• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৫ : আয়াত ৩

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৫৫ Time View
Update : রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আল-মায়িদাহ : আয়াত ৩

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ۚ ذَٰلِكُمْ فِسْقٌ ۗ الْيَوْمَ يَئِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ ۚ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍ لِإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ


বাংলা ভাবার্থ

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে—মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস, এবং যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে; শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত, আঘাতে মৃত, পতনে মৃত, শিংয়ের আঘাতে মৃত, এবং হিংস্র জন্তুর ভক্ষিত—তবে যা তোমরা যথাযথভাবে যবেহ করতে পেরেছ তা ব্যতীত; এবং যা বেদীর উপর যবেহ করা হয়েছে; এবং ভাগ্য নির্ধারণের জন্য তীর ব্যবহার করা। এগুলো ফিস্ক। আজ কাফিররা তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে নিরাশ হয়েছে—তাই তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে সন্তুষ্ট হলাম। তবে যে ব্যক্তি চরম ক্ষুধায় বাধ্য হয়—পাপের দিকে ঝুঁকে নয়—তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আল-মায়িদাহর ৩ নম্বর আয়াত কুরআনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত। এতে একদিকে খাদ্যবিধান স্পষ্ট করা হয়েছে, অন্যদিকে দ্বীনের পূর্ণতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই আয়াতে হালাল-হারামের সীমা, নৈতিক শৃঙ্খলা, ঈমানী দৃঢ়তা এবং জরুরি অবস্থার ব্যতিক্রম—সব একত্রে এসেছে। তাই এটি কেবল খাদ্যবিধানের আয়াত নয়; বরং ইসলামী জীবনব্যবস্থার পরিপূর্ণতার ঘোষণা।

প্রথম অংশে বলা হয়েছে—
“حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ…”
তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু।

এখানে “মাইতা” বলতে স্বাভাবিক মৃত্যুতে মৃত প্রাণী—যা যবেহ ছাড়া মারা গেছে। এরপর রক্ত, শূকরের মাংস, এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত পশু—এসব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আধ্যাত্মিক ও স্বাস্থ্যগত উভয় দিক রয়েছে। বিশেষত “মা উহিল্লা লিগাইরিল্লাহ”—যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ—এটি শিরকের সাথে সম্পর্কিত। খাদ্য কেবল পুষ্টি নয়; আকীদার অংশও।

এরপর বিভিন্ন প্রকার অযথাযথ মৃত্যুর প্রাণীর কথা এসেছে—
শ্বাসরুদ্ধ, আঘাতে মৃত, পতনে মৃত, শিংয়ের আঘাতে মৃত, হিংস্র জন্তুর ভক্ষিত—এগুলো সবই অনিয়ন্ত্রিত ও অশুদ্ধ মৃত্যু। তবে ব্যতিক্রম—
“إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ”
যদি তোমরা সময়মতো যবেহ করতে পারো, তাহলে বৈধ।
অর্থাৎ প্রাণ থাকা অবস্থায় সঠিক যবেহ করলে তা হালাল।

এরপর বলা হয়েছে—
“وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ”
যা বেদীর উপর যবেহ করা হয়েছে।
অর্থাৎ মূর্তি বা উপাসনাস্থলের নামে উৎসর্গ—এটি নিষিদ্ধ।

এবং—
“وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ”
ভাগ্য নির্ধারণের জন্য তীর ব্যবহার করা।
জাহেলি যুগে মানুষ তীর টেনে সিদ্ধান্ত নিত—কোনো কাজ করবে কি না। ইসলাম সেই কুসংস্কার নিষিদ্ধ করেছে। সিদ্ধান্ত হবে ওহী ও বিবেচনার ভিত্তিতে, ভাগ্যগণনার মাধ্যমে নয়।

এরপর বলা হয়েছে—
“ذَٰلِكُمْ فِسْقٌ”
এগুলো ফিস্ক—অর্থাৎ আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন।

এরপর আয়াত হঠাৎ এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয়—
“الْيَوْمَ يَئِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن دِينِكُمْ”
আজ কাফিররা তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে নিরাশ হয়েছে।

অর্থাৎ ইসলামের বিধান সুস্পষ্ট হয়ে গেছে; আকীদা, আইন, নৈতিকতা—সব প্রতিষ্ঠিত। বিরোধীরা বুঝে গেছে—এ দ্বীন আর মুছে যাবে না।

এরপর নির্দেশ—
“فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ”
তাদের ভয় করো না; আমাকেই ভয় করো।
এটি ঈমানী দৃঢ়তার শিক্ষা। দ্বীনের পূর্ণতা মানুষের প্রশংসা বা বিরোধিতার উপর নির্ভরশীল নয়।

এরপর কুরআনের অন্যতম ঐতিহাসিক ঘোষণা—
“الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ”
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম।

দ্বীন পূর্ণাঙ্গ—অর্থাৎ মৌলিক আকীদা, ইবাদত, নৈতিকতা, আইন—সব সম্পূর্ণ। নতুন করে মানুষের তৈরি সংযোজনের প্রয়োজন নেই।

“وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي”
আমি তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম।
সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো হিদায়াত।

“وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا”
ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে সন্তুষ্ট হলাম।
অর্থাৎ ইসলামই চূড়ান্ত জীবনব্যবস্থা।

শেষাংশে এসেছে ব্যতিক্রম—
“فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ…”
যে ব্যক্তি চরম ক্ষুধায় বাধ্য হয়—পাপের দিকে ঝুঁকে নয়—তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল।

এখানে ইসলামের বাস্তবতা ও দয়া প্রকাশ পেয়েছে। জীবন রক্ষা অগ্রাধিকার। যদি কেউ প্রাণরক্ষার জন্য বাধ্য হয়, এবং সীমা অতিক্রমের উদ্দেশ্য না থাকে—তাহলে ছাড় রয়েছে।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াতের গভীর শিক্ষা কয়েকটি স্তরে:

১. খাদ্যবিধান আকীদার সাথে সম্পর্কিত।
২. কুসংস্কার ও ভাগ্যগণনা প্রত্যাখ্যান।
৩. দ্বীন পূর্ণাঙ্গ—মানবসংযোজনের প্রয়োজন নেই।
৪. ভয় আল্লাহর প্রতি; মানুষের প্রতি নয়।
৫. জরুরি অবস্থায় দয়া ও নমনীয়তা।

এখানে কঠোরতা ও দয়ার ভারসাম্য রয়েছে। হারাম স্পষ্ট; কিন্তু জীবনরক্ষায় ছাড় আছে।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ২:১৭৩ — খাদ্যবিধান ও জরুরি অবস্থা
  • ৬:১৪৫ — নিষিদ্ধ খাদ্যের তালিকা
  • ১৬:১১৫ — বাধ্যতার ক্ষেত্রে ছাড়
  • ৩:১৯ — ইসলাম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ হালাল-হারামের সীমা মানা
✔ আকীদা-সম্পর্কিত শিরক থেকে সতর্ক থাকা
✔ কুসংস্কার বর্জন
✔ দ্বীনের পূর্ণতায় আস্থা
✔ জরুরি অবস্থায় সীমা না ছাড়িয়ে প্রয়োগ

আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর পূর্ণাঙ্গ দ্বীনকে সম্মান করার তাওফীক দিন এবং তাকওয়ার সীমার মধ্যে জীবনযাপন করার শক্তি দান করুন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page