লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمِيثَاقَهُ الَّذِي وَاثَقَكُم بِهِ إِذْ قُلْتُمْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
তোমাদের প্রতি আল্লাহ যে অনুগ্রহ করেছেন এবং যে অঙ্গীকার তোমাদের থেকে নিয়েছিলেন—তা স্মরণ করো; যখন তোমরা বলেছিলে, “আমরা শুনেছি এবং আমরা পালন করব।” আর আল্লাহ সম্পর্কে সচেতন হও। নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় জানেন।
সূরা আল-মায়িদাহর ৭ নম্বর আয়াত মুসলিম উম্মাহকে তাদের ঈমানী পরিচয়ের মূলভিত্তির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়—অনুগ্রহ (নিয়ামত) এবং অঙ্গীকার (মিসাক)। এর আগের আয়াতগুলোতে হালাল-হারাম, ন্যায়নীতি, সহযোগিতা ইত্যাদি বিধান এসেছে। এখন এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে—এসব বিধান কেবল আইন নয়; এগুলো একটি অঙ্গীকারের অংশ। তোমরা যে দ্বীন গ্রহণ করেছ, তা একটি প্রতিশ্রুতি।
আয়াতের সূচনা—
“وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ”
তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো।
“নিয়ামত” এখানে কেবল রিজিক বা সম্পদ নয়; বরং হিদায়াত, দ্বীন, কুরআন, রাসূল, ঈমান—সবকিছু। সূরা মায়িদাহর প্রেক্ষাপটে এই নিয়ামতের বড় উদাহরণ হলো দ্বীনের পূর্ণতা (৫:৩)। আল্লাহ দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন—এটি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ।
নিয়ামত স্মরণ করা মানে কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। যখন মানুষ নিয়ামত ভুলে যায়, তখন অবাধ্যতা বাড়ে। কুরআন বহুবার সতর্ক করেছে—
“وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ” (১৪:৭)
তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই বৃদ্ধি করব।
অতএব নিয়ামত স্মরণ কেবল আবেগ নয়; আনুগত্যের ভিত্তি।
এরপর বলা হয়েছে—
“وَمِيثَاقَهُ الَّذِي وَاثَقَكُم بِهِ”
এবং সেই অঙ্গীকার যা তিনি তোমাদের থেকে নিয়েছিলেন।
“মিসাক” মানে দৃঢ় অঙ্গীকার। এখানে দুই ধরনের অঙ্গীকারের কথা বোঝানো যেতে পারে:
১. ঈমানের অঙ্গীকার—যখন মানুষ শাহাদাহ গ্রহণ করে।
২. কুরআনের বিধান মানার অঙ্গীকার—“আমরা শুনেছি ও পালন করব।”
আয়াত স্পষ্ট করে—
“إِذْ قُلْتُمْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا”
যখন তোমরা বলেছিলে—আমরা শুনেছি এবং আমরা পালন করব।
এটি মুমিনের ভাষা। সূরা বাকারা (২:২৮৫)-এ একই বাক্য এসেছে—
“আমরা শুনেছি এবং আমরা পালন করেছি।”
এর বিপরীতে বনি ইসরাঈলের একটি অবস্থা ছিল—
“আমরা শুনেছি কিন্তু অবাধ্য হয়েছি।” (৪:৪৬-এর ইঙ্গিত)
অতএব ৫:৭ আয়াত মুসলিমদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—তোমাদের পরিচয় আনুগত্যে।
শোনা মানে কেবল শব্দ শোনা নয়; গ্রহণ করা। আর পালন মানে বাস্তব প্রয়োগ।
এরপর আবার তাকওয়ার নির্দেশ—
“وَاتَّقُوا اللَّهَ”
আল্লাহর বিষয়ে সচেতন হও।
তাকওয়া এখানে অঙ্গীকার রক্ষার অভ্যন্তরীণ শক্তি। কেবল মুখে বলা যথেষ্ট নয়; অন্তরের সততা প্রয়োজন।
শেষে বলা হয়েছে—
“إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ”
নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় জানেন।
এটি গভীর সতর্কতা। মানুষ প্রকাশ্যে আনুগত্যের কথা বলতে পারে, কিন্তু অন্তরে দ্বিধা বা অবাধ্যতা লালন করতে পারে। আল্লাহ বাহ্যিক ঘোষণার চেয়ে অন্তরের অবস্থা জানেন। সূরা গাফির (৪০:১৯)-এ বলা হয়েছে—
“তিনি চোখের গোপন দৃষ্টি ও অন্তরের গোপন বিষয় জানেন।”
অতএব এই আয়াত বাহ্যিক প্রতিশ্রুতি ও অন্তরের সততার সমন্বয় দাবি করে।
এই আয়াত চারটি মৌলিক শিক্ষা দেয়:
১. দ্বীন আল্লাহর নিয়ামত—এটি কৃতজ্ঞতার দাবি রাখে।
২. ঈমান একটি অঙ্গীকার—শোনা ও পালন।
৩. আনুগত্য কেবল মুখের ঘোষণা নয়; অন্তরের সততা।
৪. আল্লাহ অন্তরের গোপন অবস্থা জানেন—অতএব ভণ্ডামি নয়।
এটি মুসলিম সমাজকে আত্মসমালোচনায় আহ্বান করে—আমরা কি সত্যিই “সামি‘না ওয়া আতাআনা” অবস্থায় আছি, নাকি কেবল শুনি কিন্তু পালন করি না?
✔ আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করা
✔ ঈমানী অঙ্গীকার নবায়ন করা
✔ শোনা মানে পালন করা
✔ অন্তরের সততা রক্ষা
✔ তাকওয়ার মাধ্যমে অঙ্গীকার পূর্ণ করা
আল্লাহ আমাদেরকে এমন অন্তর দান করুন, যা কেবল বলে না—“আমরা শুনেছি”—বরং সত্যিকার অর্থে পালন করে; এবং আমাদেরকে তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞ বানান। নিশ্চয় তিনি অন্তরের গোপন বিষয় জানেন।
