তাফসীর by, Friends of Quran Foundation
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ ۚ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ ۖ فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ ۗ وَاللَّهُ يَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
“মানুষ ছিল একক জাতি। তারপর আল্লাহ নবীদের প্রেরণ করলেন—সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে; আর তাদের সঙ্গে সত্যসহ কিতাব নাজিল করলেন, যাতে মানুষের মধ্যে তারা যে বিষয়ে মতভেদ করেছে সে বিষয়ে বিচার হয়। আর স্পষ্ট প্রমাণ তাদের কাছে আসার পরও যারা তা পেয়েছিল তারাই কেবল পারস্পরিক হিংসার কারণে এতে মতভেদ করেছে। এরপর আল্লাহ তাঁর অনুমতিতে বিশ্বাসীদের সেই সত্যে পথনির্দেশ দিলেন, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করেছিল। আর আল্লাহ যাকে চান তাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।”
সূরা আল-বাকারার এই আয়াতটি মানবজাতির ইতিহাস, ধর্মের উদ্দেশ্য এবং মতভেদের প্রকৃত কারণ—এই তিনটি বিষয়কে একত্রে অত্যন্ত গভীরভাবে উপস্থাপন করেছে। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বিবরণ নয়; বরং মানুষের সামাজিক, নৈতিক ও চিন্তাগত বিচ্যুতির মূল কারণ চিহ্নিত করে দেয়। এই আয়াত আমাদের জানিয়ে দেয়—মানুষের সমস্যার মূল শিকড় কোথায়, আর সেই সমস্যার সমাধান আল্লাহ কীভাবে দিয়েছেন।
এই আয়াতটি এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যেখানে আগের আয়াতগুলোতে ঈমান, সমর্পণ, বিলম্বপ্রবণতা ও বিচারদিবসের বাস্তবতা আলোচনা করা হয়েছে। এরপর এই আয়াতে আল্লাহ মানবজাতির দিকে ফিরে তাকান এবং বলেন—সমস্যা শুরু হয়েছিল কোথা থেকে, কেন নবী ও কিতাব প্রয়োজন হলো, আর কেন সত্য উপস্থিত থাকার পরও মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ল।
এই আয়াতের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি ধর্মীয় বিভাজনকে আল্লাহর পরিকল্পনার ফল নয়, বরং মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ও পারস্পরিক হিংসার পরিণতি হিসেবে তুলে ধরে। একই সঙ্গে এটি আশার কথাও বলে—সব মতভেদের মাঝেও আল্লাহ বিশ্বাসীদের সত্যের দিকে পথ দেখান।
এই আয়াতের মূল বক্তব্যকে সহজভাবে এভাবে বোঝা যায়—
মানুষের সূচনা ছিল একক ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মতভেদ সৃষ্টি হয়। তখন আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য নবীদের পাঠান, যারা মানুষকে সত্যের সুসংবাদ দেয় এবং ভুল পথের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে। শুধু নবী পাঠিয়েই আল্লাহ থেমে যাননি; বরং তাঁদের সঙ্গে সত্যসহ কিতাব নাজিল করেছেন, যাতে মানুষ নিজের মতামত বা প্রবৃত্তির ভিত্তিতে নয়, বরং আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে বিরোধ মীমাংসা করতে পারে।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—যাদের কাছে এই কিতাব ও স্পষ্ট প্রমাণ পৌঁছেছিল, তারাই পারস্পরিক হিংসা, ক্ষমতার লোভ ও আত্মঅহংকারের কারণে মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। সত্যের অভাব তাদের সমস্যা ছিল না; সমস্যাটি ছিল নৈতিকতার অভাব।
তবুও আল্লাহ মানবজাতিকে ছেড়ে দেননি। তিনি বিশ্বাসীদের তাঁর অনুমতিতে সেই সত্যের দিকে পথ দেখিয়েছেন, যে সত্য নিয়ে মানুষ বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত হিদায়াত আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, আর তিনিই যাকে চান তাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।
সূরা আল-বাকারার এই অংশে আল্লাহ মানবসমাজের নৈতিক ভাঙন ও পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরছেন। আগের আয়াতগুলোতে মানুষকে পূর্ণ সমর্পণের আহ্বান, শয়তানের ধাপে ধাপে বিভ্রান্তি এবং বিচারদিবসের অনিবার্যতার কথা বলা হয়েছে। এরপর এই আয়াতে এসে আল্লাহ দেখাচ্ছেন—এই বিভ্রান্তি নতুন কিছু নয়; এটি মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ।
এই আয়াতটি বোঝায়—আল্লাহ কখনো মানুষকে পথহীন অবস্থায় রাখেননি। মতভেদ সৃষ্টি হলে তিনি নবী ও কিতাবের মাধ্যমে সত্য স্পষ্ট করেছেন। কিন্তু যখন মানুষ নিজের স্বার্থকে সত্যের ওপরে স্থান দেয়, তখনই বিভাজন সৃষ্টি হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল কিতাব আসার আগে নয়, বরং কিতাব আসার পর। অর্থাৎ, জ্ঞানের অভাব নয়; বরং নৈতিক বিচ্যুতিই বিভাজনের মূল কারণ।
এই আয়াতে ব্যবহৃত কিছু ধারণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
“উম্মাতান ওয়াহিদাহ”—একক জাতি—এটি বোঝায়, মানুষের মৌলিক প্রকৃতি ছিল ঐক্যপূর্ণ ও সরল।
“মুবাশশিরীন ও মুনযিরীন”—নবীদের ভূমিকা কেবল আদেশ দেওয়া নয়; বরং আশার সংবাদ ও সতর্কবার্তা দুটোই।
“আল-কিতাব বিল-হক্ক”—সত্যসহ কিতাব—এটি প্রমাণ করে, কিতাব মতের জন্য নয়, বিচারের মানদণ্ড হিসেবে নাজিল হয়েছে।
“বাগইয়ান বাইনাহুম”—পারস্পরিক হিংসা—এই শব্দগুচ্ছ মতভেদের আসল কারণকে উন্মোচন করে।
এই আয়াতের ভাষা স্পষ্ট করে দেয়—মানুষের বিভক্তির পেছনে বুদ্ধিবৃত্তিক পার্থক্য নয়, বরং হৃদয়ের ব্যাধি কাজ করেছে।
এই আয়াতের বক্তব্য কুরআনের বহু আয়াতে বিভিন্ন দিক থেকে ব্যাখ্যা ও সমর্থন পেয়েছে।
কুরআন জানায় যে, মানুষকে আল্লাহ হিদায়াতের জন্য নবী পাঠিয়েছেন এবং কেউ যেন না বলতে পারে—আমরা পথ দেখানোর কেউ পাইনি।
সূরা আন-নিসা (4) : আয়াত 165
رُسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ
“সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে রাসূল পাঠানো হয়েছে, যাতে রাসূলদের পরে মানুষের আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত না থাকে।”
এই আয়াতটি সূরা বাকারা ২১৩-এর ‘নবীদের প্রেরণ’-এর উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে।
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, কিতাব নাজিলের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
সূরা আল-হাদীদ (57) : আয়াত 25
لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ
“যাতে মানুষ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।”
এটি দেখায়—কিতাব মতাদর্শিক অস্ত্র নয়; বরং ন্যায়বিচারের মানদণ্ড।
অন্যদিকে কুরআন স্পষ্ট করে দেয়—মতভেদ সত্যের অভাবে হয়নি।
সূরা আশ-শূরা (42) : আয়াত 14
وَمَا تَفَرَّقُوا إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ
“তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরও তারা পারস্পরিক হিংসার কারণে বিভক্ত হয়েছে।”
এটি সূরা বাকারা ২১৩-এর বক্তব্যের সরাসরি প্রতিধ্বনি।
কুরআন আবার এটাও জানায়—সব মতভেদের মাঝেও আল্লাহ বিশ্বাসীদের সত্যে স্থির রাখেন।
সূরা ইউনুস (10) : আয়াত 19
فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ
“আল্লাহ বিশ্বাসীদের সেই সত্যে পথ দেখান, যে বিষয়ে মানুষ মতভেদ করেছে।”
এটি প্রমাণ করে—হিদায়াত কেবল জ্ঞানের ফল নয়; এটি আল্লাহর অনুগ্রহ।
এই আয়াত আমাদের শেখায়—
মানুষের বিভক্তি আল্লাহর ইচ্ছা নয়; বরং মানুষের নৈতিক ব্যর্থতার ফল।
নবী ও কিতাব মানুষের ঐক্যের জন্য পাঠানো হয়েছে, বিভাজনের জন্য নয়।
যখন মানুষ সত্যকে ক্ষমতা ও অহংকারের অধীন করে, তখন ধর্মই বিভক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
আর সত্যিকার হিদায়াত আসে আল্লাহর কাছ থেকেই।
এই আয়াতকে কখনো কখনো এমনভাবে বোঝা হয় যেন মতভেদ অনিবার্য এবং স্বাভাবিক। কিন্তু আয়াতটি স্পষ্ট করে—মতভেদ হয়েছিল হিংসা ও বাগইয়ের কারণে, সত্যের অস্পষ্টতার কারণে নয়।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো—সব পথই সমান সত্য। কিন্তু আয়াতটি জানায়—সত্য একটাই, আর আল্লাহ বিশ্বাসীদের সেই সত্যেই পথ দেখান।
ব্যক্তিগতভাবে এই আয়াত আমাদের প্রশ্ন করে—আমি কি সত্য অনুসরণ করছি, না নিজের দল, মত বা স্বার্থ?
সামাজিকভাবে এটি আমাদের শেখায়—ঐক্য আসে সত্যের প্রতি বিনয় থেকে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে নয়।
আমি কি সত্য পেলে বিনীতভাবে গ্রহণ করি, নাকি অহংকার করি?
আমার মতভেদ কি সত্যের জন্য, না নিজের অবস্থান রক্ষার জন্য?
আমি কি আল্লাহর কিতাবকে বিচারক মানি, না নিজের প্রবৃত্তিকে?
সূরা আল-বাকারার এই আয়াতটি মানবজাতির ইতিহাসকে এক বাক্যে সংক্ষেপ করে দেয়। মানুষ ঐক্যবদ্ধ ছিল, নবী ও কিতাব এসেছে ঐক্য রক্ষার জন্য, আর বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে মানুষের হিংসা ও অহংকার থেকে।
তবুও আল্লাহর করুণা এখানেই শেষ নয়। তিনি বিশ্বাসীদের সত্যের দিকে পথ দেখান এবং আজও দেখান। কারণ শেষ পর্যন্ত হিদায়াত মানুষের মতের হাতে নয়; তা আল্লাহরই হাতে।
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ঐক্যের পথ ক্ষমতার নয়, সত্যের। আর যে সত্যে অবিচল থাকে, আল্লাহ তাকেই সরল পথে পরিচালিত করেন।
