• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৩২ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৫ : আয়াত ৮

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৪৭ Time View
Update : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আল-মায়েদা : আয়াত ৮

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation


আয়াত (আরবি):

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ


ভাবার্থভিত্তিক সঠিক তর্জমা:

হে ঈমানদারগণ!
তোমরা আল্লাহর জন্য দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও,
ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদানকারী হও।
কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে
ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে।
ন্যায়বিচার করো—এটাই তাকওয়ার সবচেয়ে নিকটবর্তী।
আর আল্লাহকে সচেতনভাবে মান্য করো।
নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আল-মায়েদার এই আয়াতটি কুরআনের নৈতিক দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। এখানে আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের সামনে তাকওয়ার একটি বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। অনেক সময় তাকওয়াকে মানুষের অন্তরের বিষয় বলে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়; কিন্তু এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়—তাকওয়া অন্তরের অনুভূতি নয়, বরং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রকাশিত একটি নৈতিক অবস্থান।

আয়াতের শুরুতে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ”—অর্থাৎ এই নির্দেশ কেবল সাধারণ নৈতিক উপদেশ নয়; বরং ঈমানের দাবিদারদের জন্য বাধ্যতামূলক নৈতিক অঙ্গীকার। এরপর বলা হয়, “কূনূ কাওয়ামিনা লিল্লাহ”—আল্লাহর জন্য দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো মানুষ হও। এখানে “কাওয়ামিন” শব্দটি এমন ব্যক্তিত্ব বোঝায়, যে ন্যায় ও সত্যের প্রশ্নে নড়বড়ে নয়, পরিস্থিতির চাপে আপস করে না।

এই দৃঢ় অবস্থানের পরই বলা হয়েছে, “শুহাদাআ বিল কিস্ত”—ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদানকারী হও। সাক্ষ্য এখানে আদালতের আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্য নয়; বরং জীবনাচরণের মাধ্যমে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। একজন মুমিনের কথা, কাজ, সিদ্ধান্ত—সবকিছুতেই যেন ন্যায় প্রতিফলিত হয়।

এরপর আয়াতটি মানুষের একটি স্বাভাবিক দুর্বলতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আল্লাহ বলেন, কোনো জাতির প্রতি শত্রুতা বা বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে সরিয়ে না দেয়। মানুষ সাধারণত বন্ধুদের ক্ষেত্রে ছাড় দেয় এবং শত্রুদের ক্ষেত্রে কঠোর হয়। কিন্তু কুরআনের ন্যায়নীতি এই দ্বৈত মানদণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে। এখানে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—ন্যায় শত্রু-মিত্রনিরপেক্ষ।

এই আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি হলো—
“ই‘দিলূ—হুয়া আকরাবু লিত্ তাকওয়া”
অর্থাৎ, ন্যায়বিচার করো—এটাই তাকওয়ার সবচেয়ে নিকটবর্তী পথ

এই ঘোষণার মাধ্যমে আল্লাহ তাকওয়ার সংজ্ঞাকে বাস্তব মাটিতে নামিয়ে এনেছেন। তাকওয়া মানে শুধু ইবাদতের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং তাকওয়া মানে হলো—ক্ষমতা, আবেগ, বিদ্বেষ ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। যেখানে ন্যায় নেই, সেখানে তাকওয়ার দাবি কুরআনের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ।

আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ আবার সতর্ক করেন—“আল্লাহকে ভয় করো”, এবং স্মরণ করিয়ে দেন—“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমরা যা করো সে বিষয়ে অবগত।” এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, ন্যায়বিচার শুধু সামাজিক চুক্তি নয়; বরং এটি আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার বিষয়।


এই আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য আয়াতসমূহ

  • সূরা আল-বাকারা : ১৪৩
    মুসলিম উম্মাহকে “উম্মাতে ওয়াসাত” বলা হয়েছে—যার বাস্তব রূপ হলো ন্যায় ও ভারসাম্যপূর্ণ সাক্ষ্য।
  • সূরা নিসা : ১৩৫
    নিজের বা আত্মীয়ের বিরুদ্ধেও ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ—ন্যায়ের সর্বোচ্চ মানদণ্ড।
  • সূরা আনআম : ১৫২
    কথা ও সিদ্ধান্তে ন্যায়বিচার বজায় রাখার নির্দেশ—নৈতিক ধারাবাহিকতা।
  • সূরা শুরা : ১৫
    আল্লাহ রাসূলকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদেশ দিয়েছেন—এটি নবী-উম্মাহ উভয়ের দায়িত্ব।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

আজকের সমাজে ন্যায়বিচার প্রায়ই দল, মত, জাতি ও স্বার্থের অধীন হয়ে পড়েছে। মানুষ নিজের গোষ্ঠীর অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে ঢাকে, আর প্রতিপক্ষের ন্যায্যতাকেও অস্বীকার করে। সূরা আল-মায়েদা ৫:৮ এই মানসিকতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। এটি ঘোষণা করে—যে ন্যায় করতে পারে না, সে তাকওয়ার দাবিদার হতে পারে না।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, মুসলিম পরিচয় মানে আবেগী পক্ষপাত নয়; বরং ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থান।


সংক্ষেপে উপসংহার

সূরা আল-মায়েদা ৫:৮ আমাদেরকে একটি সুস্পষ্ট সত্য শেখায়—
তাকওয়া কোনো গোপন অনুভূতি নয়,
বরং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রকাশিত একটি দৃশ্যমান গুণ।

যেখানে ন্যায় আছে, সেখানেই তাকওয়া আছে।
আর ন্যায়বিচারই হলো উম্মাতে ওয়াসাত–এর সবচেয়ে স্পষ্ট পরিচয়।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page