• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ন

নবীর মর্যাদা কি জনাকীর্ণ রাস্তায় নগ্ন দৌড়ের কাহিনিতে রক্ষিত হয়?

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১০৮ Time View
Update : রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

নবীর মর্যাদা কি জনাকীর্ণ রাস্তায় নগ্ন দৌড়ের কাহিনিতে রক্ষিত হয়? — কুরআনের মানদণ্ডে হযরত মূসা (আ.)-কে নিয়ে একটি বহুল প্রচারিত হাদিসের বিচার

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

ভূমিকা

কুরআন যখন কোনো নবীর কথা বলে, তখন তাঁর চরিত্র, লজ্জাবোধ, নৈতিক দৃঢ়তা ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ মর্যাদায় তুলে ধরে। নবীরা কুরআনের ভাষায় কেবল ইতিহাসের চরিত্র নন; তাঁরা মানবজাতির জন্য নৈতিক আদর্শ। সেজন্য কুরআন নবীদের বিষয়ে ভাষা বেছে নেয় অত্যন্ত সংযতভাবে—অশ্লীলতা, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত দৃশ্য বা বিব্রতকর বর্ণনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

কিন্তু ইসলামের নামে প্রচলিত কিছু হাদিসে এমন সব কাহিনি পাওয়া যায়, যেগুলো নবীদের এই কুরআনিক মর্যাদার সাথে গুরুতর সংঘর্ষে লিপ্ত। এর মধ্যে একটি হলো—হযরত মূসা (আ.)-কে জনাকীর্ণ রাস্তায় লোকজনের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দৌড়াতে দেখানোর কাহিনি। এই প্রবন্ধে আমরা সেই বর্ণনাকে কুরআনের মানদণ্ডে বিচার করব।


উল্লিখিত হাদিস (আরবি, বাংলা ও তথ্যসূত্রসহ)

হাদিস (আরবি):
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «إِنَّ مُوسَى كَانَ رَجُلًا حَيِيًّا سِتِّيرًا، لَا يُرَى مِنْ جِلْدِهِ شَيْءٌ، فَآذَاهُ مَنْ آذَاهُ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ، فَقَالُوا: مَا يَسْتَتِرُ هَذَا التَّسَتُّرَ إِلَّا مِنْ عَيْبٍ بِجِلْدِهِ…»
(এরপর বর্ণনায় আসে—মূসা (আ.) গোসলের সময় পাথরের উপর কাপড় রাখেন, পাথর কাপড় নিয়ে দৌড় দেয়, আর মূসা (আ.) লোকজনের সামনে নগ্ন অবস্থায় পাথরের পেছনে দৌড়াতে থাকেন।)

বাংলা সারমর্ম:
আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন—
বনি ইসরাঈলের লোকেরা বলত, মূসা (আ.) এত বেশি লজ্জাশীল কেন, নিশ্চয়ই তাঁর শরীরে কোনো দোষ আছে। একদিন তিনি নির্জনে গোসল করলেন, কাপড় পাথরের ওপর রাখলেন। পাথর কাপড় নিয়ে দৌড়াতে লাগল, আর মূসা (আ.) লোকদের সামনে নগ্ন অবস্থায় পাথরের পেছনে দৌড়াতে লাগলেন—ফলে লোকেরা তাঁর শরীর দেখে বুঝল যে তাঁর কোনো দোষ নেই।

তথ্যসূত্র:
সহিহ বুখারী
– ১ম খণ্ড, হাদিস ২৭৭
– ৪র্থ খণ্ড, হাদিস ৬১৬


এই কাহিনির মৌলিক প্রশ্ন

এই বর্ণনার মুখ্য দাবি হলো—
আল্লাহ নাকি হযরত মূসা (আ.)-এর শরীরের “দোষ নেই” প্রমাণ করার জন্য তাঁকে জনসমক্ষে নগ্ন অবস্থায় দৌড়াতে দিলেন।

এখানেই একাধিক মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—

এই ঘটনা কি নবীর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আল্লাহ কি তাঁর নবীর সম্মান রক্ষার জন্য এমন অশালীন দৃশ্যের প্রয়োজন বোধ করেন?
কুরআন কি কখনো নবীদের এভাবে উপস্থাপন করেছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে আমাদের কুরআনের দিকে ফিরে যেতে হবে।


কুরআনে হযরত মূসা (আ.)-এর মর্যাদা

কুরআন হযরত মূসা (আ.)-কে পরিচয় করিয়েছে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদায়—

وَاصْطَنَعْتُكَ لِنَفْسِي

“আমি তোমাকে আমার জন্য বিশেষভাবে নির্বাচিত করেছি।”
(সূরা ত্বা-হা ২০:৪১)

এছাড়া কুরআন তাঁকে বলেছে—

وَكَانَ عِندَ اللَّهِ وَجِيهًا

“তিনি আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান ছিলেন।”
(সূরা আল-আহযাব ৩৩:৬৯)

এই আয়াতেই আল্লাহ ইঙ্গিত দিয়েছেন—মূসা (আ.) সম্পর্কে বনি ইসরাঈলের অপবাদ ছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সেই অপবাদ থেকে মর্যাদার সাথে মুক্ত করেছেন, কোনো অশ্লীল ঘটনার মাধ্যমে নয়।


সূরা আহযাব ৬৯: সরাসরি দলিল

আল্লাহ বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَىٰ فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছিল; অতঃপর আল্লাহ তাঁকে তাদের কথার অপবাদ থেকে মুক্ত করেছিলেন।”
(সূরা আল-আহযাব ৩৩:৬৯)

এই আয়াত লক্ষ করুন—
এখানে কোথাও বলা হয়নি যে, আল্লাহ তাঁকে নগ্ন করে লোকের সামনে দৌড় করিয়ে অপবাদ খণ্ডন করেছেন। বরং কুরআনের ভাষা সংযত, সম্মানজনক ও নৈতিক


নবীদের লজ্জাবোধ ও কুরআনের নীতি

কুরআন নবীদের লজ্জাহীন দৃশ্যে উপস্থাপন করে না। বরং লজ্জাবোধ (হায়া) কুরআনের একটি মৌলিক নৈতিক স্তম্ভ।

আল্লাহ বলেন—

إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَاحِشَةَ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ অশ্লীলতা পছন্দ করেন না।”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২৮)

যে আল্লাহ অশ্লীলতা অপছন্দ করেন, তিনি কি তাঁর একজন মহান নবীকে জনাকীর্ণ পথে নগ্ন করে দৌড় করাবেন—এটা কি কুরআনিক চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?


আল্লাহ কি অপবাদ খণ্ডনের জন্য অশ্লীলতার আশ্রয় নেন?

কুরআনের সর্বত্র আমরা দেখি—আল্লাহ অপবাদ খণ্ডন করেন ওহি, সত্য ও নৈতিকতার মাধ্যমে, কখনোই অশালীন দৃশ্যের মাধ্যমে নয়। মারইয়াম (আ.)-এর ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাঁর পবিত্রতা প্রমাণ করেছেন অলৌকিক নিদর্শনের মাধ্যমে, নগ্নতা বা লজ্জাহানিকর কোনো ঘটনার মাধ্যমে নয়।

এটা প্রমাণ করে—
নগ্ন দৌড়ের কাহিনি আল্লাহর পদ্ধতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


এই বর্ণনার অন্তর্নিহিত সমস্যা

এই হাদিসে তিনটি গুরুতর সমস্যা রয়েছে—

প্রথমত, এটি নবীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
দ্বিতীয়ত, এটি কুরআনের সংযত ভাষার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তৃতীয়ত, এটি আল্লাহর বিচারপ্রণালীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে—যেন সত্য প্রমাণের জন্য অশ্লীল দৃশ্য প্রয়োজন।

এ ধরনের বর্ণনা নবীদের মানুষ নয়, বরং হাস্যকর কাহিনির চরিত্রে নামিয়ে আনে।


কুরআনের আলোকে সঠিক অবস্থান

কুরআনের আলোকে সঠিক অবস্থান হলো—
হযরত মূসা (আ.) ছিলেন মর্যাদাবান, লজ্জাশীল ও আল্লাহর নির্বাচিত নবী। বনি ইসরাঈলের অপবাদ আল্লাহ নিজেই খণ্ডন করেছেন, কিন্তু তা করেছেন সম্মান ও নৈতিকতার সাথে, কোনো নগ্ন কাহিনির মাধ্যমে নয়।

অতএব যে বর্ণনা কুরআনের এই স্পষ্ট নীতির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত, তা যত সহিহ নামেই পরিচিত হোক না কেন, কুরআনের মানদণ্ডে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।


উপসংহার

ইসলাম নবীদের নিয়ে কৌতুক, অশ্লীলতা বা নাটকীয় দৃশ্যের ধর্ম নয়। কুরআন নবীদের আমাদের সামনে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে—যাদের থেকে আমরা চরিত্র, সংযম ও আল্লাহভীতি শিখি। যে কোনো বর্ণনা যদি এই আদর্শ ভেঙে দেয়, তবে সেটিকে প্রশ্ন করা বিদ্রোহ নয়; বরং কুরআনের প্রতি আনুগত্য।


চূড়ান্ত শ্লোগান

“কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ,
কুরআনের সাথে না মিললে—বর্জন।”

নবীর মর্যাদা কি জনাকীর্ণ রাস্তায় নগ্ন দৌড়ের কাহিনিতে রক্ষিত হয়? — কুরআনের মানদণ্ডে হযরত মূসা (আ.)-কে নিয়ে একটি বহুল প্রচারিত হাদিসের বিচার


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page