• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২২ : আয়াত ৪০

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১০৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ২২ : আয়াত ৪০

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation

আয়াত
ٱلَّذِينَ أُخْرِجُوا۟ مِن دِيَـٰرِهِم بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّآ أَن يَقُولُوا۟ رَبُّنَا ٱللَّهُ ۗ وَلَوْلَا دَفْعُ ٱللَّهِ ٱلنَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَٰمِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَٰتٌ وَمَسَـٰجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا ٱسْمُ ٱللَّهِ كَثِيرًا ۗ وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥٓ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِىٌّ عَزِيزٌ

অনুবাদ
যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বের করে দেওয়া হয়েছে—এ ছাড়া আর কোনো অপরাধ ছিল না যে তারা বলত: “আমাদের রব আল্লাহ।” আর যদি আল্লাহ মানুষের এক দলকে আরেক দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যেত সন্ন্যাসীদের উপাসনালয়, গির্জা, ইবাদতখানা ও মসজিদ—যেগুলোতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে আল্লাহকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত শক্তিশালী, পরাক্রমশালী।
(সূরা আল-হজ্জ, ২২:৪০)


এই আয়াতটি কুরআনের এমন একটি আয়াত, যেখানে একসাথে ইতিহাস, আকিদা, সমাজনীতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আল্লাহর সুন্নাহ—সবকিছু গভীরভাবে সংযুক্ত হয়েছে। এটি কেবল যুদ্ধ বা প্রতিরোধের অনুমতির আয়াত নয়; বরং এটি ব্যাখ্যা করে কেন আল্লাহ পৃথিবীতে সংঘর্ষের অনুমতি দেন এবং কেন ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা একটি কুরআনিক দায়িত্ব।

আয়াতটির প্রথম অংশ আমাদের নিয়ে যায় নির্যাতিত মানুষের বাস্তবতায়। “যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বের করে দেওয়া হয়েছে”—এটি কোনো কল্পিত ঘটনা নয়, বরং বাস্তব ইতিহাস। কুরআন এখানে স্পষ্ট করে দেয়, এই নির্যাতনের কারণ কোনো অপরাধ নয়, কোনো সামাজিক বিশৃঙ্খলা নয়, কোনো অর্থনৈতিক দুর্নীতি নয়—বরং একটাই কারণ: তারা বলত, “আমাদের রব আল্লাহ।”

এখানে কুরআন অত্যন্ত শক্ত ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে যে, তাওহিদ উচ্চারণ করা, আল্লাহকে একমাত্র রব হিসেবে স্বীকার করা—এটাই ছিল তাদের ‘অপরাধ’। এটি প্রমাণ করে, পৃথিবীতে সত্যের বিরোধিতা মূলত আদর্শগত; ক্ষমতাকেন্দ্র, শোষণব্যবস্থা ও মিথ্যা কর্তৃত্ব তাওহিদকে সহ্য করতে পারে না।

এই আয়াত থেকে আমরা বুঝি, আল্লাহর দৃষ্টিতে নির্যাতনের মূল কারণ হলো—আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। যারা আল্লাহকে রব বলে মানে, তারা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের তৈরি রবত্ব, আইন ও আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে। ফলে তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে।

এরপর আয়াতটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে—“আল্লাহ মানুষের এক দলকে আরেক দল দ্বারা প্রতিহত না করলে…”। এটি আল্লাহর সুন্নাহ বা পরিচালনানীতি। পৃথিবীতে যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ না থাকত, যদি সত্যকে রক্ষার জন্য মানুষ দাঁড়াত না, তবে পৃথিবী একতরফা জুলুমের কবলে পড়ত। আল্লাহ এই সংঘর্ষকে অনুমতি দেন, যাতে ভারসাম্য বজায় থাকে এবং সত্য সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে না যায়।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—এই প্রতিরোধের উদ্দেশ্য কী? কুরআন নিজেই তার উত্তর দেয়। যদি এই প্রতিরোধ না থাকত, তবে ধ্বংস হয়ে যেত সন্ন্যাসীদের উপাসনালয়, গির্জা, ইবাদতখানা এবং মসজিদ। অর্থাৎ আল্লাহর দৃষ্টিতে ধর্মীয় স্থাপনার সুরক্ষা একটি মৌলিক ন্যায়সংগত কারণ।

এই আয়াতে চার ধরনের উপাসনালয়ের কথা এসেছে, যা প্রমাণ করে যে আল্লাহ মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে একটি বাস্তব মূল্য হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে এখানে একটি গভীর শর্ত যুক্ত আছে—“যেগুলোতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়।” অর্থাৎ স্থাপনাটি গুরুত্বপূর্ণ তার কাঠামোর জন্য নয়, বরং সেখানে আল্লাহর স্মরণ হচ্ছে কিনা—এই কারণে।

মসজিদ এখানে আলাদা করে উল্লেখিত হয়েছে, কিন্তু গির্জা বা অন্যান্য উপাসনালয়ের মতোই একটি মূল নীতির অধীনে—যেখানে আল্লাহর নাম স্মরণ হয়। এটি দেখিয়ে দেয় যে কুরআনের দৃষ্টিতে মসজিদ মানে কেবল একটি মুসলিম স্থাপনা নয়; বরং এটি তাওহিদের কেন্দ্র। আর যেখানে তাওহিদ ধ্বংস হয়, সেখানে মসজিদ বাস্তবে তার অস্তিত্ব হারায়।

এই আয়াত থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়—মসজিদ রক্ষার অর্থ শুধু দেয়াল রক্ষা নয়, বরং সেখানে আল্লাহর নাম, আল্লাহর বিধান ও আল্লাহর কর্তৃত্ব রক্ষা করা। যদি মসজিদে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হলেও তাঁর বিধান অগ্রাহ্য হয়, তবে কুরআনের আলোকে সেই মসজিদের আত্মা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর আয়াতটি একটি চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে শেষ হয়—“আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে আল্লাহকে সাহায্য করে।” এখানে আল্লাহকে সাহায্য করা মানে আল্লাহর সত্তাকে সাহায্য করা নয়—বরং আল্লাহর দীন, আল্লাহর বিধান ও আল্লাহর ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। যারা এই দায়িত্ব নেয়, তাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য নিশ্চিত।

এই সাহায্য আবেগের ওপর নির্ভর করে না, সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে অবস্থানের ওপর—কে আল্লাহর পক্ষে দাঁড়াল, আর কে আল্লাহর বিরোধিতায় অবস্থান নিল।

আয়াতের শেষ বাক্যে আল্লাহ নিজের গুণ ঘোষণা করেছেন—তিনি শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী। এটি একটি আশ্বাস। অর্থাৎ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষ কখনো একা নয়; শক্তির প্রকৃত উৎস আল্লাহ নিজেই।


কুরআনের অন্যান্য সম্পর্কিত আয়াত

২:১১৪ — মসজিদে আল্লাহর নাম স্মরণে বাধা দেওয়া সবচেয়ে বড় যুলুম
৯:১৮ — আল্লাহর মসজিদ কেবল মুত্তাকীরাই আবাদ করে
৭২:১৮ — মসজিদ আল্লাহরই জন্য, সেখানে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ডাকা যাবে না
৪১:৩০ — যারা বলে আমাদের রব আল্লাহ এবং অবিচল থাকে
২২:৩৯ — নির্যাতিতদের প্রতিরোধের অনুমতি


বর্তমান প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

এই আয়াত আজ আমাদের শেখায়—ধর্মীয় স্বাধীনতা কোনো পাশ্চাত্য ধারণা নয়; এটি কুরআনের মৌলিক ন্যায়নীতি। তবে এই স্বাধীনতার কেন্দ্রবিন্দু হলো তাওহিদ। মসজিদ, গির্জা বা যেকোনো উপাসনালয় তখনই মর্যাদা পায়, যখন সেখানে আল্লাহর স্মরণ সত্যিকার অর্থে জীবিত থাকে।

এই আয়াত আমাদের দায়িত্বও নির্ধারণ করে—মসজিদ রক্ষা মানে শুধু দখলমুক্ত রাখা নয়, বরং শির্ক, জুলুম ও বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করা। আর আল্লাহর পক্ষে দাঁড়ানো মানে অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকা।

সূরা ২২ : আয়াত ৪০ আমাদের শিখিয়ে দেয়—আল্লাহর দীন রক্ষার জন্য সংগ্রাম কখনো বিশৃঙ্খলা নয়; বরং তা মানবতা, ন্যায় এবং তাওহিদের ভারসাম্য রক্ষারই অংশ।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page