লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحِلُّوا شَعَائِرَ اللَّهِ وَلَا الشَّهْرَ الْحَرَامَ وَلَا الْهَدْيَ وَلَا الْقَلَائِدَ وَلَا آمِّينَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّن رَّبِّهِمْ وَرِضْوَانًا ۚ وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا ۚ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا ۘ وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
হে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছ, তোমরা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে লঙ্ঘন করো না; নিষিদ্ধ মাসকে লঙ্ঘন করো না; উৎসর্গের জন্য নির্ধারিত পশুকে লঙ্ঘন করো না; তাদের গলায় দেওয়া চিহ্নকে লঙ্ঘন করো না; এবং যারা পবিত্র গৃহের উদ্দেশে যায়—তারা তাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে—তাদের বাধা দিও না। আর যখন তোমরা পবিত্র অবস্থা থেকে মুক্ত হবে, তখন শিকার করো। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ—কারণ তারা তোমাদের মসজিদুল হারাম থেকে বাধা দিয়েছিল—তোমাদের যেন সীমা অতিক্রমে প্ররোচিত না করে। তোমরা সৎকাজ ও আল্লাহর বিষয়ে সচেতনতার ক্ষেত্রে পরস্পর সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমা অতিক্রমে সহযোগিতা করো না। এবং আল্লাহর বিষয়ে সংযত হও। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর।
সূরা আল-মায়িদাহর এই আয়াতটি ইসলামের নৈতিক-সভ্যতার এক বিস্তৃত নীতিপত্র। এখানে একদিকে ইবাদতের প্রতীকসমূহের মর্যাদা রক্ষা, অন্যদিকে আবেগ-বিদ্বেষের উপর ন্যায় প্রতিষ্ঠা, এবং তৃতীয়দিকে সামাজিক সহযোগিতার মূলনীতি একত্রে উপস্থাপিত হয়েছে। এই আয়াত কেবল হজ বা শিকার সম্পর্কিত বিধান নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার ঘোষণা।
আয়াতের সূচনা—
“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا”
হে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছ।
অর্থাৎ এই নির্দেশগুলো ঈমানের দাবী। কেবল আইনগত বিষয় নয়; আধ্যাত্মিক দায়বদ্ধতা।
প্রথম নির্দেশ—
“لَا تُحِلُّوا شَعَائِرَ اللَّهِ”
আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে লঙ্ঘন করো না।
“শা‘আয়িরুল্লাহ” বলতে আল্লাহ নির্ধারিত প্রতীক, চিহ্ন ও বিধান বোঝানো হয়েছে—যেমন হজ, কুরবানি, ইহরাম, সম্মানিত মাস, পবিত্র স্থান। এগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এগুলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ। এগুলোকে তুচ্ছ করা মানে দ্বীনের ভিত্তিকে দুর্বল করা।
এরপর বলা হয়েছে—
নিষিদ্ধ মাসকে লঙ্ঘন করো না।
এই সম্মানিত মাসগুলো (যুলক্বদ, যুলহিজ্জা, মুহাররম, রজব) এমন সময়, যেখানে যুদ্ধ ও রক্তপাত পরিহার করার ঐতিহ্য ছিল। কুরআন সেই ঐতিহ্যকে শুদ্ধ করে প্রতিষ্ঠা করেছে। সময়েরও মর্যাদা আছে—এ শিক্ষা এখানে পুনরায় এসেছে (দেখুন ৯:৩৬)।
এরপর—
উৎসর্গের জন্য নির্ধারিত পশুকে লঙ্ঘন করো না; তাদের গলায় দেওয়া চিহ্নকে লঙ্ঘন করো না।
হজের সময় কুরবানির পশুকে গলায় চিহ্ন দিয়ে নির্ধারণ করা হতো। সে পশু নিরাপদ থাকবে—এটি ছিল একটি সম্মিলিত সামাজিক সম্মান। এমনকি শত্রুও সেই পশুকে আঘাত করত না। ইসলাম এই নীতিকে বজায় রাখে—ইবাদতের পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এরপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ—
“وَلَا آمِّينَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ”
যারা পবিত্র গৃহের উদ্দেশে যায়—তাদের বাধা দিও না।
এখানে এমন লোকদের কথাও বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে হজে যাচ্ছে—যদিও তারা পূর্বে মুসলিমদের বাধা দিয়েছিল। অর্থাৎ ইবাদতের পথে প্রতিশোধ নয়; ন্যায়।
এরপর বলা হয়েছে—
“وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا”
তোমরা যখন ইহরামমুক্ত হবে, তখন শিকার করো।
অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা সাময়িক। ইহরাম অবস্থায় শিকার নিষিদ্ধ; কিন্তু অবস্থা শেষ হলে বৈধ। দ্বীনের বিধান প্রেক্ষাপটভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল।
এরপর আয়াতের কেন্দ্রীয় নৈতিক ঘোষণা—
“وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ… أَن تَعْتَدُوا”
কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন সীমা অতিক্রমে প্ররোচিত না করে।
এটি কুরআনের ন্যায়নীতির উচ্চতম স্তর। মুসলিমদেরকে মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল। তাদের মনে স্বাভাবিক ক্ষোভ ছিল। কিন্তু কুরআন বলছে—বিদ্বেষ থাকলেও অন্যায় নয়। প্রতিশোধের নামে সীমালঙ্ঘন নয়।
এই একই নীতি ৫:৮ আয়াতে পুনরায় এসেছে—
“বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়চ্যুত না করে; ন্যায় করো—এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।”
এরপর সমাজ গঠনের নীতি—
“وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ”
সৎকাজ ও আল্লাহর বিষয়ে সচেতনতার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করো।
“বির্” মানে নেকি, কল্যাণ, ন্যায়।
“তাকওয়া” মানে আল্লাহর বিষয়ে সচেতন থাকা, সীমা রক্ষা করা।
অর্থাৎ সমাজে সহযোগিতা হবে নেকির পক্ষে। অন্যায়, দুর্নীতি, নিপীড়ন—এসবের সঙ্গে কোনো সহযোগিতা নেই।
এরপর স্পষ্ট নিষেধ—
“وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ”
পাপ ও সীমা অতিক্রমে সহযোগিতা করো না।
এটি এক সর্বজনীন নীতি। কেবল ব্যক্তিগত পাপ নয়; সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়েও সহযোগিতা নিষিদ্ধ। কোনো ব্যবস্থা যদি জুলুমের উপর দাঁড়ায়, সেখানে সহযোগিতা করা এই আয়াতের পরিপন্থী।
শেষে সতর্কতা—
“وَاتَّقُوا اللَّهَ”
আল্লাহর বিষয়ে সংযত হও।
অর্থাৎ সব নির্দেশের মূল হলো তাকওয়া।
এই আয়াত একটি ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতার রূপরেখা দেয়। এখানে দেখা যায়—
এখানে ইসলাম প্রতিশোধের ধর্ম নয়; ন্যায় ও সংযমের ধর্ম। এমনকি যারা পূর্বে বাধা দিয়েছে, তাদের প্রতিও সীমালঙ্ঘন নয়।
✔ আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্মান করা
✔ সম্মানিত সময় ও স্থান রক্ষা
✔ বিদ্বেষের বশে সীমালঙ্ঘন না করা
✔ নেকি ও তাকওয়ার সহযোগী হওয়া
✔ পাপ ও জুলুমে সহযোগিতা না করা
✔ আল্লাহর বিষয়ে সচেতন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া
আল্লাহ আমাদের এমন তাকওয়া দান করুন, যাতে আমরা বিদ্বেষের মধ্যেও ন্যায়পরায়ণ থাকতে পারি, এবং নেকির পথে সহযোগিতার সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
