তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation
সূরা আলে ইমরান : আয়াত ২৬
বলুন, “হে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেন। আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। সমস্ত কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান।”
সূরা আলে ইমরান : আয়াত ২৭
“আপনি রাতকে দিনে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতে প্রবেশ করান। আপনি মৃত থেকে জীবিত বের করেন
এবং জীবিত থেকে মৃত বের করেন। আর আপনি যাকে ইচ্ছা করেন অগণিতভাবে রিজিক দান করেন।”
সূরা আলে ইমরানের এই দুইটি আয়াত কুরআনের এমন একটি কেন্দ্রীয় ঘোষণা, যা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, ক্ষমতার প্রকৃতি, সম্মান-অপমানের মানদণ্ড, রিজিকের উৎস এবং ইতিহাস ও বাস্তবতার অন্তর্নিহিত পরিচালনাকে একত্রে উন্মোচন করে। এই আয়াতদ্বয় শুধু আকীদার আয়াত নয়, বরং ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য একটি মৌলিক দর্শন।
এই আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ রাসূলকে নির্দেশ দিচ্ছেন—“বলুন”। অর্থাৎ এটি কোনো ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়; বরং মানবজাতির সামনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি চূড়ান্ত ঘোষণা। এখানে যে শব্দটি ব্যবহার হয়েছে—“মালিকুল মুলক” (সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী)—তা মানুষের তৈরি রাজা, শাসক, রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করে। কুরআনের দৃষ্টিতে ক্ষমতার উৎস কোনো জনগোষ্ঠী, কোনো ভোটব্যবস্থা, কোনো বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র বা সামরিক শক্তি নয়; বরং ক্ষমতার একমাত্র মালিক আল্লাহ নিজেই।
“আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেন”—এই বাক্যটি ইতিহাসের একটি চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে। কুরআনের দৃষ্টিতে ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির যোগ্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, আবার ক্ষমতা হারানো কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায়ও নয়। বরং ক্ষমতা একটি পরীক্ষা।
কুরআন অন্যত্র বলে—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন তোমাদের একে অপরের মাধ্যমে।” (সূরা মুহাম্মাদ : আয়াত ৪)
ক্ষমতা পাওয়া যেমন পরীক্ষা, ক্ষমতা হারানোও তেমনি পরীক্ষা। ফেরাউন ক্ষমতা পেয়েছিল, কিন্তু সে তা অহংকার ও জুলুমের জন্য ব্যবহার করেছিল। বিপরীতে দাউদ ও সুলাইমান (আ.) ক্ষমতা পেয়েছিলেন, কিন্তু তারা তা ন্যায়বিচার, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করেছিলেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কুরআনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়—ক্ষমতা নিজে কোনো সম্মানের নিশ্চয়তা নয়; বরং ক্ষমতার ব্যবহারই সম্মান বা লাঞ্ছনার কারণ।
“আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন”—এই অংশটি মানুষের প্রচলিত মানসিকতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। মানুষ সাধারণত সম্মানকে সম্পদ, পদ, সামাজিক মর্যাদা বা জনপ্রিয়তার সাথে যুক্ত করে। কিন্তু কুরআন এই ধারণাকে ভেঙে দিয়ে ঘোষণা করে—সম্মানের একমাত্র উৎস আল্লাহ।
কুরআন অন্য আয়াতে বলে—
“যে কেউ সম্মান চায়, তবে জেনে রাখুক—সমস্ত সম্মান আল্লাহরই।” (সূরা ফাতির : আয়াত ১০)
এখানে “লাঞ্ছিত করা” বলতে শুধু বাহ্যিক অপমান নয়, বরং অন্তরের শূন্যতা, নৈতিক পতন, দিকভ্রান্তি এবং আখিরাতের ব্যর্থতাও অন্তর্ভুক্ত। অনেক সময় মানুষ দুনিয়াতে সম্মানিত মনে হলেও আখিরাতে সে হবে চরম লাঞ্ছিত। আবার অনেক সময় দুনিয়াতে অবহেলিত ব্যক্তি আখিরাতে হবে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
“সমস্ত কল্যাণ আপনারই হাতে”—এই ঘোষণা মানুষের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। মানুষ চেষ্টা করবে, পরিকল্পনা করবে, শ্রম দেবে—কিন্তু ফলাফল নির্ধারণ করবে আল্লাহ।
কুরআন বলে—
“তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।” (সূরা তাকবীর : আয়াত ২৯)
এখানে মানুষের দায়িত্ব বাতিল করা হয়নি; বরং মানুষের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। মানুষ কারণ অবলম্বন করবে, কিন্তু ফলাফলের মালিক সে নয়।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন—“আপনি রাতকে দিনে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতে প্রবেশ করান।” এটি শুধু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সত্য নয়; বরং একটি গভীর দার্শনিক ইঙ্গিত। যেমন দিন ও রাত স্থায়ী নয়, তেমনি কোনো জাতির উত্থান-পতন, কোনো ব্যক্তির সুখ-দুঃখ, কোনো সভ্যতার আধিপত্যও স্থায়ী নয়।
কুরআন অন্যত্র বলে—
“এই দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে পালাবদল করি।” (সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১৪০)
অর্থাৎ ইতিহাস একটি স্থির রেখা নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মে ঘুরে ফিরে চলে।
“আপনি মৃত থেকে জীবিত বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃত বের করেন”—এই বাক্যটি সৃষ্টির রহস্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মৃত মাটি থেকে জীবন্ত গাছ, শুক্র থেকে পূর্ণ মানুষ, আবার জীবিত মানুষ থেকে মৃত দেহ—সবই আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন।
কুরআন বলে—
“তিনি জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন।” (সূরা মুলক : আয়াত ২)
এখানে জীবন কোনো দুর্ঘটনা নয়, মৃত্যু কোনো ব্যর্থতা নয়—উভয়ই উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি।
“আর আপনি যাকে ইচ্ছা করেন অগণিতভাবে রিজিক দান করেন”—এই অংশটি মানুষের অর্থনৈতিক ভয় ও লোভের মূলকে আঘাত করে। মানুষ মনে করে রিজিক তার দক্ষতা, ডিগ্রি বা পুঁজি নির্ভর। কিন্তু কুরআন বলে—রিজিকের মূল উৎস আল্লাহ।
কুরআন অন্যত্র বলে—
“পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিক আল্লাহর দায়িত্ব নয়।” (সূরা হুদ : আয়াত ৬)
এখানে “অগণিতভাবে” শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আল্লাহর দান কোনো হিসাবের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।
এই আয়াতদ্বয়ের সাথে কুরআনের বহু আয়াত সরাসরি সম্পর্কযুক্ত—
আজকের বিশ্বব্যবস্থা ক্ষমতাকে রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত করেছে। মানুষ মনে করছে—যার হাতে সামরিক শক্তি, মিডিয়া বা অর্থ আছে, ক্ষমতা তারই। এই আয়াত সেই ধারণাকে সরাসরি বাতিল করে দেয়।
মুসলিম সমাজ যখন ক্ষমতা হারায়, তখন হতাশ হয়ে পড়ে; আবার ক্ষমতা পেলে অহংকারে ডুবে যায়। এই আয়াত আমাদের শেখায়—ক্ষমতা পাওয়া বা না পাওয়া উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর সামনে জবাবদিহি রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে এই আয়াত শেখায়—
সামাজিকভাবে এই আয়াত শেখায়—
সূরা আলে ইমরানের ২৬–২৭ নম্বর আয়াত আমাদেরকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বদর্শন দেয়—যেখানে ক্ষমতা, সম্মান, সময়, জীবন, মৃত্যু ও রিজিক—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু আল্লাহ। এই আয়াত মানুষকে অহংকার থেকে নামিয়ে এনে দায়িত্বশীল বানায়, হতাশা থেকে তুলে এনে আশাবাদী করে এবং দুনিয়ার মোহ ভেঙে আখিরাতমুখী করে।
যে ব্যক্তি এই আয়াত বুঝে নেয়, সে ক্ষমতা পেলেও বিনয়ী হবে, ক্ষমতা হারালেও ভেঙে পড়বে না। কারণ সে জানে—মালিক একজনই, আর তিনি কখনো অন্যায় করেন না।
