লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
আজকের যুগে নারী-শালীনতা, পর্দা, পোশাক ও আচরণ নিয়ে বিভ্রান্তি প্রচুর। কেউ চরম কড়াকড়ি করে ইসলামের নামে সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়, কেউ আবার বলে—এগুলো পুরনো ধারণা। কিন্তু একজন মুমিন নারী কীভাবে চলবে—এ প্রশ্নের উত্তর সংস্কৃতি নয়, আবেগ নয়; কুরআনের আলোকে নির্ধারিত হতে হবে।
কুরআন নিজেই বলে—
“يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُم” — আল্লাহ তোমাদের জন্য স্পষ্ট করে দেন। (৪:১৭৬)
অতএব এই বিষয়টি কুরআন দিয়ে, কুরআনের ব্যাখ্যা কুরআন থেকেই স্পষ্ট করতে হবে।
এই আলোচনায় আমরা তিনটি স্তর পরিষ্কার করবো:
১. মৌলিক নৈতিক ভিত্তি
২. মাহরাম (নিকটাত্মীয়)দের সামনে আচরণ
৩. অমাহরাম (বিবাহযোগ্য পুরুষ)দের সামনে আচরণ ও পোশাক
শালীনতা একতরফা বিধান নয়। সূরা আন-নূর ২৪:৩০–৩১-এ প্রথমে পুরুষদের বলা হয়েছে:
“قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ”
মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।
এরপরই ২৪:৩১-এ নারীদের বলা হয়েছে:
“وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ”
মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে।
অর্থাৎ শালীনতা পারস্পরিক নৈতিক চুক্তি। কেবল নারীর দায়িত্ব নয়।
কুরআনের নীতি হলো:
এটি বাহ্যিক পোশাক দিয়ে শুরু হয় না; বরং অন্তরের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে শুরু হয়।
সূরা আন-নূর ২৪:৩১-এ যে তালিকা এসেছে, সেটি হলো—
“إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ…”
এদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
১. পূর্ণ পর্দা বাধ্যতামূলক নয়।
২. স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশে থাকতে পারবে।
৩. মাথা খোলা রাখা বৈধ—কারণ আয়াত বলছে “ولا يبدين زينتهن إلا…” — এই তালিকার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা বৈধ।
৪. ঘরোয়া পোশাক বৈধ—তবে অশালীনতা নয়।
এখানে লক্ষ্য রাখতে হবে—
শালীনতা চরিত্রগত বিষয়। মাহরাম হলেও অশালীন পোশাক ইসলামের আদর্শ নয়। কিন্তু পূর্ণ আচ্ছাদন বাধ্যতামূলক নয়।
এখন মূল প্রশ্ন—বাইরে একজন মুমিন নারী কীভাবে চলবে?
সূরা নূর ২৪:৩১-এ তিনটি স্পষ্ট নির্দেশ আছে:
“زينت” মানে অলংকার ও আকর্ষণীয় অংশ।
অর্থাৎ—
“خُمُر” = মাথার আবরণ
“جيوب” = বক্ষদেশ
অর্থাৎ—
এখানে স্পষ্ট—হিজাবের মূল কাঠামো:
✔ মাথা আবৃত
✔ বুক আবৃত
✔ শরীরের গঠন স্পষ্ট না হয়
✔ স্বচ্ছ না হয়
অর্থাৎ আচরণেও সংযম।
সূরা আহযাব ৩৩:৩২-এ বলা হয়েছে:
“فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ”
কথায় কোমল প্রলুব্ধতা আনো না।
কুরআনের ভিত্তিতে পোশাকের শর্তগুলো:
১. মাথা আবৃত থাকবে
২. বুক ঢাকা থাকবে
৩. শরীরের আকৃতি স্পষ্ট না হয়
৪. স্বচ্ছ না হয়
৫. আকর্ষণমূলক সাজসজ্জা প্রদর্শন নয়
৬. অশ্লীলতা নয়
সূরা আহযাব ৩৩:৫৯:
“يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ”
তারা যেন নিজেদের উপর চাদর টেনে নেয়।
এটি নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য।
কুরআন নারীকে অদৃশ্য হতে বলেনি।
কুরআন নারীকে ঘরে বন্দি হতে বলেনি।
কুরআন নারীকে সমাজবিচ্ছিন্ন হতে বলেনি।
কুরআন বলেছে—
১. যৌন বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ
২. পরিবার রক্ষা
৩. সমাজে পবিত্রতা
৪. সন্দেহ ও অপবাদ কমানো
সূরা নূর সম্পূর্ণ সূরাই সামাজিক পবিত্রতা নিয়ে।
মাহরামদের সামনে:
অমাহরামদের সামনে:
এই বিধান নারীর ওপর চাপ নয়; এটি মর্যাদা রক্ষার আইন।
কুরআন প্রথমে পুরুষকে সংযম শিখিয়েছে, তারপর নারীকে।
শেষে ২৪:৩১ আয়াতের আহ্বান:
“وتوبوا إلى الله جميعا أيها المؤمنون”
হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসো।
অর্থাৎ এটি নারী বনাম পুরুষ নয়—এটি পুরো সমাজের আত্মশুদ্ধির আহ্বান।
✔ দৃষ্টি সংযম
✔ শালীন পোশাক
✔ আচরণে সংযম
✔ মাহরাম–অমাহরাম পার্থক্য বোঝা
✔ কুরআনের ভারসাম্য গ্রহণ করা
আল্লাহ আমাদেরকে শালীনতা, মর্যাদা ও ভারসাম্যের পথে পরিচালিত করুন।
