• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৫ : আয়াত ১

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২৬৮ Time View
Update : রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আল-মায়িদাহ : আয়াত ১

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ ۚ أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ ۗ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ


বাংলা ভাবার্থ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো। তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে—তবে যা তোমাদেরকে পড়ে শোনানো হবে তা ব্যতীত—এবং ইহরাম অবস্থায় শিকারকে হালাল মনে করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ যা ইচ্ছা ফয়সালা করেন।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আল-মায়িদাহ একটি বিধানভিত্তিক সূরা। এখানে হালাল-হারাম, চুক্তি, খাদ্যবিধান, ইবাদতের শৃঙ্খলা—এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে এসেছে। এই সূরার প্রথম আয়াতই একটি মৌলিক নৈতিক নীতির ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছে—“অঙ্গীকার পূর্ণ করো।” অর্থাৎ দ্বীনের ভিত কেবল ইবাদত নয়; প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বস্ততা।

আয়াতের সূচনা—
“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا”
হে ঈমানদারগণ।

এই সম্বোধন নির্দেশ করে—অঙ্গীকার রক্ষা ঈমানের দাবী। এটি কেবল সামাজিক নীতি নয়; ঈমানের অংশ।

এরপর বলা হয়েছে—
“أَوْفُوا بِالْعُقُودِ”
তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।

“আকদ” শব্দের অর্থ চুক্তি, প্রতিশ্রুতি, বাধ্যবাধকতা। এটি বিস্তৃত—আল্লাহর সাথে চুক্তি (ঈমান, ইবাদত), মানুষের সাথে চুক্তি (বিবাহ, ব্যবসা, সামাজিক অঙ্গীকার), এমনকি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক চুক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত। কুরআন অন্যত্র বলেছে—
“وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولًا” (১৭:৩৪)
অঙ্গীকার পূর্ণ করো; অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

অতএব ৫:১ আয়াতের প্রথম অংশ একটি সর্বজনীন নীতি স্থাপন করে—বিশ্বাসযোগ্যতা ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না।

এরপর আয়াত খাদ্যবিধানের দিকে যায়—
“أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ”
তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে।

এখানে “বাহীমাতুল আন‘আম” বলতে উট, গরু, ছাগল প্রভৃতি গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু বোঝানো হয়েছে। ইসলাম খাদ্যে সংকীর্ণতা আরোপ করেনি; বরং মূলনীতি হলো—হালাল। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে, যা পরবর্তী আয়াতগুলোতে বিস্তারিত এসেছে (৫:৩ ইত্যাদি)।

এরপর বলা হয়েছে—
“إِلَّا مَا يُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ”
যা তোমাদেরকে পড়ে শোনানো হবে তা ব্যতীত।

অর্থাৎ কিছু নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ বিষয় রয়েছে—যেমন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত প্রাণী ইত্যাদি (৫:৩)। এখানে একটি নীতি দেখা যায়—হালাল মূলধারা, হারাম নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম।

এরপর বলা হয়েছে—
“غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ”
তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকারকে হালাল মনে করো না।

ইহরাম হলো হজ বা উমরাহর সময়ের বিশেষ অবস্থা, যেখানে কিছু কাজ নিষিদ্ধ। এর মধ্যে শিকারও রয়েছে। অর্থাৎ দ্বীন কেবল সাধারণ জীবন নয়; বিশেষ ইবাদতের সময় অতিরিক্ত সংযম দাবি করে।

আয়াত শেষ হয়েছে—
“إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ”
নিশ্চয়ই আল্লাহ যা ইচ্ছা ফয়সালা করেন।

এখানে একটি মৌলিক আকীদাহ রয়েছে—হালাল-হারামের নির্ধারক মানুষ নয়; আল্লাহ। মানুষ নিজের পছন্দমতো বিধান বানাতে পারে না। আল্লাহর বিধানই চূড়ান্ত।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত চারটি ভিত্তি স্থাপন করে:

প্রথমত, ঈমান মানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জীবন।
দ্বিতীয়ত, হালাল-হারাম আল্লাহ নির্ধারণ করেন।
তৃতীয়ত, দ্বীনের বিধান জীবনব্যাপী—ব্যবসা, খাদ্য, ইবাদত সব ক্ষেত্রেই।
চতুর্থত, বিশেষ ইবাদতের সময় সংযমের মাত্রা বাড়ে।

এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য আছে—দ্বীন সংকীর্ণ নয়; আবার নিয়ন্ত্রণহীনও নয়। হালাল বিস্তৃত, হারাম নির্দিষ্ট। কিন্তু অঙ্গীকার ভঙ্গ, বিশ্বাসঘাতকতা—এসব গুরুতর।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ১৭:৩৪ — অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা
  • ৫:৩ — খাদ্যবিধানের বিস্তারিত
  • ২:১৭৭ — অঙ্গীকার পূর্ণ করা নেকির অংশ
  • ৫:৯৫ — ইহরাম অবস্থায় শিকার নিষিদ্ধ

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা
✔ ব্যবসা, বিবাহ ও সামাজিক চুক্তিতে বিশ্বস্ত থাকা
✔ হালাল-হারাম নির্ধারণে আল্লাহর বিধান মানা
✔ ইবাদতের সময় সংযম বাড়ানো
✔ দ্বীনকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা

আল্লাহ আমাদেরকে অঙ্গীকার রক্ষাকারী বানান, তাঁর বিধানকে সম্মান করার তাওফীক দিন এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page