• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০১:৪৫ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৪ : আয়াত ৩৪

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২১৭ Time View
Update : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আন-নিসা : আয়াত ৩৪

তাফসীর | Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ ۚ وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ ۖ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا


ভাবার্থভিত্তিক অনুবাদ

পুরুষরা নারীদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে, কারণ আল্লাহ তাদের কাউকে কারও উপর বিশেষ সামর্থ্য দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সৎ নারীরা অনুগত থাকে এবং আল্লাহ যেসব বিষয় রক্ষা করতে বলেছেন, তারা তা গোপনে রক্ষা করে। আর যদি তোমরা তাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, তবে প্রথমে তাদের উপদেশ দাও, এরপর শয্যায় পৃথক থাকো, এবং (শেষ পর্যায়ে) সংশোধনের উদ্দেশ্যে কঠোরতা অবলম্বন করো। তারপর তারা যদি অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
(অনুবাদ – Friends of Quran Foundation)


আয়াতের তাফসীর

সূরা আন-নিসা পারিবারিক ও সামাজিক আইনসমূহের একটি কেন্দ্রীয় সূরা। এখানে উত্তরাধিকার, বিবাহ, ন্যায়, দায়িত্ব ও নৈতিক আচরণের বিধান ধারাবাহিকভাবে এসেছে। ৪:৩৪ আয়াতটি পরিবারব্যবস্থার কাঠামো এবং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব সম্পর্কে একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে। এই আয়াত বহু আলোচনার বিষয় হয়েছে। তাই এটিকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, কুরআনের সামগ্রিক ন্যায় ও দয়া-ভিত্তিক কাঠামোর আলোকে বুঝতে হবে।

আয়াতটি শুরু হচ্ছে— “الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ”। “قوّام” শব্দটি “قيام” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ দাঁড়িয়ে থাকা, দায়িত্ব নেওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ করা। এখানে শ্রেষ্ঠত্ব বা প্রভুত্ব বোঝানো হয়নি; বরং দায়িত্ব বোঝানো হয়েছে। কুরআনের ভাষায় “قوّام” মানে দায়িত্বশীল অভিভাবক, যিনি ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। সূরা নিসা ৪:১৩৫-এ বলা হয়েছে—
“كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ” — তোমরা ন্যায়ের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো।
অর্থাৎ “কওয়াম” মানে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্বশীল অবস্থান।

এখানে পুরুষদেরকে পরিবার পরিচালনা ও আর্থিক দায়িত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। কারণ আয়াতেই বলা হয়েছে— “بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ” — আল্লাহ তাদের কাউকে কারও উপর বিশেষ সামর্থ্য দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে। অর্থাৎ দায়িত্ব ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে নেতৃত্ব। এটি মর্যাদাগত শ্রেষ্ঠত্ব নয়; বরং কার্যগত দায়িত্ব।

কুরআন অন্যত্র বলে—
“وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ” (২:২২৮)
নারীদের জন্যও তেমন অধিকার রয়েছে যেমন তাদের উপর দায়িত্ব আছে, ন্যায্যতার ভিত্তিতে।
অর্থাৎ পারস্পরিক ভারসাম্য।

এরপর আয়াতে বলা হয়েছে— “فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ” — সৎ নারীরা অনুগত। এখানে “قانتات” শব্দটি আল্লাহর প্রতি অনুগত্য বোঝায়। সূরা বাকারা ২:১১৬-এ “قانتون” শব্দ ব্যবহার হয়েছে আল্লাহর প্রতি নিবেদিতদের বোঝাতে। অর্থাৎ স্ত্রীর অনুগত্য স্বামীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং আল্লাহর বিধানের মধ্যে থেকে দায়িত্বশীল আচরণ।

“حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ” — তারা গোপন বিষয় রক্ষা করে, যেমন আল্লাহ রক্ষা করতে বলেছেন। এখানে গৃহের সম্মান, পারিবারিক আস্থা, বৈবাহিক বিশ্বস্ততা—এসব বোঝানো হয়েছে।

এখন আয়াতের সবচেয়ে আলোচিত অংশ— “وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ” — যদি তোমরা তাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর। “نشوز” মানে বিদ্রোহী আচরণ, সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার মনোভাব। এটি সাধারণ মতবিরোধ নয়; বরং গুরুতর বৈবাহিক সংকট।

কুরআন ধাপে ধাপে সমাধানের পথ দেখিয়েছে। প্রথমে— “فَعِظُوهُنَّ” — উপদেশ দাও। অর্থাৎ কথোপকথন, বোঝানো, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান।

যদি তা কার্যকর না হয়— “وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ” — শয্যায় পৃথক থাকো। অর্থাৎ আবেগগত দূরত্ব সৃষ্টি করে সমস্যার গুরুত্ব বোঝানো।

সবশেষে— “وَاضْرِبُوهُنَّ” — এই শব্দটি নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে। “ضرب” শব্দের বহু অর্থ আছে—প্রহার করা, আলাদা করা, উদাহরণ দেওয়া, দূরে রাখা। কুরআনের অন্যান্য আয়াতে “ضرب” ভিন্ন অর্থে এসেছে। যেমন সূরা ইবরাহীম ১৪:২৪—
“ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا” — আল্লাহ উদাহরণ দিয়েছেন।
সূরা নিসা ৪:১০১—
“وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ” — যখন তোমরা সফরে বের হও।

অতএব শব্দটির অর্থ প্রেক্ষাপটনির্ভর। অধিকাংশ প্রাচীন তাফসিরে এখানে হালকা, প্রতীকী কঠোরতা বোঝানো হয়েছে—যা আঘাত বা অপমানের উদ্দেশ্যে নয়, বরং চূড়ান্ত সতর্কতা হিসেবে। কুরআনের সামগ্রিক ন্যায়নীতি বিবেচনায় এটি সহিংসতার অনুমতি নয়। কারণ কুরআন অন্যত্র বলে—
“وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ” (৪:১৯)
তোমরা তাদের সঙ্গে সদাচরণের ভিত্তিতে বসবাস করো।

আর সূরা রূম (৩০:২১)-এ বিবাহকে বর্ণনা করা হয়েছে—
“لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً”
তোমরা যেন তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করা হয়েছে।

অতএব ৪:৩৪ আয়াতের ধাপগুলোকে সহিংসতার লাইসেন্স হিসেবে দেখা যাবে না; বরং পরিবার ভাঙন রোধে ধাপে ধাপে সমাধানের কাঠামো হিসেবে দেখতে হবে।

এরপর আয়াত বলে— “فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا” — যদি তারা সংশোধিত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো পথ অনুসন্ধান করো না। অর্থাৎ প্রতিশোধ নয়, পুনর্মিলনই লক্ষ্য।

সবশেষে— “إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا” — আল্লাহ মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। এটি একটি সতর্কতা—যে পুরুষ নিজেকে ক্ষমতাবান মনে করে অত্যাচার করতে চায়, সে যেন মনে রাখে আল্লাহ তার উপর আরো মহান ও উচ্চতর।

সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

এই আয়াতকে বুঝতে হলে কুরআনের অন্যান্য পারিবারিক নির্দেশনা স্মরণ করতে হবে।
সূরা বাকারা (২:২৩১):
“وَلَا تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا” — তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আটকে রেখো না।
সূরা নিসা (৪:১২৮):
বৈবাহিক বিরোধে আপস ও সমঝোতার কথা বলা হয়েছে।
সূরা ত্বালাক (৬৫:২):
বিচ্ছেদ হলেও ন্যায্যতার নির্দেশ।

অতএব কুরআনের সামগ্রিক বার্তা—ন্যায়, দয়া ও ভারসাম্য।

সংক্ষেপে (করণীয়)

এই আয়াত আমাদের শেখায়—পরিবারে নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব, প্রভুত্ব নয়। স্বামীকে আর্থিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। স্ত্রীকে বিশ্বস্ততা ও পারিবারিক সম্মান রক্ষা করতে হবে। বিরোধ দেখা দিলে ধাপে ধাপে আলোচনার পথ অনুসরণ করতে হবে। সহিংসতা নয়, সংশোধন ও পুনর্মিলনই লক্ষ্য। এবং সর্বোপরি মনে রাখতে হবে—আল্লাহ সর্বোচ্চ; তাই পরিবারে অন্যায় করার অধিকার কারও নেই।

আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোকে ন্যায়, ভালোবাসা ও রহমতের উপর প্রতিষ্ঠিত করুন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page