• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৩২ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৮৩ : আয়াত ৩

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৮৩ Time View
Update : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ৮৩ : আয়াত ৩

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation


আয়াত (আরবি):

وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ ۝ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ ۝ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ ۝


ভাবার্থভিত্তিক সঠিক তর্জমা:

ধ্বংস তাদের জন্য—যারা মাপে কম দেয়।
যারা মানুষের কাছ থেকে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় নেয়,
কিন্তু যখন তাদেরকে মেপে দেয় বা ওজন করে দেয়—
তখন কম দেয়।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আল-মুতাফ্ফিফীনের সূচনা কুরআনের ভাষায় অত্যন্ত কঠোর। মাত্র তিনটি আয়াতেই আল্লাহ একটি পূর্ণ সামাজিক অপরাধকে উন্মোচন করেন। “ওয়াইলুন”—এই শব্দটি কুরআনে সাধারণ তিরস্কার নয়; বরং ধ্বংস, ভয়াবহ পরিণতি ও নৈতিক পতনের ঘোষণা। প্রশ্ন হলো—কাদের জন্য এই ধ্বংস? উত্তর—মুতাফ্ফিফীন, অর্থাৎ যারা মাপে কম দেয়।

এখানে “মাপে কম দেওয়া” কেবল বাজারের ওজন বা পরিমাপে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন নিজেই পরবর্তী আয়াতে এর ব্যাখ্যা খুলে দেয়। তারা এমন মানুষ, যারা নিজের পাওয়ার সময় পূর্ণ অধিকার দাবি করে, কিন্তু দেওয়ার সময় কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ এটি একটি দ্বিমুখী নৈতিকতা—নিজের জন্য ন্যায়, অন্যের জন্য ছাড়।

এই আয়াতগুলো মানুষের মানসিকতার গভীরে আঘাত করে। কারণ বেশিরভাগ অন্যায়ই এভাবেই জন্ম নেয়। মানুষ মনে করে—আমি পুরোটা পাবো, কিন্তু অন্যকে পুরোটা দেওয়ার দরকার নেই। কুরআন এই মানসিকতাকেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এখানে “ইযাক্তালু আলান্নাসি ইয়াসতাওফূন”—মানুষের কাছ থেকে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রা নেওয়া—এটি দেখায়, অন্যায়টি সচেতন। এটি ভুল নয়, এটি প্রতারণা। আর “ওয়া ইযা কালুহুম আও ওযানুহুম ইউখসিরূন”—দেওয়ার সময় কম দেওয়া—এটি পরিকল্পিত অবিচার।

এই আয়াতগুলোর গভীরতা এখানেই যে, কুরআন অর্থনৈতিক অন্যায়কে সরাসরি নৈতিক ও আখিরাতের অপরাধে পরিণত করেছে। এটি বলে দেয়—ব্যবসা, লেনদেন, হিসাব—এসব কোনো ধর্মনিরপেক্ষ এলাকা নয়। এখানেও আল্লাহর নজরদারি রয়েছে।

সূরা আল-আন‘আম ৬:১৫২–এ আল্লাহ বলেন, “পরিমাপ ও ওজন ন্যায়সহকারে পূর্ণ করো।” সেখানে এটি একটি আদেশ। আর সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন ৮৩:১–৩–এ সেই আদেশ ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ঘোষণা। অর্থাৎ কুরআন আদেশ ও পরিণতিকে পাশাপাশি দাঁড় করায়।

এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই আয়াতগুলো সমাজের আস্থাকে কেন্দ্র করে। যখন মানুষ বুঝে যায় যে নেওয়া ও দেওয়ার মানদণ্ড এক নয়, তখন সমাজে বিশ্বাস ভেঙে পড়ে। কুরআনের দৃষ্টিতে এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; বরং নৈতিক ধস।

এই সূরার পরবর্তী আয়াতগুলোতে কুরআন প্রশ্ন তোলে—“এরা কি বিশ্বাস করে না যে তারা এক মহাদিবসে পুনরুত্থিত হবে?” অর্থাৎ মাপে কম দেওয়ার মূল কারণ হলো জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি। যে ব্যক্তি আখিরাতকে গুরুত্ব দেয়, সে ইচ্ছাকৃতভাবে কম দিতে পারে না।


এই আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য আয়াতসমূহ (সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ)

  • সূরা আল-আন‘আম : ১৫২
    পরিমাপ ও ওজন ন্যায়সহকারে পূর্ণ করার নির্দেশ—নৈতিক ভিত্তি।
  • সূরা হুদ : ৮৪–৮৫
    শু‘আইব (আ.)–এর কওমকে মাপে কম দেওয়া থেকে নিষেধ—সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ।
  • সূরা আর-রাহমান : ৭–৯
    ভারসাম্য (মীযান) প্রতিষ্ঠার নির্দেশ—সৃষ্টি ও সমাজ উভয়ের জন্য।
  • সূরা আন-নিসা : ২৯
    অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ নিষিদ্ধ—অর্থনৈতিক ন্যায়নীতি।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

আজকের সমাজে “মাপে কম দেওয়া” শুধু দোকানের দাঁড়িপাল্লায় সীমাবদ্ধ নয়। চাকরিতে দায়িত্বে ফাঁকি, চুক্তিতে গোপন শর্ত, সেবায় কম দেওয়া, কথায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ—সবই আধুনিক মুতাফ্ফিফীন সংস্করণ। সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন আমাদের জানিয়ে দেয়—এইসব আচরণ কুরআনের দৃষ্টিতে সামান্য ত্রুটি নয়; বরং ধ্বংসাত্মক অন্যায়।


সংক্ষেপে উপসংহার

সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন ১–৩ আমাদের শেখায়—
ন্যায় শুধু নেওয়ার সময় নয়, দেওয়ার সময়ও পূর্ণ হতে হবে।

যে ব্যক্তি নিজের জন্য পূর্ণ দাবি করে কিন্তু অন্যের জন্য কম দেয়— সে কুরআনের ভাষায় ন্যায়বিচারক নয়, বরং ধ্বংসের পথে থাকা একজন প্রতারক।

কুরআনের সমাজে মাপ একটাই— নেওয়া ও দেওয়ার জন্য সমান।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page