• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৪:১৬ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৩ : আয়াত ৭

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৯৯ Time View
Update : বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আলে ইমরানের  ৭ আয়াতের তাফসীর

তাফসীর by, Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ ۖ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ ۗ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ ۗ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ


অনুবাদ

“তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব নাজিল করেছেন। এর মধ্যে কিছু আয়াত আছে সুস্পষ্ট ও দৃঢ়—এসবই কিতাবের মূলভিত্তি। আর কিছু আয়াত আছে রূপক ও বহুবিধ অর্থবহনকারী। যাদের অন্তরে বক্রতা আছে, তারা ফিতনা সৃষ্টি ও মনগড়া ব্যাখ্যার অনুসন্ধানে এরূপ আয়াতগুলোর পেছনে লেগে যায়। অথচ এর প্রকৃত ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুদৃঢ়, তারা বলে—আমরা এতে বিশ্বাস করি; সবই আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। আর বোধশক্তিসম্পন্নরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।”


১. ভূমিকা

সূরা আলে ইমরানের ৭ নম্বর আয়াত কুরআনের ব্যাখ্যা-পদ্ধতির কেন্দ্রীয় আয়াত। এই এক আয়াতের ভেতরেই আল্লাহ বলে দিয়েছেন—কুরআন কীভাবে পড়তে হবে, কীভাবে বুঝতে হবে, আর কীভাবে ভুল বোঝা হয়। কুরআনকে ভুলভাবে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর মূল কারণ কী—তাও এখানে স্পষ্ট।

এই আয়াতটি নাজিল হয়েছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন কুরআনের কিছু আয়াতকে বিচ্ছিন্নভাবে তুলে ধরে আকিদাগত বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছিল। আল্লাহ তাই শুরুতেই বলে দেন—কুরআন একরকম নয়; এর ভেতরে রয়েছে সুস্পষ্ট মূলনীতি ও রূপকধর্মী বক্তব্য। সমস্যা আয়াতে নয়; সমস্যা পাঠকের অন্তরের অবস্থায়


২. আয়াতের সরল সারমর্ম

এই আয়াত বলছে—কুরআনের সব আয়াত একই ধাঁচের নয়। কিছু আয়াত পরিষ্কার, সিদ্ধান্তমূলক, নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি তৈরি করে। এগুলোই কিতাবের মেরুদণ্ড। আবার কিছু আয়াত আছে, যেগুলো উদাহরণ, রূপক, ভবিষ্যৎ বা অতীন্দ্রিয় বিষয় নিয়ে কথা বলে—যার গভীর অর্থ একাধিক স্তরে বিস্তৃত।

যাদের অন্তর সোজা নয়, তারা মূল আয়াতগুলো ছেড়ে এসব জটিল বা রূপক আয়াত ধরে বিভ্রান্তি ছড়ায়। আর যারা জ্ঞানে দৃঢ়, তারা কুরআনের সামগ্রিক কাঠামোকে গ্রহণ করে—নিজেদের সীমা জানে এবং বলে: সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।


৩. প্রেক্ষাপট (সিয়াক ও সিবাক)

এই আয়াতের আগে সূরা আলে ইমরানে তাওহীদ, রিসালাত ও কুরআনের সত্যতা নিয়ে আলোচনা এসেছে। পরের আয়াতগুলোতে দোয়া ও আত্মশুদ্ধির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ৩:৭ আয়াতটি তত্ত্ব ও প্রয়োগের সংযোগস্থল

এটি কুরআন বোঝার একটি নিরাপত্তা-নির্দেশনা। যেন মানুষ কুরআনের নাম করে কুরআনকেই বিকৃত না করে।


৪. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ধারণা বিশ্লেষণ

مُحْكَمَاتٌ (মুহকামাত)
যে আয়াতগুলো সুদৃঢ়, স্পষ্ট, নৈতিক ও আইনগত দিকনির্দেশ দেয়। যেমন—তাওহীদ, ন্যায়বিচার, যুলুমের নিষেধাজ্ঞা, সামাজিক অধিকার। এগুলোই উম্মুল কিতাব—কিতাবের মূলভিত্তি।

مُتَشَابِهَاتٌ (মুতাশাবিহাত)
যে আয়াতগুলো রূপক, প্রতীকী, অতীন্দ্রিয় বা বহুস্তর অর্থবহনকারী। এগুলো দিয়ে আকিদা গড়া যায় না; বরং এগুলো মুহকাম আয়াতের আলোকে বুঝতে হয়।

زَيْغٌ (যাইগ)
অন্তরের বক্রতা। এটি জ্ঞানের অভাব নয়; বরং উদ্দেশ্যের বিকৃতি। এমন মানুষ সত্য খুঁজে না—নিজের মত প্রমাণ খোঁজে।

الرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ
যারা জ্ঞানে দৃঢ়। তারা সব জানার দাবি করে না; বরং নিজেদের সীমা বোঝে।


৫. কুরআনের আলোকে আয়াতের ব্যাখ্যা (Cross-reference)

এই নীতিটি কুরআনের বহু স্থানে পুনরুক্ত হয়েছে।

  • আন‘আম 6:114–115
    আল্লাহর কিতাব পূর্ণ ও সুস্পষ্ট—মানুষের মনগড়া ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
  • যুমার 39:23
    কুরআন একইসঙ্গে স্পষ্ট ও পুনরুক্ত—বহুস্তর অর্থ বহন করে।
  • বাকারা 2:26
    আল্লাহ একই উদাহরণ দিয়ে কাউকে হেদায়াত দেন, কাউকে গোমরাহ করেন—কারণ অন্তরের অবস্থান ভিন্ন।
  • ইসরা 17:82
    কুরআন মুমিনদের জন্য শিফা, কিন্তু জালিমদের জন্য ক্ষতিই বাড়ায়।

এগুলো দেখায়—কুরআনের আয়াত নয়, পাঠকের নিয়ত ফল নির্ধারণ করে।


৬. আয়াতটি কী শিক্ষা দিতে চায় (মৌলিক বার্তা)

এই আয়াতের মূল শিক্ষা—

  • কুরআন বুঝতে হলে আগে মুহকাম আয়াত ধরতে হবে
  • রূপক আয়াত দিয়ে আকিদা বা বিধান বানানো যাবে না
  • কুরআনকে বিভক্ত করে পড়া মানেই বিভ্রান্তি
  • প্রকৃত জ্ঞানী সে, যে নিজের সীমা জানে
  • বিনয় ছাড়া কুরআন বোঝা যায় না

৭. সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি ও তার সংশোধন

একটি বড় ভুল হলো—সব আয়াত একইভাবে literal ধরে নেওয়া। এতে রূপক আয়াত দিয়ে ভুল আকিদা তৈরি হয়।

আরেকটি ভুল হলো—“এর ব্যাখ্যা কেবল আল্লাহ জানেন”—এই কথা বলে চিন্তা বন্ধ করে দেওয়া। অথচ আয়াত বলছে—চূড়ান্ত জ্ঞান আল্লাহর, কিন্তু মানুষকে মুহকাম আয়াতের আলোকে চিন্তা করতে নিষেধ করা হয়নি।


৮. ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োগ

ব্যক্তিগতভাবে এই আয়াত শেখায়—আমি কি কুরআন পড়ি হেদায়াতের জন্য, নাকি নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্য?

সামাজিকভাবে এটি একটি সতর্কবার্তা—ধর্মের নামে বিভক্তি তৈরি হয় তখনই, যখন মুতাশাবিহ আয়াতকে অস্ত্র বানানো হয়।


৯. আত্মসমালোচনার প্রশ্ন

  • আমি কি কুরআন থেকে মূলনীতি নিই, নাকি জটিলতা খুঁজি?
  • আমার ব্যাখ্যা কি ন্যায় ও দয়া বাড়ায়, নাকি বিভাজন?
  • আমি কি “সব জানি” ভঙ্গিতে কথা বলি?

১০. উপসংহার

সূরা আলে ইমরানের ৭ নম্বর আয়াত কুরআন বোঝার নৈতিক মানচিত্র। এটি বলে—কুরআন বিভ্রান্তির কিতাব নয়; মানুষই তাকে বিভ্রান্তির হাতিয়ার বানায়। যারা বিনয় ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কুরআনের কাছে আসে, তাদের জন্য কুরআন স্পষ্ট পথনির্দেশ।

এই আয়াত আমাদের শেখায়—কুরআন বোঝার আগে নিজেকে সোজা করতে হয়।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page