উত্তরাধিকার নির্ধারণ করে; কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠান কেমন হবে, কবরের কাঠামো কেমন হবে, শোক প্রকাশের ধরন কেমন হবে—এসব নির্দিষ্ট করে দেয় না। জানাজার ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর। কুরআন বলে দাফন করা মানবিক মর্যাদা—“ثُمَّ أَمَاتَهُ فَأَقْبَرَهُ” (৮০:২১)। কুরআন শেখায় মৃত মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে—“رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ” (৫৯:১০)। কিন্তু এটি বলে না, চার তাকবীর হবে, রুকু থাকবে না, নির্দিষ্ট সূরা পড়তে হবে।

এখানে অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন: যদি কুরআনে রিচুয়াল নির্দিষ্ট না থাকে, তাহলে কি যেকোনো পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য? এর উত্তর কুরআনিক নীতির ভেতরেই নিহিত। কুরআন কখনো বিশৃঙ্খলা চায় না; বরং শৃঙ্খলা, মর্যাদা ও আল্লাহকেন্দ্রিকতা চায়। সুতরাং জানাজার ক্ষেত্রে কুরআনিকভাবে যা অপরিহার্য তা হলো—মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, জীবিতদের নিজেদের জবাবদিহিতা স্মরণ করা, এবং দাফনকে সম্মানের সাথে সম্পন্ন করা। এর বাইরে যে কাঠামোই সমাজ গ্রহণ করুক, তা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন তা কুরআনের মূল নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কুরআন মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে আবেগ নয়, বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত দেয়। ৯:৮৪ এবং ৯:১১৩ আয়াতগুলো দেখায় যে সম্পর্ক, রক্তের বন্ধন বা সামাজিক চাপ নয়; বরং ঈমানের অবস্থানই নির্ধারণ করবে দো‘আ করা যাবে কি না। এটি জানাজার আলোচনাকে একটি গভীর তাওহিদী মাত্রা দেয়। জানাজা কেবল একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি বিশ্বাসঘোষণা। যখন আমরা মৃত মুমিনের জন্য দো‘আ করি, তখন আমরা ঘোষণা করি যে সে ঈমানের ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত। আর যখন কুরআন নিষেধ করে কুফরি অবস্থায় মৃতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে, তখন সেটিও তাওহিদের সুরক্ষা।

এখন যদি আমরা বাস্তব কুরআনিক পদ্ধতির কথা বলি, তবে সেটি কোনো জটিল রিচুয়াল নয়। বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক সমাবেশ হতে পারে, যেখানে মানুষ দাঁড়িয়ে বা বসে আল্লাহর প্রশংসা করবে, মৃত্যুর বাস্তবতা স্মরণ করবে, মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা চাইবে এবং নিজেদের জন্য হেদায়েত কামনা করবে। এখানে রুকু বা সিজদা থাকা অপরিহার্য নয়, কারণ মৃতের উপর সালাতের আয়াতে সেগুলোর উল্লেখ নেই। আবার এগুলো নিষিদ্ধও নয়—যদি কেউ সাধারণ সালাতের মতো দাঁড়িয়ে দো‘া করতে চায়। মূল বিষয় হলো উদ্দেশ্য: এটি কোনো প্রদর্শনমূলক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আল্লাহর সামনে বিনয়ী প্রার্থনা।

এখানে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। একদিকে বলা যাবে না যে জানাজার প্রচলিত রিচুয়াল সম্পূর্ণ অকার্যকর, কারণ কুরআন মৃতের উপর সালাতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি। অন্যদিকে এটিও বলা যাবে না যে চার তাকবীর, নির্দিষ্ট কাঠামো—এসব কুরআনের বাধ্যতামূলক নির্দেশ। কুরআনের আলোকে জানাজার মূল আত্মা দো‘আ ও নৈতিক অবস্থান। কাঠামো হতে পারে, কিন্তু তা নীতির অধীন; নীতি কাঠামোর অধীন নয়।

সবশেষে বলা যায়, কুরআনিক দৃষ্টিতে জানাজা হলো জীবিতদের জন্যও একটি শিক্ষা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে জীবন সাময়িক, মৃত্যু নিশ্চিত, এবং প্রত্যেককে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। মৃত ব্যক্তির জন্য দো‘আ করতে গিয়ে মানুষ নিজের জন্যও দো‘আ করে। এটি একটি সমষ্টিগত আত্মসমালোচনা, একটি তাওহিদী স্মরণ, একটি নৈতিক ঘোষণা। কুরআনের আলোকে জানাজার মূল অর্থ এখানেই—আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করা, এবং ঈমানের ভ্রাতৃত্বকে স্মরণ করা।

এই আলোচনার পর আমরা দেখতে পাই যে প্রশ্নের সরল উত্তর নেই—“আছে” বা “নেই”—এভাবে নয়। বরং কুরআন জানাজার মৌলিক নীতি দিয়েছে: মৃত মুমিনের জন্য সালাত তথা দো‘আ, কুফরি অবস্থায় মৃতের জন্য ক্ষমা নিষিদ্ধ, এবং দাফনের মর্যাদা। রিচুয়াল কাঠামো কুরআনের নির্ধারিত নয়; এটি নীতির আলোকে গঠিত সামাজিক রূপ। তাই কুরআনিকভাবে জানাজা মানে দো‘আ, স্মরণ, তাওহিদ এবং মানবিক সম্মান—এর বেশি কিছু নয়, এর কমও নয়।

এভাবেই জানাজার প্রশ্ন কুরআনের আলোকে একটি সুসংহত রূপ পায়—যেখানে রিচুয়ালের চেয়ে নীতি বড়, কাঠামোর চেয়ে উদ্দেশ্য বড়, আর সামাজিক অভ্যাসের চেয়ে তাওহিদ বড়।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page