• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২২ : আয়াত ৭২

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৪০ Time View
Update : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আল-হাজ্জ : আয়াত ৭২

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

وَإِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ تَعْرِفُ فِي وُجُوهِ الَّذِينَ كَفَرُوا الْمُنكَرَ ۖ يَكَادُونَ يَسْطُونَ بِالَّذِينَ يَتْلُونَ عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا ۗ قُلْ أَفَأُنَبِّئُكُم بِشَرٍّ مِّن ذَٰلِكُمُ ۗ النَّارُ وَعَدَهَا اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ


বাংলা ভাবার্থ

আর যখন তাদের সামনে আমাদের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তুমি অবিশ্বাসীদের মুখে বিরক্তি ও অস্বীকৃতি দেখতে পাও। তারা প্রায়ই ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হয় তাদের উপর, যারা তাদের কাছে আমাদের আয়াত তিলাওয়াত করে। বলো—আমি কি তোমাদেরকে এর থেকেও অধিক মন্দ কিছুর সংবাদ দেব? তা হলো আগুন (জাহান্নাম), যা আল্লাহ অবিশ্বাসীদের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর তা কতই না নিকৃষ্ট পরিণাম।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আল-হাজ্জের এই আয়াত মানুষের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা তুলে ধরে। যখন সত্য মানুষের সামনে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপিত হয়, তখন সব মানুষ একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কেউ তা গ্রহণ করে, কেউ তা উপেক্ষা করে, আবার কেউ তা ঘৃণা ও ক্রোধের সাথে প্রত্যাখ্যান করে।

এই আয়াত মূলত সেই মানুষদের সম্পর্কে, যারা কুরআনের স্পষ্ট আয়াত শুনেও সত্যকে গ্রহণ করতে চায় না; বরং বিরক্তি, ক্রোধ এবং শত্রুতার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখায়।


“وإذا تتلى عليهم آياتنا بينات” — সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হলে

এই অংশে বলা হয়েছে—আল্লাহর আয়াতগুলো “বাইয়্যিনাত”, অর্থাৎ স্পষ্ট ও পরিষ্কার।

কুরআন নিজেকে বারবার স্পষ্ট নির্দেশনা হিসেবে বর্ণনা করেছে। এটি এমন একটি গ্রন্থ যা মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করে এবং যুক্তি, দৃষ্টান্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে কথা বলে।

সূরা আল-বাকারায় বলা হয়েছে—

“এটি এমন একটি কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ।” (২:২)

অর্থাৎ কুরআনের বার্তা গোপন বা অস্পষ্ট নয়; বরং মানুষের চিন্তা ও বিবেককে জাগ্রত করার জন্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত।


“تعرف في وجوه الذين كفروا المنكر” — তাদের মুখে বিরক্তি দেখা যায়

যখন সত্য তাদের সামনে আসে, তখন তাদের মুখে অসন্তোষ ও ঘৃণার চিহ্ন ফুটে ওঠে।

এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া। সত্য অনেক সময় মানুষের অহংকারকে আঘাত করে। যখন কেউ এমন একটি সত্য শুনে যা তার বিশ্বাস, স্বার্থ বা অভ্যাসের বিপরীত, তখন সে অনেক সময় যুক্তি দিয়ে নয়, বরং আবেগ দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়।

কুরআন এই প্রতিক্রিয়াকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করেছে—
তুমি তাদের মুখের অভিব্যক্তিতে তা দেখতে পারো।


يكادون يسطون بالذين يتلون عليهم آياتنا” — তারা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হয়

এই অংশে বলা হয়েছে যে তারা এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে যে যারা কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে তাদের উপর আক্রমণ করতে উদ্যত হয়।

ইতিহাসে আমরা এই ধরনের আচরণের অনেক উদাহরণ দেখি। মক্কার মুশরিকরা যখন কুরআনের বার্তা শুনত, তখন তারা শুধু তা প্রত্যাখ্যানই করত না; বরং যারা তা প্রচার করত তাদের উপর অত্যাচার চালাত।

এই আয়াত সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরে—
সত্যকে অনেক সময় যুক্তি দিয়ে নয়, বরং শক্তি দিয়ে দমন করার চেষ্টা করা হয়।


“قل أفأنبئكم بشر من ذلكم” — এর থেকেও খারাপ কিছুর সংবাদ দেব?

আল্লাহ এখানে রাসূলকে নির্দেশ দেন একটি প্রশ্ন করতে।

তোমরা কুরআনের আয়াত শুনে এত বিরক্ত হচ্ছ—
কিন্তু আমি কি তোমাদেরকে এর থেকেও ভয়ংকর কিছুর কথা বলব?

এই প্রশ্ন মানুষের দৃষ্টি দুনিয়ার প্রতিক্রিয়া থেকে আখিরাতের পরিণামের দিকে নিয়ে যায়।


النار وعدها الله الذين كفروا” — জাহান্নামের প্রতিশ্রুতি

এখানে কুরআন একটি গুরুতর সতর্কতা দেয়। যারা সত্যকে অস্বীকার করে এবং অহংকারের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করে, তাদের জন্য জাহান্নামের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

কুরআনে জাহান্নামের উল্লেখ বারবার এসেছে সতর্কতা হিসেবে, যেন মানুষ নিজেদের পথ পুনর্বিবেচনা করে।

সূরা নিসা ৪:৫৬ আয়াতে বলা হয়েছে—

“যারা আমাদের আয়াত অস্বীকার করে, আমরা তাদেরকে আগুনে প্রবেশ করাব।”

এটি প্রতিশোধের ভাষা নয়; বরং ন্যায়বিচারের ঘোষণা।


“وبئس المصير” — কত নিকৃষ্ট পরিণাম

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে—জাহান্নাম একটি নিকৃষ্ট পরিণাম।

কুরআন বারবার মানুষের সামনে দুটি পথ তুলে ধরে:

১. সত্য গ্রহণের পথ
২. অহংকার ও অস্বীকারের পথ

এই দুই পথের শেষ পরিণামও ভিন্ন।


আয়াতের মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা

এই আয়াত মানুষের অন্তরের একটি বাস্তবতা প্রকাশ করে।

সত্যের সামনে মানুষের তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে:

১. গ্রহণ করা
২. চিন্তা করা
৩. ক্রোধের সাথে প্রত্যাখ্যান করা

তৃতীয় অবস্থাটি সাধারণত অহংকার থেকে আসে। যখন মানুষ মনে করে যে তার বিশ্বাস বা ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তখন সে অনেক সময় সত্যের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়।


সত্যের প্রতি শত্রুতা

ইতিহাসে প্রায় সব নবীর ক্ষেত্রেই দেখা গেছে—তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে তাদের সমাজের ক্ষমতাধর ও অহংকারী শ্রেণি থেকে।

কারণ সত্য মানুষের ক্ষমতা ও স্বার্থের কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সূরা মুমিনুন ২৩:২৪ আয়াতে বলা হয়েছে—

“তাদের সম্প্রদায়ের নেতারা বলেছিল—এ তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ।”

অর্থাৎ সত্যকে গ্রহণ না করার জন্য মানুষ নানা অজুহাত তৈরি করে।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ২:৬ — অবিশ্বাসীদের হৃদয় সীলমোহর করা
  • ৬:২৫ — তারা শোনে কিন্তু বোঝে না
  • ৪১:২৬ — কুরআন শুনতে বাধা দেওয়া
  • ৮৩:১৪ — পাপের কারণে হৃদয় আচ্ছন্ন হওয়া

গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেয়:

১. কুরআনের বার্তা স্পষ্ট ও যুক্তিপূর্ণ
২. সত্য অনেক সময় মানুষের অহংকারকে আঘাত করে
৩. সত্যকে দমন করার চেষ্টা ইতিহাসে বহুবার হয়েছে
৪. আখিরাতের বিচারই চূড়ান্ত বাস্তবতা


সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ কুরআনের আয়াত মনোযোগ দিয়ে শোনা
✔ সত্যের সামনে অহংকার না করা
✔ যুক্তি ও জ্ঞানের মাধ্যমে বিষয় বোঝা
✔ সত্য প্রচারকারীদের সম্মান করা
✔ আখিরাতের পরিণাম স্মরণ রাখা


আল্লাহ আমাদেরকে সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা তাঁর আয়াত শুনে তা উপলব্ধি করে এবং বিনয়ের সাথে তা গ্রহণ করে। যেন আমরা সত্য শুনে বিরক্ত না হই, বরং তা আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করে। নিশ্চয় আল্লাহর আয়াত মানুষের জন্য হেদায়েত ও সতর্কবার্তা।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page