• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন

তাফসীর | সূরা ১৪ : আয়াত ৪৮

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৩৫৪ Time View
Update : রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ইবরাহীম : আয়াত ৪৮

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ ۖ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ


বাংলা ভাবার্থ

যেদিন এই জমিনকে পাল্টে অন্য জমিন বানানো হবে এবং আসমানসমূহকেও; আর তারা সবাই উন্মুক্তভাবে হাজির হবে আল্লাহর সামনে—যিনি এক ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা ইবরাহীমের ৪৮ নম্বর আয়াত কিয়ামতের দিনের এক মহিমান্বিত ও ভয়াবহ দৃশ্য উপস্থাপন করে। এটি কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়; বরং মানবসভ্যতার চূড়ান্ত পরিণতির ঘোষণা। এখানে পৃথিবী ও আসমানের পরিবর্তন, মানুষের উন্মুক্ত উপস্থিতি এবং আল্লাহর একত্ব ও সর্বশক্তিমত্তা—এই তিনটি বিষয় একত্রে এসেছে। আয়াতটি আমাদের দৃষ্টিকে বর্তমান পৃথিবীর সীমাবদ্ধতা থেকে তুলে নিয়ে চূড়ান্ত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়।

আয়াতের সূচনা—
“يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ”
যেদিন এই জমিনকে পাল্টে অন্য জমিন বানানো হবে।

“তুবাদ্দালু” শব্দটি পরিবর্তন বোঝায়—মূল কাঠামোর রূপান্তর। অর্থাৎ এটি কেবল ধ্বংস নয়; রূপান্তর। বর্তমান পৃথিবী, যা পরীক্ষা ও কর্মের ক্ষেত্র, তা বিলুপ্ত হয়ে এমন এক নতুন পৃথিবীতে রূপ নেবে, যা বিচার ও পরিণামের ক্ষেত্র। সূরা আল-হাক্কাহ (৬৯:১৩–১৫)-এ বলা হয়েছে—শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, পাহাড় ভেঙে যাবে, পৃথিবী উল্টে যাবে। আবার সূরা তাকভীর (৮১:১–৩)-এ এসেছে—সূর্য মুছে যাবে, তারকারা ঝরে পড়বে, পাহাড় চলতে থাকবে।

অর্থাৎ বর্তমান ভৌত জগতের নিয়ম ভেঙে যাবে। এই পরিবর্তন কেবল ভৌগোলিক নয়; অস্তিত্বগত।

এরপর বলা হয়েছে—
“وَالسَّمَاوَاتُ”
আসমানসমূহকেও (পরিবর্তন করা হবে)।
অর্থাৎ কেবল পৃথিবী নয়; সমগ্র মহাবিশ্ব রূপান্তরিত হবে। সূরা আনবিয়া (২১:১০৪)-এ বলা হয়েছে—
“যেদিন আমরা আসমানকে গুটিয়ে নেব, যেমন লিখিত পত্র গুটানো হয়।”

এটি মহাবিশ্বের সমাপ্তি ও পুনর্গঠনের ঘোষণা।

এরপর আয়াতের কেন্দ্রীয় অংশ—
“وَبَرَزُوا لِلَّهِ”
তারা সবাই উন্মুক্তভাবে হাজির হবে আল্লাহর সামনে।

“বারাজু” মানে প্রকাশিত হওয়া, আড়ালহীন হয়ে দাঁড়ানো। দুনিয়াতে মানুষ অনেক আড়াল, পরিচয়, ক্ষমতা, সম্পদ, প্রভাবের আড়ালে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিন সব আড়াল সরে যাবে। সূরা কাহফ (১৮:৪৭)-এ বলা হয়েছে—
“তুমি দেখবে, তাদেরকে একত্র করা হবে; কারওকেই বাদ দেওয়া হবে না।”

কেউ ক্ষমতার আড়ালে থাকবে না, কেউ গোপন থাকবে না। সূরা গাফির (৪০:১৬)-এ বলা হয়েছে—
“সেদিন তারা প্রকাশিত হবে; তাদের কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকবে না।”

এরপর আল্লাহর দুটি গুণ এসেছে—
“الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ”
এক ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী।

“আল-ওয়াহিদ”—একক, তুলনাহীন, অংশীদারহীন।
“আল-কাহহার”—সবকিছুর উপর পরাক্রমশালী, যিনি সবকিছুকে অধীন করেন।

এই দুই গুণের সমন্বয় গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কিয়ামতের দিন মানুষ বুঝবে—কোনো শিরক, কোনো অংশীদার, কোনো মধ্যস্থতাকারী নেই। যাকে তারা দুনিয়াতে শক্তিশালী মনে করত—সব মুছে যাবে। কেবল এক আল্লাহ, যিনি সবকিছুর উপর পরম কর্তৃত্বশীল।

সূরা যুমার (৩৯:৬৭)-এ বলা হয়েছে—
“পৃথিবী তাঁর মুঠোয় থাকবে, আসমানসমূহ তাঁর ডান হাতে গুটানো থাকবে।”

অর্থাৎ যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সমাপ্তি ঘটাবেন এবং পুনর্গঠন করবেন।


আখিরাতের দৃষ্টিতে এই পৃথিবী

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বর্তমান পৃথিবী চূড়ান্ত নয়। এটি পরীক্ষা। মানুষ এখানে কাজ করে, কিন্তু ফল ভোগের স্থান অন্যত্র। যখন পৃথিবীই পাল্টে যাবে, তখন দুনিয়ার স্থায়িত্বের অহংকার অর্থহীন। সূরা আল-হাদীদ (৫৭:২০)-এ দুনিয়ার জীবনকে খেলাধুলা ও অলংকারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু আখিরাত স্থায়ী।

এই আয়াত মানুষকে দায়িত্ববোধ শেখায়। কারণ যখন সবকিছু বদলে যাবে, তখন কেবল আমলই থাকবে। সূরা ইয়াসীন (৩৬:৫৪)-এ বলা হয়েছে—
“আজ কাউকে জুলুম করা হবে না; তোমরা যা করতে, তাই প্রতিদান পাবে।”


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত তিনটি মৌলিক সত্য স্থাপন করে:

প্রথমত, দুনিয়া স্থায়ী নয়; পরিবর্তন অনিবার্য।
দ্বিতীয়ত, বিচার দিবসে সবাই আল্লাহর সামনে উন্মুক্ত হবে।
তৃতীয়ত, আল্লাহ এক ও সর্বশক্তিমান—কোনো অংশীদার নেই।

এটি অহংকার ভাঙে। মানুষ ক্ষমতা, সম্পদ, প্রভাব নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু যেদিন পৃথিবীই বদলে যাবে, সেদিন এসব অর্থহীন। তখন কেবল ঈমান ও আমল।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ২১:১০৪ — আসমান গুটিয়ে নেওয়া
  • ১৮:৪৭ — সবাইকে একত্র করা হবে
  • ৪০:১৬ — কিছুই গোপন থাকবে না
  • ৩৯:৬৭ — পৃথিবী তাঁর মুঠোয়

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ দুনিয়ার অস্থায়িত্ব স্মরণ রাখা
✔ আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া
✔ অহংকার ত্যাগ করা
✔ এক আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ থাকা
✔ আমলের হিসাবের কথা স্মরণ রাখা

আল্লাহ আমাদেরকে সেই দিনের জন্য প্রস্তুত থাকার তাওফীক দিন, যেদিন এই পৃথিবী পাল্টে যাবে এবং আমরা সবাই তাঁর সামনে উন্মুক্তভাবে দাঁড়াবো—তাঁর সামনে, যিনি এক ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page