• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৯ : আয়াত ১০৭

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২৭৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আত-তাওবা : আয়াত ১০৭

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لِّمَنْ حَارَبَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ مِن قَبْلُ ۚ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَىٰ ۖ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ


বাংলা ভাবার্থ

আর যারা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে, কুফরকে শক্তিশালী করার জন্য, মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য এবং সেই ব্যক্তির জন্য ঘাঁটি হিসেবে—যে পূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল—তারা অবশ্যই শপথ করবে: “আমরা তো শুধু ভালো উদ্দেশ্যই চেয়েছিলাম।” কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আত-তাওবার ১০৭ নম্বর আয়াত ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করে, যা “মসজিদে দিরার” নামে পরিচিত। এই আয়াত শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করে না; বরং ধর্মের নামে ষড়যন্ত্র, বিভেদ সৃষ্টি এবং মুনাফিকদের কৌশল সম্পর্কে গভীর সতর্কতা দেয়।

এখানে কুরআন দেখিয়েছে—সব মসজিদ পবিত্র উদ্দেশ্যে নির্মিত হয় না। কখনো কখনো ধর্মীয় প্রতীকও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হতে পারে। তাই ইসলামে কেবল বাহ্যিক রূপ নয়; উদ্দেশ্য ও নিয়তই মূল।


১. “والذين اتخذوا مسجدا ضرارا” — ক্ষতি করার জন্য নির্মিত মসজিদ

এখানে বলা হয়েছে—কিছু লোক একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল “দিরার” উদ্দেশ্যে।

“দিরার” শব্দের অর্থ—ক্ষতি করা, অন্যকে দুর্বল করা, বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করা।

অর্থাৎ তারা মসজিদ বানিয়েছিল আল্লাহর ইবাদতের জন্য নয়; বরং মুমিনদের ক্ষতি করার জন্য।

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একটি পবিত্র স্থানের নাম ব্যবহার করলেই তা পবিত্র হয়ে যায় না। যদি উদ্দেশ্য অন্যায় হয়, তবে বাহ্যিক পবিত্রতা অর্থহীন।


২. “وكفرا” — কুফরকে শক্তিশালী করার জন্য

এই মসজিদ ছিল এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সংগঠিত করা হতো।

এখানে “কুফর” বলতে প্রকাশ্য অবিশ্বাস নয়; বরং মুনাফিকদের গোপন বিরোধিতা।

তারা মুসলিম সমাজের ভেতরে থেকেই ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করছিল।


৩. “وتفريقا بين المؤمنين” — মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি

মুনাফিকদের অন্যতম কৌশল ছিল বিভাজন।

তারা একটি আলাদা মসজিদ বানিয়ে মুসলিম সমাজকে দুই ভাগে ভাগ করতে চেয়েছিল।

কুরআন বারবার ঐক্যের উপর গুরুত্ব দিয়েছে:

“তোমরা সবাই আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।” (৩:১০৩)

অতএব এই মসজিদ ছিল ঐক্য ভাঙার একটি পরিকল্পনা।


৪. “وإرصادا لمن حارب الله ورسوله” — শত্রুর জন্য ঘাঁটি

“ইরসাদ” মানে ঘাঁটি বা অপেক্ষার স্থান।

এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে আবু আমির নামে এক ব্যক্তির দিকে, যিনি পূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

মুনাফিকরা সেই ব্যক্তির জন্য এই মসজিদকে একটি কেন্দ্র বানাতে চেয়েছিল—যেখানে সে এসে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাতে পারবে।

অর্থাৎ এটি ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছদ্মবেশে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ঘাঁটি।


৫. “وليحلفن إن أردنا إلا الحسنى” — মিথ্যা অজুহাত

মুনাফিকদের স্বভাব হলো—তারা সবসময় নিজেদের কাজকে ভালো উদ্দেশ্য হিসেবে উপস্থাপন করে।

তারা বলবে—
“আমরা তো ভালোই চেয়েছি।”

এই আয়াত মানুষের একটি চিরন্তন দুর্বলতা প্রকাশ করে—
অন্যায় কাজও অনেক সময় “ভালো উদ্দেশ্য” নামে ঢেকে দেওয়া হয়।


৬. “والله يشهد إنهم لكاذبون” — আল্লাহ সাক্ষ্য দেন তারা মিথ্যাবাদী

মানুষকে প্রতারিত করা সম্ভব, কিন্তু আল্লাহকে নয়।

মুনাফিকরা হয়তো সমাজকে বোঝাতে পারে যে তারা ভালো কাজ করছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তরের উদ্দেশ্য জানেন।

কুরআন বারবার বলেছে—

“আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় জানেন।” (৩:২৯)

অতএব নিয়তই আসল।


মসজিদে দিরার: ইতিহাস

ঐতিহাসিকভাবে এই ঘটনা ঘটে তাবুক অভিযানের সময়।

মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলেছিল—
আপনি যেন এসে এই মসজিদে নামাজ পড়েন, যাতে এটি বৈধতা পায়।

কিন্তু আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন এবং রাসূলকে সতর্ক করেন।

পরবর্তী আয়াতে (৯:১০৮) নির্দেশ দেওয়া হয়—
এই মসজিদে কখনো দাঁড়াবে না।

পরবর্তীতে এই মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

এটি ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও যদি অন্যায়ের কেন্দ্র হয়, তবে তা বৈধ নয়।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত চারটি বড় শিক্ষা দেয়:

১. ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে ষড়যন্ত্র করা সম্ভব।
২. মুনাফিকরা বিভেদ সৃষ্টি করে।
৩. নিয়ত বাহ্যিক কাঠামোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৪. আল্লাহ মানুষের অন্তর জানেন।


আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা

আজও “মসজিদে দিরার” ধারণা প্রাসঙ্গিক।

যখন—

  • ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হয়
  • ধর্ম ব্যবহার করে বিভাজন তৈরি করা হয়
  • ক্ষমতার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা হয়

তখন সেই পরিস্থিতি এই আয়াতের সতর্কতার আওতায় পড়ে।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ৯:১০৮ — তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ
  • ৩:২৯ — আল্লাহ অন্তরের কথা জানেন
  • ৪:১৪৫ — মুনাফিকদের অবস্থান
  • ৩:১০৩ — ঐক্যের নির্দেশ

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি থেকে সতর্ক থাকা
✔ নিয়তের বিশুদ্ধতা রক্ষা
✔ মুনাফিকতার কৌশল বুঝা
✔ ঐক্য বজায় রাখা
✔ ধর্মকে ক্ষমতার হাতিয়ার না বানানো


আল্লাহ আমাদেরকে সেই মসজিদের মতো বানান, যা তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত—যেখানে সত্য, ঐক্য এবং আল্লাহভীতি থাকে। আর আমাদেরকে সেইসব কাজ থেকে দূরে রাখুন, যা ধর্মের নামে বিভেদ ও ক্ষতির কারণ হয়। নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের সত্য জানেন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page