কুরআন নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এমন এক কিতাব হিসেবে, যা মানুষকে পবিত্র করে, চিন্তাকে শুদ্ধ করে এবং সমাজকে নৈতিক ভারসাম্যে দাঁড় করায়। কুরআনের ভাষা সংযত, মর্যাদাপূর্ণ ও উদ্দেশ্যনির্ভর। যৌনতা প্রসঙ্গেও কুরআন অশ্লীল বর্ণনায় যায়নি; বরং প্রয়োজনের জায়গায় নীতিগত নির্দেশ দিয়েছে, সীমা নির্ধারণ করেছে, পবিত্রতা ও লজ্জাবোধ (হায়া) রক্ষা করেছে।
কিন্তু ইসলামের নামে প্রচলিত কিছু হাদিস বর্ণনা রয়েছে, যেগুলো কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং ভাষা ও উপস্থাপনার দিক থেকে নোংরা, ব্যক্তিগত ও বিব্রতকর—যা কুরআনের সামগ্রিক রুচি, নৈতিকতা ও ওহির মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক। এই প্রবন্ধে আমরা সহিহ বুখারীর কিছু বহুল আলোচিত যৌন বিষয়ক হাদিসকে কুরআনের মানদণ্ডে বিচার করব।
হাদিস (আরবি):
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: «كُنْتُ أَغْسِلُ الْمَنِيَّ مِنْ ثَوْبِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ، ثُمَّ يَخْرُجُ إِلَى الصَّلَاةِ وَأَثَرُ الْغُسْلِ فِي ثَوْبِهِ».
বাংলা অর্থ:
আয়িশা (রা.) বলেন—
“আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাপড় থেকে বীর্য ধুয়ে দিতাম, তারপর তিনি সেই কাপড় পরেই নামাজে বের হতেন, আর ধোয়ার চিহ্ন কাপড়ে থাকত।”
তথ্যসূত্র:
সহিহ বুখারী, ৭ম খণ্ড, হাদিস ১৭৩–১৭৪
হাদিস (আরবি):
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: «كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا اغْتَسَلَ مِنَ الْجَنَابَةِ دَعَا بِشَيْءٍ نَحْوَ الْحِلَابِ، فَأَخَذَ بِكَفِّهِ فَبَدَأَ بِشِقِّهِ الْأَيْمَنِ، ثُمَّ الْأَيْسَرِ، ثُمَّ أَفَاضَ عَلَى رَأْسِهِ».
বাংলা অর্থ (সংক্ষিপ্ত ভাবানুবাদ):
আয়িশা (রা.) বলেন—
নবি (সা.) জানাবত থেকে গোসল করার সময় এভাবে এভাবে করতেন… (এরপর শরীর ধোয়ার বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিবরণ এসেছে)।
তথ্যসূত্র:
সহিহ বুখারী, ৭ম খণ্ড, হাদিস ৮১
এই হাদিসগুলো প্রথম দৃষ্টিতে হয়তো “ফিকহি মাসআলা” শেখানোর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে—
প্রথমত, ওহির ভাষা কি এতো ব্যক্তিগত ও শরীরকেন্দ্রিক হওয়া উচিত?
দ্বিতীয়ত, এই বিবরণগুলো ছাড়া কি পবিত্রতার বিধান বোঝানো অসম্ভব ছিল?
তৃতীয়ত, কুরআনের রুচি ও ভাষার সাথে এগুলোর কোনো মিল আছে কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে আমাদের কুরআনের দিকে তাকাতে হবে।
কুরআন মানুষকে সৃষ্টি, দাম্পত্য, এমনকি যৌন সম্পর্কের কথাও বলেছে—কিন্তু কীভাবে? অত্যন্ত সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ ভাষায়।
আল্লাহ বলেন—
هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ
“তারা তোমাদের জন্য পোশাক, আর তোমরা তাদের জন্য পোশাক।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭)
এই একটি উপমাই দেখিয়ে দেয়—কুরআন যৌন সম্পর্ককে কীভাবে ইঙ্গিতপূর্ণ, মার্জিত ও নৈতিক ভাষায় উপস্থাপন করে।
গোসল, পবিত্রতা, জানাবত—সবকিছুর বিধান কুরআনে আছে। কিন্তু কোথাও অশ্লীল বা বিব্রতকর বর্ণনা নেই।
আল্লাহ বলেন—
وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا
“আর যদি তোমরা জানাবত অবস্থায় থাক, তবে পবিত্রতা অর্জন কর।”
(সূরা আল-মায়েদা ৫:৬)
এই আয়াতেই গোসলের ফরজিয়ত স্পষ্ট। এখানে কোনো কাপড়ের বীর্য, কোনো ব্যক্তিগত শরীরচর্চার দৃশ্য নেই। প্রশ্ন হলো—এই আয়াত অসম্পূর্ণ ছিল কি?
কুরআন বারবার মানুষকে লজ্জাশীল হতে বলেছে, দৃষ্টি সংযত রাখতে বলেছে, অশ্লীলতার ধারে-কাছেও যেতে নিষেধ করেছে।
আল্লাহ বলেন—
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً
“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা।”
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৩২)
যে কিতাব অশ্লীলতার কাছেও যেতে নিষেধ করে, সেই কিতাবের আলোকে প্রশ্ন জাগে—অপ্রয়োজনীয় যৌন বিবরণ কি অশ্লীলতার সীমা ছুঁয়ে যায় না?
কুরআন নবীকে পরিচয় করিয়েছে—
وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ
“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।”
(সূরা আল-কলম ৬৮:৪)
এখন প্রশ্ন হলো—নবীর চরিত্র কি এমন ছিল, যা মানুষকে তাঁর সবচেয়ে ব্যক্তিগত শারীরিক বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে জানাতে উদ্বুদ্ধ করবে? নাকি এই বর্ণনাগুলো পরবর্তী বর্ণনাকারীদের মানবিক কৌতূহল ও সংস্কৃতির প্রতিফলন?
কুরআন সবসময় প্রয়োজনীয় জ্ঞান দেয়, কৌতূহল তৃপ্তির জ্ঞান নয়। আদম (আ.)-এর কাহিনিতেও কুরআন যৌনতার ইঙ্গিত দিয়েছে “লজ্জাস্থান প্রকাশ” বলে—নির্দিষ্ট অঙ্গ বা দৃশ্য বর্ণনা করেনি।
এটি প্রমাণ করে—কুরআনের স্টাইল নীতিনির্ভর, দৃশ্যনির্ভর নয়।
এই বর্ণনাগুলো অন্তত তিনটি কুরআনিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক—
এক, হায়া ও সংযমের নীতি।
দুই, নবীর মর্যাদা ও আদর্শিক অবস্থান।
তিন, ওহির ভাষার পবিত্রতা ও উদ্দেশ্য।
কুরআন মানুষকে চরিত্র গঠনের দিকে ডাকে; এই ধরনের বর্ণনা চরিত্র গঠনের বদলে কৌতূহল উসকে দেয়।
কুরআনের আলোকে সঠিক অবস্থান হলো—পবিত্রতা ফরজ, গোসল ফরজ, দাম্পত্য হালাল; কিন্তু এই সত্যগুলো জানাতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়, ব্যক্তিগত ও বিব্রতকর বর্ণনা ওহির অংশ হতে পারে না। দ্বীন শেখানো হয় নীতির মাধ্যমে, দৃশ্যের মাধ্যমে নয়।
ইসলাম কোনো নোংরা কৌতূহলনির্ভর ধর্ম নয়। কুরআন মানবসমাজকে শুদ্ধ করতে এসেছে, রুচি উন্নত করতে এসেছে, নিচে নামাতে নয়। অতএব ইসলামের নামে প্রচলিত যে কোনো যৌন বর্ণনা যদি কুরআনের ভাষা, রুচি ও নৈতিক মানদণ্ডের সাথে না মেলে, তবে তা যাচাই করা ঈমানি দায়িত্ব।
“কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ,
কুরআনের সাথে না মিললে—বর্জন।”
