• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৫৫ : আয়াত ৯

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৮০ Time View
Update : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আর-রহমান : আয়াত ৭–৯

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation


আয়াত (আরবি):

وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ ۝ أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ ۝ وَأَقِيمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيزَانَ ۝


ভাবার্থভিত্তিক সঠিক তর্জমা:

আর আকাশকে তিনি উচ্চে স্থাপন করেছেন
এবং তিনি মীযান (ভারসাম্য ও মানদণ্ড) স্থাপন করেছেন—
যাতে তোমরা মীযানে সীমালঙ্ঘন না করো।
আর ন্যায়ের সাথে ওজন প্রতিষ্ঠা করো
এবং মীযানে কোনো ঘাটতি করো না।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আর-রহমানের এই তিনটি আয়াত কুরআনের ন্যায় ও ভারসাম্য দর্শনের সবচেয়ে মৌলিক ঘোষণা। এখানে আল্লাহ ন্যায়বিচারকে কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক বিধান হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং তিনি একে সৃষ্টিজগতের কাঠামোর অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। আয়াতের প্রথম বাক্যেই বলা হয়—“তিনি আকাশকে উচ্চে স্থাপন করেছেন এবং মীযান স্থাপন করেছেন।” অর্থাৎ আকাশের শৃঙ্খলা ও মীযানের ধারণা একই বাক্যে যুক্ত। এটি দেখায়—যে ভারসাম্যে মহাবিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে, সেই একই ভারসাম্য মানবসমাজেও চাওয়া হয়েছে।

এখানে “মীযান” শব্দটি অত্যন্ত গভীর। এটি কেবল দাঁড়িপাল্লা নয়; বরং মানদণ্ড, সীমা, ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি। আল্লাহ যেভাবে মহাবিশ্বকে নির্দিষ্ট নিয়ম ও পরিমাপে পরিচালনা করছেন—গ্রহের কক্ষপথ, দিন-রাতের ভারসাম্য, ঋতুচক্র—ঠিক তেমনি মানুষের জীবন, সমাজ ও অর্থনীতিতেও একটি নৈতিক মীযান থাকা আবশ্যক।

দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেন—“যাতে তোমরা মীযানে সীমালঙ্ঘন না করো।” এখানে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে যে, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রবণতা হলো সীমা অতিক্রম করা—নিজের লাভের জন্য, ক্ষমতার জন্য, সুবিধার জন্য। কুরআনের ভাষায় এই সীমালঙ্ঘনই “তাগিয়ান”। অর্থাৎ ন্যায় শুধু লঙ্ঘিত হয় না; বরং ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলা হয়।

তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ আদেশ দেন—“ন্যায়ের সাথে ওজন প্রতিষ্ঠা করো এবং মীযানে কোনো ঘাটতি করো না।” এখানে দুটি নির্দেশ একসাথে এসেছে। প্রথমত, ন্যায়কে কায়েম করা—অর্থাৎ এটি সক্রিয় দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, ঘাটতি না করা—অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত কমানো, ফাঁকি দেওয়া, প্রতারণা বন্ধ করা। সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন ৮৩:১–৩–এ যে অপরাধের নিন্দা করা হয়েছে, এখানে তার মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই আয়াতগুলো আমাদের জানিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার মানুষের বানানো কোনো নৈতিক বিলাসিতা নয়। এটি আল্লাহর সৃষ্টির কাঠামোর অংশ। যে সমাজ মীযান ভেঙে ফেলে, সে সমাজ প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়। তাই কুরআনের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক অবিচার, সামাজিক ভারসাম্যহীনতা ও নৈতিক বিশৃঙ্খলা—সবই একই সমস্যার ভিন্ন রূপ।


এই আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য আয়াতসমূহ

  • সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন : ১–৩
    মীযানে ঘাটতি করা—ধ্বংসের কারণ হিসেবে ঘোষিত।
  • সূরা আল-আন‘আম : ১৫২
    পরিমাপ ও ওজন ন্যায়সহকারে পূর্ণ করার নির্দেশ।
  • সূরা আন-নিসা : ১৩৫
    ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদেশ।
  • সূরা আল-বাকারা : ১৪৩
    উম্মাতে ওয়াসাত—ভারসাম্যপূর্ণ জাতি হওয়ার ঘোষণা।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

আজকের বিশ্বে ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে নানা স্তরে—অর্থনীতিতে চরম বৈষম্য, পরিবেশে ধ্বংস, রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার। সূরা আর-রহমান ৭–৯ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই সংকটগুলোর মূল কারণ একটাই: মীযান ভাঙা। মানুষ যখন নিজের সুবিধাকে মানদণ্ড বানায়, তখন আল্লাহর স্থাপিত ভারসাম্য লঙ্ঘিত হয়। কুরআনের সমাধান তাই শুধু আইন নয়; বরং নৈতিক পুনর্গঠন।


সংক্ষেপে

সূরা আর-রহমান ৭–৯ ঘোষণা করে— আকাশ যেমন ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে আছে, মানব সমাজও তেমনি ন্যায় ও মানদন্ডে ভারসাম্যে দাঁড়াতে হবে।

যেখানে মীযান ভাঙে, সেখানে শুধু ব্যবসা নয়—সভ্যতাই ভেঙে পড়ে।

কুরআনের দৃষ্টিতে ন্যায়বিচার কোনো বিকল্প নয়;
এটি সৃষ্টির মৌলিক নিয়ম।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page