• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৮ অপরাহ্ন

জাহান্নামের আগুন শ্বাস নেয়—একটি কল্পকথার হাদিস

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২১৩ Time View
Update : রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

জাহান্নামের আগুন শ্বাস নেয়—একটি কল্পকথার হাদিস ও কুরআনের স্পষ্ট বিরোধিতা

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ


ভূমিকা

ইসলামে আকিদার ভিত্তি কল্পনা, রূপকথা বা লোককাহিনি নয়—আকিদার ভিত্তি কুরআন। কুরআন নিজেকে ঘোষণা করেছে ফুরকান—সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড হিসেবে। তাই নবীর নামে বর্ণিত কোনো কথা যদি প্রকৃতির বাস্তব নিয়ম, আল্লাহর সৃষ্টিগত আইন (সুন্নাতুল্লাহ) এবং কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তবে সেই বর্ণনা যত পুরোনো বা প্রসিদ্ধই হোক, তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। এই প্রবন্ধে এমনই একটি বহুল প্রচলিত হাদিস—যেখানে বলা হয়েছে জাহান্নামের আগুন আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছে এবং শ্বাস নেওয়ার ফলে পৃথিবীতে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম ও শীতের তীব্র ঠান্ডা সৃষ্টি হয়—এই দাবিকে কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে।


আলোচ্য হাদিস

হাদিসের আরবি পাঠ:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا، فَقَالَتْ: يَا رَبِّ، أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا، فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ، نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ، فَهُوَ أَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْحَرِّ، وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الزَّمْهَرِيرِ»

বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“জাহান্নামের আগুন তার প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করল এবং বলল: হে আমার রব! আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলছে। তখন আল্লাহ তাকে দুইবার শ্বাস নেওয়ার অনুমতি দিলেন—একটি শীতকালে, অন্যটি গ্রীষ্মকালে। আর তোমরা যে প্রচণ্ড গরম অনুভব করো তা গ্রীষ্মকালের শ্বাসের কারণে, আর যে তীব্র শীত অনুভব করো তা শীতকালের শ্বাসের কারণে।”

তথ্যসূত্র:
সহিহ বুখারী, ৪র্থ খণ্ড, হাদিস ৪৮২ (সমজাতীয় বর্ণনা মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবেও পাওয়া যায়)


হাদিসটির মৌলিক দাবি

এই হাদিসে কয়েকটি গুরুতর আকিদাগত দাবি করা হয়েছে—
১) জাহান্নাম একটি সচেতন সত্তা, যা অভিযোগ করে।
২) জাহান্নামের আগুন নিজের অংশ নিজেই খেয়ে ফেলে।
৩) জাহান্নাম শ্বাস নেয়।
৪) পৃথিবীর গ্রীষ্মের গরম ও শীতের ঠান্ডা এই শ্বাসের ফল।

এই দাবিগুলো যদি সত্য হয়, তবে প্রকৃতি, আবহাওয়া, ঋতু পরিবর্তন—সবকিছুর কারণ হিসেবে কুরআনের বক্তব্য নতুন করে ভাবতে হয়। প্রশ্ন হলো, কুরআন কি এমন কিছু বলে?


কুরআনের দৃষ্টিতে ঋতু ও আবহাওয়ার কারণ

কুরআন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করেছে।

১. ঋতু পরিবর্তনের কারণ

إِنَّ فِي اخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَّقُونَ

“নিশ্চয়ই রাত ও দিনের পরিবর্তনে এবং আসমান ও জমিনে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, তাতে মুত্তাকিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা ইউনুস ১০:৬)

রাত–দিনের পরিবর্তন, সূর্যের অবস্থান, পৃথিবীর গতি—এসবই কুরআনের দৃষ্টিতে আবহাওয়ার কারণ। কোথাও জাহান্নামের শ্বাসের কথা নেই।

২. সূর্যকে তাপের উৎস বলা হয়েছে

وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَهَّاجًا

“আমি (সূর্যকে) করেছি এক প্রজ্বলিত প্রদীপ।” (সূরা নাবা ৭৮:১৩)

গ্রীষ্মের তাপের উৎস হিসেবে কুরআন সূর্যের কথা বলছে, জাহান্নামের নিঃশ্বাস নয়।


শীতের কারণ কুরআনের ভাষায়

اللَّهُ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيَاحَ فَتُثِيرُ سَحَابًا

“আল্লাহই বায়ু পাঠান, যা মেঘমালা সৃষ্টি করে।”
(সূরা রূম ৩০:৪৮)

বায়ুপ্রবাহ, মেঘ, বৃষ্টি—এসবই শীত ও আবহাওয়ার কারণ হিসেবে কুরআনে বর্ণিত। কোথাও জাহান্নামের ‘শীতল নিঃশ্বাস’ নেই।


জাহান্নাম কি দুনিয়ার আবহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত?

কুরআনের দৃষ্টিতে জাহান্নাম হলো আখিরাতের শাস্তির স্থান।

وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيطَةٌ بِالْكَافِرِينَ
(সূরা তাওবা ৯:৪৯)

জাহান্নাম ভবিষ্যৎ পরিণতি হিসেবে বর্ণিত, দুনিয়ার আবহাওয়াব্যবস্থার অংশ হিসেবে নয়। কুরআন কোথাও বলেনি যে জাহান্নামের কোনো কার্যকলাপ পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।


অভিযোগ ও শ্বাস—রূপক না বাস্তব?

কুরআনে কিছু জড়বস্তুর রূপক ভাষায় কথা বলা হয়েছে, যেমন—

قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ
(সূরা ফুসসিলাত ৪১:১১)

কিন্তু এখানে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক কারণ নির্ধারণ করা হয়নি। অথচ আলোচ্য হাদিসে গ্রীষ্ম–শীতের বাস্তব কারণ হিসেবে জাহান্নামের শ্বাস নির্ধারণ করা হয়েছে, যা কুরআনের ব্যাখ্যার সরাসরি বিরোধী।


হাদিসটির সমস্যার গভীরতা

এই হাদিস—

  • প্রকৃতির কারণকে কল্পনামূলক ব্যাখ্যায় রূপ দিয়েছে,
  • কুরআনের সূর্য, বায়ু, পৃথিবীর গতি-সংক্রান্ত ব্যাখ্যাকে অপ্রাসঙ্গিক করেছে,
  • এবং আখিরাতের শাস্তিকে দুনিয়ার আবহাওয়ার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে—যা কুরআনে নেই।

ফলে এটি কেবল একটি দুর্বল ব্যাখ্যা নয়, বরং কুরআনিক বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি বর্ণনা।


সঠিক কুরআনিক অবস্থান

কুরআনের অবস্থান পরিষ্কার—

  • গ্রীষ্ম ও শীত আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ফল।
  • সূর্য, পৃথিবীর গতি, বায়ুপ্রবাহ—এসবই আল্লাহর সৃষ্টি করা কারণ।
  • জাহান্নাম আখিরাতের বিষয়, দুনিয়ার আবহাওয়ার নয়।

আল্লাহ কোনো কিছুকে কারণ দিয়ে সৃষ্টি করেন, কিন্তু কুরআন কখনো কল্পকাহিনিকে সেই কারণ হিসেবে দাঁড় করায় না।


উপসংহার

নবীর নামে বর্ণিত কোনো কথা যদি কুরআনের স্পষ্ট আয়াত, বাস্তব জ্ঞান ও আল্লাহর সুন্নাতের বিরুদ্ধে যায়, তবে সেটিকে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করা ঈমান নয়—বরং ঈমানহীন অনুসরণ। আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন কুরআন, যেন আমরা তা দিয়ে বিচার করি।

শ্লোগান:
কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ—না মিললে বর্জন; কুরআনই সত্য ও মিথ্যার একমাত্র মানদণ্ড।

জাহান্নামের আগুন শ্বাস নেয়—একটি কল্পকথার হাদিস ও কুরআনের স্পষ্ট বিরোধিতা


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page