• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:০৫ পূর্বাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৭ : আয়াত ১৭২

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২০৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ৭ : আয়াত ১৭২

তাফসীর।। Friends of Quran Foundation


ভূমিকা: “আলাস্তু বিরাব্বিকুম” — মানব আত্মার প্রাচীন সাক্ষ্য

সূরা আ‘রাফের ১৭২ নম্বর আয়াত কুরআনের অন্যতম গভীর ও আলোচিত আয়াত। এখানে আল্লাহ তাআলা এমন একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, যা মানুষের অস্তিত্ব, তার দায়িত্ববোধ, ঈমান, জবাবদিহি—সব কিছুর ভিত্তির সাথে সম্পর্কিত। আয়াতটি হলো—

“আর যখন তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পিঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের উপর সাক্ষী করলেন—‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলল—‘অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।’—যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা না বলো, ‘আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।’”
(সূরা আ‘রাফ ৭:১৭২)

এই আয়াতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। কেউ এটিকে আক্ষরিক অর্থে একটি অতীত ঘটনার বর্ণনা হিসেবে বোঝেন; কেউ বলেন এটি মানুষের স্বভাবজাত ঈমান বা ফিতরাহর রূপক ভাষা। কিন্তু কুরআন-নিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা প্রথমে কুরআনের ভেতরেই দেখি—এই আয়াত কী বলছে, কী উদ্দেশ্যে বলছে, এবং এর প্রেক্ষাপট কী।


প্রেক্ষাপট: সূরা আ‘রাফে ধারাবাহিক আলোচনার অংশ

সূরা আ‘রাফের মাঝামাঝি অংশে আল্লাহ মানবজাতির ইতিহাস, নবীদের দাওয়াত, এবং মানুষের অবাধ্যতার ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছেন। আদম (আ.)-এর ঘটনা, ইবলিসের অস্বীকৃতি, বনী ইসরাইলের অবাধ্যতা—এসব আলোচনার পর ১৭২ নম্বর আয়াতে হঠাৎ করে একটি গভীর স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়—মানুষ একদিন তার রবের সামনে সাক্ষ্য দিয়েছে।

এই আয়াতের পরপরই ১৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—

“অথবা তোমরা যেন না বলো—আমাদের পিতৃপুরুষরা পূর্বে শিরক করেছিল, আর আমরা ছিলাম তাদের পরবর্তী বংশধর; তাহলে কি তুমি আমাদের ধ্বংস করবে তাদের কৃতকর্মের জন্য?”
(৭:১৭৩)

অর্থাৎ ১৭২ নম্বর আয়াতটি মানুষের ভবিষ্যৎ অজুহাত বন্ধ করার প্রসঙ্গে এসেছে। আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন—মানুষের কাছে এমন এক সাক্ষ্য রয়েছে, যা তাকে অজুহাতহীন করে দেয়।


আয়াতের মূল বক্তব্য: সাক্ষ্য, দায়িত্ব, জবাবদিহি

আয়াতের তিনটি অংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

১. “আদম সন্তানের পিঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন”
২. “তাদের নিজেদের উপর সাক্ষী করলেন—আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?”
৩. “যাতে তোমরা কিয়ামতের দিন না বলো—আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।”

এই তিনটি অংশ মিলেই আয়াতের পূর্ণ অর্থ দাঁড়ায়। এখন আমরা কুরআন-নিষ্ঠ বিশ্লেষণে এগুলো ব্যাখ্যা করব।


“পিঠদেশ থেকে বংশধরদের বের করা” — এর অর্থ কী?

আয়াতে বলা হয়েছে—আল্লাহ আদম সন্তানের পিঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন। কুরআনের অন্য আয়াতেও “পিঠদেশ” থেকে বংশ বিস্তারের কথা এসেছে। যেমন—

“তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ থেকে, তারপর তার থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, এবং তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু অবতীর্ণ করেছেন… তিনি তোমাদের মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করেন এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে।”
(সূরা যুমার ৩৯:৬)

এখানে দেখা যায়, মানুষের বংশবিস্তার একটি ধারাবাহিক জৈবিক প্রক্রিয়া। সুতরাং “পিঠদেশ থেকে বের করা” কথাটি মানুষের প্রজন্মের ধারাবাহিক উৎপত্তির দিকেই ইঙ্গিত করে।

অর্থাৎ, এটি এমনও হতে পারে—আল্লাহ মানবজাতিকে এমন স্বভাব ও চেতনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যাতে প্রত্যেক প্রজন্ম তার ভেতরে রবকে চেনার ক্ষমতা বহন করে।


“আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” — প্রশ্নের তাৎপর্য

এই অংশটি আয়াতের কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহ প্রশ্ন করছেন—“আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?”
তারা উত্তর দিচ্ছে—“অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।”

এখানে লক্ষ্যণীয়, আল্লাহ বলছেন না—“তোমরা কি আমাকে মানো?” বরং বলছেন—“আমি কি তোমাদের রব নই?” অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, নিয়ন্ত্রক—এই পরিচয়।

কুরআনের অন্য আয়াতেও দেখা যায়, মানুষ স্বীকার করে আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা। যেমন—

“তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস কর—কে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে—আল্লাহ।”
(সূরা লুকমান ৩১:২৫)

অর্থাৎ মানুষের ভেতরে এক স্বাভাবিক স্বীকৃতি রয়েছে—আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা।


এটি কি আক্ষরিক ঘটনা?

কুরআন-নিষ্ঠ পদ্ধতিতে আমরা প্রথমে দেখি—কুরআন কি অন্য কোথাও এই ঘটনার বিস্তারিত দিয়েছে?
না, কুরআনে এমন কোনো আয়াত নেই যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে মানব আত্মাগুলো একত্রে এনে শপথ নেওয়া হয়েছিল। বরং এখানে সংক্ষিপ্ত ভাষায় একটি সাক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আল্লাহর উদ্দেশ্য কী? আয়াতের শেষ অংশেই তার উত্তর—

“যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা না বলো—আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।”

অর্থাৎ এটি মানুষের অজুহাত রোধের জন্য উল্লেখিত।


ফিতরাহ: মানুষের অন্তর্নিহিত স্বীকৃতি

কুরআনের আলোকে বোঝা যায়—আল্লাহ মানুষকে এমন স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যাতে সে তার রবকে চিনতে সক্ষম হয়। সূরা রূমে বলা হয়েছে—

“তুমি তোমার মুখ একনিষ্ঠভাবে দ্বীনের দিকে স্থির রাখো—আল্লাহর সেই প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা রূম ৩০:৩০)

এখানে “প্রকৃতি” বা স্বভাব (ফিতরাহ) মানুষের ভেতরের সেই প্রাকৃতিক প্রবণতা—যা সত্য, ন্যায় ও সৃষ্টিকর্তার স্বীকৃতির দিকে ধাবিত।

অতএব, সূরা আ‘রাফ ১৭২-এর সাক্ষ্যকে এমনভাবে বোঝা যায়—আল্লাহ মানুষকে এমন এক চেতনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যা তাকে স্বাভাবিকভাবেই তার রবকে চেনার সাক্ষী করে তোলে।


অজুহাতের অবসান

আয়াত ১৭৩-এ আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন—

“অথবা তোমরা যেন না বলো—আমাদের পিতৃপুরুষরা পূর্বে শিরক করেছিল…”

অর্থাৎ, মানুষ যেন বলতে না পারে—
আমরা তো জানতাম না।
আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করেছি।

আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন—তোমাদের ভেতরে সাক্ষ্য ছিল। তোমাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছে, কিতাব পাঠানো হয়েছে, নিদর্শন দেখানো হয়েছে। সুতরাং অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।


কুরআনের সামগ্রিক বার্তার সাথে সামঞ্জস্য

কুরআনের বার্তা বারবার একটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে—মানুষ দায়িত্বশীল সত্তা।
সে অজ্ঞতার অজুহাত দিতে পারবে না, কারণ—

  • তাকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে
  • তাকে বিবেক দেওয়া হয়েছে
  • তাকে নিদর্শন দেখানো হয়েছে

এই আয়াত সেই সার্বজনীন সত্যকেই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়।


উপসংহার: আয়াতের মূল শিক্ষা

সূরা আ‘রাফ ১৭২ আমাদের শেখায়—

১. মানুষ স্রষ্টাকে চেনার স্বভাব নিয়ে জন্মায়।
২. আল্লাহর রবুবিয়্যাত মানুষের অন্তরে স্বীকৃত।
৩. কিয়ামতের দিন অজ্ঞতার অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না।
৪. পূর্বপুরুষের ভুল অনুসরণের দায় ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হবে।

এটি এমন একটি আয়াত যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আমাদের ঈমান কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত একটি সাক্ষ্য।



আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page