• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০৯ পূর্বাহ্ন

কুরআনের আলোকে ‘মেরুদণ্ড অক্ষয়’ হাদিসের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৭১ Time View
Update : রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

কুরআনের আলোকে ‘মেরুদণ্ড অক্ষয়’ হাদিসের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ


ভূমিকা

ইসলামে সত্য ও মিথ্যার মানদণ্ড কী—এই প্রশ্নের উত্তর কুরআন নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “এই কিতাবের মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই” (বাকারা ২:২)। সুতরাং নবীর নামে বর্ণিত কোনো বক্তব্য, ব্যাখ্যা বা বর্ণনা যদি কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্য, বাস্তবতা ও আল্লাহর নির্ধারিত নীতির সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তবে একজন ঈমানদার পাঠকের কর্তব্য হলো সেটিকে কুরআনের মানদণ্ডে যাচাই করা। এই প্রবন্ধে এমনই একটি বহুল প্রচলিত হাদিস—যেখানে বলা হয়েছে যে কবরের মাটি আদমসন্তানের সমস্ত দেহ ভক্ষণ করলেও মেরুদণ্ড অক্ষত থাকে এবং সেখান থেকেই কেয়ামতে দেহ পুনর্গঠিত হবে—এই দাবিকে কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে।


আলোচ্য হাদিস

হাদিসের আরবি পাঠ:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «كُلُّ ابْنِ آدَمَ يَأْكُلُهُ التُّرَابُ إِلَّا عَجْبَ الذَّنَبِ، مِنْهُ خُلِقَ وَمِنْهُ يُرَكَّبُ»

বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“আদমসন্তানের সমস্ত দেহ মাটি খেয়ে ফেলে, শুধু মেরুদণ্ডের শেষ অংশ (আজবুয্‌ যানাব) ব্যতীত। এই অংশ থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং কেয়ামতের দিন এই অংশ থেকেই তাকে আবার গঠন করা হবে।”

তথ্যসূত্র:
সহিহ মুসলিম: ৭০৫৬ (এছাড়াও ৭০৫৫ ও ৭০৫৭ নম্বরে সমজাতীয় বর্ণনা বিদ্যমান)


হাদিসটির মৌলিক দাবি ও প্রশ্ন

এই হাদিসের মূল দাবি তিনটি—
১) মানুষের দেহ কবরের মাটিতে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়।
২) কেবল একটি বিশেষ হাড় বা মেরুদণ্ডের অংশ অক্ষত থাকে।
৩) সেই অংশ থেকেই কেয়ামতে মানুষের দেহ পুনর্গঠন করা হবে।

এই দাবিগুলো শুনতে ধর্মীয় আবহে আবৃত হলেও প্রশ্ন হলো—এগুলো কি কুরআনের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এবং বাস্তবতার সঙ্গেই বা কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?


কুরআনের দৃষ্টিতে মৃত্যুর পর দেহের পরিণতি

কুরআন বহু জায়গায় মানুষের দেহ মৃত্যুর পর কী অবস্থায় পৌঁছে তা স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছে।

১. সম্পূর্ণ দেহ মাটিতে মিশে যাওয়া

مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَىٰ

“এই মাটি থেকেই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, এতে তোমাদের ফিরিয়ে দেব এবং এখান থেকেই আবার তোমাদের বের করব।” (সূরা ত্বা-হা ২০:৫৫)

এই আয়াতে কোনো ব্যতিক্রমী অঙ্গ বা হাড়ের কথা বলা হয়নি। বরং পুরো মানুষ—একক সত্তা—মাটিতে ফিরে যায় বলে উল্লেখ আছে।

২. হাড়ও ধূলিতে পরিণত হয়

قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ

“সে বলল: কে এই হাড়গুলোকে জীবিত করবে, যখন এগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে?” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৭৮)

এখানে ‘রামীম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ—সম্পূর্ণ ভঙ্গুর, গুঁড়ো হয়ে যাওয়া। কুরআনের ভাষায় হাড়ও শেষ পর্যন্ত গুঁড়ো হয়ে যায়, কোনো নির্দিষ্ট হাড় অক্ষত থাকার কথা বলা হয়নি।


পুনরুত্থানের কুরআনিক পদ্ধতি

কুরআন পুনরুত্থানকে কোনো “অক্ষত হাড়” সংরক্ষণের ওপর নির্ভরশীল করে না। বরং আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতাকেই এর ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে।

قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ

“বলুন, যিনি প্রথমবার তা সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আবার তা জীবিত করবেন।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৭৯)

এখানে পুনর্গঠনের উৎস কোনো দেহাংশ নয়; বরং স্রষ্টার ইচ্ছা ও ক্ষমতা।

আরও বলা হয়েছে—

وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ

“তিনি প্রতিটি সৃষ্টির ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।”

অর্থাৎ মানুষ কোথায়, কী অবস্থায়, কীভাবে বিলীন হয়েছে—সবকিছুই আল্লাহর জ্ঞানের আওতায়। আলাদা করে কোনো হাড় সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা কুরআনে নেই।


বাস্তবতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে

প্রাকৃতিকভাবে কবরস্থ দেহ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে পচে যায়। মেরুদণ্ডসহ সব হাড়ই শেষ পর্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে মাটিতে মিশে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক ও জীববৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণেও এমন কোনো অক্ষত “বিশেষ হাড়” পাওয়া যায় না, যা হাজার বছর ধরে অপরিবর্তিত থাকে। কুরআন যখন বলে “তোমাদেরকে মাটিতে ফিরিয়ে দেব”, তখন সেটি বাস্তবতার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।


হাদিসটির সমস্যার মূল জায়গা

এই হাদিসের বক্তব্য কুরআনের তিনটি মৌলিক নীতির সঙ্গে সংঘর্ষে আসে—

১) কুরআন কোথাও পুনরুত্থানকে কোনো অঙ্গের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল করেনি।
২) কুরআন হাড়সহ সম্পূর্ণ দেহের ধূলিতে পরিণত হওয়ার কথা বলেছে।
৩) কুরআনের পুনরুত্থান তত্ত্ব আল্লাহর সর্বশক্তিমান সৃষ্টিশীল ক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো, কোনো জৈব অবশিষ্টাংশের ওপর নয়।

ফলে এই হাদিস কুরআনের সার্বিক বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


তাহলে সঠিক ধারণা কী?

কুরআনের দৃষ্টিতে কেয়ামতে মানুষের পুনরুত্থান হবে—

  • আল্লাহর জ্ঞান দ্বারা,
  • আল্লাহর ইচ্ছা দ্বারা,
  • এবং আল্লাহর সৃষ্টিশীল ক্ষমতা দ্বারা।

মানুষের দেহের কোনো অংশ টিকে থাকুক বা না থাকুক, তা পুনরুত্থানের শর্ত নয়। যিনি প্রথমবার শূন্য থেকে সৃষ্টি করতে পারেন, তিনি ধূলিকণা থেকেও আবার সৃষ্টি করতে সক্ষম।


উপসংহার

নবীর নামে বর্ণিত যেকোনো বক্তব্য যতই প্রসিদ্ধ হোক না কেন, যদি তা কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে কুরআনই হবে শেষ কথা। ঈমান কোনো আবেগের নাম নয়; ঈমান হলো আল্লাহর নাজিলকৃত কিতাবের প্রতি পূর্ণ আস্থা।

শ্লোগান:
কুরআনের সঙ্গে মিললে গ্রহণ—না মিললে বর্জন; কুরআনই সত্য ও মিথ্যার একমাত্র মানদণ্ড।

কুরআনের আলোকে ‘মেরুদণ্ড অক্ষয়’ হাদিসের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page