• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৩৮ : আয়াত ৩২

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৩৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ছাদ : আয়াত ৩২

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

فَقَالَ إِنِّي أَحْبَبْتُ حُبَّ الْخَيْرِ عَن ذِكْرِ رَبِّي حَتَّىٰ تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ


বাংলা ভাবার্থ

তিনি বললেন—আমি কল্যাণ (অশ্বসমূহ) ভালোবেসেছিলাম আমার রবের স্মরণের পরিবর্তে—এমনকি সূর্য পর্দার আড়ালে চলে গেল।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ

এই আয়াত সূরা ছাদের ৩১ নম্বর আয়াতের ধারাবাহিকতা। সেখানে বলা হয়েছিল যে বিকেলের সময়ে সুলাইমান (আ.)–এর সামনে উৎকৃষ্ট অশ্বসমূহ উপস্থাপন করা হয়েছিল। এখন এই আয়াতে আমরা তাঁর হৃদয়ের অবস্থা ও আত্মসমালোচনার মুহূর্ত দেখি।

এটি এক নবীর আত্মসমীক্ষা—এবং এখানেই এর গভীরতা।


১. “فقال” — তিনি বললেন

এটি একটি উপলব্ধির ঘোষণা। তিনি নিজের অবস্থা স্বীকার করছেন। এটি আত্মপক্ষ সমর্থন নয়; আত্মসমালোচনা।

নবীরা ভুলে অবিচল থাকেন না; তারা সাথে সাথে সচেতন হন।


২. “إني أحببت حب الخير” — আমি কল্যাণ ভালোবেসেছিলাম

“খাইর” শব্দের আক্ষরিক অর্থ কল্যাণ। এখানে তা অশ্ব বা দুনিয়াবী সামর্থ্যের প্রতীক।

অর্থাৎ তিনি ঘোড়াগুলোকে ভালোবেসেছিলেন। কিন্তু কেন?

কিছু ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে—তিনি এগুলোকে ভালোবাসতেন আল্লাহর পথে শক্তি অর্জনের জন্য। আবার আয়াতের গঠন ইঙ্গিত করে—সেই ভালোবাসা সাময়িকভাবে তাঁকে যিকর থেকে ব্যস্ত করেছিল।

এখানে সূক্ষ্মতা রয়েছে।
ঘোড়া ভালোবাসা নিজে হারাম নয়। কিন্তু যখন তা যিকরের উপর প্রাধান্য পায়—সেখানে পরীক্ষা।


৩. “عن ذكر ربي” — আমার রবের স্মরণ থেকে

এখানে “আন” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি দূরত্ব বোঝায়।

অর্থাৎ এই ভালোবাসা এমনভাবে প্রবল হয়েছিল যে তা তাঁকে যিকর থেকে ব্যস্ত রেখেছিল।

এটি নবীর বিনয়—তিনি উপলব্ধি করছেন যে সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে।


৪. “حتى توارت بالحجاب” — সূর্য পর্দার আড়ালে চলে গেল

“তাওয়ারাত” মানে আড়াল হয়ে যাওয়া।
“হিজাব” মানে পর্দা—অর্থাৎ দিগন্তের আড়াল।

অর্থাৎ সূর্য অস্তমিত হয়েছে।

এটি ইঙ্গিত করে যে বিকেলের সময় অতিবাহিত হয়েছে।

এই অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সময় নীরবে চলে যায়। মানুষ ব্যস্ত থাকে, কিন্তু সূর্য ডুবে যায়।


৫. আয়াতের মূল শিক্ষা

এই আয়াতে তিনটি বড় বিষয় উঠে আসে—

১. দুনিয়াবী ভালোবাসা
২. যিকর থেকে সাময়িক ব্যস্ততা
৩. আত্মসচেতনতা

সুলাইমান (আ.) সম্পদের মধ্যে থেকেও অন্তরে আল্লাহমুখী ছিলেন। তাই তিনি বুঝতে পেরেছেন—কোথায় মন সরে গেছে।


৬. ভুল ব্যাখ্যার সংশোধন

কেউ কেউ ধারণা করেন—তিনি নাকি যিকর ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু কুরআন কোথাও বলেনি যে তিনি সালাত ছেড়ে দিয়েছিলেন বা গুনাহ করেছেন। বরং তিনি উপলব্ধি করেছেন যে সময় কেটে গেছে।

নবীদের মর্যাদা রক্ষার্থে এটিকে সাময়িক ব্যস্ততা হিসেবে বোঝাই সঠিক।


৭. আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা

আজ আমাদের “খাইর” কী?

  • ব্যবসা
  • প্রযুক্তি
  • সামাজিক মাধ্যম
  • সম্পদ
  • কর্মজীবন

এসব খারাপ নয়। কিন্তু যদি তা আল্লাহর স্মরণকে আড়াল করে, তবে হৃদয়ের পরীক্ষা।

সূরা মুনাফিকুন (৬৩:৯)-এ বলা হয়েছে—
“তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেন আল্লাহর স্মরণ থেকে তোমাদের ব্যস্ত না রাখে।”

এই আয়াত তার বাস্তব উদাহরণ।


৮. নবীসুলভ আত্মসমালোচনা

সুলাইমান (আ.)–এর মহত্ত্ব এখানেই—
তিনি ক্ষমতাশালী রাজা হয়েও নিজের হৃদয় পর্যবেক্ষণ করেছেন।

এটাই মুত্তাকীর বৈশিষ্ট্য—নিজেকে প্রশ্ন করা।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত আমাদের শেখায়—

  • ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
  • সময় অমূল্য।
  • আল্লাহর স্মরণ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
  • সচেতনতা হলো ঈমানের চিহ্ন।

দুনিয়া ব্যবহার করতে হবে, দুনিয়ার দ্বারা ব্যবহৃত হওয়া নয়।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ৩৮:৩১–৩৩ — সম্পূর্ণ ঘটনা
  • ৬৩:৯ — সম্পদ যেন যিকর থেকে ব্যস্ত না রাখে
  • ১৮:৪৬ — সম্পদ ও সন্তান দুনিয়ার অলংকার
  • ২৮:৭৭ — আখিরাত অগ্রাধিকার

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ সময়ের মূল্য বুঝা
✔ যিকরকে অগ্রাধিকার দেওয়া
✔ দুনিয়াবী ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ
✔ আত্মসমালোচনার অভ্যাস
✔ সম্পদকে আল্লাহর পথে ব্যবহার

আল্লাহ আমাদেরকে সুলাইমান (আ.)–এর মতো অন্তর দান করুন—যেন আমরা দুনিয়াকে ভালোবাসি দায়িত্ব হিসেবে, কিন্তু কখনো আমাদের রবের স্মরণকে তার আড়ালে হারিয়ে না ফেলি।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page