• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২ : আয়াত ২২০

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৬০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ২ : আয়াত ২২০

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation


আয়াত
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ ٱلۡيَتَـٰمَىٰۖ قُلۡ إِصۡلَـٰحٗا لَّهُمۡ خَيۡرٞۚ وَإِنۡ تُخَالِطُوهُمۡ فَإِخۡوَانُكُمۡۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ ٱلۡمُفۡسِدَ مِنَ ٱلۡمُصۡلِحِۚ وَلَوۡ شَاءَ ٱللَّهُ لَأَعۡنَتَكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ


অনুবাদ
তোমরা যখন এতিমদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা কর, বলো, তাদের জন্য কল্যাণকর ব্যবস্থা করা শ্রেয়। আর যদি তুমি তাদের সাথে মিশো, তারা তোমাদের ভাইসদৃশ। আর আল্লাহ জানেন কে অনৈতিক ও কে সৎ। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে তিনি তোমাদেরকে কঠোরতায় ফেলতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।


আয়াতের বিস্তারিত আলোচনা

২:২২০ আয়াতটি সমাজে এতিম ও অসহায়দের প্রতি মুসলিমদের দায়িত্ব এবং নৈতিক আচরণের মূলনীতি নির্দেশ করছে। এটি ব্যক্তিগত নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং আল্লাহর বিচারবোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে, “তোমরা যখন এতিমদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা কর”—এটি নির্দেশ দেয় যে, সমাজে শিশু বা অসহায় ব্যক্তিদের বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত। মুসলিমদের কাজ হলো কেবল তাদের তত্ত্বাবধান করা নয়, বরং তাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করা যা তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করে। এখানে ‘কল্যাণকর ব্যবস্থা’ বলতে বোঝানো হয়েছে—তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক সুরক্ষা, এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ দেওয়া।

এরপর আয়াতটি বলে, “যদি তুমি তাদের সাথে মিশো, তারা তোমাদের ভাইসদৃশ।” অর্থাৎ এতিমদের সঙ্গে আচরণ এমন হওয়া উচিত, যেন তারা পরিবার বা ভাইয়ের মতো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এটি নির্দেশ করে যে নৈতিকতার মূল ভিত্তি শুধু আইন বা নিয়ম নয়; বরং আন্তরিক অনুভূতি, সহানুভূতি এবং সামাজিক বন্ধন অপরিহার্য।

আয়াতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—“আল্লাহ জানেন কে অনৈতিক ও কে সৎ।” এখানে বোঝানো হয়েছে যে, মানুষ চেষ্টা করতে পারে, বিচার করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত ন্যায়বিচার আল্লাহর হাতে। মুসলিমদের দায়িত্ব হলো সৎ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে চেষ্টা করা, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর উপর নির্ভর করে। এটি মানুষের নিজস্ব ক্ষমতা ও আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করে।

পরবর্তী অংশে আয়াতটি স্মরণ করায়—“যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে তিনি তোমাদেরকে কঠোরতায় ফেলতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।” এটি মানুষের জন্য একটি সতর্কীকরণ। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন; কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করা উচিত ন্যায় ও কল্যাণে। আল্লাহর শাসন সর্বদা দয়ালু এবং প্রজ্ঞা দ্বারা পরিচালিত।


কুরআনের সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ২:২১৯ — সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক সীমাবদ্ধতা
  • ৯:৭১ — সমাজে পুরুষ ও নারীর সমান দায়িত্ব
  • ৪:৭৫ — নির্যাতিতদের পক্ষে লড়াই এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা
  • ২:১৯০ — ন্যায়পরায়ণ যুদ্ধ এবং সীমা নির্ধারণ
  • ৬০:৮ — ন্যায় ও দয়া, অন্যদের প্রতি নৈতিক আচরণ

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

আজকের সমাজে এতিম ও অসহায় শিশুদের সুরক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও নৈতিক বিষয়। ২:২২০ আয়াত স্মরণ করায় যে, তাদের সঙ্গে আচরণ কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং ইসলামের একটি মৌলিক আদর্শ। মুসলিমদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো, সহানুভূতি প্রকাশ করা এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা।

এই আয়াত আমাদের শেখায়—সৎতা, সতর্কতা ও ন্যায়পরায়ণতা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামাজিক জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন, কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করতে হবে নৈতিক ও সৎ উদ্দেশ্যে। এতে সমাজে ন্যায়, শান্তি ও সমতা বজায় থাকে।

আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের নিজের সীমিত বিচার থাকে, কিন্তু চূড়ান্ত ন্যায়বিচার আল্লাহর হাতে। আমাদের কাজ হলো সচেতনতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা। ইসলামের আদর্শ সমাজে এতিম ও অসহায়দের প্রতি সহানুভূতি এবং ন্যায়পরায়ণ আচরণ প্রতিটি মুসলিমের নৈতিক কর্তব্য।

এইভাবে, সূরা বাকারা ২:২২০ আয়াত আমাদের শেখায়—নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয় ছাড়া সঠিক জীবন, ঈমান এবং সমাজ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page