লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
الم
আলিফ-লাম-মীম।
সূরা আল-বাকারার প্রথম আয়াত—“الم”—মাত্র তিনটি অক্ষর। কোনো বাক্য নয়, কোনো স্পষ্ট নির্দেশ নয়, কোনো দৃশ্যচিত্র নয়। তবুও এটি কুরআনের অন্যতম গভীর ও চিন্তাজাগানিয়া সূচনা। এই তিনটি অক্ষরকে বলা হয় হুরূফে মুকাত্তা‘আত—অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ।
কুরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে এ ধরনের অক্ষর এসেছে—যেমন “الم”, “الر”, “كهيعص”, “طه”, “يس” ইত্যাদি। এগুলোর অর্থ নিয়ে যুগে যুগে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কুরআন নিজে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। এখানেই রয়েছে গভীর শিক্ষা।
“الم” তিনটি আরবি অক্ষর—আলিফ, লাম, মীম। এগুলো আলাদা আলাদা উচ্চারণ করা হয়। প্রশ্ন হলো—এগুলোর অর্থ কী?
কুরআনের প্রাথমিক মুফাসসিরগণ বলেছেন—এগুলোর প্রকৃত অর্থ আল্লাহই ভালো জানেন। কারণ কুরআন নিজেই ঘোষণা করেছে—
“وما يعلم تأويله إلا الله” (৩:৭)
এর প্রকৃত ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
অতএব প্রথম শিক্ষা—মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। কুরআনের কিছু অংশ আমাদের বোধগম্য, কিছু অংশ পরীক্ষা হিসেবে রহস্যময়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—যেসব সূরার শুরুতে হুরূফে মুকাত্তা‘আত এসেছে, তার অনেকগুলোর পরপরই কুরআনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন:
الم ذلك الكتاب لا ريب فيه (২:১–২)
الر تلك آيات الكتاب (১০:১)
حم تنزيل الكتاب من الله (৪০:১–২)
এতে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আছে। যেন বলা হচ্ছে—এই কুরআন গঠিত হয়েছে তোমাদের পরিচিত অক্ষর দিয়ে। আলিফ, লাম, মীম—এসব তো তোমাদের ভাষার অক্ষর। তবুও তোমরা এর মতো একটি গ্রন্থ আনতে পারছ না।
অর্থাৎ এটি একটি চ্যালেঞ্জ। কুরআন বারবার বলেছে—
“فأتوا بسورة من مثله” (২:২৩)
এর মতো একটি সূরা নিয়ে আসো।
সুতরাং “الم” হতে পারে সেই ভাষাগত চ্যালেঞ্জের সূচনা—এই অক্ষর দিয়েই কুরআন, অথচ এর মতো কিছু তোমরা আনতে পার না।
“الم” মানুষের বুদ্ধিকে নম্র করে। আমরা সবকিছু ব্যাখ্যা করতে চাই। কিন্তু এখানে কুরআন আমাদের থামায়। বলে—সবকিছু তোমাদের আয়ত্তে নয়।
এটি ঈমানের একটি স্তর। ঈমান মানে কেবল বুঝে গ্রহণ করা নয়; আল্লাহর জ্ঞানের উপর আস্থা রাখা। সূরা বাকারা (২:৩)-এ বলা হয়েছে—
“الذين يؤمنون بالغيب”
যারা অদৃশ্য বিষয়ের উপর ঈমান রাখে।
“الم” সেই অদৃশ্য জ্ঞানের অংশ। আমরা এর মাধ্যমে শিখি—মানবজ্ঞান সীমিত, আল্লাহর জ্ঞান অসীম।
একটি সাহিত্যিক দিকও রয়েছে। “الم”—তিনটি অক্ষর—শ্রোতাকে থামিয়ে দেয়। আরবরা যখন এটি শুনত, তারা চমকে উঠত। কারণ এটি প্রচলিত বক্তৃতার ধরন নয়। এটি মনোযোগ আকর্ষণের এক অভিনব পদ্ধতি।
এরপর আসে—
“ذلك الكتاب لا ريب فيه”
এই সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই।
অর্থাৎ “الم” একটি দরজা—এর পর শুরু হয় কুরআনের ঘোষণা।
ইতিহাসে কেউ কেউ “الم” অক্ষরের সংখ্যাগত মান বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কুরআন নিজে এমন কোনো ইঙ্গিত দেয় না। তাই নিরাপদ অবস্থান হলো—যেখানে কুরআন নীরব, সেখানে অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা নয়।
প্রথম যুগের সাহাবাগণ যখন এই আয়াত শুনেছেন, তারা অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেননি; বরং গ্রহণ করেছেন।
কিছু আলেম বলেছেন—এই অক্ষরগুলো আল্লাহর নাম বা গুণের ইঙ্গিত হতে পারে। তবে নিশ্চিত প্রমাণ না থাকায় এটিকে অনুমান হিসেবে রাখা হয়েছে। আমাদের অবস্থান হবে—যা নিশ্চিত নয়, তা নিশ্চিত দাবি না করা।
কুরআনের নীতি—
“ولا تقف ما ليس لك به علم” (১৭:৩৬)
যার সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।
এই ছোট আয়াত আমাদের কয়েকটি বড় শিক্ষা দেয়:
১. কুরআন অলৌকিক—সাধারণ অক্ষর দিয়ে অসাধারণ গ্রন্থ।
২. মানবজ্ঞান সীমিত; আল্লাহর জ্ঞান অসীম।
৩. ঈমান মানে অদৃশ্যের উপর আস্থা।
৪. কুরআনের সূচনা বিনয় ও মনোযোগ দাবি করে।
“الم” আমাদের শেখায়—দ্বীনের পথে অহংকার নয়; বিনয়।
✔ কুরআনের সামনে বিনয়ী হওয়া
✔ অদৃশ্য বিষয়ের উপর ঈমান দৃঢ় করা
✔ জ্ঞান সীমাবদ্ধ তা স্বীকার করা
✔ কুরআনের অলৌকিকতা উপলব্ধি করা
আল্লাহ আমাদেরকে এমন অন্তর দান করুন, যা কুরআনের সামনে বিনম্র হয়, এবং এমন ঈমান দান করুন, যা অদৃশ্যের উপর দৃঢ় থাকে। “الم”—এই তিন অক্ষরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিনয়, চ্যালেঞ্জ ও ঈমানের গভীর শিক্ষা।
