• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৯ অপরাহ্ন

১১২ — সুরা আল-ইখলাস

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৩৭২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

১১২ঃ১  قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
বলুন— তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

১১২ঃ২  اللَّهُ الصَّمَدُ
আল্লাহ— যিনি সকলের অভাব পূরণকারী, আর নিজে কারো মুখাপেক্ষী নন।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

১১২ঃ৩  لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
তিনি জন্ম দেননি এবং তিনি জন্মগ্রহণও করেননি।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

১১২ঃ৪  وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

(তাফসীর দেখুন)


সুরা আল-ইখলাস — আলোচনা

সুরা আল-ইখলাস কুরআনের সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে গভীর আধ্যাত্মিক ঘোষণাগুলোর একটি। মানব ইতিহাসে যে ভুলগুলো মানুষ সবচেয়ে বেশি করেছে— ঈশ্বরকে বিভক্ত করা, তাঁর সাথে সাদৃশ্য তৈরি করা, তাঁকে রূপ, বংশ, সম্পর্ক, সৃষ্টি— এসবের মধ্যে আটকে ফেলা— সে সব ভুলের উপর এই সুরা এক শক্ত ধাক্কা। এখানে ঈমানের কেন্দ্রীয় ঘোষণা এসেছে: আল্লাহ কেমন?

সুরাটি শুরু হয়েছে: قُلْ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ — “বলে দাও, তিনিই আল্লাহ, এক।” এখানে “أحد” শব্দটি শুধু সংখ্যার এক নয়; বরং গুণগত এককত্ব, তুলনাহীনতা, অনন্যতা। এই শব্দটি আরবি ভাষায় এমন এককত্ব বোঝায় যা কোনো বিভাগ, শ্রেণি বা প্রকারে ফেলা যায় না। মানুষ এক, দুই, তিন হতে পারে; কিন্তু মানুষ “أحد” নয়। মানুষ এমন যে তার পাশে আরেক মানুষ দাঁড় করানো যায়; অথচ আল্লাহ এমন যে তাঁর পাশে “আরেক” দাঁড় করানোর ধারণাটাই অর্থহীন হয়ে যায়। এ কারণেই এই সুরা সব শির্ক, পৌত্তলিকতা, দেবদেবীর বহুত্ব, অবতারবাদ, দেহী রূপ বা প্রতিমায় উপস্থাপন— সবকিছুকে ভেঙে দিয়ে ঈশ্বরকে কেবল ঈশ্বরের জায়গায় বসায়।

পরবর্তী আয়াত: ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ — “আল্লাহ সমদ।” “সমদ” শব্দের ভিতরে আছে দুই স্তরের অর্থ। প্রথমত, তিনি এমন যাঁর দিকে সৃষ্টি ফিরে যায়, যাঁর উপর নির্ভর করে, যাঁর কাছে চাওয়া হয়, যিনি অভাবহীন। দ্বিতীয়ত, তিনি কারো উপর নির্ভরশীল নন, কারো দ্বারা পূর্ণ হন না, কারো দ্বারা তৈরি বা পরিচালিতও নন। মানুষের প্রয়োজন আছে, দেবদেবীর কল্পনাগুলোতেও প্রয়োজন ছিল— খাদ্য লাগে, শক্তি লাগে, বংশ লাগে, সাহায্য লাগে। কিন্তু “সমদ” ধারণা বলে: আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই, বরং সকল প্রয়োজন তাঁর দিকে ওঠে।

তারপর সুরাটি আসে সবচেয়ে বিতর্কহীন অথচ সবচেয়ে বিপ্লবী জায়গায়: لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ — “তিনি জন্ম দেননি এবং জন্মগ্রহণও করেননি।” মানব ইতিহাসে ঈশ্বরকে নিজের মতো করে বুঝতে গিয়ে মানুষ তাঁকে পরিবার, পিতৃত্ব, সন্তানের ধারণায় টেনে এনে ছোট করেছে। পৌত্তলিক ধর্ম, মিশরীয় হরুস-ওসিরিস, গ্রিক অলিম্পাস, রোমান জুপিটার, পারস্যের দেবতা— সবার মধ্যে পরিবার ব্যবস্থা ছিল। এমনকি পরবর্তী ধারার ধর্মে ঈশ্বর পুত্র ধারণার মাধ্যমে মানুষকে নিকট করতে চাওয়া হয়। ইখলাস সুরা এখানে ঈশ্বরত্বকে মানবিক জৈবতা থেকে মুক্ত করে। এই বক্তব্য কেবল ধর্মতত্ত্ব নয়, বরং মানব চিন্তার কল্পনাকে উন্মুক্ত করে বলে: ঈশ্বরকে মানুষের মতো বানিয়ে চিন্তা করো না।

পাশাপাশি বলা হলো: লَمْ يُولَدْ — “তাঁকে জন্ম দেওয়া হয়নি।” এটি আরও বড় ঘোষণা। এর অর্থ, তাঁর কোনো শুরু নেই। কোনো ইতিহাস নেই যেখানে তিনি তৈরি হয়েছেন। সেই জন্য: আল্লাহর আগে কেউ নেই, আল্লাহকে তৈরি করেছে এমনও কেউ নেই। সৃষ্টির প্রথম কারণ পর্যন্ত মানুষ যুক্তিতে যেতে পারে, কিন্তু “সৃষ্টিহীন” ধারণার দরজা প্রথম এখানেই খুলে যায়— কারণ যে সৃষ্টি নয়, সে-ই কেবল ঈশ্বর।

সবশেষ আয়াত: وَلَمْ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدٌ — “তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” এখানেই সুরার পূর্ণতা। মানুষ তুলনা দিয়ে বোঝে, প্রতিচ্ছবি দিয়ে বোঝে। মানুষ শক্তি বোঝাতে সূর্যের উদাহরণ দেয়, মহিমা বোঝাতে সমুদ্রের উদাহরণ দেয়, কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে সব উদাহরণ ব্যর্থ। এখানে ঘোষণা হলো — আল্লাহকে কোনো অস্তিত্বের শ্রেণিতে ফেলতে পারবে না। সুতরাং তিনি কোনো জিনিসের মতো নন, কোনো শক্তির মতো নন, কোনো সত্তার মতো নন— এবং তাই তাঁর বিষয়ে সব তুলনা অসার।

এই চারটি আয়াত মূলত তিনটি দর্শন প্রতিষ্ঠা করে:
প্রথমত— আল্লাহর পূর্ণ একত্ব (tawhid ar-rububiyyah)।
দ্বিতীয়ত— আল্লাহর পূর্ণ মুক্ততা সকল প্রকার নির্ভরশীলতা ও মানবিক বৈশিষ্ট্য থেকে (tanzih)।
তৃতীয়ত— আল্লাহর সাথে তুলনার অসম্ভবতা (tawhid al-asma’ was-sifat)।

সুরাটি স্বল্প শব্দের মধ্যে এক মুক্ত বিপ্লব— ঈশ্বরকে ফের মানুষনির্মিত প্রতিমা, গোষ্ঠী, জাতি, ভূখণ্ড, ক্ষমতা, রাজনীতি— এসবের হাত থেকে উদ্ধার করে অসীমের দরজায় দাঁড় করানো। সেজন্যই রাসূল ﷺ বলে গেছেন— এটি কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। কারণ কুরআনের এক-তৃতীয়াংশই তাওহীদের ব্যাখ্যা, বাকিটা মানব ইতিহাস ও পথনির্দেশ।

আর সমাজিক দৃষ্টিতে এই সুরার প্রভাবও গভীর। যে সমাজে ঈশ্বরকে বিভক্ত করা হয় না, সেখানে ক্ষমতাও বিভক্ত দেবতার নামে নয়; সেখানে রাষ্ট্র, নৈতিকতা, ন্যায়, শাসন— সব একই উৎসে গেঁথে যায়। এবং এতে মানুষের সামনে আসে মুক্তির ঘোষণা: তৈরি হওয়া মানুষ আর কারো সামনে মাথা রাখবে না, কারো কাছে দাস হবে না, কারো ইশারায় জীবন কাটাবে না— কারণ সমদ কেবল একজন। মানুষ সৃষ্টির সেবা করবে, কিন্তু দাসত্ব করবে না কারো প্রতিই— except the One.

এ কারণেই এই সুরা শুধু ধর্মতত্ত্ব নয়— এটি সামাজিক বিপ্লব, রাজনৈতিক মুক্তি, মানসিক স্বাধীনতা এবং বোধের পরিশুদ্ধি।

(অনুবাদ ও তাফসীর “ফ্রেন্ডস অফ কুরআন ফাউন্ডেশন)



আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page