• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২২ : আয়াত ৩৯

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৪১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ২২ : আয়াত ৩৯

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation

আয়াত
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ

অনুবাদ
যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে (প্রতিরোধের) অনুমতি দেওয়া হলো—কারণ তাদের প্রতি জুলুম করা হয়েছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।


এই আয়াতটি কুরআনের একটি অত্যন্ত মৌলিক ও ঐতিহাসিক আয়াত। এটি সেই আয়াত, যেখানে প্রথমবারের মতো নির্যাতিত মুমিনদেরকে সশস্ত্র প্রতিরোধের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই অনুমতি কোনো আবেগী আহ্বান নয়, কোনো প্রতিশোধের ঘোষণা নয়, কোনো ধর্মীয় আগ্রাসনের লাইসেন্সও নয়। বরং এটি একটি গভীর ন্যায়নৈতিক ঘোষণা—যার ভিত্তি হলো জুলুমের অবসান এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষা।

আয়াতটির ভাষা খুব সংযত, কিন্তু অর্থ অত্যন্ত শক্তিশালী। এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কুরআন বলেনি “যারা যুদ্ধ করতে চায়”—বরং বলেছে, “যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে”। অর্থাৎ উদ্যোগ তাদের পক্ষ থেকে নয়; বরং তারা আগ্রাসনের শিকার। এই এক শব্দেই কুরআন যুদ্ধের নৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছে। কুরআনের দৃষ্টিতে যুদ্ধ কখনোই প্রথম পছন্দ নয়; এটি চাপিয়ে দেওয়া পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া।

এরপর আল্লাহ বলেন, “কারণ তাদের প্রতি জুলুম করা হয়েছে।” এখানে যুদ্ধের একমাত্র বৈধ কারণ হিসেবে জুলুমকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো ভূখণ্ড দখল, কোনো রাজনৈতিক আধিপত্য, কোনো জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা কোনো ধর্মীয় বলপ্রয়োগ—এর কোনোটিই এখানে কারণ নয়। কেবল জুলুম। অর্থাৎ মানুষের উপর নির্যাতন, অধিকার হরণ, বিশ্বাসের কারণে নিপীড়ন—এসবই সেই জুলুম, যা প্রতিরোধকে ন্যায়সঙ্গত করে তোলে।

এই আয়াতটি নাজিল হওয়ার পেছনের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মক্কায় দীর্ঘ তেরো বছর ধরে মুমিনরা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। তাদের মারধর করা হয়েছে, সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছে, সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, এমনকি হত্যা করা হয়েছে। অথচ এই পুরো সময়জুড়ে কুরআনের নির্দেশ ছিল ধৈর্য ধারণ করা, সহ্য করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। তখন প্রতিরোধের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এটা প্রমাণ করে, কুরআনের দৃষ্টিতে যুদ্ধ কোনো তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়। বরং এটি সর্বশেষ উপায়, যখন অন্য সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। যখন নির্যাতন একটি কাঠামোগত রূপ নেয় এবং মানুষকে তার অস্তিত্ব ও বিশ্বাস রক্ষার জন্য দাঁড়াতেই হয়।

এই আয়াতে “অনুমতি দেওয়া হলো” কথাটিও গভীর অর্থ বহন করে। এটি কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, কোনো ফরমান নয়—বরং অনুমতি। অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিরোধ করা বৈধ হলো, কিন্তু প্রতিশোধপরায়ণতা বা সহিংসতা নিজেই লক্ষ্য হয়ে উঠলো না। কুরআন এখানেও সংযমের সীমা বজায় রেখেছে।

এরপর আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।” এটি শুধু একটি আশ্বাস নয়; এটি একটি আকিদাগত ঘোষণা। অর্থাৎ সাহায্যের উৎস অস্ত্র নয়, সংখ্যা নয়, কৌশল নয়—সাহায্যের প্রকৃত উৎস আল্লাহ। প্রতিরোধ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল থেকে পরিচালিত হয়।

এই আয়াতটি বুঝলে একটি বড় ভুল ধারণা ভেঙে যায়—যে ইসলাম যুদ্ধপ্রিয়। বাস্তবে কুরআন যুদ্ধকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু কখনো কখনো অপরিহার্য ন্যায়নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরে। যুদ্ধ এখানে লক্ষ্য নয়; লক্ষ্য হলো জুলুমের অবসান।

এই আয়াতের সাথে পরবর্তী আয়াতগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পরের আয়াতে (২২:৪০) আল্লাহ ব্যাখ্যা করেন, এই প্রতিরোধ না থাকলে কী ঘটত—ধ্বংস হয়ে যেত উপাসনালয়গুলো, যেখানে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়। অর্থাৎ ২২:৩৯ আয়াতটি কেবল আত্মরক্ষার অনুমতি নয়, বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও তাওহিদের কেন্দ্রগুলো রক্ষার ভিত্তি।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়—কুরআনের যুদ্ধনীতি প্রতিরক্ষামূলক হলেও তা নিষ্ক্রিয় নয়। জুলুম চলতে থাকলে কেবল সহ্য করাকে কখনোই ন্যায় বলা হয়নি। বরং একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই আল্লাহর নির্দেশ।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, নীরবতা সবসময় তাকওয়া নয়। কখনো কখনো নীরবতা নিজেই অন্যায়ের অংশ হয়ে যায়। তাই কুরআন এমন এক ভারসাম্য শিক্ষা দেয়—ধৈর্য ও প্রতিরোধের মধ্যে, ক্ষমা ও ন্যায়ের মধ্যে।

আজকের প্রেক্ষাপটে এই আয়াতের অপব্যবহারও হয়, আবার অবমূল্যায়নও হয়। কেউ এটাকে আগ্রাসনের বৈধতা বানাতে চায়, আবার কেউ এটাকে ইতিহাসের পাতায় বন্দি করে রাখতে চায়। অথচ কুরআন এখানে একটি সার্বজনীন নীতি দিয়েছে—যেখানে জুলুম, সেখানে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো বৈধ; কিন্তু সেই দাঁড়ানো হতে হবে সীমার ভেতরে, নৈতিকতার ভিত্তিতে, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে।

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহ নির্যাতিতদের পাশে আছেন, কিন্তু সেই সাহায্য আসে তখনই, যখন মানুষ ন্যায়ের অবস্থানে দাঁড়ায়। আল্লাহর সাহায্য কোনো জাতিগত পরিচয়ের সাথে নয়; এটি যুক্ত ন্যায়ের সাথে।


সম্পর্কিত কুরআনিক আয়াতসমূহ

২:১৯০ — যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না
৪:৭৫ — নির্যাতিত নারী, পুরুষ ও শিশুদের জন্য সংগ্রাম
২:২৫১ — আল্লাহ মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত করেন
২২:৪০ — উপাসনালয় রক্ষার জন্য প্রতিরোধ
৪১:৩০ — যারা বলে আমাদের রব আল্লাহ, তারপর অবিচল থাকে


বর্তমান প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

সূরা ২২ : আয়াত ৩৯ আমাদের শেখায়—ইসলাম কোনো নির্যাতিত দর্শন নয়, আবার আগ্রাসী মতবাদও নয়। এটি ন্যায়ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা। যেখানে জুলুম কাঠামোগত হয়ে ওঠে, সেখানে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো ইবাদতে পরিণত হয়।

এই আয়াত আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রযোজ্য। জুলুম শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না; হয় চিন্তার ওপর, হয় বিবেকের ওপর, হয় সত্য বলার অধিকারের ওপর। এই আয়াত আমাদের সাহস দেয়—ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে ভয় পেও না, কারণ আল্লাহ সাহায্য করতে সক্ষম।

সূরা আল-হজ্জের এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শান্তি আসে ন্যায় থেকে, আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কখনো কখনো প্রতিরোধ অপরিহার্য।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page